বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
আমরা মেয়েরা
 

বনেদি বাড়ির পুজোর ডাকে

শহরের নানা বনেদি বাড়ির সাবেকি পুজোয় মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন সাবির আহমেদ। 

সর্বজনীন দুর্গাপুজোর রমরমার মধ্যেও উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির সাবেকি পুজোগুলোর বরাবরই একটা আকর্ষণ রয়েছে। গত বছর কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তকমা পেয়েছে। এই স্বীকৃতির নেপথ্যে বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব পালনের অবদানও যথেষ্ট। এই বাড়িগুলিতে দুর্গাপুজো নিয়ে নানারকম গল্প ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। ১৭৭৫ সালে লর্ড ক্লাইভ সিরাজদ্দৌলাকে হারিয়ে কলকাতা বিজয়ের পর শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণ করেন। এই বাড়ির পুজোকে আজও তাই অনেকেই ‘কোম্পানির পুজো’ বলে ডাকে। বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে এইরকম অজস্র গল্প। এই সব অজানা সব গল্প শুনতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘নো ইওর নেবার’ ও সিস্টার  নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশিওলজি বিভাগের পড়ুয়া, শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়ে ৪০ জনের একটা দল গত ৪ অক্টোবর উত্তর কলকাতার বেশ কয়েকটি বনেদি বাড়ি হেঁটে ঘুরে দেখেন। এই ‘নেবারহুড  ওয়াক’-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর কলকাতার বড় বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প শোনা এবং এই পুজোগুলোয় বিশেষ করে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও তাঁদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত জানা।  দর্জিপাড়ার মিত্র বাড়ির কথা দিয়ে শুরু করা যাক। এই বাড়ির  মেয়ে  অনসূয়া বিশ্বাস শুরুতেই বললেন, ‘মূলত বলা যেতে পারে এই বাড়ির পুজোর কর্তা বা কর্ত্রী হলেন মহিলারা। বাড়ির মহিলারাই পুজোর সবরকম দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। এককথায় বলা যেতে পারে আমাদের বাড়ির সব পুজো মহিলা দ্বারা পরিচালিত।’ পরিস্থিতির কারণে এখানে মেয়েরা পুজোর দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে বাড়ির পুরুষরা অবশ্যই পুজোর কাজে তাঁদের পাশে থাকেন।
এই বাড়ির পুজোর বয়স এখন প্রায় ২১৭ বছর।  ২০০৬ সালে ২০০ বছর পূর্ণ হয়েছিল। প্রথম থেকেই এই বাড়ির পুজোর যাবতীয় নিয়ম একইভাবে মেনে চলা হচ্ছে। এই বাড়ির পুজো শুরু করেন রাধাকৃষ্ণ মিত্র। তাঁর সব পুত্র অবশ্য পুজো চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেয়নি, পুত্রদের মধ্যে একমাত্র রাজকৃষ্ণ মিত্র এই পূজার দায়িত্বভার নিয়েছিলেন। একসময় এই পরিবারের মানবেন্দ্র কৃষ্ণের তিন ছেলে ছিলেন এবং তাঁদের কোনও পুত্রসন্তান না থাকায় পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরাই এই পুজোর দায়িত্ব এবং পুজো সংক্রান্ত 
বিষয়ে সবরকম সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। সেই কারণেই এটিকে মহিলা পরিচালিত পুজো বলা হয়। 
পড়ুয়া ও গবেষকদলকে অনসূয়া বিশ্বাস খুব যত্ন করে এই বাড়ির  দুর্গাপুজো পালনের গল্প শোনাচ্ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘এখানে দুর্গাপুজো ছাড়াও কালী  ও জগদ্ধাত্রী পুজোরও আয়োজন করা হয় দীর্ঘদিন ধরে। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে এই পরিবারের পরম্পরা ধরে রেখেছে বর্তমান প্রজন্মও। ঠাকুরের পিছনের অংশটির কাজ প্রতি বছর নতুনভাবে করা হয়, তবে এর জন্য এক বিশেষ ছাঁচ  বহু বছর ধরে ব্যবহার করা হয়। এই বাড়ির পুজোয় ভোগের আয়োজন হয়। তবে এখানে রান্না ভোগ হয় না, লুচি বা মিষ্টির ভোগ হয়। এই বাড়ির পুজোয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এসে থাকেন। এছাড়াও ঠাকুরের রূপসজ্জার জন্য বহু বছর ধরে আমরা মির্জা গালিব স্ট্রিটের খাঁ সাহেবের কাছ থেকে আতর আনিয়ে থাকি।’ 
মিত্র বাড়ির অনতিদূরে বাঙালির আর এক বড় বাড়ি ‘টেগোর প্যালেস’। প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিটে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ১৮৮৪ সালের রাজকীয় বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ ঘটেছিল, এই পরিবারের  সদস্যা ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা সৌরজা ঠাকুরের (যতীন্দ্রমোহনের প্রপৌত্রের কন্যা) সৌজন্য ও সহযোগিতায়। পড়ানোর সঙ্গে নানা শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত সৌরজা এই বাড়ি দর্শনের সময় না থাকতে পারায় তাঁর মা সৌমা ঠাকুর পড়ুয়া ও শিক্ষকদের সামনে তুলে ধরলেন এই  বাড়ির পুজোর ঐতিহ্য। নানা কারণে  পারিবারিক পুজোর সেই জৌলুস এখন হয়তো আর নেই। পুজো একুশ শতকের প্রথম দশকে এসে বন্ধও হয়ে গিয়েছিল। তবে সৌমা দেবীর বয়সের কারণে উৎসাহ ভাটা পড়লেও মেয়ে সৌরজা ঠাকুরের প্রবল উদ্যমে শারদোৎসবের আয়োজন এক নতুন রূপ পেয়েছে। গত বছরের মতো এবারেরও ‘টেগোর প্যালেস’-এ শারদোৎসবের প্রতিদিনের নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়েছে।  মহালয়ার দিনে ‘আনন্দমেলার’ সূচনা। সেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি আবোলতাবোল পালা, রবীন্দ্রনৃত্য, মৌ মাসির গল্পের আসর এবং পুতুল নাচ থাকবে। সপ্তমী থেকে দশমী প্রতিদিন নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মনোজ মুরলী নায়ারের শ্লোক উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে সপ্তমী অনুষ্ঠান শুরু হবে, রবীন্দ্রসঙ্গীতে থাকবেন নৌশাদ আলি, বাউলসঙ্গীতে আছেন উত্তম দাস বাউল। দশমীর ‘আনন্দযাত্রা’ চমকপ্রদ শোভাযাত্রা। সৌমা দেবী জানালেন, এই নতুন রূপে এই বাড়ির শারদোৎসবে মূল আকর্ষণ ন্যূনতম ধর্মীয় আচরণ এবং পরিবেশের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া। এই উৎসবে তাঁরা গঙ্গাদূষণের ভাগীদার হতে চান না বলে প্রথামাফিক ভাসানও কখনও হয় না। বরং কুমোরটুলিতেই আবার প্রতিমা ভেঙে কাঠামো ‘রিসাইকল’ করার জন্য তা ফিরিয়ে আনা হয়।
বনেদি বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত শোভাবাজারের রাজবাড়ির পুজো, সেখানে মেয়েরা অবশ্য উৎসব উদযাপনের আনন্দেই মেতে থাকেন বেশি। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন নন্দিনী দেব, পরে এই বাড়ির বউ হিসাবে এখন এই পরিবারের স্থায়ী সদস্যা তিনি। পুজোয় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে একটু অন্য মত প্রকাশ করে বললেন, ‘এমনিতেই মেয়েদের সারা বছর সংসারের কাজের চাপ থাকে। পুজোয় ক’টা দিন পরিবারের পুরুষরা সব কিছু সামলান। বংশ পরম্পরায় কিছু পরিবার এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে যুক্ত। তাঁরাই সব কাজ করেন। বরং আমার পূর্বপুরুষদের কাছে 
কৃতজ্ঞ যে এই ক’টা দিন আমরা বেশ আনন্দ করে কাটাতে পারি।’ 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  শারদোৎসবের  রূপ বদলেছে, বনেদি বাড়ির সাবেকি পুজো থেকে সর্বজনীন থিম পুজো, সবক্ষেত্রেই মেয়েদের ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর যে বিশেষ সম্মান লাভ করেছে, তার নেপথ্যও এক অধ্যাপিকার নিরলস গবেষণা ও চেষ্টা ছিল।

14th     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ