বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

ব্যক্তিপুজো!

বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু গেরুয়া শিবিরের সবচেয়ে মূল্যবান ‘ম্যাজিক পণ্য’ যে নরেন্দ্র মোদি, আর একবার যেন তা বুঝিয়ে দিল বিজেপি। কেন একথা উঠছে? নির্বাচন এলে জাতীয়, আঞ্চলিক প্রায় সব দলই ইস্তাহার প্রকাশ করে। সেটাই দস্তুর। বাংলা নববর্ষের দিন, সংবিধানপ্রণেতা আম্বেদকরের জন্মদিনকে স্মরণে রেখে রবিবার সেই ইস্তাহার প্রকাশ করেছে দেশের শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু দলীয় ইস্তাহার বদলে গিয়েছে মোদির ‘গ্যারান্টি’-তে! ৭৬ পাতার বইয়ের প্রচ্ছদে বড় হরফে লেখা ‘মোদি কি গ্যারান্টি-২০২৪’। নীচে লেখা ‘ফির একবার, মোদি সরকার।’ গোটা পুস্তিকায় মোদির ছবি রয়েছে ৫৩টি। তাঁর নাম রয়েছে ৬৫ বার। প্রায় গোটা দেশে বিরোধীদের উদ্দেশে বিজেপির আক্রমণের অন্যতম হাতিয়ার হল ‘পরিবারতন্ত্র’। আক্রমণের লক্ষ্য মূলত কংগ্রেসের গান্ধী পরিবার হলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক দলকেও এই ইস্যুতে আক্রমণ করে বিজেপি বোঝায়, তাদের দল এসবের ঊর্ধ্বে। আরএসএস-বিজেপির ডিএনএ-তে ব্যক্তিপুজোর নাকি স্থান নেই। হিন্দু ভাবধারার আদর্শে পরিচালিত বিজেপিতে দলই শেষ কথা, ব্যক্তি নয়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির জমানায় সেই আদর্শ, সেই ভাবনা তামাদি হতে বসেছে। তা এতটাই যে, ২০১৪ সালে দলীয় ইস্তাহারে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদির নাম ছিল তিনবার। এবার ৬৫ বার! এই বিবর্তনের মধ্যে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, যা পরিবারতন্ত্রের চেয়েও ক্ষতিকর। তাই প্রশ্ন উঠেছে, দলের আগে মোদি, নাকি মোদির উপরে দল? একটি রেজিমেন্টেড শৃঙ্খলাপরায়ণ দলের এমন পরিবর্তন দেখে অনেককে ঠাট্টা করে বলতে শোনা যাচ্ছে, আবার ক্ষমতায় এলে কংগ্রেসের পাশে (আই) এর মতো বিজেপিও কি বিজেপি (এম) হয়ে যেতে পারে? 
কোনও শাসকগোষ্ঠীর ইস্তাহার মানে, গত পাঁচ বছরের শাসনে কী হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে কী কাজ করার পরিকল্পনা তা সবিস্তারে বলা। এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই যে মোদির দশ বছর রাজত্বের পর দেশের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্ব। অথচ মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় কালোবাজারি ও মজুতদারি বন্ধে কড়া পদক্ষেপ করার প্রতিশ্রুতি ছিল আগের ইস্তাহারে। আগে প্রতিশ্রুতি ছিল, কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি করে বছরে ২ কোটি বেকারকে চাকরি দেওয়া হবে। বলা হয়েছিল, বিদেশ থেকে কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেওয়া হবে। আরও প্রতিশ্রুতি ছিল, কৃষকের আয় দ্বিগুণ হবে। এসবের কোনওটাই যে পূরণ করা হয়নি তা ভুক্তভোগী আম জনতা জানে। এসব প্রতিশ্রুতিভঙ্গ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই ‘মোদির গ্যারান্টি’তে। তাই এবার মোদির গ্যারান্টি লেখা ইস্তাহার বা সংকল্প পত্রে চাকরির কোনও গ্যারান্টি নেই। গরহাজির বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি—শব্দ দুটোই। ভোটের আগে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ফের যুব-মহিলা-কৃষকদের স্বার্থরক্ষার কথা বলা হলেও আগের প্রতিশ্রুতিগুলি যে রক্ষা করা হয়নি, তা নিয়ে  কোনও শব্দ খরচ করা হয়নি এবারের ইস্তাহারে। শব্দ চয়নের মারপ্যাঁচে মানুষের মন ভেজানোর চেষ্টা করে ২০৪৭ সালে কী হতে চলেছে সেই স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছে! আগামী পাঁচ বছরে বিজেপি কী করবে তা যতটা না গুরুত্ব পেয়েছে তার থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাস্তব নির্মম সত্যকে আড়াল করার প্রচেষ্টা। নয়া মোড়কে এমন সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যা প্রমাণ করে দিচ্ছে অতীতের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি মোদি সরকার। যেমন বলা হয়েছিল ২০২২ সালের মধ্যে সবার মাথার উপরে থাকবে পাকা ছাদ। তা যে হয়নি তা বলে দিচ্ছে এবারের গ্যারান্টি, যেমন তিন কোটি পাকা বাড়ির প্রতিশ্রুতি। কত মানুষ এখনও ফুটপাতে দিন গুজরান করেন সেই সত্যটা আড়ালে থেকে গেল! এমন অনেক উদাহরণই আছে। 
‘মোদি কি গ্যারান্টি’ আসলে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের ইস্যুগুলি নিয়েই ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার। এর মধ্যে রয়েছে সিএএ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, এক দেশ এক ভোট ইত্যাদি বিষয়। ইস্তাহারে তাৎপর্যপূর্ণভাবে উল্লেখ আছে রামমন্দিরের কথা। অথচ কৃষকের স্বার্থরক্ষার্থে নেই ফসলের ন্যূনতম সহায়কমূল্য অর্থাৎ এমএসপি আইনের প্রসঙ্গ। মোদির ‘গ্যারান্টির’ ইস্তাহারটি আসলে অতীতের মতোই বিজেপি-আরএসএস-এর এজেন্ডা পূরণের ‘গ্যারান্টি’, যে প্রতিশ্রুতিতে আম-আদমির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দিশা নেই। মোদির দশ বছরের রাজত্বে সাধারণ মানুষকে যে দুর্বিষহ জীবন সংগ্রাম চালাতে হচ্ছে তা অতীতের কোনও প্রধানমন্ত্রীর আমলেই হয়নি। তাঁর আধুনিক শক্তিশালী ভারত গঠনের চমকপদ প্রচারে কিন্তু ঢাকা পড়ছে না বাস্তব প্রশ্নগুলি। ২০১৪ এবং ২০১৯-এর ভোটের আগে গেরুয়া শিবির যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কতটা পালন করেছে সে প্রশ্ন উঠবেই। এই অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে প্রকৃত সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা হয়েছে এবারের সংকল্প পত্রে। ’২৪-এ দাঁড়িয়ে ‘মোদি কি গ্যারান্টি’র প্রচারের আলোকে ’৪৭-এর কথা! তখন আজকের বিজেপি নেতারা কোথায় থাকবেন বা আদৌ দল ক্ষমতায় থাকবে কি না, এ ‘গ্যারান্টি’ কে দেবেন? ঈশ্বরের ‘বরপুত্র’ ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ‘নমো’ কি সেই ‘গ্যারান্টি’টাও দেবেন আম জনতাকে? 

16th     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ