বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
গল্পের পাতা
 

বাজির আলোয় সেকালের কলকাতা

অমিতাভ পুরকায়স্থ: মারাঠা যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভের উপর পাকা সিলমোহর পড়ল উনিশ শতকের একদম গোড়ায়। এমন ঘটনার উদযাপনে একটু বিশেষ ধরনের আমোদের ব্যবস্থা করতে আয়োজন হল এক এলাহি আতসবাজির প্রদর্শনী। ১৮০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ‘দি ক্যালকাটা মান্থলি জার্নাল’ সেই খবর বিশদে ছেপে জানাল যে, মহাশূন্যে হাতির লড়াই থেকে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে দেবালয় বা বিভিন্ন রঙের আলোর ঝর্ণা দেখে কলকাতার মানুষের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার খবর। এই ‘শো’-র শীর্ষবিন্দু ছিল ঘুরন্ত গ্লোবের ভেতর থেকে ফুটে ওঠা ইংল্যান্ডেশ্বরের উদ্দেশ্যে লেখা ফার্সি অক্ষরের কল্যাণবাণী ‘আপনার সমৃদ্ধি অক্ষয় হোক’!  
চাহিদা ছিল বলেই বিলেত থেকে বাজি বিশেষজ্ঞরা  কলকাতায় এসে তাঁদের খেলা দেখাতেন। আর বিলক্ষণ দু’পয়সা রোজগারও হতো। কলকাতার দর্শকদের কাছে থেকে পাওয়া প্রশস্তি ভরসা করে তারা এরপর পৌঁছে যেতেন ভারতের অন্যান্য জায়গায় নিজেদের কৌশল প্রদর্শন করতে। 
হ্যাঁ, বলাই যায় যে, এ তো সরকারি উৎসব। তাতে খানিক বাহুল্য হতেই পারে। কিন্তু ঘটনা হল যে, ব্যক্তিগতস্তরেও ছোট-বড় উদযাপনের অনুসঙ্গ ছিল বাজি পোড়ানো। ১৭৮৮ সালের এক বিজ্ঞাপনে দেখা যায় কাশীনাথবাবুর বাগানে এক বাজি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন জনৈক শ্বেতাঙ্গ বাজি বিশেষজ্ঞ। এই সাহেবের বিশেষত্ব ছিল আগুনের অক্ষরে বিভিন্ন রাজভক্তিমূলক বাক্য ফুটিয়ে তোলা। যেমন— ‘গড সেভ দি কিং’ অথবা ‘লং লিভ দি কিং’। এই সব বাজির কসরৎ দেখে শহরবাসী বিলক্ষণ বাহবায় ভরিয়ে দিতেন সাহেবকে। 
উনিশ শতকের মাঝামাঝি কলকাতার বিলিতি আলোকসজ্জার ব্যবহার কীভাবে সাধারণ বাড়িতেও ঢুকে পড়ল, তার সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন অমৃতলাল বসু। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ শেষে কলকাতায় খুশির আমেজ। রসরাজের মেজো কাকা টানাপাখার মতো একটা জিনিস এনে বসিয়ে দিলেন ছাদের আলসেতে। নাম তার ‘ট্রান্সপারেনসি’। মাঝখানে মহারানির ছবি রেখে তার দুই ধারে বন্দুক কাঁধে দেশীয় ও গোরা সেনার ছবি আঁকা। সামনে এক সারি তেল পোরা সরার উপর কাপড়ের সরষের পুঁটলি করে জ্বালালেন। মূলত প্রদীপের উন্নত সংস্করণ হলেও সামনের দিক থেকে অন্যরকম দেখাত জিনিসটি। রাতে গড়ের মাঠে বাজি পোড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায় অমৃতলাল লিখেছেন— ‘বাজীওয়ালাদের হাতে পড়েছিল টক্কা আর যারা বাজী দেখবেন, তাঁদের হাতে পড়েছিল ফক্কা।’ কারণ কোনও কোনও বাজিতে সেদিন আগুনই ধরল না আর যেগুলিতে আগুন ধরল, লোকে দেখে ভাবল কাপড় বা ন্যাকড়া জ্বলে উঠল মাত্র। মানে পুরো মাত্রায় ফ্লপ শো! কলকাতার বাজির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার পর রাস্তায় বাজি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের অসুবিধা বা সুরক্ষার প্রশ্ন নিয়েও চিন্তিত হয়েছেন প্রশাসন। ১৮৭১ সালের একটি পুলিস রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, সে বছর এই কারণে একুশজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এছাড়াও হাউই বা তুবড়ির আগুনে খড়ের চালে আগুন লাগার ফলে বাজির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথাও জানা যায়। তবে এইসব পদক্ষেপ কলকাতার মানুষকে বাজি পোড়ানোর আনন্দ থেকে দূরে সরাতে পারেনি। যেকোনও উৎসব পার্বণে বাজি পোড়ানো হয়ে উঠেছিল আমোদের একটি জনপ্রিয় উপাদান, যার শীর্ষে অবশ্যই ছিল কালীপুজো ও দীপাবলির উদযাপন।  ধনী বাবুরা সাধারণত বাজার থেকে বাজি কিনে শখ মেটালেও অনেকেরই ‘হবি’ ছিল হাতে বাজি তৈরি করা। তাই বাড়িতে বাজি তৈরির একটা বাজারও গড়ে উঠেছে। উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম অর্ধে বহু মানুষের শখ ছিল বাড়িতে তুবড়ি, তারাবাজি, হাউই তৈরি করা। তার জন্য নানা ধরনের বই বিক্রি হতো খুব সুলভ মূল্যে। ‘আতসবাজি তৈরি শিক্ষা’ নামে এমন একটি পাতলা বইয়ের লেখক হিসেবে রহস্য রোমাঞ্চ লেখক সমরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে বা  স্বপনকুমারের নামও পাওয়া যায়।  এই সব বই সাধারণ উপকরণ দিয়ে বাজি তৈরির প্রণালী শেখাত। যেমন ধরুন ‘হাজার জিনিস’ নামের একটি বইয়ে তারাবাজি তৈরির মূল উপকরণ হিসেবে তলতা বাঁশের ব্যবহারের কথা জানা যায়। সেখানেই ‘ময়ূরপুচ্ছ বাজি’ নামে একরকমের বাজির কথায় লেখা আছে— ‘হাউয়ের বারুদের সঙ্গে কিঞ্চিৎ কাঁচচূর্ণ, সূক্ষ্ম ইস্পাত ও কাষ্ঠের চূর্ণ মিশ্রিত করিলে ঊর্ধ্বে উঠিবার সময় অবিকল ময়ূরপুচ্ছের ন্যায় দেখাইবে।’    
আশাপূর্ণা দেবীর বাবা হেমেন্দ্রনাথ গুপ্ত। তিনি ছিলেন পেশায় কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। কিন্তু পেশার বাইরে কুস্তি থেকে বাজি তৈরি পর্যন্ত নানা দিকে ব্যাপ্ত ছিল তাঁর আগ্রহের পরিধি। আশাপূর্ণা দেবী নিজের ছোটবেলার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘বাবার হাতের তৈরি তুবড়ির বিলক্ষণ খ্যাতি ছিল। তবে ওইসব উপকরণগুলিকে ঠিক পর্যায়ে প্রস্তুত করে রাখার ক্যাপাসিটি মায়ের। মা শিলনোড়া হামান দিস্তা দিয়ে জিনিসগুলোকে যথাযথ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে, আবার ন্যাকড়া দিয়ে গন্ধক, কাঠকয়লা ছাঁকতে বসতেন।’ এরপর সপরিবারের তাঁরা বসে যেতেন তুবড়ির খোলের মধ্যে এই মশলা ঠাসতে। ভদ্রলোক অবশ্য স্বীকার করতেন যে, গৃহকর্ত্রীর হাতের ঠাসা তুবড়িগুলিই ‘বেস্ট’ হয়। 
উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকের গোড়ায় স্বদেশি ও স্বনির্ভরতার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তাও হয়তো খানিকটা কাজ করেছে এই নিজের হাতে তৈরি জিনিসের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে। তা ছাড়াও সে সময়ের বহু মানুষের মধ্যে বহুমুখী আগ্রহ দেখা যেত। সেটাও উনিশ শতকের বাংলার একটি বিশেষত্ব। হাতে করে বাজি বা ফানুস তৈরির শখ ছিল তারই একটি দিক। শৌখিন মানুষেরা ‘অফিশিয়াল সিক্রেটের’ মতো আগলে রাখতেন নিজেদের বাজির ফর্মুলা। আজও বহু পুরনো পরিবারে খোঁজ করলে পাওয়া যাবে বাজি তৈরির খাতা। নতুন প্রজন্মের কাছে দীপাবলির রাত সেই পারিবারিক ঐতিহ্যকে একবার ফিরে দেখার সুযোগ করে দেয়।

5th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ