বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

সোনায় সোহাগা

স্বর্ণে বসতে লক্ষ্মী। বাঙালির মনে এই ধারণা বদ্ধমূল। তাই তো গয়না থেকে সম্পত্তি, সবক্ষেত্রেই কনক-কদর।  লিখেছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
 
ভারতে সোনার গয়নার প্রচলন অন্তত ছ’হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাস বলে, সেই সময় নাগাদই সোনার সাজ ধনীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ছাড়াও সোনা দিয়ে গয়না ও অন্যান্য শখের জিনিসপত্র বানানোর চল দেখা গিয়েছিল চীন, মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, রোম  ও মিশরে।  এরপর আবার একটা  সময় আসে  যখন সোনা অলঙ্কার রূপে মূলত রাজা ও রানিদের অঙ্গে শোভা পেত। গ্রিসে নাকি রাজারা বর্ম বানানোর জন্যও সোনার পাত ব্যবহার করতেন। আর রানিদের মাথায় সোনার মুকুট, সেও তো বহু পুরনো রীতি।

ইতিহাস অনুযায়ী দেখা যায়, প্রথম দিকে সোনার গয়নায় দামি পাথর বসানোর চল খুব একটা ছিল না। তখন সোনার বর্ম বা মুকুটে তেমন কারুকাজও দেখা যেত না। বরং পাতের মতো করে সোনার প্লেট বানানো হতো এবং সেই প্লেটই বিভিন্ন গয়নায় রূপান্তরিত হতো। তবে বর্ম বা মুকুট যাই হোক না কেন তাতে সামান্য খাদ মেশানোর চল সেই আদি যুগেও ছিল। নাহলে  গয়নার সোনাকে মজবুত করে বানানো যেত না।
এবার একটু দেশের গয়না ও তার নকশার দিকে চোখ ফেরানো যাক। ভারতে সোনার বর্ম থেকে গয়না সবেতেই কারুকাজ শুরু হয় মোগল সাম্রাজ্যের কয়েক দশক আগে থেকে। মুসলমান কারিগররা প্রথম জাফরির কাজ ও জালের কাজ শুরু করেন। তবে এই ধরনের কারুকাজ মূলত মহিলাদের গয়নাতেই দেখা যেত। এর কিছু সময় পর বাংলায় সোনার গয়নায় গোলাপ ফুল নকশা, জুঁই ফুল নকশা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। 
আবারও একটু গয়নার ইতিহাস কথায় ফেরা যাক। মোটামুটি তিন হাজার বছর আগে মেসোপোটেমিয়ায় চওড়া নেকলেস রাজপরিবারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই নেকলেসের মাঝে চুনী, পান্না এবং হীরে বসানো শুরু হয় তার বেশ কয়েক দশক পরে। নেকলেসের নকশায় ভারতীয় ছাপ পড়তে শুরু করেছিল বাবুয়ানার সময় থেকে। তখন নেকলেসের নকশায় একটু জালি কাজ দেখা যেতে শুরু করেছিল।    
ক্রমশ সোনার গয়না রাজপরিবার ছেড়ে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সেই সময় মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষ মহলেও সোনার টুকটাক গয়না পরার রেওয়াজ দেখা যাচ্ছিল।  বাংলায় যখন ‘বাবু’-দের বেশ রমরমা, সেই সময় গলায় সোনা বাঁধানোর মুক্তর হার, কানে সোনার মোটা মাকড়ি ইত্যাদি পরতেন বাড়ির পুরুষরাও। অনেকে আবার সলিড সোনার চওড়া হারও পরতেন। কেউ বা হাতেও রুলি নকশার বালা পরতেন। 
মহিলাদের পরনে উঠত পাটি হার, কান বালা, কান পাশা, চওড়া চূড়, মোটা বালা ইত্যাদি। একটু চওড়া গলা ভরা গয়না গড়াতেন বনেদি বাড়ির মহিলারা। সোনার গয়নায় চেনের নকশা কিন্তু সম্পূর্ণই বিদেশি। রোমান সাম্রাজ্য যখন প্রায় শেষের দিকে, মোটা চওড়া সোনার পাত দিয়ে গয়না গড়ানোর আর ক্ষমতা নেই রাজাদের, সেই সময়ই মুক্তো ও চেনের প্রচলন শুরু হয়েছিল রোম দেশে। পরে তা-ই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।  
রাজারাজরা বা বাবু-বিবিদের ছেড়ে যদি মধ্যবিত্ত পরিবারের  দিকে চোখ ফেরানো যায় তাহলে দেখা যাবে যে, সেখানে সোনার গয়না গড়ানো কিন্তু চিরকালই ‘ইনভেস্টমেন্ট’। একটা সময় ছিল যখন  মহিলারা সে অর্থে রোজগেরে হয়ে ওঠেননি, মেয়ের বিয়ের সময় সাধ্যমতো গয়না দিতেন বাবা মা। সেই গয়নাই ছিল নববধূর ‘স্ত্রীধন’। বিপদেআপদে সেই স্ত্রীধনের উপরেই ভরসা করত মধ্যবিত্ত গৃহিণী। শ্বশুরবাড়িতে নতুন বউটির জোর ফলানোর মূল ছিল ওই ‘স্ত্রীধন’,বিষয়টা এভাবে দেখার চলও ছিল। 
বাড়ির গিন্নিরা ক্রমশ অনেকাংশে রোজগেরে হয়েছেন ঠিকই, তবু আজও সোনাকে মধ্যবিত্ত পরিবারে ইনভেস্টমেন্ট হিসেবেই ধরা হয়, জানালেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার। তাঁর কথায়, ‘উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মূলত তিন ক্ষেত্রে লগ্নি করে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লগ্নি হয় সোনায়। অন্য দু’টির এক হল স্টক মার্কেট, আর দুই ডলার। সাধারণত দেখা যায় স্টক মার্কেট যখন অতিরিক্ত ওঠানামা করে তখন সোনায় বিনিয়োগ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, বিগত কয়েক দশকে সোনার দাম খুব একটা বেশি কমেনি। মাঝেমধ্যে একটু আধটু পড়লেও সোনার দামের ট্রেন্ড মূলত ঊর্ধ্বমুখী। সেই কারণেই মধ্যবিত্তর কাছে সোনা হল ‘সেফ ইনভেস্টমেন্ট’ বা নিরাপদ লগ্নির উপায়।’ 
তিনি আরও বলেন, সোনার এই যে নিরাপদ লগ্নির উপায় হওয়া, এর ভালো ও খারাপ দুটো দিকই রয়েছে। ভালো দিক হল, এর দাম মোটামুটি ঊর্ধ্বমুখী, ফলে এতে লগ্নি করলে ক্ষতির চেয়ে লাভের সম্ভাবনাই বেশি। একইসঙ্গে সেই লাভের হার স্টক মার্কেটের তুলনায় কম। অর্থাৎ স্টক মার্কেট যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে তখন তাতে লগ্নির বিনিময়ে লাভের হার যতটা হয়, সেটা সোনার ক্ষেত্রে কখনওই ততটা হয় না। একইসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে, স্টক মার্কেট হঠাৎ পড়ে গেলে যতটা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, সোনার দাম কখনও সেই হারে পড়ে না। এছাড়া সোনাকে মধ্যবিত্ত পরিবারে সম্পত্তি হিসেবেও ধরা হয়। ফলে সোনায় ইনভেস্ট করার সেটাও একটা কারণ। আর একটা কারণও রয়েছে সোনায় লগ্নি করার, তা হল এর রিসেল ভ্যালু বা বিক্রয়মূল্য। অন্যান্য সব ধরনের গয়নার তুলনায় সোনার বিক্রয়মূল্য যেহেতেু বেশি, মধ্যবিত্ত বিপদকালের ভরসা হিসেবে সোনা কেনে। 
এখন প্রশ্ন হল, গয়নার সোনার রিসেল ভ্যালু কতটা? গয়নায় যেহেতু সামান্য খাদ মেশানো হয় তাই তার বিক্রিয় মূল্য সামান্য হলেও সোনার বাটের তুলনায় কম হবে। অভিরূপবাবু বললেন, ‘এক্ষেত্রে যেটা দেখার তা হল, গয়নার সোনার ক্যারেট। সাধারণভাবে সোনার বাট হলে তা ২৪ ক্যারেটের হয়। গয়নার ক্ষেত্রে যদি খাদ মেশানোর পরেও ২২ ক্যারেট সোনা থাকে তাহলে অবশ্যই তার বিক্রয়মূল্য বেশি হবে। ক্যারেট যত কমবে রিসেল ভ্যালুও ততই কমবে।’ 
এছাড়াও মধ্যবিত্ত আর এক উপায়েও সোনায় লগ্নি করতে পারে, তা হল গোল্ড বন্ড কিনে। এই বন্ডের মূল্য সোনার দামের উপর নির্ধারিত হয়। এতে সোনা কেনার প্রবণতা খানিকটা হলেও কমে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে এই বন্ড কেনা ও তার মূল্য নির্ধারণের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় যা বিভিন্ন ব্যাঙ্কের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছয়। 
‘স্ত্রীধন’ মারফত সোনার উপর মধ্যবিত্ত গৃহবধূর যে ভরসার সূত্রপাত হয়েছিল সেই ভরসাই আজও তাদের মনে অটুট রয়েছে। বিয়ে হোক বা অন্য যে কোনও শুভ অনুষ্ঠান, সোনার ছোঁয়ায় তা সম্পূর্ণ রূপ পায়। তাই তো আজও সোনাই নারীর সোহাগ, সোনাই সম্বৃদ্ধি।

গো ল্ড  ব ন্ড

যাঁরা সরাসরি সোনা কিনতে চান না, সোনায় লগ্নিতে তাঁদের দু’টি অন্যতম মাধ্যম গোল্ড বন্ড এবং গোল্ড ইটিএফ। এর মধ্যে গোল্ড বন্ড বিক্রি হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগে। তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর গোল্ড বন্ড বাজারে আনে। ইন্ডিয়ান বুলিয়ান অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া সোনার দাম অনুযায়ী ওই বন্ডের দর ঠিক হয়। বন্ড কেনার আগের শেষ তিনটি কাজের দিনে সোনার যে দাম থাকে, তার গড় করেই সাধারণত দর ঘোষিত হয়। এক গ্রাম সোনার যে দাম হয়, ন্যূনতম সেই অঙ্কের বন্ড কেনা যায়। যাঁরা ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে সেই বন্ড কেনেন, তাঁরা সেই দামের উপর আরও ৫০ টাকা ছাড় পান। যে কোনও বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক থেকে গোল্ড বন্ড কেনা যেতে পারে। তবে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক এবং পেমেন্টস ব্যাঙ্ক থেকে তা কেনা যায় না। নির্দিষ্ট কয়েকটি পোস্ট অফিস থেকেও তা কেনার সুযোগ মেলে। এছাড়া স্টক হোল্ডিং কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড থেকেও কেনা যায় বন্ড। সেবি স্বীকৃত স্টক এক্সচেঞ্জ, যেমন বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ বা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে গোল্ড বন্ড কিনতে পারবেন সাধারণ মানুষ। এই বন্ড কিনতে প্যান কার্ড থাকা আবশ্যক। লগ্নির উপর বাৎসরিক ২.৫ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যায়। আট বছর পর মেয়াদ শেষে বন্ড ভাঙিয়ে টাকা নেওয়া যায়। সেই সময় সোনার যে বাজারদর থাকবে, বন্ডের মেয়াদ শেষের শেষ তিনটি কাজের দিনে সেই দামের গড় করে, টাকা ফেরত দেওয়া হয় গ্রাহককে। গোল্ড বন্ডের ক্ষেত্রে যে বাৎসরিক ২.৫ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যায়, তা আয়করযোগ্য। কিন্তু মেয়াদ শেষে সোনার দাম বাবদ যে থোক টাকা পাওয়া যায়, তা আয়কর আইনে ছাড়যোগ্য। অন্যদিকে যেভাবে শেয়ার বাজার থেকে সাধারণ মানুষ শেয়ার কেনেন, সেভাবেই কেনা যায় গোল্ড ইটিএফ বা এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড। তার জন্য দরকার ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট। এক গ্রাম সোনার দরেই কেনা যায় ইটিএফের ইউনিট। তার থেকে পাওয়া থোক টাকা আয়করযোগ্য এবং মূলধনী লাভ হিসেবে কর দিতে হয় গ্রাহককে। যেভাবে বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন ট্রেডিং হয়, এখানেও একই পদ্ধতিতে তা হয়। ব্রোকারের সাহায্যে গ্রাহক তাঁর পছন্দমতো ইটিএফে লগ্নি করতে পারেন।  
 বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী 

4th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ