বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

মূল্যবৃদ্ধিতেও ‘গ্যারান্টি’!

দেশে এখন ভোটের মেজাজ। ঢাক পেটানোর যাবতীয় ‘অস্ত্র’ নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে মোদিবাহিনী। একদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ- হিন্দুত্বের প্রচার, অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষকে কতটা ‘ভালো’ রেখেছে দ্বিতীয় মোদি সরকার তা জনসমক্ষে তুলে ধরতে মরিয়া পদ্মশিবির। মনমোহন সিংয়ের জমানার তুলনায় গত দশ বছরে আর্থিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য মিলেছে সেসবেরও ঢালাও প্রচার শুরু হয়েছে। মুশকিল হচ্ছে, এসব করতে গিয়ে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে দেদার অসত্য কথা বলে চলেছেন কোনও কোনও মন্ত্রীসান্ত্রি। মোদি, নির্মলা সীতারামনরা বোঝাতে চাইছেন, এই জমানায় দেশের মানুষ কত ভালো আছেন! কিন্তু এসব করেও সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না। যেমন, দেশজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি যে একটা চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভুক্তভোগী মাত্রই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বস্তুত, নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যের ঠেলায় গরিবের নুন-ভাত জোগাড় করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরই বলছে, ২২ সালের অক্টোবরে খাদ্যপণ্যের দামবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৭ শতাংশ। ২০২৩-এর অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৮.৭ শতাংশ অর্থাৎ দ্বিগুণ। আবার, শহরের তুলনায় গ্রামীণ ভারতে এই বৃদ্ধির হার বেশি। মোদি থেকে নির্মলারা অবশ্য বলেই চলেছেন, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আছে। অথচ ঘটনা হল, সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে গরিব মধ্যবিত্তের সংসার খরচও যে অনেকটাই বেড়েছে, তা উঠে এসেছে খোদ সরকারি তথ্যেই। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত দশ বছরে সাধারণ মানুষের মাথাপিছু মাসিক সংসার খরচ বেড়েছে আড়াই গুণ। কেন্দ্রের রিপোর্টই বলছে, আয়ের ৪২ শতাংশ যাচ্ছে খাদ্যপণ্যে। কংগ্রেস আমলে ২০১১-১২ সালে মানুষের গড় মাসিক খরচ ছিল শহরাঞ্চলে ২ হাজার ৬৩০ টাকা। মোদির জমানায় তা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৪৫৯ টাকা। আবার গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু মাসিক খরচ ইউপিএ জমানার শেষলগ্নে ছিল ১ হাজার ৪৩০ টাকা, যা মোদি জমানায় বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৩ টাকা। শুধু খেতেই মোট আয়ের ৪২.৭ শতাংশ অর্থ চলে যাচ্ছে। তথ্য আরও বলছে, খাদ্যদ্রব্য কিনতে গ্রামের একটি পরিবারের মাসিক আয়ের ৪৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের পরিবারের ৩৯ শতাংশ অর্থ খরচ হয়। এ ব্যাপারে শহর ও গ্রামে সমীক্ষা করেছিল ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন। মূল্যবৃদ্ধিতে দেশ ধুঁকলেও এতদিন তা নিয়ে কোনওরকম হেলদোল ছিল না মোদি সরকারের। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করলেও তাদের হুঁশ ফেরেনি! কিন্তু ভোট বড় বালাই। তাই রিপোর্টটি সামনে আসায় অস্বস্তিতে পড়ে এখন নড়েচড়ে বসেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। কীভাবে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে তার জন্য দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। যে মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুতে ইউপিএ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছিল গেরুয়া শিবির, এবার সেই ইস্যুটিই তাদেরই গলায় ফাঁসের মতো চেপে বসছে। 
অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে, ব্যয় বাড়লে সেই অনুপাতে আয় বৃদ্ধিও হওয়া উচিত। এই প্রশ্নেও অসততার আশ্রয় নিয়েছে মোদিবাহিনী। তারা দেখাতে চাইছে গত দশ বছরে ভারতে মাথাপিছু আয় বেড়েছে দেড় গুণ। অঙ্কের হিসেবে এই তথ্য সঠিক। কিন্তু এর পিছনে যে আসল সত্যটা লুকিয়ে আছে তা কোনওভাবেই সামনে আনতে চাইছে না শাসকদল। কারণ তাতে অসত্য প্রচারের পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে। প্রকৃত ঘটনা হল, মোদি জমানায় ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে। এখন জি-২০ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির মধ্যে সর্বনিম্ন মাথাপিছু আয় ভারতের (২৬০০ ডলার)। আইএমএফ-র হিসাব অনুযায়ী, মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪৩তম। দেখা যাচ্ছে ২০১৩-১৪ সালে দেশের সবচেয়ে বেশি ১ শতাংশ আয়করদাতার আয় ছিল ১৭ শতাংশ। ২০২১-২২ সালে এই ১ শতাংশের আয় বেড়ে হয়েছে ২৩ শতাংশ। এও দেখা যাচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির জেরে ২৫ শতাংশ করদাতার আয় ১১ শতাংশ কমে গিয়েছে। এই তথ্য আড়াল করতে নানাবিধ পথে ক্রমাগত দেশের উন্নয়নের গ্যারান্টি দিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ভোটের মুখে তাঁর নতুন স্লোগান ‘গ্যারান্টি’। সেই গ্যারান্টিরও আবার অভিমুখ দুটি। প্যাকেজ এবং ধর্ম। 
ভোট প্রচারে মগ্ন মোদির দেওয়া ‘গ্যারান্টি’র মধ্যে অবশ্য স্থান পায়নি মূল্যবৃদ্ধিরোধ। সরকারি রিপোর্টেই স্পষ্ট, তাঁর জমানায় আম আদমির সংসার খরচ যতটা বেড়েছে, সেই অনুপাতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের আয় বাড়েনি। মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগামী দিনে তাঁদের কতটা খাবার জুটবে সেই সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে কৃষক আন্দোলন সরকারের স্নায়ুচাপ বাড়াচ্ছে। কৃষক আন্দোলন মাসের পর মাস চললে নিঃসন্দেহে ফসল উৎপাদন কমবে। আর উৎপাদন মার খাওয়ার কারণে চাহিদার তুলনায় ফসলের জোগান কম হলে আবারও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। বলা বাহুল্য, ফসলের ন্যূনতম সহায়কমূল্য (দাবি মেনে) বেঁধে দেওয়ার ক্ষেত্রে মোদি সরকারের টালবাহানার জেরেই আজকের এই পরিস্থিতি। তাই লোকসভা ভোটের মুখে অন্নদাতাদের আন্দোলন বিজেপিকে বিস্তর চাপে ফেলেছে। মূল্যবৃদ্ধির আঁচে আম জনতা পুড়ছে। কৃষকরা পথে। এসব সমস্যার আশু সমাধানের কোনও ‘গ্যারান্টি’ কি দিচ্ছেন ‘গ্যারান্টার’মোদি? 

27th     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ