বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
গল্পের পাতা
 

মিষ্টির ভুবন
অর্পিতা সরকার (চন্দ)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সন্দেশ বাংলাদেশে বাজিমাত করেছে। যা ছিল শুধু খবর, বাংলাদেশ তাকে সাকার বানিয়ে করে দিল খাবার।’

কথায় বলে, ‘বাঙালির হলেও মিষ্টি, মরলেও মিষ্টি।’ বিখ্যাত প্রাবন্ধিক তথা সংখ্যাতত্ত্ববিদ যতীন্দ্রমোহন দত্ত বলেছিলেন, বাঙালির মেধার গ্রাফ এই যে, দিনে দিনে পড়তির দিকে তার কারণও নাকি মিষ্টি। মানে মিষ্টির দাম বেড়ে যাওয়া আর তার কারণে বাঙালির মিষ্টি বিমুখতা। তাঁর কথায়, ‘যখন সন্দেশের সের দুই আনা তিন আনা তখন দেশে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মাইয়াছেন, যখন সন্দেশের দর চার আনা ছয় আনা তখন দেশে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ জন্মাইলেন, যখন সন্দেশের সের এক টাকা, দেড় টাকা তখন দেশে সুনীতি চাটুজ্যে, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা জন্মাইয়াছেন...।
আখের রস জাল দিয়ে গুড় আর শর্করা তৈরির কৌশল জানিয়ে দিয়ে যে আমাদের দেশই ভুবনজুড়ে মিষ্টির এই আসন পেতেছে, সে কথা আজ আর কারও অজানা নয়। তা বলে কি শর্করার আগে কোনও মিষ্টি জিনিস ছিল না? ছিল, মধু আর মিষ্টি ফলা ও ফলের রস। বেদে আখের কথা থাকলেও গুড়ের  কথা কিন্তু নেই। মোটামুটি ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে গুড় এবং গুড় থেকে প্রস্তুত মিষ্টির বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। পাণিনি যেখানে গুড় ও ফাণিত এই দুটির নাম করেছেন, সেখানে তার একশো বছর পর কৌটিল্য বলছেন গুড়, ফাণিত, মৎসাণ্ডিকা (আজকের মিছরি), খণ্ড (লালচে চিনি) ও শর্করা (দানা চিনি)— এই পাঁচ রকম ইক্ষুরসজাত দ্রব্যের কথা। বানভট্ট ‘হর্ষচরিত’-এ ‘পাটল শর্করা’ মানে লাল শর্করা আর ‘করক শর্করা’ মানে সাদা শর্করার কথা বলেছেন। তবে, ইক্ষু শর্করার আজকের এই রমরমা কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ শ্রমণদের দান। গৌতম বুদ্ধের অতি প্রিয় ছিল এই ইক্ষুজাত বস্তুটি। তাই তো চীনা মহাযান বৌদ্ধ সাহিত্যে গৌতম বুদ্ধকে ‘ইক্ষুর রাজা’ বলা হয়েছে। সপ্তম শতকে হর্ষবর্ধনের সময় চীনা সম্রাটের পাঠানো প্রতিনিধি দল এবং ভারত থেকে যাওয়া বৌদ্ধ শ্রমণদের হাত ধরে আখ চাষের কৌশল ও আখের রস পরিশুদ্ধ করে তার থেকে চিনি প্রস্তুতের পদ্ধতি চীনে পৌঁছয়। 
পারস্যের সাসানীয় সম্রাট প্রথম খুসরু (৫৩১-৫৭৮) সখের ঔষধি বৃক্ষের উদ্যানের জন্য ভারত থেকে আখ গাছ নিয়ে গিয়েছিলেন। আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় তার সেনাদের আখের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেটা তাঁর সেনাপতি নিয়ারকাসের বর্ণনাতেই পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন যে, ভারতীয়রা মৌমাছি ছাড়া একধরনের তৃণজাতীয় গাছ থেকে মধু তৈরি করে।    
এবার আসা যাক মিষ্টান্নর কথায়। বেদে বর্ণিত অপূপ হল আমাদের পাতের প্রথম মিষ্টি, যা আজও মালপোয়া, পূয়া, গুড়ের পিঠা ইত্যাদি নামে আমাদের স্বাদকোরককে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। জাতকের কাহিনিতে ‘মধুগোলক’ নামক একপ্রকার মোদকের উল্লেখ আছে। মোদককার বা মোদক হল মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী জাতি, চলিত বাংলায় যাদের ময়রা বলা হয়।
প্রাচীন ভারতে ‘সম্যাভ’ নামে গমের আটা ঘিয়ে ভেজে তার সঙ্গে দুধ ও গুড় যোগ করে বানানো  হালুয়ার মতো একপ্রকার মিষ্টির কথা পাওয়া যায়। স্বাদবর্ধক হিসেবে এতে মেশানো হতো এলাচ, গোলমরিচ ও আদা। চক্রপাণি দত্তের স্ত্রীরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত অধ্যায়ে এই ‘সম্যাভ’-এর আর একটি প্রকার পাই যেখানে ছাগদুগ্ধ, গমের আটা, মধু, ঘি ও চিনিকে একযোগে পাক করে বানানো হচ্ছে একধরনের মিষ্টান্ন, যা শরীরের জন্য উপকারী। এই সম্যাভর পারস্য দেশীয় সংস্করণ ছিল ‘আফ্রাসাগ’ নামক মিষ্টি, যেখানে দুধ বাদে বাকি মূল উপকরণ ও রন্ধন পদ্ধতি প্রায় এক। আরবদের পারস্য জয়ের পর কিছু সেদেশীয় মিষ্টিকে আরবরা তাদের ভাষায় ‘হিলওয়া’ (মানে মিষ্টি) আখ্যা দেয়, ফার্সি ভাষায় সেটাই হল ‘হালভা’। কিন্তু পরবর্তীকালে ওই প্রাচীন আফ্রাসাগ-ই কেবল হালভা নামে জনপ্রিয় হয়। এই হালভা মোঘল-পাঠানদের হাত ধরে আমাদের দেশেও পৌঁছে যায়। আর শুধু পৌঁছে যায় কেন, এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, ভারতে বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে মোদকদের মতো ‘হালভাই’ নামক এক পেশার জন্ম হয়। হিন্দি হালভাই কথাটি খুব সম্ভবত এসেছে তুর্কি ‘হালভারি’ মানে মিষ্টি তৈরির কারিগর থেকে। আমাদের মোহনভোগ পশ্চিম এশিয়ায় হল ‘হালভা আর্দ-এ সুজি’। আবার জগন্নাথদেবের ছাপান্ন ভোগে তারই নাম ‘বল্লভ’। আর পশ্চিম এশিয়ার আটার হালুয়া ‘হালভা খোস্ক’ শিখ ধর্মাবলম্বীদের গুরুদ্বারে হয়েছে ‘কারা প্রসাদ’।  
শুধু কি তাই! ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে’ যে ফেনির কথা আছে কালে কালে তার নাম হল বাতাসা। এই বাতাসা নামটি ফার্সি শব্দ। ছোটবেলায় কেউ তারকেশ্বরের মন্দিরের প্রসাদ এনেছে শুনলেই সাদা বাতাসা আর নকুলদানা পাব বলে সে কি উচ্ছ্বাস। এই নকুলদানা সে তো পারস্যের ‘নঘুল’, আফগানিস্তানে এসে ‘নকুল’ হয়ে আজ সে বাঙালির নকুলদানা। ছোলা, বাদাম জাতীয় দানাকে চিনির মোড়ক পরিয়ে আজও ইরানে তৈরি হয় নঘুল।      এবার আসি ক্ষীরের মিষ্টির কথায়। মণ্ড মানে যেমন কোনও কিছুর তাল বোঝায় তেমনি মণ্ডা মানে হল ঘনীভূত দুধ বা জমাট বাঁধা দুধ, যাকে আমরা খোয়া ক্ষীর বলি। জগন্নাথদেবের ছাপান্ন ভোগের অন্যতম হল ‘খোয়া মণ্ডা’ (খোয়া ক্ষীর ও খণ্ড চিনি মিশিয়ে বানানো লাড্ডু বিশেষ)। চতুর্দশ শতকে সংকলিত ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ গ্রন্থে আমরা ‘মণ্ডা’ নামক গোলাকার মিষ্টির নাম পাই। আবার জৈন সাহিত্যিক জিনাসুর তাঁর গ্রন্থে প্যাড়া জাতীয় মিষ্টির কথা বলেছেন, যার নাম ‘পিণ্ড’। ক্ষীরের পাকের তারতম্যের জন্য রকমফের হয় ক্ষীরের মিষ্টির। উত্তর ভারত ও বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষীর যদি দেখেন দেখবেন যে, সেখানের ক্ষীর দক্ষিণবঙ্গের ক্ষীরের মতো সাদা বা হালকা বাদামি আভা যুক্ত নয়। তার রং ঘন বাদামি। যেমনটা থাকে এপারের বিখ্যাত রসকদম্বে, বা ওপারের রাজশাহি-নাটোর-পাবনা প্রভৃতি অঞ্চলের বিখ্যাত মিষ্টি ‘অবাক সন্দেশে’। 
বাঙালির মিষ্টির অন্যতম সন্দেশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সন্দেশ বাংলাদেশে বাজিমাত করেছে। যা ছিল শুধু খবর, বাংলাদেশ তাকে সাকার বানিয়ে করে দিল খাবার। এখানকার সন্দেশেও খবর-খাবারের অর্থাৎ সাকার-নিরাকারের শিবরাত্রির মিলন।’ সত্যি কি নিরাকার খবরকে সাকার খাবার করার কৃতিত্ব বাঙালির একার! মনে হয় না, কারণ সংস্কৃত অভিধানে ‘সম-দেশ’ নামক এক মিষ্টান্নের উল্লেখ আছে। ব্যাকারণ বইতে এই ‘সম-দেশ’-এর ‘ম’ কেন ‘ন’ হয়ে গিয়েছে তা বলা আছে।  এই ‘সম-দেশ’ নামক মিষ্টির উল্লেখ শুধু অভিধান আর লোকমুখেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে যুগের কোনও সাহিত্যে এর উল্লেখ নেই। হয়তো তেমন পাত্তা দেওয়ার মতন বা তেমন জনপ্রিয় মিষ্টি ছিল না। তেমন যদি হয়ে থাকে, তাহলে স্বীকার করতেই হয় একে জাতে তুলেছে বাঙালি।  সেখানেই বাঙালির কৃতিত্ব।
বাংলায় ছানার সন্দেশের বহুল প্রচলনের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে বৈষ্ণব ধর্ম। রাধা-কৃষ্ণের ভোগারতিতে ছানার মিষ্টান্নের বহুল প্রচলন হয় পুরী ও বৃন্দাবনের প্রভাবে। বলা হয়, মল্লভূমের মল্ল রাজ বীর হাম্বিরের বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষাগুরু শ্রীনিবাস আচার্য বৃন্দাবনের অনুকরণে  রাধাকৃষ্ণের ভোগে ছানার মিষ্টির প্রচলন করেন বিষ্ণুপুরে। আর সেই প্রথা মেনে মল্লরাজরা যে সব রাধাকৃষ্ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন তার কাছে ভগবানের ভোগের মিষ্টির জোগান দেওয়ার জন্য একঘর মোদক আর এক ঘর গোপ বা গয়লা এনে বসালেন। মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ যখন আর্থিক সঙ্কটের শিকার হন, তখন তিনি কলকাতার ধনী নুনের ব্যবসায়ী গোকুল মিত্রের কাছে তার মদনমোহন বিগ্রহ বন্ধক দিয়ে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করলেন। আর গোকুল মিত্র বাগবাজারে প্রতিষ্ঠা করলেন বিশাল মদনমোহন মন্দির।
গৌতম গুপ্ত তাঁর ‘দ্বারিকের মিষ্টি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, একবার নাকি কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারপতি দ্বারিক ঘোষের কাছে গিয়ে ফরমাশ করলেন তার মেয়ের বিয়েতে ক্ষীরের হাইকোর্ট ইত্যাদি বানিয়ে দিতে হবে। তখন ডাক পড়ল কুমোরটুলির শিল্পীদের। তাঁরা মাটির তালের মতো ক্ষীর ও মাখনের তাল দিয়ে গড়ে দিলেন সব। তত্ত্বের মিষ্টি আজ এক শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাঙালির মিষ্টি, যা এই জাতির কাছে ইমোশন। যে আসন সে একদিন পেতেছিল সারা দুনিয়ার জন্য সেই মিষ্টির আসন তার নিজের হৃদয়েও স্থায়ী আসন পেতেছে।

12th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ