বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

ধর্মের নামে বজ্জাতির পরিণতি
পি চিদম্বরম

কংগ্রেস এবং বিজেপির ইস্তাহারের মধ্যে তুলনা করতে পারিনি বলে আমার গত সপ্তাহের কলামে আক্ষেপ করেছিলাম। আমার লেখার পরপরই অবশ্য ‘মোদি কি গ্যারান্টি’ নামে একটি ইস্তাহার বিজেপি প্রকাশ করে। এটা এখন ভীষণ রকমে স্পষ্ট যে বিজেপি আর একটি রাজনৈতিক দলমাত্র নয়, এটি একটি কাল্ট বা গোঁড়া ধর্মীয় গোষ্ঠীর নাম। তাদের এই দলিল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দলের ‘মূল’ নীতি হিসেবে ধর্মীয় গোঁড়ামিটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নথিটি হল গত পাঁচ-দশ বছরে বিজেপি-এনডিএ সরকারের তরফে নেওয়া পদক্ষেপগুলির একটি সংগ্রহ। সমস্ত ত্রুটি এবং বৈষম্যের ভিত্তিতে তাদের যেসব কর্মসূচি চলছে সেগুলিকে নতুন করে সাজিয়েছে বিজেপি। অতঃপর সেগুলিই রূপায়ণের প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা বিস্মৃত হয়ে।
‘মোদি কি গ্যারান্টি’ বা ‘মোদির গ্যারান্টি’ কথাটির মধ্যে বিপুল পরিমাণ অগ্নিবর্ষী বার্তা মজুত রয়েছে, যা কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। সর্বাগ্রে রয়েছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) এবং এক দেশ এক নির্বাচন (ওয়ান নেশন ওয়ান ইলেকশন বা ওএনওই)। উভয়ই, অথবা অন্তত একটির জন্য বড় ধরনের সাংবিধানিক সংশোধনের প্রয়োজন হবে এবং বিজেপি নেতৃত্বকে এই প্রশ্নে অকুতোভয় বলেই মনে হচ্ছে। তাদের প্রথম উদ্দেশ্য হল, একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মডেল তৈরি করা, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত হবে। বিজেপির দ্বিতীয় উদ্দশ্য হল, দেশবাসীকে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে যতটা সম্ভব একসূত্রে বেঁধে ফেলা। এই শাসকের তৃতীয় উদ্দেশ্য হল, তথাকথিত দুর্নীতি নির্মূল করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন। কিন্তু এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য হল চিহ্নিত বিরোধী দল এবং রাজনৈতিক নেতাদের শায়েস্তা করা।
মোদির গ্যারান্টির বাকিটা আর কিছুই নয়, গত ১০ বছরের দাবি এবং অহংকারের চর্বিতচর্বণ, যা ইতিমধ্যেই ভীষণ ক্লান্তিকর। পুরনো স্লোগান বাতিলের পাশাপাশি আমদানি করা হয়েছে কিছু হাতে গরম স্লোগান। উদাহরণ? এটি আর কোনোভাবেই আচ্ছে দিন আনেওয়ালা হ্যায় ট্যায় নয়, এবারের সোজাসাপটা পেশ ‘বিকশিত ভারত’। আহা, যেন কোনও জাদুবলে মাত্র এক দশকেই ভারত একটি ‘উন্নয়নশীল’ দেশ থেকে ‘উন্নত’ রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে! এই দাবি নিতান্তই হাস্যকর। মোদি কি গ্যারান্টি—২০২৪-এর প্রধান প্রতিশ্রুতির দিকেই ফিরে আসা যাক:
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি)
ভারতে একাধিক সিভিল কোড বা দেওয়ানি বিধি রয়েছে। সেগুলি আইনত ‘কাস্টম’ বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণির রীতি/প্রথা হিসেবে স্বীকৃত। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি এবং ইহুদিদের দেওয়ানি বিধিগুলির পার্থক্য আমাদের সবারই জানা। নানা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব রয়েছে; আছে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং দত্তক গ্রহণের অনেক নিয়ম ও রীতিনীতি; উত্তরাধিকারেরও (ইনহেরিটেন্স অ্যান্ড সাকসেশন) বিভিন্ন নিয়ম; এবং মানুষের জন্ম ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও পালিত হয় নানারকম আচারবিচার। পারিবারিক কাঠামো, খাদ্য, পোশাক এবং সামাজিক আচরণেও কিছু বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। তবে এই জিনিসটা সবাই ওয়াকিবহাল নয় যে, প্রতিটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এবং এক-একটি গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে কত অগুনতি পার্থক্য রয়েছে!
ইউসিসি হল সমজাতীয়করণের বা সংহতিস্থাপনের জন্য একটি নরমসরম কথা। ইংরেজিতে যাকে বলে হোমোজেনাইজেশন। এজন্য খোদ রাষ্ট্র কেন এগিয়ে এসে পদক্ষেপ করবে? এমন অভিন্ন নিয়মাবলি রচনার গুরুদায়িত্ব দেশের কে নেবেন কিংবা কোন গোষ্ঠীর পুরুষ ও মহিলাদের উপর তা ন্যস্ত হবে? জনগণের মধ্যে যে দুস্তর তফাত, তার জন্য যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বকারী হবে কি এই ধরনের কোনও গোষ্ঠী? সমজাতীয়করণ হল—প্রতিটি ব্যক্তিকে এক ছাঁচে ফেলার এবং নাগরিকদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার একটি দুষ্ট প্রয়াস—অনেকটা চীনের সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার ব্যর্থ এক কাণ্ডকারখানা। ইউসিসি হল—মানুষের মুক্ত চেতনার অবমাননা। এই ফরমান চেপে বসলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ মুছে যাবে।
ব্যক্তিগত আইনের সংস্কার প্রয়োজন কিন্তু সেই সংস্কারের চাহিদা ও প্রকরণ অবশ্যই উঠে আসতে হবে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিতর থেকে। রাষ্ট্র প্রণীত আইন—শুধুমাত্র সম্প্রদায়ের তরফে গৃহীত কিংবা স্পষ্টভাবে মেনে নেওয়া সংস্কারকে স্বীকৃতি দিতে পারে। ইউসিসি বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতির মধ্যে তিক্ত বিতর্কের সূত্রপাত ঘটাবে। বিতর্কগুলি চলে যাবে ক্ষোভ, ক্রোধ এবং অসন্তোষের দিকে। অতঃপর সেই অসন্তোষই রূপ নেবে দ্বন্দ্বের। ব্যাপারটা শেষমেশ হিংসাত্মকও হয়ে উঠতে পারে!
এক দেশ এক নির্বাচন (ওএনওই)
এক দেশ এক নির্বাচন বা সংক্ষেপে ওএনওই হল—আঞ্চলিক পার্থক্য, পছন্দ এবং সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার একটি গোপন মতলব। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রেরণা নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হল একটি ফেডারেশন বা সংঘ। সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের জন্য দু’বছর অন্তর। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয় প্রতি চার বছরে একবার। এছাড়া প্রতি ছ’বছর অন্তর সেনেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার মতো ফেডারেল পার্লামেন্টারি সিস্টেম বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সংসদীয় ব্যবস্থায়ও একযোগে ভোট নেওয়া হয় না। একটি এগজিকিউটিভ গভর্নমেন্ট বা কার্যনির্বাহী সরকার তার প্রতিদিনের কাজকর্মের ব্যাপারে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ। ওএনওই হল এই নীতির বিরোধী। জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) দেশজুড়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি ক্যালেন্ডার মেনটেন করে।  এক দেশ এক নির্বাচন আসলে, কমিশনের ওই নিয়ন্ত্রণ সরকারের তরফে ছিনিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
দুর্নীতি-বিরোধী ধর্মযুদ্ধ
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথাকথিত ধর্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য হল সমস্ত বিরোধী দলকে শেষ করে দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরোধী নেতাদের দূরে রাখা। বিজেপির মারাত্মক আলিঙ্গন ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দলকে ((মূলত একটি রাজ্যেই যাদের কর্মকাণ্ড) সাইনবোর্ড-সর্বস্ব করে ফেলেছে। কংগ্রেস এবং ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক দলগুলির মোকাবিলায় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে আইনগুলি। আমি নিশ্চিত যে ইডি, এনআইএ এবং এনসিবি যে পদ্ধতিতে কিছু লোককে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিচ্ছে, এটা কোনও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। এই তথাকথিত ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ আদৌ  দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়, এটি বরং আরও আধিপত্য বিস্তারের কৌশল।
ইউসিসি এবং ওএনওই-র মতো দুটি সিদ্ধান্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিজেপি মরিয়া কেন? কারণ, অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণের পরে বিজেপি উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির হিন্দু আধিপত্যবাদীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপযোগী কিছু বিষয়ের সন্ধানে রয়েছে—যেসব ইস্যুকে সামনে রেখে হিন্দিভাষী, রক্ষণশীল, ঐতিহ্য-মগ্ন, বর্ণ-সচেতন শ্রেণিগুলি থেকে নিশ্চিতভাবে রাজৈনতিক ফায়দা তোলা সম্ভব। এই রাজ্যগুলিই তিন দশক যাবৎ আরএসএস এবং বিজেপির রাজনৈতিক সমর্থন লাভের উৎস। সেই রাজনৈতিক ভিত্তিকে সুসংহত  বা আরও মজবুত করার কৌশলের নামই হল ইউসিসি এবং ওএনওই। এরপর আঞ্চলিক দল বা ভারতের ধর্মীয়, জাতি ও ভাষাগত গোষ্ঠীগুলি তাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় জাহির করতে গেলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির নির্বাচনী ওজনের গুঁতোয় ঘায়েল হয়ে যাবে।
এই নির্বাচনে মোদির ইউসিসি এবং ওএনওই গ্যারান্টি তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এবার তামিলনাড়ু (১৯ এপ্রিল) এবং কেরলের (২৬ এপ্রিল) জনগণের রায় কী হবে, তা আন্দাজ করতে পারি। তবে অন্য অঞ্চলের মধ্যে, বিশেষ করে উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী, রক্ষণশীল এবং বর্ণ-সচেতন রাজ্যগুলিতে বিজেপির মনোবাঞ্ছা পূরণ হতে পারে।
• লেখক সাংসদ ও দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। 
মতামত ব্যক্তিগত

22nd     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ