বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
সম্পাদকীয়
 

অপশাসন

হকের বেতনের টাকা চাইতে গিয়ে জুটল নিদারুণ প্রহার। সঙ্গে মালকিনের জুতো মুখে নেওয়ার অভিনব শাস্তি! ঘটনাস্থল, মোদি জমানায় ‘এগিয়ে থাকা’ রাজ্য গুজরাত। প্রধানমন্ত্রী এ রাজ্যের ভূমিপুত্রও বটে। খবরে প্রকাশ, অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মহিলার সংস্থায় ১৬ দিনের কাজের বেতন চাওয়ায় এক যুবককে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। মালকিন তাঁর পায়ের জুতো মুখে নিতে বাধ্য করেন ওই যুবককে। এটা অক্টোবরের ঘটনা। গত জুন মাসে এই রা঩জ্যেই মাঠে খেলা দেখার সময় এক কিশোর বল-এ হাত দিয়েছিল বলে তাকে জাত তুলে গালি দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদ করায় ওই কিশোরের কাকার বুড়োআঙুল কেটে নেওয়া হয়। বছর দুয়েক আগে পিছিয়ে যাওয়া যাক। মোদির রাজ্যে এক মন্দিরে প্রবেশ করায় এক পরিবারের ছ’জনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। বিজেপি শাসিত এই রাজ্যের উনাতে বছরখানেক আগে এক সমাবেশে বর্ণবিদ্বেষের আগুন ছড়িয়ে ১৯ জনকে বেধড়ক মারা হয়েছিল। উপরের প্রতিটি ঘটনায় আক্রান্তদের একটাই পরিচয়, তারা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। উচ্চবর্ণের প্রতিভূ বিজেপির একাংশের চোখে এরা ‘অস্পৃশ্য, ঘৃণার পাত্র-পাত্রী’। তাই ঘৃণার আগুন গুজরাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিজেপিশাসিত অন্য দুই ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্য উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাল ২০১৯। মধ্যপ্রদেশের শিবপুরি জেলার এক অজ গ্রাম। এ গ্রামে দলিত বাড়িতে শৌচাগার নেই। ফলে গ্রামের পুরুষ-নারী প্রকাশ্যে মলত্যাগ করতে বাধ্য হন। এখানেই একদিন ১০ ও ১২ বছরের দুই কিশোরী মাঠের মাঝে সেই কাজ করায় তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে উচ্চবর্ণের লোকেরা। ধরা যাক, সঞ্জয়ভাই পারমারের কথা। শখ করে গোঁফ রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু একজন দলিত কোন সাহসে গোঁফ রাখে, এই অজুহাতে তাঁকে গোঁফ কাটতে বাধ্য করা হয়। এমন অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে অন্যত্রও। মোদি জমানায় কোনও কোনও ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যে অপশাসনের জেরে একেবারে জঙ্গলের রাজত্ব চলছে। সেখানে দলিত নিগ্রহ মাত্রাছাড়া, হেলদোল নেই পদ্মশিবিরের! 
হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত সবচেয়ে নিম্নবর্ণের প্রতি শাসকদলের সমর্থকদের একাংশের নানাবিধ অত্যাচার ও ঘৃণাবর্ষণের নজির যে ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলিতেই বেশি তা অস্বীকার করা যাবে কি? গতবছর লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায়মন্ত্রক যে রিপোর্ট পেশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, মোদি জমানায় দলিতদের উপর অত্যাচার কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০১৮ থেকে ’২০ এই তিন বছরে দলিত, তফসিলি জাতি-উপজাতিদের উপর অত্যাচারের মামলার নিরিখে প্রথম দুটি স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ। লক্ষণীয় বিষয় হল, অত্যাচার, ঘৃণা, অস্পৃশ্যতার এমন নগ্ন প্রদর্শন চললেও ভোট রাজনীতির ময়দানে এই বিজেপিই আবার ‘দলিত-দরদি’ সেজে মাঠে নেমে পড়ে! যেমন দেখা গিয়েছে, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রে। এক দলিত যুবককে প্রস্রাব খেতে বাধ্য করেছিল উচ্চবর্ণের এক ব্যক্তি। এই নিয়ে দেশজুড়ে হইচই হতেই রাজ্যে বিধানসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী ওই যুবককে নিজের বাসভবনে ডেকে ক্ষমা চেয়ে পা ধুয়ে দেন। এই একই লক্ষ্যে অর্থাৎ ওবিসি ভোট নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদি নিজেকেই নাকি ‘ওবিসি’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। এমনিতে বিজেপি হিন্দু, উচ্চহিন্দু জাতির পার্টি বলে পরিচিত। কিন্তু শুধু এই পরিচয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যাবে না বুঝেই ভোটের রাজনীতিতে তোষণের কৌশল নিয়েছে বিজেপি। প্রথমে আদিবাসী, তারপর তফসিলি, তারপরে ওবিসিদের নথিভুক্ত করছে ফাঁদ পেতে। বলা যায়, এই কাজে তারা সফলও। উদাহরণ, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৩৭.৪ শতাংশ। এর মধ্যে ওবিসি ভোট ছিল ৪৪ শতাংশ। 
নির্মম সত্য হল, ওবিসির ভোট বেশি পেলেও তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানতে জাতভিত্তিক জনগণনায় রাজি নয় বিজেপি। খুব সম্প্রতি বিহার সরকার জাতভিত্তিক গণনা রিপোর্ট প্রকাশ করার পর মোদি সরকার তাদের চিরাচরিত অনড় অবস্থান প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়। কারণ সেই ভোটের রাজনীতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে শেষ জাত গণনা হয়েছিল ১৯৩১ সালে। তার ভিত্তিতেই মণ্ডল কমিশন বলেছিল, ভারতের জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত। এই অবস্থায় নতুন করে জাত গণনা হলে যদি দেখা যায়, ওবিসির সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি তাহলে সেই হারে সংরক্ষণ দেওয়ার দাবি উঠবে। বিজেপি বলছে, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় ওবিসিদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করলে জেনারেল ক্যাটাগরি বা উচ্চবর্ণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে। এতে বিজেপির নিজস্ব উচ্চবর্ণের ভোট ব্যাঙ্ক হারানোর ভয় আছে। এই অঙ্কেই জাত গণনায় প্রবল আপত্তি মোদিবাহিনীর। জাত গণনা নিয়ে বিজেপির অবস্থানে এটা স্পষ্ট, ভোটের রাজনীতিতে ওবিসি-মুসলিমদের মতো নিচু শ্রেণি-সংখ্যালঘু-জনজাতি সম্প্রদায়গুলিকে প্রয়োজন হয় বিজেপির। তাদের অসত্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোভ দেখিয়ে ভোটও পায় গেরুয়াবাহিনী। কিন্তু বাস্তবে এই পিছিয়ে পড়াদের অবদমিত করে, তাদের উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েই দাবিয়ে রাখার নীতি নিয়ে চলছে সেই বিজেপিই। যারই প্রতিফলন বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে দলিত নির্যাতনের ঘটনা। 

26th     November,   2023
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ