বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

দরকার দৃষ্টিভঙ্গির বদল

আজও মেয়েরা বাইরে তো বটেই, নিজের ঘরেও নির্যাতিতা। তাই প্রতিবছর পারিবারিক হিংসার বিরুদ্ধে সচেতনতা কর্মসূচি চলে। বিস্তারিত জানালেন সমাজকর্মী 
গার্গী গুহ। কথা বললেন কমলিনী চক্রবর্তী। 


বর্ধমানের এক গ্রামের তরুণী কন্যা শ্রীমতী রায়। শহুরে পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে তার। শ্রীমতীর গ্রামের বাড়িতে দেখা হল পাত্র পাত্রীর। প্রেম মিশ্রিত মুগ্ধ দৃষ্টিতে শ্রীমতীকে দেখছে ছেলেটি। ঈষৎ লজ্জিত মুখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামাল শ্রীমতী। লজ্জাই নাকি নারীর ভূষণ। যুগ যুগ ধরে এই ধারণা সমাজ তো বটেই, এমনকী মেয়েদের মনেও বদ্ধমূল। কিন্তু মেয়েদের এই লজ্জাকেই হাতিয়ার করে পুরুষতন্ত্র যে অবাধে নারী নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে সে খবর সমাজ রাখে কি? প্রশ্ন তুললেন নারীকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘স্বয়ম’-এ কর্মরত সমাজকর্মী গার্গী গুহ। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতি বছরের মতোই এবছরও এক পক্ষব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করেছে তাঁর সংস্থা। সেই প্রসঙ্গেই নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করলেন তিনি। 

 নারী নির্যাতন এখনও কতটা এবং কীভাবে হচ্ছে?
সরাসরি মেয়েদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা যা দেখেছি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নারী নির্যাতনের রূপ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু তার মাত্রা কমেনি। আজও আমাদের রাজ্যে ও দেশে বিভিন্ন স্তরে মহিলাদের নির্যাতন করা হয়। তবে হ্যাঁ সেই নির্যাতনের ধরন এখন অনেকাংশেই আলাদা। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘ফ্রম উম্ব টু টুম্ব উইমেন অ্যাবিউজ হ্যাপেনস ইন অল ফর্মস’। অর্থাৎ মাতৃগর্ভ থেকে চিতায় চড়া পর্যন্ত মেয়েরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার। আর পৃথিবীর সর্বত্রই এই চিত্র।   
 
কেমন সেই বদল? 
 মোটামুটি পঁচিশ তিরিশ বছর আগের চিত্র যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে সেই সময় মহিলারা মধ্য বয়সের আগে পর্যন্ত নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন না। কিন্তু এখন চিত্রটা পাল্টে গিয়েছে। মহিলারা আর অত্যাচার সহ্য করেন না। তবে অত্যাচারের ধরনও বদলেছে। যেমন আগে শারীরিক অত্যাচারকেই নির্যাতনের পর্যায়ে ফেলা হতো। এখন মানসিক অত্যাচারকেও নির্যাতনের পর্যায়ে ফেলা হয়। এটা মূলত সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বদল। এখন মেয়েরা অনেকাংশেই শিক্ষিত ও স্বনির্ভর। ফলে তাঁদের মধ্যে সচেতনতার মাত্রাও বেশি। আর সেই কারণেই প্রতিবাদের ধরন বদলেছে, হারও বেড়েছে। আর আমাদের সমীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নারী নির্যাতনের আর একটা দিকও ক্রমশ উঠে আসছে সেটা হল বাপের বাড়িতে মেয়েদের নির্যাতন। অনেক মেয়েই বাবা বা মায়ের হাতে মার খায়, তাঁদের প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না, কথায় কথায় মেয়ের চরিত্র তুলে কথা বলা বা বকাঝকা করা— এগুলো সবই নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। এই যে টুকরো টুকরো সচেতনতা এগুলোই প্রতিবাদের বিভিন্ন দিক।

 শহরের তুলনায় শহরতলি বা গ্রামে কি নির্যাতনের মাত্রা বেশি?
আমাদের অভিজ্ঞতা সে কথা বলে না। বরং বলব, ধরনটা ভিন্ন। নারী নির্যাতনকে আমরা কয়েকটা ভাগে ভাগ করে থাকি — শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক। এগুলো কিন্তু সমাজের সব স্তরে, শহরে ও গ্রামে সমানভাবে ঘটতে দেখা যায়। তবে শহুরে নির্যাতনের ধরনটা হয়তো গ্রামের চেয়ে আলাদা। যেমন শহরে চাকরিজীবী বা রোজগেরে মহিলা অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে তাঁদের হ্যারাসমেন্ট বা অপমান করার ধরনটা একটু ভিন্ন। যেমন স্বামী স্ত্রীকে বলেন, ‘তুমি আর বাড়িতে থাকো কতক্ষণ যে সংসারের  দিকে খেয়াল রাখবে?।’ অথবা বাচ্চার জীবন ও পড়াশোনায় পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রীয়ের চাকরির দোহাই দেয় পরিবার।  অফিসে পুরুষ সহকর্মীদের কুনজর, দু’জন পুরুষ সহকর্মীর একজন মহিলার সামনে তাকে শুনিয়ে গালমন্দ করা, অশ্লীল আলোচনা বা মহিলাদের সম্পর্কে কটু কথা বলা— এইগুলো হয়তো গ্রামের দিকে ততটা দেখা যায় না। সেখানে আবার শারীরিক বা যৌন অত্যাচারের মাত্রা বেশি। ফলে অত্যাচার শহর বা গ্রাম কোথাও কিছু কম নয়। ধরনটা আলাদা। আর একটা জিনিসও গ্রামের দিকে ভীষণ প্রকট, তা হল বাল্যবিবাহ। সেটা করোনার পর আরও বেড়েছে। মেয়েদের পড়াতে না পেরে বাবা মা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। তাদের অমতে বিয়ে দিচ্ছেন। এগুলো শহরে ততটা দেখা যায় না।

 মেয়েদের মনোভাব পাল্টালে কি নির্যাতন কমতে পারে?
খানিকটা হয়তো কমতে পারে। একটা দৃষ্টান্ত দিই, পুরুষ সহকর্মীর বিশ্রী চাহনিতে কর্মক্ষেত্রে কোনও মহিলা অস্বস্তিতে পড়লেও সবসময় সেটা মুখের উপর বলতে পারেন না। ওই যে লজ্জা! মেয়েদের জীবনগত বিপুল পরিবর্তনের পরেও এই লাজুক স্বভাবটা তারা কাটিয়ে উঠতে পারল না। আর সেটাকেই হাতিয়ার করে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। বিয়ের পর অনেক মহিলাই যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তবু সে কথা মুখ ফুটে বলতে বা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে লজ্জা পান। এই আচরণগুলো পাল্টাতে হবে।

 নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে আইন রয়েছে তার সুফল মেয়েরা পাচ্ছেন?
আইন সবসময়ই সুবিচার পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ। ফলে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কোনও বিচার পেতে হলে আইনের সাহায্যই নিতে হয়। কিন্তু সেটা বেশ সময়সাপেক্ষ। অনেক মেয়েই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। আসলে বহুযুগ ধরেই পুরুষতন্ত্র আমাদের সমাজে জাঁকিয়ে বসে আছে। সেটা ভাঙতে হবে। সমাজ প্রথমেই মেয়েদের প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। নির্যাতিত মহিলারা যখন থানায় রিপোর্ট করতে যান তখন প্রথমেই তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। সেই প্রশ্নগুলোর মুখে পড়ে অনেকেই লজ্জায় কুঁকড়ে যান। কেউ হয়তো আর থানার দ্বারস্থ হতেই চান না। একটা বস্তাপচা ধারণা এখনও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বদ্ধমূল, শারীরিক অত্যাচার ছাড়া বাকিগুলো অত্যাচারই নয়। এই ধারণাগুলো ভাঙতে হবে। কিছুটা যে ভাঙছে না তা নয়, তবু আজও বিস্তর পথ চলা বাকি। নারী নির্যাতন বিরোধী আইনই আজও মেয়েদের আশার আলো দেখার একমাত্র উপায়। 

 আইনের দ্বারস্থ কি মেয়েরা আদৌ হচ্ছে?
আমার মতে মেয়েদের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকরী আইন পিডব্লুডিভিএ বা প্রোটেকশন অব উইমেন এগেনস্ট ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট। এই আইনের আওতায় মহিলাদের প্রচুর সুরক্ষার কথা বলা হয়। পারিবারিক নির্যাতনের সব দিকগুলোই এই আইনের আওতায় পড়ে। তাছাড়া আরও অনেক আইন রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। বিবাহ পরবর্তী যৌন নির্যাতনের (ম্যারিটাল রেপ) বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। কিন্তু আইনগুলোর মাধ্যমে বিচার পেতে গেলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।  আশার কথা এই যে প্রতিবাদ হচ্ছে। নির্ভয়া কাণ্ডের পর থেকে মেয়েরা প্রতিবাদের মাত্রা বাড়িয়েছে। ম্যারিটাল রেপের বিরুদ্ধে ওয়েব সিরিজ হচ্ছে, দর্শক দেখছে এবং পছন্দও করছে। এগুলো সবই পজিটিভ দিক। 

2nd     December,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ