বিশেষ নিবন্ধ

বাজেট: মধ্য ও নিম্নবিত্তের একবুক আশা
শান্তনু দত্তগুপ্ত

হরিপদ কেরানির জীবনের লক্ষ্য কী ছিল? একটাই—উপার্জনের প্রতিটা আনা-পাই বাঁচানো। খাই খরচ বাঁচাতে তিনি পড়াতে যান দত্তদের বাড়ি। ছেলে পড়িয়ে যা পাওয়া যায়, সেটাই দিয়েই পেটের অন্তরাত্মাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে নেন। কেরোসিনের খরচ কমাতে সন্ধেটা কাটান শিয়ালদহ স্টেশনে। লোহার গরাদ দেওয়া একতলা ঘরখানির ভাড়া গুনে থাকেন তিনি। আর তাকিয়ে থাকেন টিকটিকিটার দিকে। একই ভাড়ায় সেও যে এখানেই থেকে গিয়েছে। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। ফারাক শুধু একটাই—ওর অন্নের অভাব নেই। কে এই হরিপদ? ‘বেতন পঁচিশ টাকা,/ সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।’ আশপাশের ছোট্ট, টালিভাঙা কুঁড়েতে খুঁজলেই পাওয়া যাবে তাঁকে। তিনি মধ্যবিত্ত, বা নিম্নবিত্ত। তিনিই সমাজের সবচেয়ে দুচ্ছাই করা শ্রেণি। অথচ হারকিউলিসের মতো পৃথিবীটাকে ধরে রাখেন নিজের কাঁধের উপরে। চাকরি করে যা ইনকাম হয়, তাতে সংসার চলে না তাঁর। কিন্তু রাজার খাজনা বাকি রাখতে পারেন না... কর দিতে হয় তাঁকে। আয়কর। সরকার বাহাদুরের প্রণামী বাক্সে ওই টাকাটা ঢেলে দেওয়ার সময় ভাবেন, এইবার কিছু উন্নতি হবে। তাঁর, সমাজের, দেশের। তারপর আবার দুশ্চিন্তার পাহাড় মাথায় চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েন কাজে। প্রতি বছর বাজেটের আগে আশায় থাকেন, এবার সরকার তাঁর জন্য কিছু রাখবে। জিনিসপত্রের দাম কমবে, মধ্যবিত্তের জন্য নতুন কোনও কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু হবে, কিংবা আয়করে ছাড় মিলবে। কিন্তু প্রতিবার হতাশ হন হরিপদরা। নাঃ, এবারও যে বাজেটে তাঁর জন্য কিছু নেই! গত ১০ বছরের এটাই ট্রেন্ড। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত এই এক দশকে কেমন একটা যেন সেকেন্ড ক্লাস নাগরিক হয়ে গিয়েছে। রবি ঠাকুর যে সময়ে ‘বাঁশি’ লিখেছিলেন, ক্যালেন্ডারের পথ ধরে আজ আমরা পিছিয়ে গিয়েছি ঠিক সেখানেই। হরিপদকে ‘না পাওয়া’ সমাজের প্রতিনিধি 
হিসেবে তুলে ধরেছিলেন কবিগুরু। কিন্তু তিনি জানতেন না, একশো বছর পরেও হরিপদর জায়গা কেউ নিতে পারবে না। সে তখনও এই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি হয়েই থেকে যাবে। মাটির তলা দিয়ে ট্রেন গড়াবে, পরমাণু বোমা পড়বে, রোবট জায়গা নিয়ে নেবে মানুষের, প্রযুক্তি পাড়ি দেবে মঙ্গলে... কিন্তু হরিপদ থাকবে হরিপদতেই। নাঃ, রবি ঠাকুর একথা জানতেন না। আর আজকের শাসককুল সেটা জেনেও জানতে চান না। অন্তত যতক্ষণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। 
সময় কি বদলাচ্ছে? মোদি সরকারের ট্যাগলাইন খসে এনডিএ শিরোনামে আসা মাত্র যেন হাওয়া বদলের একটা গন্ধ চারদিকে। ৪০০ পারের স্বপ্ন ২৪০’এ আছড়ে পড়ার পর সরকার বাহাদুরের বোধহয় মনে হয়েছে, মধ্যবিত্ত ডোবাল। তা না হলে রাজ্যে রাজ্যে এভাবে হারের স্বাদ গিলতে হতো না। হিসেবের বাইরে চলে যাওয়া চারটি রাজ্য কোনওমতে বাঁচিয়ে দিয়েছে। না হলে ২০০’র নীচেই নেমে যেত বিজেপি। কোন চারটি রাজ্য? অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা এবং দিল্লি। এর মধ্যে প্রথম দু’টি রাজ্যে শরিক বন্ধুদের ভূমিকা মারাত্মক। প্রতি মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদি তা উপলব্ধি করছেন এবং তাঁদের সেই উষ্ণতা ফিরিয়েও দিচ্ছেন। কিন্তু মুখেন মারিতংয়ে দেশবাসী ভুলতে পারে, শরিকরা কি ভুলবেন? তাঁরা থাকবেন যথাযথ উত্তরের অপেক্ষায়। আর তা মিলবে ২৩ জুলাই। বাজেটে। এ পর্যন্ত যা শোনা যাচ্ছে, চন্দ্রবাবু নাইডু-নীতীশ কুমারদের জন্য বড়সড় প্যাকেজের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। কিন্তু শুধু দুই শরিককে প্যাকেজ ধরালে বড্ড চোখে লাগে। এবার বিরোধীরা আর দুধ-ভাত নয়। চেপে ধরবেই। তাই অন্য দু’-একটি রাজ্য যদি এই সুযোগে প্যাকেজ নামক উপঢৌকন পেয়ে যায়, অবাক হবেন না। খানিক প্রলেপ, আর বাকি সবটা কার্যসিদ্ধি। এটাই জোট সরকারের পাখির চোখ। 
কিন্তু আম জনতা?
নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর যেন মূল্যবৃদ্ধি আরও বেশি করে মাথাচাড়া দিয়েছে। সব্জির দাম এক মাসেই বেড়েছে দেড় থেকে দু’গুণ। ডাল-তেলের দাম মাছ-মাংসের সঙ্গে একাসনে বসেছে। পেট্রল-ডিজেল এবং রান্নার গ্যাস যে শৃঙ্গ জয়ে বেরিয়েছিল, সেখান থেকে আর ফেরেনি। বেকারত্ব নিত্যদিন রেকর্ড গড়ছে। আর চাকরিজীবীদের আয়? কোভিডের সময় একটা বড় ধাক্কা লেগেছিল। সেই ঘা এখনও শুকোয়নি। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, অথচ সেই তুলনায় মাথা তুলে দাঁড়ায়নি বেতনের বহর। ফল? ব্যয় বৃদ্ধি ও সঞ্চয়ে ঘাটতি। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির জমানো টাকা যা ছিল, তার বেশিরভাগটাই ঢুকে গিয়েছে সংসারে। আগে তাও এই শ্রেণি কষ্ট করে হলেও কিছু টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করত, কিছু জমা রাখত এমআইএসে, কিছু কিষান বিকাশে। কারণ, সম্মানজনক সুদের হার। এই জমানায় সেটাও আর নেই। ফলে শেয়ার বাজারের ফাটকায় ঝুঁকে পড়া ছাড়া মধ্যবিত্তের হাতে উপায় বেশি থাকছে না। তাহলে রইল বাকি? ক্ষীণ আশা... যদি বাজেটে সরকার কিছু দেয়। ক্ষীণ কেন? নরেন্দ্র মোদির খানিক সুনাম আছে। তিনি যা করেন, কর্পোরেট বন্ধুদের জন্য। আর কিছু পড়ে থাকলে প্রান্তিক শ্রেণি। কর্পোরেট কর ছাড় নীতি, সরকারি সংস্থাকে বোতলবন্দি করে বেসরকারি জগৎকে পাইয়ে দেওয়া চলে একদিকে। আর উল্টো পিঠে গরিব ও দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষের জন্য সরকারি প্রকল্প। তাও অবশ্য ঋণসর্বস্ব। কেন এই দুই শ্রেণিই নিরন্তর সরকারের ভালোবাসার ভরকেন্দ্র হয়ে থাকে? উত্তর খুব সহজ। প্রথম পক্ষ অর্থে-অনর্থে সরকারের ঠেকনা। আর দ্বিতীয় শ্রেণি ভোটব্যাঙ্ক। দরিদ্র যে মানুষজন সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকে, তারা দেশের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি। বাকি যে ১৫-২০ শতাংশ মধ্য ও নিম্নবিত্ত! তাদের কথা অতটা না ভাবলেই বা কী?
কিন্তু এবার ভাবতে হচ্ছে। কারণ, এরাই হয়ে উঠছে নির্ণায়ক শক্তি। প্রতিটা রাজ্যে, জনপদে। আসন্ন বাজেটের পাইপলাইনে তাই চলে এসেছে অনেকগুলি মধ্যবিত্ত-নির্ভর প্রস্তাব। শোনা যাচ্ছে অনেক কিছু। যেমন, ১) আয়করে স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হতে পারে ১ লক্ষ টাকা। এই প্রস্তাব এলে কম বেতনের বহু মানুষ উপকৃত হবেন। এক ঝটকায় অনেকেই আয়করের আওতার বাইরে চলে আসবেন। মূল্যবৃদ্ধির এই আগুনে যা কিছুটা মলম তো বটেই। ২) সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এখন আয়কর দিতে হয় না। সেই অঙ্কটা নাকি ৫ লক্ষ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই পদক্ষেপ নিলে মানুষের হাতে কিছুটা হলেও টাকার জোগান বাড়বে। বাড়তি টাকা হাতে এলে তার খরচ ভোগ্যপণ্যের উপর হবে। অর্থাৎ বাজার অর্থনীতি ঘুরবে। পণ্যের ডিমান্ড তৈরি হলে সেই অনুপাতে সাপ্লাই বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে উৎপাদন সংস্থাগুলিও নড়েচড়ে বসবে। আর তার থেকে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। পুরোটাই একটা চেইনের মতো। একের সঙ্গে অপর জড়িত। ৩) পিপিএফের মতো স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের বার্ষিক জমার ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি। এ পর্যন্ত যা শোনা যাচ্ছে, অঙ্কটা ৫০ হাজার বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বছরে দেড় লক্ষের পরিবর্তে দু’লক্ষ টাকা একজন চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত পিপিএফে রাখতে পারবেন। এবং সেই টাকাটাও করমুক্ত। এখানে প্রশ্ন হল, ৮০সি ধারায় একজন করদাতা তো দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্তই ছাড় পেয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে এর ঊর্ধ্বসীমাও দু’লক্ষ টাকা হওয়ার সম্ভাবনা একটা দেখা দিচ্ছে। ৪) আয়করের নতুন রেজিমে স্ল্যাব বদলের কানাঘুষোও শোনা যাচ্ছে দিল্লির দরবারে। ৫) জমা আমানতে সুদ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত থাকলে, তার উপর এখন কর দিতে হয় না। এই অঙ্কটা ২৫ হাজার টাকায় নিয়ে যাওয়ার ভাবনাচিন্তা করছে এনডিএ সরকার। 
এই ভাবনাচিন্তার অর্ধেকও যদি কাগজে কলমে নথিভুক্ত হয়, তাহলে সংশয় থাকবে না যে, বিজেপিও মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। হলই বা পাঁকে পড়ে। তাও ভাবছে তো! ঠিক যেভাবে এখন দরদ দেখা যাচ্ছে মহিলা ও কৃষকদের নিয়ে। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচন দেখিয়েছে, মহিলা ভোটাররা এখন আর পরিবারের বড় কর্তার কথামতো কলের পুতুল হয়ে ভোট দিচ্ছেন না। তাঁরা বাড়ছেন। সংখ্যায়। আত্মবিশ্বাসে। তাঁদের ভোট বদলে দিচ্ছে 
এক একটি কেন্দ্রের ভাগ্য। আর কৃষক? এই একটি ইস্যু বিজেপিকে গত কয়েক বছরে বারবার ডুবিয়েছে। এবারও অন্যথা হয়নি। তাই চলতি বছরের শেষ থেকে যেসব রাজ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য কোমর বাঁধা হচ্ছে, তার খুঁটিপুজো বাজেটেই করে দেবে ভারত সরকার। দেশের জন্য না হোক, ভোটের জন্য তো বটেই।
২৯ জুন মাঝরাত। রাস্তার একধারে বাইকটা পার্ক করে রাখা আছে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে নেচে চলেছেন ভদ্রলোক। গায়ের টি-শার্টটা হাতে তাঁর। ঘোরাচ্ছেন তিনি আনন্দে। ঠিক যেমন লর্ডসের ব্যালকনিতে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ঘুরিয়েছিলেন। বাইকের সিটে বাঁধা ব্যাগটা বলছে, তিনি ফুড ডেলিভারি বয়। ভারতের বিশ্বজয়ের খবর পাওয়া মাত্র আবেগ আর আটকে রাখতে পারেননি। এত রাতে খাবার ডেলিভারি করলে বাড়তি কয়েকটা টাকা পাওয়া যাবে... বাড়িতে হয়তো তাঁর জন্য অপেক্ষায় বসে থাকবে কোনও মা বা কোনও দুধের শিশু। তিনি খেটে যাবেন উদয়াস্ত। চেষ্টা করবেন, দুটো টাকা যদি বাড়তি উপার্জন করা যায়। তার মাঝে ভারতের জয়ে আনন্দ... এই আবেগের বিস্ফোরণ যে অন্তর থেকে। এই এক মুহূর্তে এসে আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির ভেদ থাকে না। কিনু গোয়ালার গলির ওই ছেঁড়াছাতার সঙ্গে মিলে যায় রাজছত্র। মধ্যবিত্ত? নিম্নবিত্ত? জানা নেই। কিন্তু এঁরাই যে ধরে ধাকেন দেশকে। অর্থনীতিকে। আবেগকে। ‘এ গান যেখানে সত্য/অনন্ত গোধূলিলগ্নে’।
15d ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

চল্লিশের ঊর্ধ্ব বয়সিরা সতর্ক হন, রোগ বৃদ্ধি হতে পারে। অর্থ ও কর্ম যোগ শুভ। পরিশ্রম...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮৩.১৭ টাকা৮৪.২৬ টাকা
পাউন্ড১০৬.৯৩ টাকা১০৯.৬০ টাকা
ইউরো৯০.০০ টাকা৯২.৪৪ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা