বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

ভিনরূপী তিন দুর্গা

পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে নানারূপে পুজো পান মা দুর্গা। একটু অন্য ধরনের তিন দুর্গাপুজোর গল্প শোনালেন উত্তরা গঙ্গোপাধ্যায়।

সুভাষগ্রামের অর্ধ-কালী দুর্গা 
তখনও দেশ ভাগ হয়নি। ঢাকা-বিক্রমপুরের মেদিনী-মণ্ডল গ্রামে দোর্দণ্ডপ্রতাপ দারোগা হরিকিশোর ঘোষের বাড়িতে চলছে দুর্গোৎসবের আয়োজন। পটুয়ারা মূর্তির গায়ে হলুদ রং চড়াতে শুরু করেছে। এমন সময় দেখা গেল সাবেকি প্রথার মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমার ডানদিক নিজে নিজেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ বাঁদিকে হলুদ রং অটুট।
পটুয়ারা ভয় পেয়ে ছুটে গেল দারোগাবাবুকে জানাতে। তখন ঘোষ-মশায়ের মনে পড়ল তিনি স্বপ্নে এমন দেবী মূর্তিই দর্শন করেছিলেন। কুল-পুরোহিত সব শুনে সবাইকে আশ্বস্ত করে বললেন যে, কৃষ্ণবর্ণ অংশটি দেবী কালিকার স্বরূপ। অর্থাৎ একই মূর্তিতে দেবী শক্তির দুই রূপের—দুর্গা ও কালীর সহাবস্থান।
দেশভাগের পর ঘোষ পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। কলকাতার দক্ষিণে সুভাষগ্রামে তাঁদের পারিবারিক বাসস্থানে আজও পুজো হয় অর্ধকালী দুর্গার, জানালেন ওই পরিবারের অন্যতম সদস্যা অধ্যাপিকা অনুরাধা ঘোষ।
এবছর ১৬০তম বছরে পা দেওয়া এই পুজোটি ১৯৫৯ সাল থেকে সুভাষগ্রামের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসার সময় সেখানকার পুজোবেদির মাটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন সদস্যরা। সেই মাটি মিশিয়ে তৈরি বর্তমান পুজোবেদি। অনুরাধা ঘোষ পুজোর আরও কিছু বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জানালেন। তান্ত্রিকমতে পুজো হলেও পশুবলি হয় না। আখ-চালকুমড়ো দিয়ে প্রতীকী বলি হয়। এরপর হয় শত্রুবলি। পরিবারের কোনও বরিষ্ঠ সদস্য সবার অলক্ষ্যে চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষ-পুতুল তৈরি করেন। সেই পুতুলটি দু’টি কচুপাতার মধ্যে রেখে বলির জায়গায় রাখা হয়। তার ওপর সলতে জ্বালানো হয়। পরিবারের ছেলেরা সবাই মিলে ওই শত্রু-রূপী পুতুল বলি দেয়। এমনকী পা দিয়ে গুঁড়িয়ে মিশিয়েও দেয়, অর্থাৎ পরিবার ও পৃথিবীর শত্রু নিধন হল।
নবমীতে একটি অনুষ্ঠান হয় যার নাম প্রশস্তি বন্ধন। পুজোয় ব্যবহৃত বিশেষ কিছু সামগ্রী পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মাথায় ঠেকানো হয়। দশমীর দিন পালিত হয় বিশেষ পারিবারিক প্রথা। পাথরের রেকাবিতে শালুক শাপলা, খেসারির ডাল ও মোটা চাল দিয়ে মা দুর্গাকে নিবেদন করা হয়। পরে ওই নিবেদিত জিনিস দিয়ে রান্না করা হয় ও পরিবারের বিবাহিত মহিলারা তা খেয়ে থাকেন। এই প্রথার পিছনে একটি মজার ভাবনা জড়িয়ে আছে।
মা দুর্গা কৈলাসে ফেরত যাওয়ার পর শিবঠাকুর জানতে চান বাপের বাড়িতে তাঁর কেমন কাটল। যারপরনাই আনন্দে, নানা সুস্বাদু খাবার খেয়ে দিন কেটেছে শুনলে যদি শিব রাগ করেন, তাই তিনি বলেন, ‘ওই শালুক-শাপলা খেয়ে কাটল।’ অনুরাধা ঘোষের মতে মা দুর্গা তাঁদের পরিবারের সদস্যের মতো, তাই মহিলারা শালুক শাপলা খেলে তার মধ্যে দিয়েই মা দুর্গার খাওয়া হয়ে যায়।
নানা পারিবারিক প্রথার পাশাপাশি আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল অর্ধ কালী দুর্গা পুজোয় গণেশ ও কার্তিকের স্থান পরিবর্তন। অর্থাৎ, দেবীর ডানদিকে কার্তিক ও বাঁদিকে গণেশের অবস্থান। 
ফুলঘরা গ্রামের মনসা পুজো
শরৎকালে যখন গোটা বাংলা দুর্গাপুজোয় ব্যস্ত, তখন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট ব্লকের ফুলঘরা গ্রামের বাসিন্দারা মেতে ওঠেন মনসা পুজোয়। বলা হয় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই পুজো। রীতি মেনেই চারদিন পুজো হয়। তবে চণ্ডীপাঠের পাশাপাশি মনসার গানও গাওয়া হয়। মূল প্রতিমা দেবী মনসার, দু’পাশে রয়েছেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। এই পুজোর পিছনে প্রচলিত কাহিনিটি এইরকম: কোনও এক বছর ফুলঘরা গ্রামে খুব সাপের উপদ্রব হয়। মারা যায় বহু লোক ও গবাদি পশু। এমন সময় গ্রামের মণ্ডল পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পান মনসা পুজো করার। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার কিছুদিন পর আত্রেয়ী নদীতে স্নান করতে গিয়ে তিনি মনসার কাঠামোর সন্ধান পান। সেটি তুলে এনে মনসা পুজোর সূত্রপাত করেন তিনি। অন্যান্য জায়গার মতো শ্রাবণ মাসেই হতো পুজো।
ইতিমধ্যে গ্রামবাসীরা দেখেন যে তাঁদের এলাকায় দুর্গাপুজো হয় না। সেই দুঃখ ঘোচাতে তাঁরা দুর্গাপুজোর সময়ে মনসা পুজো শুরু করেন। আজও প্রাচীন প্রথা মেনে বারোয়ারি উদ্যোগে পুজো হয়। পুজোর চারদিন গ্রামে নিরামিষ খাওয়া হয়। ক্রমশ পুজোর পরিচিতি বাড়তে থাকে। এখন পুজোয় মেলা বসে, হয় নানা অনুষ্ঠানও।
হাটসেরান্দি গ্রামের পটের দুর্গা 
ও নবপত্রিকা স্নান
দুর্গাপুজোর নিয়ম মেনে সব জায়গাতেই সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকাকে স্নানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বীরভূমের নানুর থানার হাটসেরান্দি গ্রামের নবপত্রিকার স্নান দেখার মতো।
ইদানীং পটে দুর্গা পুজোর জন্য এই গ্রামটি বেশ জনপ্রিয়। যদিও রাঢ় বাংলা অঞ্চলে পটে দুর্গা পুজোর রীতি আছে, তবে সংখ্যায় খুব কম, জানালেন শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কয়েক বছর ধরে এই নিয়ে চর্চা করছেন।
বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবাড়িতে আজও তিনটি পটে (বড়, মেজ ও ছোট ঠাকুরানি) দুর্গাপুজো হয়। হাটসেরান্দি গ্রামের বিশেষত্ব, এখানে অনেক বাড়িতে এই পদ্ধতিতে দুর্গাপুজো হয়।
যদিও পটে পুজোর সূত্রপাত আজ হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন অর্থনৈতিক কারণে হয়তো গ্রামের মানুষ মাটির প্রতিমা ছেড়ে পটের দিকে ঝুঁকেছিলেন। আবার এক পারিবারিক পুজোয় মাটির প্রতিমা বিসর্জনের সময়ে বিঘ্ন ঘটায় পরের বছর থেকে পটে পুজো শুরু হয় বলেও শোনা যায়। গ্রামবাসীদের কথা অনুযায়ী হাটসেরান্দি গ্রামের পটের দুর্গাপুজো দু’শো থেকে তিনশো বছরের পুরনো। কাপড়ের ক্যানভাসে ভেষজ রং দিয়ে নিপুণ হাতে মহিষাসুরমর্দিনীর ছবি আঁকেন শিল্পীরা। বংশপরম্পরায় এই কাজে যুক্ত শিল্পীদের আঁকায় পুরনো দিনের শিল্পকর্মের ছোঁয়া পাওয়া যায়। বিবর্তন অবশ্যই হয়েছে, বলেন শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কিন্তু পুরনো ছাপটি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

21st     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ