বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা

আজ কোজাগরী পূর্ণিমা। ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মীর আরাধনা। বহু মেয়েই এই আরাধনাকে একটি দিনে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রতিদিনের পরিশ্রমে বছরভর চলে তাঁদের সাধনা। ধীরে ধীরে তাঁরা পান লক্ষ্মীর আশীর্বাদ। লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস।

‘এটা কি মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ হয়েছে? দেখে তো মনে হচ্ছে ব্যাঙ থপ থপ করে লাফিয়েছে।’ আলপনা দিতে দিতেই সম্প্রীতি মায়ের দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘তাই হোক, তুমি চুপ করে বসো। এবারের লক্ষ্মীপুজোটা আমি আমার মতো করে করব।’ 
‘তা বাপু একটু সুন্দর করে আলপনাটা দিবি তো!’ 
‘তোমাকে কোনও দায়িত্ব দিইনি বলে এখন খুঁত ধরতে বসেছো। বাবা, মাকে একটা ধমক দাও তো।’ 
সম্প্রীতি বলেছে এবার সে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোটা নিজের মতো করে করবে। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ একটু একটু করে মিলছে। আর একটু পেলে লড়াইটাতে জোর পাওয়া যায়। যদি দোকানটা চালু করতে পারে, তাহলে আর এক কদম এগনো যাবে। যাদবপুরে একটা দোকান কেনার ব্যাপারে কথাবার্তা অনেকটাই এগিয়েছে। কোভিড পর্বের ঠিক আগেই বাবা রিটায়ার করলেন। কোভিডের সময় যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করে সম্প্রীতি একটা চাকরির খোঁজ করছিল। সেই সময় সিদ্ধান্ত নেয়, বাড়িতে বসেই সে হোম ডেলিভারির কাজ করবে। বাবা-মায়ের উৎসাহে শুরু হল ‘সম্প্রীতি’স কিচেন’। বেশ কয়েক বছর ধরে তার ক্লাউড কিচেনের ব্যবসার নাম ছড়িয়েছে অনলাইনে। ভালো অর্ডারও আসছে। সে সব সামলাতে দু’জনকে কাজে রাখতে হয়েছে। অল্প কিছু পুঁজিও জমিয়েছে। এখন স্বপ্ন একটা দোকান কিনবে। বাবা বার কয়েক বলেছিলেন, ‘আমার থেকে কিছু টাকা নে না মা। রিটায়ার করার পর টাকাগুলো তো ব্যাঙ্কেই পড়ে আছে।’ সম্প্রীতি বলেছিল, ‘না বাবা, ও টাকায় হাত দেবে না। তুমি আমায় আশীর্বাদ করো, যেন আমার লক্ষ্যে সফল হতে পারি।’  
মা প্রায়ই বিয়ের কথা বলে। সম্প্রীতিও নাছোড়। একদিন সে মায়ের থুতনি ধরে বলল, ‘চাও তো তোমার আর একটা বর জোগাড় করে দিই।’ মাঝে মাঝে সম্প্রীতি স্বপ্ন দেখে, তার সম্প্রীতি’স কিচেনটা অনেক বড় হয়েছে। কত মানুষের সে রুজি রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে তার রেস্তরাঁ। লোকে টাকা নিয়ে আসছে তার কাছে, ফ্র্যাঞ্চাইজি নেবে বলে। মনে মনে বলে সম্প্রীতি, ‘আমি পারব, পারব।’ 
এবারের লক্ষ্মীপুজোয় তার ইচ্ছে হয়েছে, সবটা নিজে হাতে করবে। মাকে নিজের মতো করে আরাধনা করবে। আলপনা থেকে শুরু করে, পুজোর জোগাড়, ভোগ রান্না সব। মা বলেছিল, ‘তুই কি পারবি? শিখেছিস তো মাছ, মাংস দিয়ে নানা পদ রান্না করতে। তোদের সিলেবাসে কি ঠাকুরের ভোগ রান্না ছিল?’ 
সম্প্রীতি বলে, ‘ঘরে ঘরে মায়েরা কি ভোগ রান্নার ক্র্যাশ কোর্স করেছে নাকি? তুমি এত ভেবো না।’ 
বাবা বলেন, ‘তুমি চুপ করে এবার বসে দেখো। মেয়েটাকে নিজের মতো করে পুজো করতে দাও।’
সম্প্রীতি বলে, ‘মা তুমি এত ভেবো না । এমন ভোগ রান্না করব যে, তাই খেয়ে খুশি হয়ে লক্ষ্মীদেবী আমাকে বৈকুণ্ঠের রান্নাঘরের চিফ শেফ 
করে দেবেন।’
মা বলেন, ‘চুপ কর, বাজে কথা বলিস না।’  
সম্প্রীতি মাকে বোঝায়, ‘দেখো মা, পুজোয় দু’একটা আচার, রীতি যদি বাদ পড়ে যায়, পড়তে দাও। আমি ভক্তি দিয়ে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করব। এতো কিছু মানতে গেলে নিয়মের নিগড়ে বাঁধা পড়ে যাব। এগিয়ে চলা আর হবে না।’ 
তবু মায়ের খুঁতখুঁতুনি যায় না। বলেছিলেন, ‘ভোগে কী রান্না করবি, তা তো আমাকে 
বললি না।’
‘সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য মা।’ 
‘না, তুই বল।’ 
অগত্যা নাছোড় মায়ের সামনে ভোগের মেনু প্রকাশ করেছিল সম্প্রীতি। বলেছিল, ‘ভোগে থাকবে কুসুমভোগ খিচুড়ি, পাঁচ ভাজা, আঠারো রকম সব্জি-শাক-পাতা দিয়ে হবে অষ্টাদশী লাবড়া, ধোকা পসিন্দা, খুশিয়ালি পনির, চাটনি, সাদা বোঁদের পায়েস। এছাড়া মুড়কি, নাড়ু, চন্দ্রপুলি সব থাকবে।’ 
মা বলেন, ‘পদগুলির শুধুই গালভরা নাম, নাকি সুস্বাদুও হবে।’ 
সম্প্রীতি চোখ পাকিয়ে বলে, ‘সবকিছু সময়ে জানতে পারবে।’
মনে মনে হাসেন বাবা। মেয়েটা কত বড় হয়ে গেল। ওর আত্মবিশ্বাস, সাহস আর লড়াই দেখলে অবাক হয়ে যান তিনি। নিরুপমা পুত্রসন্তান চেয়েছিল, কিন্তু একটা পুত্রসন্তান জন্মের পরই মারা যায়। এখন অবশ্য সুনীলবাবু আর নিরুপমার কোনও খেদ নেই। সম্প্রীতি তাঁদের পুত্রেরও অধিক। ধীরে ধীরে সে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অভিভাবক হয়ে উঠছে। সংসারটার দায়িত্ব নিচ্ছে। পাশাপাশি নিজে বড় হওয়ার জন্য নিজস্ব একটা রাস্তা তৈরি করছে। সম্প্রীতির মুখের দিকে তাকালেন বাবা। কোজাগরী রাতের সোনার জ্যোৎস্নার মতো একটা আভা রয়েছে সম্প্রীতির মুখে। তিনি জানেন, সেটাই ওর আত্মবিশ্বাস, ওর অধ্যবসায়। এই গুণগুলিই ওকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। মেয়ের লক্ষ্মীর সাধনা বৃথা যাবে না। লক্ষ্মীলাভ ওর হবেই। মেয়ে তাঁদের লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা।
সকাল থেকে মনটা ভালো ছিল না শান্তির। শান্তি মাহাত। বর খোকন মাহাত ছেলে ডালিমকে নিয়ে শহরে গিয়েছিল পুজোয় ঢাক বাজাতে। ছেলেটা এখন বাবার সঙ্গে কাঁসি বাজায়। আজ লক্ষ্মীপুজোর দিন ওদের ঘরে ফেরার কথা। আজ সারাদিনের ব্যস্ততা। উঠোন নিঙানো, ওরা এলে ওদের জন্য রান্না করা। তারপর বিকেলে স্নান সেরে পুজোর জোগাড় করা। উঠোনজুড়ে লতাপাতা, শালুক, শঙ্খ এঁকে আলপনা দেওয়া। সব কাজের মধ্য থেকে মাঝে মাঝেই ঘরের দাওয়ায় এসে শান্তি দূরের দিকে তাকিয়ে দেখে। দেখে মাঠের আলপথে বাপ-ছেলে হেঁটে আসছে কি না! একসময় ক্রমে পেকে ওঠা ধানখেতের মাঝখানে দিয়ে ওর মরদ আর ছেলেকে হেঁটে আসতে দেখে আনন্দে বুকের রক্ত ছলাৎ করে ওঠে। 
প্রতি বছর দুর্গাপুজোর দিনগুলো ওদের ঘরে যেন আঁধার নামে। নতুন জামাকাপড় হয় না। গ্রামের ঢাকিপাড়ার ছেলেরা ঢাক বাজিয়ে ফিরলে, তখন ঘরে কিছুদিনের জন্য লক্ষ্মী হেসে ওঠে। পুজোর ক’টা দিন ছোট মেয়েটাকে বুকে আঁকড়ে শান্তি দিন গোনে লক্ষ্মীপুজোর। গ্রামের দুর্গামণ্ডপে গিয়ে বলে, ‘ওদের ভালোয় ভালোয় ফিরিয়ে এনো মা।’ লক্ষ্মীপুজোর দিন ফিরে আসে ওর মরদ। সঙ্গে করে আনে নতুন কাপড়, ছেলের নতুন জামা, মেয়ের রঙিন ফ্রক। কোজাগরীর চাঁদের মতোই জ্যোৎস্না ছড়ায় ওদের ঘরে। সেই জ্যোৎস্নার ভিতর সুখের গন্ধ পায় শান্তি। 
সেই করোনার সময় কী দুদ্দশা! কোনওরকমে একটা পুজোর অর্ডার যাও বা এল, ঢাক সারানোর পয়সা নেই। নিজের জমানো ভাঁড় ভেঙে শান্তি টাকা দিয়েছিল। বলেছিল, ‘এই ন্যাও ট্যাকা। তুমি ঢাক সারাও। ঢাক বাজিয়ে শহুরে বাবুদের খুশি কোরো।’ 
সেই থেকে প্রতি বছরই শান্তি টাকা দেয়। সে বলেছে, ‘পিতি বছর আমিই দেব তোমার ঢাক বাঁধার ট্যাকা।’ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জমানো টাকা ব্যাঙ্কে সই করে তুলে সেটা মরদের হাতে দেয়। তাই বোধহয় মা লক্ষ্মী তার দিকে তাকিয়েছেন। গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে কাজ করে সে এখন ‘স্বনিব্ভর’। প্রতিদিন সংসারের সব কাজ সেরে শান্তি দুপুরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাজে যায়। আগে মাস্ক আর স্যানিটাইজার তৈরি করত। এখন মাদুর বোনে, বাঁশের কঞ্চি চেঁছে ঝুড়ি বোনে, ফুল তৈরি করে। এছাড়া ব্যাগ, আচার, পাঁপড় তৈরি করে। দল বেঁধে গ্রামীণ মেলায় যায়। রাতে আঁচলে পয়সা বেঁধে এনে হ্যারিকেনের আলোয় গোনে। কপালে ঠেকিয়ে তা নিজের টিনের বাক্সে রেখে দেয়। উঠোনের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে, অনেক নিষেধের বেড়া ভেঙে শান্তি এগচ্ছে। তবে সে একা নয়, তার হাত ধরে আছে আরও অনেকে। সুমতি, কৃষ্ণা, দ্রৌপদী, বেহুলারা।  
মাঝে মাঝে রাতে আঁধার ঘেরা উঠোনের দিকে তাকিয়ে শান্তি বুঝতে পারে, মা লক্ষ্মী একটা একটা করে চরণ ফেলছেন সেখানে। আঁধারে জোনাকির আলোর মতো করে ফুটে ওঠে যেন সেইসব চরণচিহ্ন। অন্ধকারের দিকে উবু হয়ে গলায় কাপড় জড়িয়ে গড় করে শান্তি। মনে মনে বলে, ‘দয়া করো মা, দয়া করো।’
কোজাগরী পুজোর দিন মরদ আর ছেলেটা ফিরলে যেন আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। ছেলেটা বকবক করতে থাকে। তার ঝুলিতে জমে থাকা শহরের সব গল্প নিমেষে মায়ের কাছে উজাড় করে দিতে চায়। দৌড়ে যায় বোনের কাছে। তাকে দেখায় বাবুদের দেওয়া নতুন জামা। খোকনও অনেক কথা বলে। কিনে আনা নতুন জামা-কাপড় দেখায়। 
শান্তি ভাত রান্না করতে করতেই সেসব দেখে, শোনে। কোমরে আঁচল জড়িয়ে উনুনের সামনে বসে আগুনে কাঠ গুঁজে দেয়। কমে আসা আগুনটা দপ করে জ্বলে ওঠে। খুন্তিতে ভাত তুলে টিপে দেখে। মুখের উপর এসে পড়ে উনুনের আগুনের এক অলৌকিক আভা। হাতের চেটো দিয়ে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মোছে সে। এরপর উঠোনে চাটাই পেতে সকলকে খেতে দেবে। তারপর নেতা দিয়ে উঠোন মুছবে। ছড়ানো ভাতের দানা খুঁটে খুঁটে তুলে পাখিকে খেতে দেবে।  চোখে মুখে তার আলতো খুশির ছোঁয়া। খোকন দাওয়ায় বসে সেইসব দেখে আর মনে মনে ভাবে, শান্তি যেন ওই কোজাগরীর আলোর মতো। আমার ঘর আলো করে রেখেছে। এভাবেই লক্ষ্মী যেন আমার ঘরে শান্তিরূপে বিরাজমান থাকেন।

28th     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ