বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

চোরাস্রোত

ভোট মানে জনমত যাচাই। আর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সেই জনমত যাচাই শুরু হয়ে যাবে গোটা দেশে। দেড় মাস ধরে এই যাচাইয়ের কাজ শেষ হলেই জানা যাবে, দিল্লির মসনদ এবার কার দখলে থাকবে। বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট, নাকি বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের হাতে। টানা তিনবার ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া বিজেপির এবার মূল নির্বাচনী এজেন্ডা হল, রামমন্দির নির্মাণ তথা হিন্দুত্ব, দুর্নীতিদমন এবং জাতীয়তাবাদ। এর সঙ্গে রয়েছে জি-টুয়েন্টি সম্মেলনের সাফল্য, চন্দ্রযান অভিযানের প্রচারও। নাগরিকত্বের প্রশ্নে সিএএ কার্যকর করার কথাও গেরুয়া শিবিরের প্রচারে উঠে আসছে। এর পাল্টা ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের প্রচারের মূল হাতিয়ার হল, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, মোদি জমানায় অসাম্য ও বিভাজনের রাজনীতির কথা। এই দুই ধারার মধ্যেই একটিকে বেছে নেবেন দেশের ৯৭ কোটি ভোটার। কিন্তু গোপনীয়তা রেখে ইভিএমে মতামত দেওয়ার আগে প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষায় জনতার যে ‘মন কি বাত’ শোনা গিয়েছে, ভোটে তার প্রতিফলন ঘটলে নরেন্দ্র মোদিবাহিনীর ‘প্রাক্তন’ হয়ে যাওয়াটা সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। একথা সকলেরই জানা যে, এদেশের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ গরিব-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাস। এদের মূল চাহিদা হল, নিয়মিত কাজ ও দু’বেলা পেট ভরে খাবারের নিশ্চয়তা। তাই রামমন্দির, হিন্দুত্ব, ধর্মের নামে বিভাজন, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার দাবি, চাঁদে পা রাখার মতো বিষয়গুলি এদের কাছে অনেক দূরের কিছু মনে হওয়া স্বাভাবিক। অনেকটা খালি বা অর্ধেক ভরা পেটে বিলাসিতা দেখানোর মতো। মোদি জমানায় গত দশ বছরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি রিপোর্ট এবং সদ্য প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দেশের এই বিপুল জনসংখ্যার ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ‘নমো’ সরকার। অন্যভাবে বললে, তাদের চরম উপেক্ষা করা হয়েছে।
সেন্টার ফর দ্য স্ট্যাডিজ অব ডেভেলপিং সোসাইটি, সংক্ষেপে সিএসডিএস কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রাপ্য একটি সমীক্ষক সংস্থা। লোকসভা ভোটের প্রেক্ষিতে গত এক সপ্তাহে ১৯টি রাজ্যের ৪০০টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের প্রায় ১১ হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বলে একটি নমুনা সমীক্ষা রিপোর্ট তৈরি করেছে এই সংস্থা। ভোটারদের কাছে তাদের প্রশ্ন ছিল সোজাসাপ্টা—এই নির্বাচনে প্রধান ইস্যুগুলি কী কী? উত্তরে যা উঠে এসেছে, তাতে ঠান্ডা ঘরে বসে থাকলেও মোদি-অমিত শাহদের কপালে ঘাম দেখা দিতে পারে। সমীক্ষায় ৭১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধিতে সংসার চালানোই তাদের কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত গত সপ্তাহে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং তা আরও বাড়তে পারে। এতদিন বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বেকারত্ব মোদি জমানায় রেকর্ড ছুঁয়েছে। সমীক্ষা রিপোর্টও বলছে, গ্রাম-শহর মিলিয়ে ৬২ শতাংশের বক্তব্য, একটা স্থায়ী চাকরি বা নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবিকার সন্ধান করে উপযুক্ত পেশার কাজ পাননি ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ। কেন্দ্রীয় স্তরের সংস্থা সিএমআইআই বলেছে, গত দশ বছরে দেশে বেকারত্ব দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৪-তে যা ছিল ৫.৪৪ শতাংশ, ২০২৩-এর নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.২ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, ভারতে কর্মহীনদের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুব সম্প্রদায়। স্নাতক বেকারের সংখ্যা ১৩.৪ শতাংশ। সিএসডিএস-এর সমীক্ষায় হিন্দুত্ব, রামমন্দির, দুর্নীতিদমন, বিদেশে ভারতের ভাবমূর্তির মতো বিজেপি’র হাতেগরম নির্বাচনী ইস্যুগুলিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ (মাত্র) ভোটার। মোদি সরকারের অন্যতম দাবি, উন্নয়ন। ‘আচ্ছে দিনের’ স্বপ্ন দেখিয়ে পাঁচ বছর আগে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মোদি। কিন্তু সমীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায় হল, এই জমানায় উন্নয়ন হয়েছে শুধু ধনীদের।
আসলে এটাই মোদি সরকারের প্রকৃত ছবি। ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার পথ দেখাতে ব্যস্ত যারা তাদের রাজত্বে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-এর মানবউন্নয়ন সূচকে বিশ্বের ১৯১টি দেশের তালিকায় ভারত রয়েছে ১৩২-এ। ক্ষুধাসূচকে ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১১১তম। আর মাথাপিছু আয়ে বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ১৪১তম স্থানে। আয়ের মাপকাঠিতে জনসংখ্যার ১ শতাংশ ধনকুবের দেশের ৪০ শতাংশ সম্পদের মালিক। অথচ গড়পড়তা আম জনতার আয় কমেছে। এই ছবিটা আদৌ ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে গর্ব করার মতো নয়। আর গণতন্ত্র! সম্প্রতি লন্ডনের একটি সংস্থা সমীক্ষা রিপোর্টে বলেছে, ভারত ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ থেকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’-তে নেমে গিয়েছে। ভারতের স্থান এখন ৪১তম। এ সবই আসলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘অমৃতকাল’-এর নির্যাস। সন্দেহ নেই, ৪০০ আসন জেতার ঘোষণা করলেও মোদি-শাহদের চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মন্দির না মূল্যবৃদ্ধি, হিন্দুত্ব না বেকারত্ব—শেষ বিচারের ভার সেই জনতার হাতে।

13th     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ