বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

অন্য ‘গ্যারান্টি’ দাবি

ইন্দিরা গান্ধী দেশজুড়ে ইমারজেন্সি জারি করেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ থেকে দেশকে রক্ষা করার অজুহাতে তিনি প্রয়োগ করেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫২। এই আদেশ অনুসারে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন তাঁর ইচ্ছাধীন ক্ষমতার অধিকারিণী। তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক দুটি হল—সমস্ত নির্বাচন বাতিল এবং সিভিল লিবার্টি বা নাগরিক স্বাধীনতা খারিজ। তার সুবাদে দ্রুত এবং পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করা হল ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধী রাজনীতিকদের। সেন্সরশিপের আওতায় চলে গেল সংবাদমাধ্যম। সরকারের সমালোচক মিডিয়ার টুঁটি চেপে ধরার পাশাপাশি ফাটকে ভরে দেওয়া হল বহু বাঘা সাংবাদিককে। ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু ওই ২১ মাসে কি দেশ আদৌ শুধরে গিয়েছিল? অন্যদের কথা ছেড়েই দেওয়া যায়, পরবর্তীকালে স্বয়ং ‘লৌহমানবী’রই উপলব্ধি হয়েছিল যে জরুরি অবস্থার সিদ্ধান্তটি ছিল ‘ঐতিহাসিক ভুল’। তিনি পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করেন—দুর্নীতিবাজ, চোরাকারকারি ও অত্যাচারী লোকদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসন আইন মাফিকই অতিকঠোর ব্যবস্থা নিতে পারত, ইমারজেন্সির কোনও দরকার ছিল না। রাষ্ট্রপতি এবং সংবিধানকে সামনে রেখে ওই যে চরম অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তটি তিনি নেন, তার ফায়দা তোলেন ঘোলা জলে মাছ ধরতে অভ্যস্ত কিছু কংগ্রেস নেতা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একাধিক মুখ্যমন্ত্রীও। রাজ্যে রাজ্যে অপছন্দের কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। লোক মুখে এসব শুনে বিমর্ষ ইন্দিরা নির্দেশ দেন, ‘তাঁদের গ্রেপ্তারের কারণ কী জানাও।’ অনুসন্ধান শেষে এটাই জানতে পারেন যে, বিনাকারণে শ’য়ে শ’য়ে কংগ্রেসির জন্য শ্রীঘরবাসের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আর কারণের কথা যদি বলতেই হয়, তা দাপুটে নেতা বা মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবাদ! তিনি আরও খবর পাচ্ছিলেন, তাঁর পুত্র সঞ্জয়ের নাম ভাঙিয়েও কিছু লোক তোলাবাজি এবং আরও নানা কায়দায় অত্যাচার চালাচ্ছিল।
পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা এসব নিয়ে খুবই আপশোস করেন। তিনি বলেন, ওইসব নিরপরাধ কংগ্রস কর্মীকে কারামুক্ত করতে তাঁকে অনেক বেগ পেতে হয়। আরও একটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, এই মওকায় বহু বদমাশ শ্রেণির লোক জার্মানি প্রভৃতি পশ্চিমা দেশে বাগিয়ে নেয় ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’। জরুরি অবস্থার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে পুলিসও। রীতিমতো গুছিয়ে নেওয়া একাধিক নেতা পরে দাবি করেন, তার সঙ্গে জরুরি অবস্থার কোনও সম্পর্ক নেই। জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজন কেন অনুভব করেছিলেন ইন্দিরা? দেশ দীর্ঘকালের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হলেও দেশবাসী বোঝেনি ‘স্বাধীনতা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? অনেকের কাছে স্বাধীনতা মানে যা-খুশি করে বেড়ানো। তারা শুধু সুবিধা ভোগ করতে চায়, কিন্তু তার বিপরীতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বলে একটা জিনিস আছে সেটা তারা স্বীকার করে না। এর জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল অভ্যন্তরীণ গোলযোগ। পরবর্তীকালে ইন্দিরা দাবি করেন, কিন্তু সেসব থামানোর জন্য তিনি সরাসরি ‘ইমারজেন্সি’ ঘোষণা করতে চাননি। তাঁর দুই দায়িত্বশীল এবং আইনজ্ঞ মন্ত্রীর পরামর্শেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নেন। ওই দুই আইনবিশারদের বক্তব্য ছিল, ইমারজেন্সি হবে সংবিধানসম্মত! অতএব সংবিধান লঙ্ঘনের চিন্তা তাঁর মাথাতেই ছিল না। ইন্দিরার আক্ষেপ, পরবর্তীকালে একজন আইনি কুপরামর্শদাতা অবশ্য ওই দায়িত্বের কথা বেমালুম অস্বীকার করেন। ২১ মাসের ইমারজেন্সিতে নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার হরণের জন্য ইন্দিরাকে চরম রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়। সাতাত্তরের সাধারণ নির্বাচনে দেশবাসী ইন্দিরার পার্টিকে ছুড়ে ফেলে দেয়, স্বাধীনতার পর প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত হয় কংগ্রেস। এমনকী, রায়বেরিলিও ফিরিয়ে দেয় ইন্দিরাকে, সেবার গোহারা হন তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুত্র সঞ্জয়ও!
উত্তরকালের রাজনীতির সামনে ঘরের এত বড় পাঠ থেকে কতটুকু শিক্ষা নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি? ২০১৪ সালের ভোট প্রচার থেকে তিনি লাগাতার ‘ভ্রষ্টাচারের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হুংকার দিয়ে চলেছেন। কিন্তু তাঁর দশ বছরের শাসনকালে দেশ থেকে দুর্নীতি যে কিছুমাত্র দূর হয়নি, এই উপলব্ধি তাঁর চেয়ে বেশি কারও হওয়ার কথা নয়। একইসঙ্গে তিনি আরও জানেন, দুর্বৃত্তায়নের ফাঁসে আরও বেশি করে লটকে যাচ্ছে দলীয় রাজনীতি। তার জন্য একক কৃতিত্ব ‘অপারেশন লোটাস’ ছাড়া কেই-বা দাবি করতে পারে? মোদির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ‘কংগ্রেস-মুক্ত’ ভারত, অঘোষিত লক্ষ্যের নাম ‘বিরোধী-মুক্ত’ ভারত। কিন্তু সেই অন্যায় পথে হাঁটতে গিয়ে গোটা দেশটাই পদ্ম-বিরোধী হয়ে উঠছে, এই বোধ হচ্ছে না তাঁর! বিরোধীদের শায়েস্তা করে পাকানো হাত জায়গায় জায়গায় প্রকৃত গেরুয়া ভক্তদের গায়েও পড়ছে না কি? ঘোলা জলের ফায়দা লুটছে না কি কিছু ধান্দাবাজ বিজেপি নেতা এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির মাতব্বর? এখানেই মস্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছে মোদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। এর মাশুল কি ইন্দিরা গান্ধীর মতোই গুনে দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন তিনি? যেসব পণ্ডিতজনের পরামর্শে তাঁর এই ভয়ানক দাপাদাপি, পরে তাঁদের টিকিও খুঁজে পাবেন তো? গ্যারান্টি দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি?

4th     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ