বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
গল্পের পাতা
 

দুনিয়াদারি
সৌরভ মিত্র

কাল রাত থেকেই দেবোত্তমের মনটা বিশেষ ভালো নেই। ছেলেকে বকাবকি করলেই দু-তিনদিন এমন হয়। কারণগুলো আপাতভাবে ন্যায্য হলেও কোথাও যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করে। বছর-আটেক বয়স। সেই অর্থে চালাক-চতুর নয়। আপনভোলা। দুই বেডরুম ফ্ল্যাটে মাঝেমাঝেই কথা বলে নিজের কাল্পনিক বন্ধুদের সঙ্গে। কাজের কথা ভুলে যায়। স্কুলে প্রায়ই বই-খাতা ফেলে আসে। ক্লাসের লেখা শেষ করতে পারে না বেশিরভাগ দিনই। মা অন্ত প্রাণ, বাবা তার যুদ্ধের আর পাগলামির দোসর। দুনিয়াদারির জলহাওয়া গায়ে লাগেনি এখনও। এক-একরাতে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বা চুলে বিলি কাটতে-কাটতে হঠাৎ কান্না পেয়ে যায় দেবোত্তমের। না, সন্তানের বিষয়ে কোনও আদিখ্যেতা নেই ওর। মায়া, বড্ড মায়া। নিজের হারিয়ে যাওয়া সময়, নিজের ‘না-হয়ে-উঠতে-পারা’ মানুষটা বুকের মধ্যে ছটফট করে যেন!
সেই ছোঁড়াই আবার মাঝেমাঝে এমন এক-একটা কাণ্ড করে বসে যে, না বকে থাকা যায় না! স্কুলে অতিরিক্ত বন্ধুপ্রীতির জন্য সম্প্রতি বেশ কয়েকটা পরীক্ষায় ধেড়িয়েছে নাকি। এই যেমন, দিন-কতক আগে, স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতার জন্য বাছাইপর্ব চলছিল নাকি। তার কোনও এক প্রাণের বন্ধু মাঝপথে লাইন ভুলে গিয়েছিল, তাই সে-ও নাকি ইচ্ছে করে খারাপ বলেছে। বন্ধুকৃত্য! তুই না পারলে আমিও পারব না! গিন্নি সপ্তাহ-দুয়েক ধরে ঠেলে-গুঁতিয়ে আদরে-ধমকে রপ্ত করিয়েছিল। বাদ পড়ার কারণ জেনে শ্রীমতী সেনশর্মা অগ্নিশর্মা হয়েছেন। 
নগর পুড়লে দেবালয় কি আর রক্ষে পায়? রোজ অফিস থেকে ফিরতেই শুরু হয় নালিশের বন্যা। —‘জানো, তোমার ছেলে আজ অমুকটা করেছে’ আর ‘জানো, তোমার ছেলে আজ তমুকটা করেনি’ জাতীয় পাপ-পুণ্যের হিসাব-কিতাব। মোদ্দা কথাটা হল, ‘লালু, হুসস্।’ ‘লেলিয়ে দিচ্ছি, যাও, এবার কামড়াও।’ তারপর নিজের বিবেক বস্তুটাকে নোংরা মোজা আর বিবেচনাকে ঘেমো স্যান্ডোগেঞ্জির মতো মহাকালের ওয়াশিংমেশিনে ঢুকিয়ে ছেলে মানুষ করার ছেলেমানুষিতে নামতেই হয়। মাঝেমাঝে ভাবলে ওর অবাক লাগে, সারা দুনিয়ায় মানুষই একমাত্র জন্তু যার শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার পাঠ নিতেই জীবনের সিলভার জুবিলি কেটে যায়। পনেরোআনা প্রাণীর তো আয়ুও তার চেয়ে কম। ধুর, ঘেন্না ধরে গেল মানবজনমে। এই হোমো সেপিয়েন্সগিরির চেয়ে বনের পশু, বা নিদেনপক্ষে হোমিনিড হওয়াও ভালো ছিল বোধহয়। শিকার আর টুকটাক কিছু  চাষআবাদ শিখলেই কেরিয়ার সেটলড্!
আজ রাস্তায় পা রাখতেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল দেবোত্তমের। সবে সকাল সাড়ে-আটটা, এর মধ্যেই- যাকে বলে চাঁদিজ্বালানো রোদ! শাটলগাড়ির স্ট্যান্ড পর্যন্ত অটোয় যেতে মিনিট দশেক লাগে। সেখান থেকে অফিস আরও ঘণ্টাখানেকের রাস্তা। শরীরের দশা ততক্ষণে আলুসেদ্ধ, আর গায়ের জামাখানা গামছা। 
ড্রাইভারের ডানদিকে বসা তখনও নিষিদ্ধ হয়নি। কোনওমতে শাটল স্ট্যান্ডে পৌঁছতেই আরেক দফা বিরক্তি। টাটা সুমো বা মহিন্দ্রা বলেরোর বদলে কী এক ব্যাঙাচি গোছের ভ্যানগাড়ির আমদানি হয়েছে আজকাল। নামেই মোটরগাড়ি, চালচলনে এক্কা! গতি বাড়লে হেঁচকি তোলে, গাদাগাদি লোক ঠুঁসেও তিড়িং-বিড়িং লাফায়! ধুর, লেট হয় হোক, ব্যাঙাচিবাহন নৈব নৈব চ।
রুমালটা এর মধ্যেই ভিজে গিয়েছে। মোটামুটি ভদ্রস্থ পরের গাড়িটা সামনে দাঁড়াতেই ও দরজার পাশের সিটে অফিসব্যাগটা রেখে দিয়েছিল। চারজনে একটু চাপাচাপিই হয়, তবুও এখানে বাতাসটুকু গায়ে লাগে অন্তত। কিন্তু, টাটা-সুমোর মাঝের সিটের চার নম্বর যাত্রীকে দেখেই আপনমনে দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে দেবোত্তম। জনৈকা এলোকেশী। কপালে বাতাসের সুখটুকুও সয় না, শিভ্যালরির কাঁথায় আগুন! এদিকে গাড়ি নড়তেই এলোকেশী কাচ তুলে দিচ্ছিলেন। দেবোত্তম আপত্তি জানায়, ‘খুব গরম, ওটা বন্ধ করবেন না প্লিজ।’
ভদ্রমহিলা উদ্ভট অ্যাকসেন্টে বললেন, ‘খুব এয়ারি। আমার হেয়ারগুলো আপনার ফেসে লাগবে।’
কথাটা শুনে মটকা জ্বলে যায় দেবোত্তমের। এই ট্যাঁশগিরি একটুও সহ্য করতে পারে না। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ফেসে লাগলেও টেঁসে যাব না ম্যাডাম। তবুও মনে অপরাধবোধ জাগ্রত হলে অলকগুচ্ছ কবরীবদ্ধ করুন।’
গাড়িসুদ্ধ লোক মুখ চেপে ফ্যাকফ্যাক করতে শুরু করল। ‘অলক’ বা ‘কবরী’ সম্ভবত এলোকেশীর সিলেবাসের বাইরের শব্দ। তিনি কী বুঝলেন কে জানে, পুরো কাচটা তুলে দিয়ে সারা রাস্তা সেদিকেই মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলেন। অবশ্য একটু বাদেই মনে হচ্ছিল, না হয় গরমই সহ্য করতে হতো কিছুক্ষণ। একজন অপরিচিতা মহিলার সঙ্গে এতটা খিটখিটে ব্যবহার ঠিক কাজ হয়নি। আগেও ভেবেছে, তাও নিজের এই দিকটা শুধরোতে পারেনি। অপ্রাসঙ্গিক বা অগভীর কথার উত্তরে শ্লেষাত্মক বাক্যগুলো যেন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। বিপরীতে কোনও মহিলা থাকলে কিছুটা বেশিই যেন! তলিয়ে ভেবে দেখেছে দেবোত্তম। না, গাঁট নারীবিদ্বেষ বা নির্বোধ পিতৃতন্ত্র— কোনওটাই ওর মধ্যে নেই। তবু কেন যে এমন হয়? ভগবানই জানেন!
পৌঁছতে দেরি হয়েছে কিছুটা। অফিসে জনগণের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে এর মধ্যেই। তাদের অন্তহীন অভিযোগ, টেবিলে ততোধিক ফাইল! এই ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফারের সবে মাস-তিনেক হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন থেকেই দম ফেলার ফুরসত পায়নি। আজও তার অন্যথা হল না। কখন যে লাঞ্চ-আওয়ার পেরিয়ে গিয়েছে! পেটের ভেতরে মোচড় না দিলে টেরও পেত না হয়তো! 
—এক ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। দেখা করতে চান। আপনার ঘরে ভিড় ছিল দেখে বসিয়ে রেখেছি।
—কোত্থেকে এসেছেন, কিছু বলল? ভিজিটিং কার্ড-টার্ড দিয়েছেন কিছু?
ওর গলায় কিছুটা বিরক্তি।
—না। নাম বললেন কী এক ব্যানার্জি যেন।
—ঠিক ভাবে শুনবেন তো! যাই হোক, লোন, ক্রেডিট কার্ড বা ইনস্যুরেন্স বেচতে আসেনি আশা করি?
—দেখে তো তেমন মনে হয়নি। আপনারই বয়সি হবেন। বললেন, ব্যক্তিগত কাজ।
—হুম্। একটু করিডরের দিকে যাচ্ছি। মিনিট পাঁচেক পর নিয়ে আসুন।
আসলে, রোজের বরাদ্দ ঠান্ডা রুটি-তরকারি চেবানোর পর মনটা একটু সিগারেট-সিগারেট করে। করিডরের শেষ প্রান্তের ফাঁকা ঘরখানা অলিখিতভাবে সেই কাজের জন্য উৎসর্গীকৃত। সেদিকে পা বাড়াতেই অফিসের পিয়ন বিশ্বাসদা পিছু ডেকেছিল। চেয়ারে ফিরে আসার মিনিটখানেকের মধ্যেই সাক্ষাৎপ্রার্থীর প্রবেশ। ধাক্কা লাগল কিছুটা, ব্যানার্জি!... নীহারিকা! কিন্তু, ঘোষ ছিল তো! ও আচ্ছা, বিয়ের পর। কয়েক মুহূর্তের অস্বস্তি পেশাদারিত্বে ঢেকে ফেলে দেবোত্তম। চোখে-মুখে ফিরে আসে স্বাভাবিক ব্যস্ততা, ‘বসুন।’ না, গলায় কোনও বাড়তি উষ্ণতা প্রকাশ পায়নি।
—বহু কষ্টে এই অফিসের খোঁজ পেলাম। কমার্শিয়াল ট্যাক্সে ছিলে জানতাম। সেখানে গিয়ে দেখি ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছ। ওরা কিছু বললও না কোথায়। তুমি তো ফেসবুকেও নেই। শেষে একে-তাকে জিজ্ঞেস করে...। যাই হোক, কেমন আছ?
—এটা অফিস তো, ‘আপনি’ বলুন প্লিজ।
কাঠ-কাঠ উচ্চারণে কথাটা শুনে কিছুটা থমকে যায় নীহারিকা। —স্যরি। কেমন আছেন?
‘খুব ভালো।’— বেশ জোর দিয়েই কথাটা বলল দেবোত্তম। এখনও মাঝেমাঝে একাকী অতীতযাপন বা আত্মমূল্যায়নের মুহূর্তে স্মৃতিগুলো মাথায় ভিড় করতেই দাঁতে দাঁত চেপে যায় আপনা থেকেই, গা গুলিয়ে ওঠে। সম্পর্ক হারানোর আফশোস নয়। বিশ্বাসভঙ্গের ঘৃণা। অসম্মানের জ্বালা। এমন কিছু অভিনব বা অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। জন্ম আর মৃত্যুর মতো প্রতিনিয়ত অনেকের সঙ্গেই হয়ে চলেছে। কিন্তু, ওই প্রতিটা ঘটনার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর আনন্দ, শোক বা আঘাত একান্তই ব্যক্তিগত। রোগের ধাঁচটা মহামারী হলেই তো রোগভোগের কষ্ট উবে যায় না।
‘আপনি কেমন আছেন’— জাতীয় প্রতিপ্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার ইচ্ছে হয়নি এক মুহূর্তের জন্যও। সেই খবরে কিছুই আসে যায় না। আচ্ছা, বিশ্বাসদাকে দিয়ে একে ঘর থেকে বের করে দিতে বললে কেমন হয়? নাহ্, অতটা, থাক।
—প্রয়োজনটা বলুন। তবে একটু সংক্ষেপে। কাজ আছে।
নীহারিকাদের পারিবারিক ব্যবসা। আর সমস্যাটা কমার্শিয়াল ট্যাক্স সংক্রান্তই। জিএসটির আগের জমানার ঘটনা। ভিনরাজ্যে মালপত্র আদান-প্রদানের জন্য দরকার পড়ত ‘ওয়ে-বিল’-এর। কমার্শিয়াল ট্যাক্স দপ্তরের ওয়েবসাইটে নিজের অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে কোম্পানি সেই বস্তুটি বানিয়ে নিতে পারত। কমার্শিয়াল ট্যাক্সের প্রাপ্য টাকাপয়সা সময়মতো মিটিয়ে দিলেই হল। 
বহু ক্ষেত্রেই ছোট বা মাঝারি ব্যাবসার মালিকদের এইসব অনলাইন বিষয়ে গাত্রদাহ থাকে, আটঘাট বোঝেও না সবসময়। ফলে, অফিসের ফিন্যান্স বা অ্যাকাউন্টসের লোকজনের উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। এবার সেই লোক চাকরি ছাড়লেও পাসওয়ার্ড বদলানোর কথা মালিকদের মাথায় থাকত না! তাই বেনিয়মও হয়েছে খুব। মালিকের অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে জালিয়াতি তো বটেই, চাকরি বদলে অন্য কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর পুরনো কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে শয়ে-শয়ে ওয়ে-বিল বানিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বিরল ছিল না। ওদিকে বকেয়া ট্যাক্সের সঙ্গে তার সুদ আর অনাদায়ের জরিমানার পরিমাণ পৌঁছে যেত হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ, লক্ষ ছাড়িয়ে কোটিতে। আর হঠাৎ একদিন সেই নোটিস হাতে পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই মালিকের মাথায় হাত পড়ত। মামলা-মোকদ্দমা, থানা-পুলিস, হাজারটা ঝামেলা। নীহারিকার সমস্যাও এই ধরনের। এখন যদি দেবোত্তমের পুরনো অফিস বাবদ চেনা-পরিচিতি কাজে লাগিয়ে কোনও সুরাহা হয়!  কিছুটা অদ্ভুতই লাগছিল। শেষেরও বোধহয় ন্যূনতম সৌজন্য-শিষ্টাচার থাকে। একসময় সেটুকুরও প্রয়োজন বোধ করেনি। এতগুলো বছর কোনও যোগাযোগ ছিল না, থাকার কথাও নয়। আজ নির্দ্বিধায় সাহায্য চাইতেও বাধছে না! দুঃখিত ম্যাডাম, আপনি এখন পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।
—মোবাইল নাম্বারটা দেওয়া যাবে? পরে একবার খবর নেওয়া যেত।
দেবোত্তম ভাবছিল বলবে, ঘন-ঘন বদলে ফেলার অভ্যেস নেই। নাম্বার একই আছে।
‘দেওয়া যাবে?’ প্রথমবারে উত্তর না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল নীহারিকা।
—ল্যান্ডলাইন নাম্বারটা রেখে দিন। মিটিং না থাকলে অফিস আওয়ারে এখানেই পাবেন।
—আচ্ছা। কাল কি একবার ফোন করব?
—এত তাড়াহুড়ো করলে হবে না। এই সপ্তাহটা খুব ব্যস্ত।
রুক্ষ গলায় কথাটা বলল দেবোত্তম।
নীহারিকা চলে গিয়েছে। শেষবেলায় তার অপমানিত মুখটা দেখে তৃপ্তি হচ্ছিল বেশ। যদিও সমস্যাটার সমাধান অজানা নয়। কমার্শিয়াল ট্যাক্সের ওয়েবসাইট হোস্ট করা হয় মিডলটন রো-এর একটা অফিস থেকে। যে সমস্ত লগ-ইনের পর সন্দেহজনক ওয়ে-বিলগুলো ইস্যু করানো হয়েছিল, তাদের খোঁজখবর নিতে হবে সেই অফিস থেকে। মিলিয়ে দেখতে হবে, লগ-ইনগুলো নীহারিকাদের অফিস বা বাড়ির বদলে অন্য কোথাও থেকে করা হয়েছিল কি না। আর তেমন কিছু মিললে, পাসওয়ার্ড চুরি যাওয়ার রিপোর্ট করতে হবে একটা। জেল-জরিমানা বাঁচানোর পক্ষে এটুকুই অনেক। আর হোস্ট-সার্ভার থেকে কোনও উত্তর না পাওয়া গেলে বেনিফিট অব ডাউট। কিন্তু, পদ্ধতি জানা থাকলেই বা, ওর কী!...
সেদিন সন্ধেয় পারিবারিক নিমন্ত্রণ ছিল যাদবপুরের দিকে। আর পরদিন সকালে অফিসের একের পর এক ফাইলের চাপে নীহারিকার প্রসঙ্গটাই যেন হারিয়ে গিয়েছিল চিন্তা-ভাবনা থেকে! পৌনে-এগারোটা নাগাদ মোবাইলটা বেজে ওঠে। বিতস্তা, ওর স্ত্রী। দু-তিনটে কথার পরই চেয়ার ছেড়ে উঠে তির বেগে বেরিয়ে যায় অফিস থেকে। 
ছেলের স্কুল থেকে ফোন এসেছিল বাড়িতে। করিডরে পড়ে কেটে গিয়েছে অনেকটা। রক্ত ঝরেছে খুব। সেলাইয়ের দরকার পড়তে পারে নাকি!
ফোন পাওয়া-মাত্র রওনা দিয়েও লম্বা রাস্তা আর বিশ্রী ট্রাফিক ডিঙিয়ে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ছেলে কে নিয়ে বিতস্তা ততক্ষণে হাসপাতালে। বেশ কষ্ট পেয়েছে তাতান। ঠোঁটের ডানদিকে দুটো সেলাই। দুই গালে, চোখের নীচে কান্না শুকিয়ে দাগ হয়ে রয়েছে। ইউনিফর্মে রক্তের ছিঁটে। বাড়ির পথে ট্যাক্সিতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেবোত্তমের জামা খামচে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে বেচারা।
—কীভাবে হল?
—আরে ওই অঙ্কিতার ছেলেটা, আরিয়াভীর...
—সে আবার কী? ওহ আচ্ছা, আর্যবীর।
—ওর বাবা-মা এভাবেই বলে নামটা।
—যত্তসব ট্যাঁশ লোকজন!
—ছেলেটা প্রচণ্ড মারকুটে। রোজই ইচ্ছে করে কাউকে না কাউকে হয়  ফেলে দিচ্ছে, না হয় দেওয়ালে বা ডেক্সে মাথা ঠুকে দিচ্ছে, কাল এর খাতায় জল ঢেলে দেয় তো আজ অন্যজনের বই লুকিয়ে রাখে! আজেবাজে কথাও বলে! অদ্ভুত মানসিকতা।
—স্কুলে কমপ্লেন করেছ?
—আর কমপ্লেন! শোনো তোমার ছেলের কাণ্ড! ফেলে দেওয়ার পর বাকি বাচ্চাগুলো তাতানকে টিচার্সরুমে  নিয়ে গিয়েছিল। ক্লাসটিচার যত জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে, ছেলে কিছুতেই বলে না! শেষে বাকি বাচ্চাদের মধ্যে একজন ‘আরিয়া’, মানে ওই আর্যবীরের ধাক্কা দেওয়ার কথাও বলেছিল। তখন নাকি তোমার ছেলে  ম্যামের প্রায় হাতে-পায়ে ধরে কেঁদেকেটে একসা!— না ম্যাম, আপনি আরিয়াভীরকে পানিশমেন্ট দেবেন না। আমরা খেলছিলাম ইত্যাদি। হাব-ভাব দেখে তিনিও নাকি কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না!
—ওই ছেলেটির গার্জেন কল হয়নি?
—ডেকেছিল। স্কুল থেকে অঙ্কিতা নার্সিংহোমেও এসেছিল। নিজের ছেলেকে কিছু বকবে কী, তাতান তাকেও জড়িয়ে ধরে, ‘না আন্টি, তুমি ওকে মারবে না, ও আমার বন্ধু।’
হঠাৎ গলার কাছে দলা-পাকানো কান্নার অস্তিত্ব টের পায় দেবোত্তম। ঘুমন্ত ছেলের হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে।
‘ও কী, তুমি কাঁদছ কেন?’ বহু কঠিন পরিস্থিতিতেও ওকে ভেঙে পড়তে দেখেনি বিতস্তা। একবার মাঝরাতে ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়েও শক্তপোক্ত ছিল বেশ। তাহলে আজকে হঠাৎ—!
ট্যাক্সি ততক্ষণে ফ্লাইওভারে। খোলা জানলার বাতাস গভীরভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে দেবোত্তমের চোখ-মুখ। আহা, উড়ে যাক সব জেদ, ভেসে যাক যত মেকি আত্মসম্মানবোধ, ছিঁড়ে কুচিকুচি হোক হিসাবনিকেশ, দেনাপাওনার খাতা। কিছু পরাজয় যে এমন সুন্দর, এমন তৃপ্তির, এমন আনন্দের...।  

19th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ