বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
চারুপমা
 

আলপনার গল্প

আলপনার নকশার গায়ে লেগে রয়েছে পুজো পুজো গন্ধ। আবার সনাতনী শিল্প হিসেবেও এর কদর করা হয়। আলপনার নানারকম নিয়ে আলোচনায় কমলিনী চক্রবর্তী।

‘শ্রীহরির বাক্য শুনি আনন্দিত মনে।
মর্তে চলিলেন লক্ষ্মী ব্রত প্রচারণে।’
মর্তে মা লক্ষ্মীর আগমনের সঙ্গে গৃহস্থের ঘরে আলপনা আঁকা যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সেই পুরনো কলকাতার লাল মেঝেতে ভরাট করে আঁকা মা লক্ষ্মীর পা, পাশে ধানের ছরা আর পদ্মফুল। খড়িমাটির টানে বাড়ির গিন্নি যখন প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় এমন আলপনার নকশা আঁকেন, তখনই লক্ষ্মীদেবীর মন্ত্র আওড়ান মনে মনে। সনাতন হিন্দু গৃহস্থ বাড়িতে এই আলপনার টানই বয়ে আনে মা লক্ষ্মীর আগমন বার্তা। কোজাগরী পূর্ণিমার জ্যোৎস্না ঝরনো রাতে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাণী শোনার জন্য কান পেতে থাকেন গৃহলক্ষ্মীরা। 
তবে আলপনার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখি তা কেবলই লক্ষ্মীর আরাধনায় সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামাঞ্চলে বাঙালি হিন্দু বাড়ির মহিলাদের হাতেই এই নকশার উদ্ভাবন হয়। তখন ব্রত পালন ছিল বঙ্গনারীর দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। স্বামী, সন্তান ও সংসারের কল্যাণে বিভিন্ন সময় নানারকম ব্রত পালন করতেন তাঁরা। সেইসব ব্রতকথার এক একটা গান থাকত।  গ্রাম্য বধূরা সেই গান গাইতে গাইতে ব্রতর ছবি আঁকতেন ঘরের মেঝের উপর। মাটির মেঝে বা উঠোন নিকিয়ে নিয়ে তাতেও আলপনার টান দেওয়া হতো। সেই থেকেই বাড়িতে নকশা আঁকার প্রচলন শুরু হয়। 
আলপনা আসলে পুজোর বিভিন্ন উপচারের অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানোর জন্য মুনি-ঋষিরা যেসব পুজো বা যজ্ঞের আয়োজন করতেন তাতেও আলপনা আঁকার প্রচলন ছিল। যখন প্রচণ্ড অনাবৃষ্টিতে ওষ্ঠাগত প্রাণ, তখন বৃষ্টি নামানোর জন্য যে যজ্ঞের আয়োজন হতো, সেখানে ঋষিপত্নী বা ঋষিকন্যারা মেঘ, বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির ছবি আঁকতেন। আবার প্রচুর শস্য ফলনের পর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে যে পুজোর উদ্যোগ নেওয়া হতো তাতে ধানের শিষ আঁকা হতো ঘরের দেওয়ালে। এইভাবেই আলপনা একটি শিল্পে উত্তীর্ণ হয়েছিল গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে।
সেই শিল্প যে গোটা দেশজুড়ে কতটা উন্নত মাত্রা পেয়েছে তারই পরিচয় পেয়েছিলাম ওড়িশার রঘুরাজপুর গ্রামে গিয়ে। সেখানে গিয়ে দেখেছিলাম আলপনার মাধ্যমে বাড়ির দেওয়াল থেকে কাপড়ের ক্যানভাসে উঠে আসছে দেশীয় পুরাণ ও ইতিহাসের গাথা। সেও সনাতন আলপনার আর একটি রূপ। এই গ্রামের লোকেদের কাছে আলপনাই জীবন ও জীবিকা। তাঁদের কাছেই শুনেছিলাম মহামারীতে পৃথিবী যখন জীর্ণ তখন এই শিল্পই তাঁদের বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়েছিল। ভারতের পুরাণকথায় শান্তির আশ্রয় খুঁজেছিলেন তাঁরা। বাড়ির প্রতিটি দেওয়াল রং করে নতুন উদ্যমে তাতে আলপনা আঁকতে শুরু করেন রঘুরাজপুর গ্রামের বাসিন্দারা। একে অপরের সাহারা হয়ে মহামারীর অশান্ত সময়ে মনের শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁরা এই আলপনার নকশার মাধ্যমেই। এখানে প্রকৃতি যেমন স্থান পেয়েছে তেমনই ঈশ্বরের আরাধনা, পুরাণের গল্প সবই উঠে এসেছে।  
তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবকিছুর মধ্যেই একটা পরিবর্তন আসে। আলপনার নকশাও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। আধুনিকতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আলপনায় বিস্তর বদল ঘটেছে। পৃথিবী যখন থেকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হয়ে উঠেছে তবে থেকেই বঙ্গনারীর আলপনার টানে অবাঙালি ছাপ মিশেছে। খড়িমাটির বদলে এসেছে পোস্টার কালার, অনামিকায় তুলো জড়ানোর বদলে হাতে উঠেছে মোটা তুলি বা পেন্ট ব্রাশ। আলপনা এখন আর লাল মেঝের উপর সাদা বা ঘিয়ে রঙে সীমাবদ্ধ নেই। বরং নানা রঙে রঙিন। লক্ষ্মীপুজো বা ব্রত ছাড়াও যে কোনও উৎসবে অনুষ্ঠানেই তার স্থান। 
দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই তো হাওড়া ব্রিজের উপর আলপনা আঁকতে বসেছিলেন একদল তরুণ শিল্পী। উৎসবের আমেজ শহরময় ছড়িয়ে দিতেই তাঁদের এই রঙিন উদ্যোগ। রোজকার কেজো রাস্তার উপর আলপনার টানের খুশির ঝিলিক লেগেছিল। পিচের রাস্তা নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল লাল, হলুদ, নীল, সবুজের নকশায়। ফুলের নকশায় উৎসবের আমেজ ধরা পড়ে বাঙালি হৃদয়ে।  
আবারও একটু সনাতনী আলপনার কথায় ফেরা যাক। এই শিল্প রচনার সরঞ্জামে যে খড়িমাটির ব্যবহার করা হয় তার সূত্রপাত নাকি শান্তিনিকেতনের শিল্প বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের হাত ধরে। তার আগে আতপ চাল ভিজিয়ে তা বেটে একটা লেই তৈরি করতেন বাড়ির বউরা। রং আনতে তাতে কখনও অল্প দুধ ও আলতার মিশ্রণ দেওয়া হতো। কখনও বা সামান্য সিঁদুর ব্যবহার করা হতো। এবং এই যে মিশ্রণ তা বেশ মোটা করে তৈরি করা হতো। তারপর সেই ঘন তরল মিশ্রণে আঙুল ডুবিয়ে তা দিয়ে বাড়ির দেওয়ালে, মেঝেতে নকশা তোলা হতো। এই নকশায় মূলত ফুলের কলকাই বেশি দেখা যেত। আজও কিন্তু সেই কলকারই প্রচলন আলপনার ডিজাইনে চোখে পড়ে।
আলপনার  নকশায় সাঁওতালি বা অন্য লোকশিল্পের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনের শিল্প বিভাগের ছাত্রদের তিনি ফোক আর্ট আঁকার পদ্ধতি শিখিয়ে নানা অনুষ্ঠানে সেই নকশায় আলপনা আঁকতে বলেন। সেই থেকেই শান্তিনিকেতনের গৃহস্থ ঘরেও ফোক আর্টের নকশায় আলপনা আঁকার প্রচলন দেখা যায়। ক্রমশ শান্তিনিকেতনী আলপনা একটা ভিন্ন ধারা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে ফুলের কলকা বা ব্রত-পুরাণ কথার বদলে প্রাকৃতিক ছোঁয়া লক্ষ করা যায়। কদম ফুল, পাখির রঙিন পুচ্ছ, জুঁই বা কামিনীর তোড়া ইত্যাদি দেখা যায় আলপনায়। পরবর্তীকালে কলাভবন প্রতিষ্ঠার পর রবীন্দ্রনাথ সেখানে আলপনার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এবং তার জন্য বিভিন্ন বিশিষ্ট শিল্পীকে নিযুক্ত করেছিলেন। আলপনার মাধ্যমে বিমূর্ত নকশা আঁকার প্রচলন শুরু হয়েছিল কলাভবনেই। অধ্যাপিকা সুকুমারী দেবী (তিনি নন্দলাল বসুর ছাত্রী ছিলেন) এই অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টফর্মটি আলপনার আঁকার ক্ষেত্রে চালু করেন। পরবর্তীতে এই নকশাই আবার শান্তিনিকেতনী বাটিক শিল্পে কাজে লাগানো হয়। সেক্ষেত্রে অবশ্য অ্যাবস্ট্রাক্টের সঙ্গে ফোকের মিশেলও ঘটতে দেখা গিয়েছিল। বৃত্ত, ত্রিভুজ বা লাইনের সাহায্যে ফিগার আঁকার চল সেই সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। 
জ্যামিতিক প্যাটার্নের টানে মানুষের ছবি আঁকা বা নকশা তৈরি করা একটা ‘আর্ট ফর্ম’-এ পরিণত হয়েছিল ভোপাল, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন গ্রামে। সেখানকার মহিলারা  চালের গুঁড়ো জলে ভিজিয়ে এই ধরনের আলপনা আঁকতেন ঘরের দেওয়ালে। এই আলপনার জন্য অবশ্য কোনও পুজো বা পার্বণের প্রয়োজন হতো না। বরং দৈনন্দিন জীবনেই এই আলপনার স্থান ছিল। ঘরের মাটির দেওয়ালগুলো একটু সুন্দর ও সুশ্রী করে তোলার জন্যই গ্রাম্যবধূদের এই প্রয়াস। অনুষ্ঠানে আবার এই আলপনাতেই বৈচিত্র্য আনতেন তাঁরা। সিঁদুর বা কুমকুমের টান পড়ত সাদা চালের আলপনার মাঝে মাঝে। তাতেই নকশায় রঙের ছোঁয়া লাগত। ঘরের সাদামাঠা দেওয়ালে ঔজ্জ্বল্যের চমক আসত।  
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার আলপনা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন যে, আলপনার নকশার ধরনগুলো অনেকটাই পারিবারিক একটা ধারায় আবদ্ধ। অর্থাৎ বিশেষ কোনও একটি  পরিবারে হয়তো একধরনের নকশায় আলপনার আঁকার প্রচলন শুরু হয়েছিল এবং বংশপরম্পরায় সেই ধারাই আলপনার নকশায় বজায় থেকেছে।  
অনেক ক্ষেত্রে আবার আলপনার নকশা থেকেই অঞ্চলেরও পরিচয় পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আলপনার নকশার ধারা আরও বিস্তৃত। অর্থাৎ একটা গোটা গ্রাম বা গ্রামের একটা বড় অংশ একই ধারায় আলপনার নকশা তুলতে অভ্যস্ত। অবন ঠাকুর বলেছেন, একটা সময় ছিল প্রাচীন বাংলায়, যখন চণ্ডীমণ্ডপে আলপনা আঁকা হতো। পুজো বা ব্রতপাঠের সময় ঘরে ঘরে যেমন আলপনা দেওয়া হতো তেমনই পাড়ার চণ্ডীমণ্ডপেও দেওয়া হতো। সেই আলপনার নকশায় যাতে একটা সামঞ্জস্য বজায় থাকে সেই কারণেই তার ধরনটা একই রাখা হতো। তাতে সৌন্দর্যও যে বৃদ্ধি হতো তা বলাই বাহুল্য। ক্রমশ এই নকশার একটা প্যাটার্ন হল। একই রকম নকশা দেখলেই বোঝা যেত সেটা কোন গ্রাম বা কোন অঞ্চলের। 
আবারও একটু আধুনিক যুগের কথায় ফিরি। হালফিল আলপনা আঁকতে খড়িমাটি বা চালের লেইয়ের প্রচলন যে কমেছে তা তো আগেই বললাম। কিন্তু সব সময় পোস্টার কালারও আলপনার জন্য প্রয়োজন হয় না। ব্যস্ত জীবনে শিল্পের ছোঁয়া আনতে অনেকেই হাতে না এঁকে স্টিকার আলপনার উপর ভরসা করেন। সেই স্টিকার আলপনায় আবার সাদার পাশাপাশি রঙিনেরও ছোঁয়া পাবেন। সাদা আর লাল এই দু’টি রঙের মধ্যেই পুজোর গন্ধ রয়েছে। তাই লক্ষ্মীপুজোর স্টিকার আলপনার মধ্যে এই দু’টি রং বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
অনেকক্ষেত্রে আবার ফুলের পাপড়ি, ভেষজ রঙের গুঁড়ো ইত্যাদি দিয়েও আলপনা আঁকা হয়। আবিরও আলপনার সামগ্রী হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। এখনকার সময়ে উৎসব অনুযায়ী আলপনা নিজেকে বিভিন্ন রূপে সাজিয়ে নিয়েছে। বসন্ত উৎসবের আলপনার নকশায় যেমন আবিরের প্রাচুর্য লক্ষণীয়। আবার রবীন্দ্রজয়ন্তী বা বৈশাখের কোনও উৎসবমুখর সন্ধ্যায় সাদা জুঁইয়ের সঙ্গে মাধবীলতা, গোলাপ বা গাঁদা ফুলের পাপড়ি ব্যবহৃত হয় আলপনার নকশায়। এইভাবেই নানা নকশায় নানা রূপে আলপনা আমাদের জীবনে বয়ে আনে উৎসবের আমেজ। হৃদকমলে লাগে আনন্দের ছোঁয়া। 

28th     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ