বিশেষ নিবন্ধ

সেই অচলায়তন দেখার জন্যই তৈরি হোন
পি চিদম্বরম

সংসদে অধিবেশনের প্রথম সাধারণ দিনগুলিতেই পরিষ্কার হয়েছে যে আমার সন্দেহ অমূলক ছিল না। যতদূর দেখা গেল, নরেন্দ্র মোদির সরকারের দৃশ্যত কোনও পরিবর্তন হয়নি।  যে সিগন্যাল (পড়ুন: ‘মোদি সরকারে বাস্তবে কিছু‌ই বদলায়নি’, ‘বর্তমান’, ১ জুলাই, ২০২৪) খালি চোখে দেখা যাচ্ছ তার কথা আলাদাভাবে বলার কিছু নেই। এর বাইরে, এটা পরিষ্কার যে প্রাক-নির্বাচন কালের দাবি, অহমিকা, পলিসি, প্রোগ্রাম, স্টাইল, অ্যাটিচুড, প্রতিহিংসার মানসিকতা প্রভৃতি রক্ষা করার ব্যাপারে মোদিজি অনড় মনোভাব নিয়েই চলবেন। সগুলিরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাব আমরা। যথাপূর্বই চলবে তাঁর সরকার। 
পরিতাপের বিষয় এটাও যে, মোদির স্বৈরাচার সংসদের উভয় কক্ষেও দাপাবে বলেই মনে হচ্ছে। সংসদের দুটি কক্ষ ‘ঐকমত্যের’ ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়াই রীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন সেখানে চলার কথা নয়।  আমরা কি মধ্যাহ্নভোজের বিরতি না নিয়ে আজ অধিবেশনের কাজ চালিয়ে যাব? এরকম একটি মামুলি প্রশ্নের মীমাংসা প্রিসাইডিং অফিসার বা হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্জিমাফিক নয়, সর্বসম্মতির ভিত্তিতেই হওয়া দরকার। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, তা সত্ত্বেও, দুই প্রিসাইডিং অফিসার কয়েকশো সদস্যের সমর্থিত একটি মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিকে (এনটিএ) ঘিরে দেশজুড়ে যে একটি মেগা-স্ক্যান্ডাল ঘটে গিয়েছে তার উপর জরুরি আলোচনা করার জন্য। সংসদে অধিবেশনের সূচনা পর্বের এই নজির গত পাঁচবছরের ইতিবৃত্ত মনে করাচ্ছে। ব্যাপারটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
মোদিজির মতলব
পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্ক এবং সংসদের বাইরে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি থেকে সরকারের অভিপ্রায় ও সম্ভাব্য নির্দেশাবলি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কী সেগুলি? দেশ এবারও একজন ব্যক্তিরই হুকুমে চলবে। সেখানে টিডিপি ও জেডিইউ’য়ের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক এবং অন্যান্য ছোট ‘বন্ধু’ দলের বিশেষ কোনও ভূমিকা থাকবে না, তারা ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে কেবল আমোদ প্রকাশ করবে। এমনকী, মোদিজি তাঁর নিজের মন্ত্রীদের এবং সংসদে দুই কক্ষের বিরোধী দলের নেতাদেরও কোনও ‘স্পেস’ দেবেন না। সরকার তার কোনও ভুল স্বীকার করবে না। এই জমানার যাবতীয় ত্রুটি-ব্যর্থতার দায় জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে অতীতের কেন্দ্রীয় সরকারগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন মোদি! একইসঙ্গে, বিজেপির মুখপাত্ররাও আগের মতোই আক্রমণাত্মক এবং অসহ্য হয়ে উঠবেন। টাকার বিনিময়ে ট্রোলের কারবার আরও জোরদার হতে থাকবে, হয়তো তার জন্য খরচাপাতি একটু বেশিই হতে পারে এবার। তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে থামানো হবে না, তার পরিবর্তে সরকারের মতলবি হুকুম তালিম করার ব্যবস্থাই জারি থাকবে।
এটাই পরিষ্কার হচ্ছে যে, ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় ২৪০ আসনে বিজেপি এবং কুড়িয়ে-বাড়িয়ে এনডিএর ২৯২ জন এমপি সংগ্রহের বাস্তব নরেন্দ্র মোদিকে মোটেই দমাতে পারেনি। সাংসদদের কী হবে? এমন একটি উপসংহারে পৌঁছনোর জন্য চারটি দিন অবশ্য খুবই কম সময়। তবে প্রাথমিক ইঙ্গিত যা দেওয়ার তা মোদিজি দিয়ে দিয়েছেন! 
•মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং ঝাড়খণ্ডের বিজেপি তথা এনডিএ সাংসদরা ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন। কারণ ওই তিন রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে এবং আসন্ন ভোটে গেরুয়া শিবিরের কেঁচে গণ্ডূষ হওয়ার দশাই আশঙ্কা করছেন  তাঁরা। মহারাষ্ট্রে ‘মহাযুতি’ সরকারের ধীরে ধীরে ভিতর থেকে ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়েছে। অন্যদিকে, লোকসভা ভোটের রেজাল্টে হরিয়ানায় কংগ্রেস এবং বিজেপি একেবারে সমান-সমান হয়ে গিয়েছে—দু’পক্ষেই আসন সংগ্রহের সংখ্যা হয়েছে ৫টি করে। এরপর আসা যাক, ঝাড়খণ্ড প্রসঙ্গে। সেখানকার হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জামিন পেয়ে গিয়েছেন হেমন্ত সোরেন। সব মিলিয়ে উপর্যুক্ত তিন রাজ্যে ‘ইন্ডিয়া’র পালেই এখন নতুন হাওয়া। 
•এনডিএ বা বিজেপি লোকসভার ভোটে একযোগে ধাক্কা খেয়েছে—পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলিতে। ওদের কপাল 
ভালো যে, ওই রাজ্যগুলিতে শিগগির বিধানসভার নির্বাচন নেই। 
•এবারের সাধারণ নির্বাচনে কেরল এবং তামিলনাড়ুতেও বিজেপি তথা এনডিএ ধরাশায়ী হয়েছে।
•দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, অসম, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং গুজরাতে এনডিএ তথা বিজেপি সাংসদদের মুখের হাসি চওড়া দেখাচ্ছে। কিন্তু ওইসব জায়গায় এনডিএ-ভুক্ত দলগুলি তাদের ‘জোট’ তকমা নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে। সেখানে জোটের আয়ুর দীর্ঘতা নিয়েও সংশয়ে তারা।
আরোহণের পর্বত
বিজেপি জানে, দল হিসেবে নিজেকে ‘নিরাপদ’ করে ফেলার  আগে, আরোহণের মতো একটি পর্বত তার আছে।  একইভাবে, কংগ্রেসেরও একটি পর্বত রয়েছে আরোহণের উপযোগী, তবে কংগ্রেসের পর্বতটাই বেশি বড়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে পারি যে, কংগ্রেস নয়টি রাজ্যে কনটেস্ট করে ৯৯+২ আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে, মোট ১৭০টি লোকসভার আসন রয়েছে এমন নয়টি রাজ্য থেকে কংগ্রেসের সংগ্রহ মাত্র চারজন এমপি। এছাড়া দেশজুড়ে ২১৫টি আসনে কংগ্রেস নিজের প্রার্থী না দিয়ে সেগুলি জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। কংগ্রেস এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোট একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তি গড়ে তুলতে পেরেছে, তবে সরকার ফেলে দেওয়ার মতো পজিশনে তারা নেই।  
এই রাজত্বের চাবিকাঠিগুলি টিডিপি (১৬ এমপি) এবং জেডিইউ (১২ এমপি)-এর হাতে। মওকার অপেক্ষায় এই দুই শরিকই আপাতত কালক্ষেপ করে যাবে।  উভয়ের নজর আসন্ন বাজেটের দিকে। তারা নিজ নিজ রাজ্যের জন্য ‘স্পেশাল ক্যাটিগরি’ স্টেটাসের দাবিতে অনড় থাকবে, কিন্তু মোদিজি তা ওদের দেবেন না। দুটি দলই মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ভোটের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে। আমরা জানি, ওই নির্বাচন মাসকয়েকের মধ্যেই। 
নীতি বিষয়ক অনুমান
অর্থনৈতিক নীতির জন্য, অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলতে কী বোঝায়? ভুল হওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও আমি একাধিক অনুমান করতে পারি:
১. সরকার অস্বীকারের মেজাজে থাকবে। তার অস্বীকারের তালিকায় থাকবে—ব্যাপক বেকারত্ব, শ্রমজীবী নাগরিকের ব্যবহার্য পণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি (বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী), ‘নন-রেগুলার’ এবং ‘ক্যাজুয়াল’ শ্রমিকদের মজুরি বা আয় বৃদ্ধি থমকে যাওয়া, জনসংখ্যার নীচের দিকের ২০ শতাংশের মধ্যে অনড় দারিদ্র্য এবং চরম বৈষম্য। স্বভাবতই, বর্তমান অর্থনৈতিক নীতির আমূল পরিবর্তন বা পুনর্নির্ধারণ হবে না। 
২. সরকার পরিকাঠামো এবং দেখনদারি প্রকল্পগুলিতেই বিনিয়োগ চালিয়ে যাবে।  পরিকাঠামো ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় থেকে অর্থনৈতিক ফায়দা মিলবে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই বেসরকারি বিনিয়োগ না-আসায় বৃদ্ধির হার আহামরি কিছু হবে না, যা হবে তা নিতান্তই মাঝারি মাপের। আশঙ্কা হয় যে, তখন মুখরক্ষার জন্য সন্দেহজনক পরিসংখ্যানের সাহায্যে ব্যাপারটাকে ‘স্বাস্থ্যকর’ হিসেবে দেখানো হতে পারে।   
৩. ভারত সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার বহু চর্চিত বৃদ্ধির ‘চাইবোল’ মডেল অনুসরণ করতে থাকবে। ‘কি সেক্টগুলিতে’ রাজ করবে ব্যবসার ‘মনোপলি’ এবং ‘ওলিগোপলি’ সিস্টেম। ফলে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি মাপের শিল্প-ব্যবসা বা এমএসএমই পড়বে দুর্দশায়। নতুন কাজ বা চাকরির সুযোগ তেমন একটা বাড়বে না। প্রতিবছর চাকরির বাজারে অল্প লেখপড়া জানা এবং অদক্ষ যে লক্ষ লক্ষ যুবক যুবক-যুবতী ভিড় করবেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সবচেয়ে বেশি। 
৪. শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও বনসৃজন, বিজ্ঞান এবং গবেষণা ও উন্নয়নের (আর-অ্যান্ড-ডি) মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে আমূল পরিবর্তন আসা জরুরি। একজন বৃদ্ধ নেতার নেতৃত্বে চলছে দেশে তৃতীয় দফার একটি সরকার। উপর্যুক্ত ক্ষেত্রগুলির প্রতিভাদের আকৃষ্ট এবং অনুপ্রাণিত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। 
নরেন্দ্র মোদি তাঁর বিশ্বাসেই অনড়। সংসদে তাঁর প্রদত্ত ভাষণেও মিলেছে একই ‘প্রতিশ্রুতি’। সুতরাং, সেই অচলায়তন দেখে যাওয়ার জন্যই প্রস্তুত হই আমরা। 
•লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত 
16d ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

চল্লিশের ঊর্ধ্ব বয়সিরা সতর্ক হন, রোগ বৃদ্ধি হতে পারে। অর্থ ও কর্ম যোগ শুভ। পরিশ্রম...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮৩.১৭ টাকা৮৪.২৬ টাকা
পাউন্ড১০৬.৯৩ টাকা১০৯.৬০ টাকা
ইউরো৯০.০০ টাকা৯২.৪৪ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা