বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

শৈশবের সঙ্গে শিশুও খুন!

শৈশব খুন হয়ে গিয়েছে আগেই। এবার শৈশবে খুনও হতে হল একটি শিশুকে! শুক্রবার রাতে নৃশংসভাবে খুন করা হল বছর আটেকের একটি ছেলেকে। তাদের বাড়িতেই। ঘটনার সময় সে একাই ছিল সেখানে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিসের তেমনই অনুমান। তদন্তকারীদের বয়ান থেকে জানা যাচ্ছে, ওইটুকু বাচ্চাকে মারতে নেওয়া হয়েছে একাধিক কায়দা। ফলকাটা ছুরি দিয়ে তাকে রীতিমতো খোঁচানো হয়েছে। নরম মাংস তুলে নেওয়া হয়েছে খুবলে খুবলে। ধারালো অস্ত্রটা দিয়ে এমনভাবে তাকে আঘাত করা হয়েছে যে তাতে বেঁকে গিয়েছে ছুরিটাই। উঠোন থেকে ইট তুলে নিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে ছেলেটির মাথা। ঘটনাস্থলে ছিল একটি গণেশ মূর্তি এবং খাবার টেবিলও। মূর্তিটা দিয়ে শিশুর দেহ থেঁতলানোর পাশাপাশি সজোরে আঘাত করা হয়েছে টেবিল দিয়েও। পশ্চিম শহরতলিতে কোন্নগরের এই ঘটনায় স্তম্ভিত সারা বাংলা। নিহত শ্রেয়াংশু চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া। তার বাবা-মা চাকরিজীবী। বাড়ি ফিরতে রোজই তাঁদের সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। তার আগে পর্যন্ত ছেলেটি থাকে তার দাদু-দিদার কাছে। কিন্তু ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তাঁরাও বাড়ি ছিলেন না। শ্রেয়াংশু একাই বাড়িতে ছিল। রাতে তারই এক তুতো দিদি বাড়ি ফিরে শ্রেয়াংশুর ওই করুণ অবস্থা দেখে সবাইকে ডাকে। স্থানীয় একটি হাসপাতালেও দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। পঙ্কজ শর্মা ও শ্রেয়া শর্মা নামে এক দম্পতি এই ঘটনায় সন্তানহারা হয়ে গেলেন। 
ওই বাড়িতে একটি পোষ্য কুকুরও আছে। অচেনা লোকজন দেখলেই সে চেঁচায়। ঘটনার পর প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এদিন কুকুরটিরও তেমন আওয়াজ তাঁরা পাননি। তবে শর্মা বাড়িতে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে বিকট আওয়াজে টিভি চলেছিল। এ থেকে তদন্তকারীদের অনুমান, হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে ওই ফাঁকেই। সব মিলিয়ে রহস্যেরই আঁচ পাচ্ছে পুলিস। নেপথ্যে যে কারণই থাক না কেন, ঘটনাটি নাড়িয়ে দিয়েছে সকলকে। শনাক্ত হওয়ার অপেক্ষায়, আততায়ীরা নিঃসন্দেহে সিনেমার ভিলেনেরও অধিক ভয়ানক! রহস্য ভেদে শর্মা পরিবার আপাতত একটি সম্ভাবনার দিক সামনে এনেছে—পুলকারের মধ্যে এক স্কুলপড়ুয়ার সঙ্গে ঝগড়া। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে শ্রেয়াংশুর সঙ্গে মাঝামারি হয় তার চেয়ে এক ক্লাস উপরের এক পড়ুয়ার। শিশুদের মধ্যে বিবাদ দুই পরিবারের ভিতরে তীব্র কলহ পর্যন্ত গড়ায়। শ্রেয়াংশুর সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণির ওই ছেলেটির মারামারি নিয়ে শর্মা পরিবার সেই বাড়িতে গিয়ে অভিযোগও জানায়। এরপর অভিযুক্ত ছেলেটি নাকি আরও খেপে যায় এবং শ্রেয়াংশুর উপর ফের চড়াও হয় একদিন। একমাত্র সন্তান হারানোর জ্বালা এবং অভিযোগের তর্জনী নিয়ে শুক্রবার রাতেই শর্মা দম্পতি পাগলের মতোই ছুটে গিয়েছিলেন সেই বাড়িতে। পুলিসের তদন্তকারী অফিসারকেও এই অভিযোগ জানিয়েছেন তাঁরা। শনিবার ঘটনাস্থল ঘুরে গিয়েছে পাঁচ সদস্যের ফরেন্সিক তদন্তকারী দল। নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি শর্মাদের বাড়িট‍ি ‘সিল’ করে দিয়েছে পুলিস। সম্ভাব্য সবক’টি দিক ধরেই তদন্তে আন্তরিক পুলিস। রহস্যের কিনারা দ্রুত হবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন চন্দননগরের পুলিস কমিশনার অমিত পি জাভালগি। দোষীরা চিহ্নিত হবে এবং বিচারে তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজাও হবে নিশ্চয়। মানুষ সেটাই প্রত্যাশা করে। শুধু শর্মা দম্পতি তাঁদের প্রাণের ধনটিকে আর ফিরে পাবেন না কখনও। 
এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় থেমে থাকলে সমাজের দুশ্চিন্তা অতটা হতো না। সমাজের আশঙ্কা, মানুষে মানুষে সম্পর্কের পরিবর্তিত ও অধঃপতিত চেহারাটি নিয়ে। মানুষ নিছক এক ‘ছোট’র মধ্যেই সমস্ত ‘সুখ’ খুঁজতে নেমে যা বরণ করে নিয়েছে সেট‍ি একটি ‘ছোট’ মন। সেখানে নিজের ছাড়া আর কারও ভালোর জায়গা নেই। বেশিরভাগ মানুষ এই নিপতিত ভাবনায় সন্তানদেরও জারিত করতে প্রয়াসী। তার ফলে বৃহৎ পরিবারের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে পাড়া কালচার, একে অপরের পাশে দাঁড়াবার মানসিক ও মানবিক পরিসর। খেলার মাঠ, সাঁতারকাটার পুকুর, পাখিদের নেচে গেয়ে বেড়াবার গাছপালা প্রভৃতি হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে, নিঃশব্দে। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে—সহপাঠী, সিনিয়র কিংবা জুনিয়রদের পাচ্ছে কেবল—তাদের মধ্যে প্রাণের ‘বন্ধু’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছে কাকে! বন্ধুহীন শিশুরা নিজেদের খুঁজে পেতে মরিয়া হচ্ছে মোবাইল কিংবা টিভি স্ক্রিনে। তার ফলে ছেলেমেয়েরা ‘স্মার্ট’ হচ্ছে হয়তো কিন্তু অকালেই হারিয়ে ফেলছে তাদের শৈশব। শ্রেয়াংশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরিণতি, অসংখ্য ছেলেমেয়ের হারানো শৈশব সম্পর্কে আমাদের সজাগ হতে বলছে না কি?         

19th     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ