বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দেশের নাম আল-জাজিরা!
মৃণালকান্তি দাস

সৌদি সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরেই একসময় আরব দুনিয়া থেকে পাততাড়ি গোটাতে হয়েছিল সংবাদসংস্থা বিবিসিকে। সেন্সরের কঠোর বিধিনিষেধের কোপে পড়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল আরবি ভাষার টেলিভিশন স্টেশন!
আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে ১৯৯৬ সালের পয়লা নভেম্বর অরবিট কমিউনিকেশন কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ হয়েছিল আল-জাজিরা স্যাটেলাইট চ্যানেলের। লক্ষ্য, আনটোল্ড স্টোরি ব্রেক করা। খবরের পিছনের খবর খুঁজে বের করা। স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, ‘দি ওপিনিয়ন অ্যান্ড দ্য আদার ওপিনিয়ন’। কাতারের তৎকালীন আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আল-জাজিরাকে প্রথম পাঁচ বছরে টিকিয়ে রাখার জন্য ১৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছিলেন। সেই শুরু...।
মধ্যপ্রাচ্যে আরবি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা ৩৫ কোটি। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তাদের কাছে পৌঁছানো শুরু করেছিল স্থানীয় রেডিও স্টেশনগুলি। ১৯৯০-এর দশকে সৌদি রাজপরিবার আরবি ভাষার বিভিন্ন সংবাদপত্র কিনতে শুরু করে এবং গোটা আবর দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে দিতে থাকে। এছাড়া আরও বেশি দর্শক টানতে এমবিসি নামে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু করেছিল সৌদি আরব। এই উদ্যোগ জনপ্রিয় না হলেও আরব দুনিয়ার সংবাদজগতে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, সৌদি আরবই মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমের লাগাম হাতে তুলে নেবে। আর এটাই কাতারের রাজ পরিবারকে ‘আল-জাজিরা’ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করেছিল। ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক বলেছিলেন, আরব দুনিয়ার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ কাতার ভেবেছিল, স্যাটেলাইট চ্যানেলের উপর ভর করে তারা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। যে সাম্রাজ্যের সূর্য্য কখনও ডুববে না। হয়েছেও তাই। জন্মসূত্রে প্যালেস্তাইনি আল-জাজিরার ডিরেক্টর জেনারেল ওয়াদা খানফার আট বছর ধরে চ্যানেলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ছোট্ট কাতারের প্রতি আরব দুনিয়ার বিদ্রুপের জবাব দেওয়া শুরু করেছিল সেই চ্যানেল।
২০০০ সালে কাতার সফরে গিয়ে মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক বিনা নোটিসে আল-জাজিরা দপ্তরে ঢুকে পড়েছিলেন। সংবাদ বিভাগটি ঘুরে বলে ফেলেছিলেন, এইটুকু দেশলাই বাক্সে এত আগুন ধরে! তখনও তিনি জানতেন না, দশ বছর পর আরব-বসন্তের প্রসারে বড় ভূমিকা নেবে এই আল-জাজিরা। মুবারকের পতনের পথও এঁকে দেবে তারাই। সেই সময় ব্রেকিংয়ের বন্যা বইয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল কাতারের এই সংবাদমাধ্যম। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর এক যুবক গায়ে আগুন দিয়ে মরার পর যে বিক্ষোভ শুরু হয় তিউনিসিয়ায়, তার আগেই ওই দেশে আল-জাজিরার ব্যুরো অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানবাধিকার কর্মী লতফি হাজ্জির মোবাইল ক্যামেরায় তোলা ছবি দিয়েই আল-জাজিরা তাদের ধারাভাষ্য শুরু করে। ‘সিদ্দি বওজিদ বিদ্রোহ’-এর সেই সংবাদ ক্রমে মিশর, বাহরিন, সিরিয়া, লিবিয়া— সর্বত্র পালাবদলের ইন্ধন জোগায়। এত সাফল্যের পরও ২০১১-এর ২০ সেপ্টেম্বর বরখাস্ত করা হয় আল-জাজিরার ডিরেক্টর জেনারেল ওয়াদা খানফারকে। তাঁর আসনে বসানো হয় কাতার গ্যাস কোম্পানির অধিকর্তা তথা শাসক আমির পরিবারের শেখ আহমেদ বিন জসিম আল থানিকে। তা নিয়ে কম জল্পনা হয়নি। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, আরব বসন্ত কি প্রচারমাধ্যমকেও গ্রাস করেছে? নাকি প্রমাদ গুনেছিলেন স্বয়ং কাতারের আমিরও। সাদ্দাম হোসেন, হোসনি মুবারক বা গদ্দাফির পরিণতি দেখে হয়তো তাঁরও মনে হয়েছিল, খানফারের হাত ধরেই কোনওদিন আবর বসন্তের ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে কাতারের মাটিতেও! যে কাতারে গণতন্ত্র নেই, আমিরই শেষ কথা। আল-জাজিরাও চলে আমিরের মর্জিতেই। তাহলে এতদিন ওয়াদা খানফারকে এত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল কেন?
‘আল-জাজিরা: দি ইনসাইড স্টোরি অব দ্য আরব নিউজ চ্যানেল’ বইয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ হিউ মাইলস লিখছেন, চরিত্রগতভাবে আল-জাজিরা কখনওই মধ্যপন্থা অবলম্বন করেনি। আল-জাজিরার আরব শাখা প্রতিনিয়ত পক্ষপাত দেখিয়ে গিয়েছে। এটাই ছিল ওয়াদা খানফারের ‘টিআরপি’। তবুও তাঁর বিরুদ্ধে অঘোষিত বিস্তর অভিযোগ ছিল। যেমন, বিন লাদেন প্রসঙ্গ। ৯/১১-র পর ওসামা যখন বিবিসি-র নাগালেরও বাইরে, তখন দিনের পর দিন এই চ্যানেলে লাদেন, আইমান আল-জাওয়াহিরি, মুসলিম ব্রাদারহুডের আধ্যাত্মিক নেতা ইউসুফ আল-কারাদাবি, আইএসের আবু মুসা আল জারকাবিসহ বিভিন্ন শীর্ষ জঙ্গিদের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে। যদিও আল-জাজিরার সেই ফুটেজ কিনেছে গোটা দুনিয়ার সংবাদমাধ্যম। আফগান যুদ্ধের সময় কখনও কখনও সেই দর পৌঁছে গিয়েছিল আড়াই লক্ষ মার্কিন ডলারে। ভারসাম্যের কোনও নীতি মানেননি ওয়াদা খানফার। প্রশ্ন উঠেছিল, যে কাতার সরকারের টাকায় চ্যানেলটি চলে, তার প্রায় কোনও খবরই কেন আল-জাজিরায় থাকে না। সম্প্রচার শুরুর পর থেকে এই চ্যানেল বার-বার আক্রান্ত হয়েছে দু’দিক থেকেই। আরব দুনিয়ায় এমন দেশ নেই যে এই চ্যানেলের সমালোচনা করেনি। দিনের পর দিন খেপিয়েছে ন্যাটোর দেশগুলিকে। কাতারের প্রধানমন্ত্রীও একসময় বলেছেন, দোহার ওই বাড়িটাই তাঁর সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।
আসলে কাতার একটি অতি ক্ষুদ্র দেশ, যাকে গ্রাস করার জন্য দু’দিকে আছে দু’টি বৃহৎ শক্তি: সৌদি আরব এবং ইরান। গিলে যে খায়নি, তার কারণ গোটা পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার এত বড় সেনা-ছাউনি আর কোথাও নেই, এমনকী সৌদি আরবেও নয়। সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের কথায়, প্রথম যখন আল-জাজিরার ইংরেজি শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন আমেরিকানরাও মধ্যপ্রাচ্যে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শুরু বলে প্রশংসা করেছিল। আল-জাজিরার মার্কিন সংস্করণ দেখে মনে হচ্ছিল, সিএনএন বা ফক্স নিউজের আরও একটি সংস্করণ। অথচ, আল-জাজিরা বাহরিন কিংবা সৌদি আরবের ভিতরের প্রতিবেদন প্রচার করত কম। কখনও কেউ প্রশ্ন তোলেনি, কাতার কেন গণতান্ত্রিক ধারায় চলে না। আর এই আল-জাজিরাই যখন ওসামা বিন লাদেনের এক্সক্লুসিভ ভাষণ প্রচার শুরু করে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বোমা মেরে গোটা স্যাটেলাইট চ্যানেলের অফিস উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
২০০১ সালের অক্টোবরে ন্যাটো-বাহিনী আফগানিস্তান আক্রমণ করে। এক মাসের মধ্যে আল-জাজিরা চ্যানেলের কাবুল অফিস বোমায় ধ্বংস হয়। অভিযোগ, সেই আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিক তায়সের আলুনি। তিনিই নিয়মিত বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিতেন। বিন লাদেনের দৃষ্টান্ত তুলে আল-জাজিরাকে যখন ইসলামি মৌলবাদের প্রচারক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেই সময়েই একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, যার নাম ‘নাস্তিকের কোরান পাঠ’। সৌদি আরব থেকে বহিষ্কৃত এক গবেষক সেখানে জানান, ওই দেশে ইসলামের মর্মবাণী কীভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়, আরব দুনিয়ায় আল-জাজিরাতেই প্রথম শোনা গিয়েছিল ইজরায়েলিদের হিব্রু ভাষা। ‘দি অপজিট ডিরেকশন’ নামে দূর-দূরান্তের সেই টক শো ছিল দ্বন্দ্বমূলক। নৈতিকতা এবং ধর্মের বিষয়গুলি নিয়ে বিতর্কের একটি ধ্রুবক উৎস। যা নিয়ে আবর দুনিয়ার রক্ষণশীলরা সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। খেপে গিয়ে আরব স্টেটস ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন আল-জাজিরার সদস্যপদ বাতিল করে। গোটা সৌদিতে ‘জ্যাম’ করা হয় চ্যানেলের সম্প্রচার। তারা আল-জাজিরাকে হোটেল ভাড়া দেওয়াও নিষিদ্ধ করে। সৌদির সঙ্গে আল-জাজিরার লড়াই সেদিন থেকেই।
এর আগে ১৯৯৯ সালে, আলজেরিয়ান সরকার একটি সম্প্রচার সেন্সর করার জন্য বেশ কয়েকটি বড় শহরের বিদ্যুৎ কেটে দিয়েছিল। একাধিক আরব দেশ অর্থ সঙ্কট তৈরি করতে বিজ্ঞাপনদাতাদের উপরও চাপ দিয়েছিল। তবুও আল-জাজিরা দ্রুত সমগ্র অঞ্চলের প্রভাবশালী সংবাদসংস্থা হয়ে উঠেছে। শুরু থেকেই চ্যানেলটি নির্ভীক প্রতিবেদন, উত্তপ্ত বিতর্ক ও আরব অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসকদের বিষয়ে ঢালাও প্রচার করে অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করেছিল। তাহরির স্কোয়ারে শোনা গিয়েছিল ‘লং লিভ আল-জাজিরা’ স্লোগান। অবশ্য এসবের মাধ্যমে চ্যানেলটি কাতারের মালিকদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজও করছিল। কিন্তু কাতারের এই চ্যানেলটি এমন কিছু বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে, যা আরব বিশ্বে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। এমনকী এর মতামতও অন্যান্য আরব মিডিয়া থেকে ভিন্ন। ২০১৭ সালে টিভি চ্যানেলটি বন্ধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাতারের উপর চাপ সৃষ্টি করে অন্য আরব দেশগুলি। কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক যুদ্ধ থামানোর জন্য এটাই ছিল অন্যতম পূর্বশর্ত। সেই শর্ত মানবে কেন কাতার?
বছরের পর বছর সৌদি মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলির সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কাতারের আমির। আল-জাজিরা দিয়ে এর প্রত্যুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। আল-জাজিরা শুরু থেকেই ইসলামপন্থাকে চাগিয়ে দিয়ে আরব বিশ্বের দর্শকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের মধ্যে সংঘর্ষ সরাসরি সম্প্রচার করা শুরু করেছিল তারাই। এমনকী ইজরায়েলের আইনসভাতেও প্রতিবেদক পাঠিয়েছে আল-জাজিরা। যা কোনও আরব চ্যানেল প্রচার করার সাহস দেখায়নি। ফলে সৌদি, আরব আমিরশাহির চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে আল-জাজিরা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে, আল-জাজিরা কি সংবাদমাধ্যম নাকি জঙ্গি সংগঠন?
আরব দুনিয়ায় লড়াইটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসলে দেশটার নাম আল-জাজিরা। তার রাজধানী কাতার।

17th     November,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ