বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
গল্পের পাতা
 

বকুল গন্ধে 
বন্যা এল
মীনাক্ষী সিংহ

চিঠিটা হাতে নিয়ে অবাক হল মনোশ্রী। আজকাল ডাকযোগে চিঠি তো এক আশ্চর্য উপহার, কে পাঠাল এই এসএমএস আর হোয়াটসঅ্যাপের ডিজিটাল যুগে? খামের ওপর বাংলাদেশের ছাপ দেখে আবারও বিস্ময়!
খামের ভিতর সাদা কাগজে আরও বিস্ময়লিপি পত্র প্রেরকের নাম দেখে মনোশ্রীর বুকে চকিত চমক আর সেইসঙ্গে ভেসে এল ঝরা বকুলের মৃদু সুবাস। সেই স্মৃতি নির্যাস কলকাতা থেকে পৌঁছে গেল ঢাকায়— এক লহমায়। ঘটল সময়ের অপসারণ।
সে তো হল বহুদিন। তরুণী অধ্যাপিকা মনোশ্রী এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল আমন্ত্রিত অতিথি। সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন ওর বাবা। ওঁর জন্মভূমি যা আজ বিদেশ, যেখানে উনি আর ফিরতে পারেননি কিন্তু মেয়ে তো যাচ্ছে। বারবার ঢাকার রাস্তাঘাট, বাড়ির নিশানা বোঝাচ্ছিলেন। সমীর হেসে বলেছিল, ‘বাবা, পঞ্চাশ বছর আগের তোমার সেই ঢাকা আর নেই। তোমাদের দেবনিবাস এখন হয়তো দবীর নিবাস হয়ে গেছে।’ বাবা চুপ করে যান, মনোশ্রী বাবাকে নিরুৎসাহ করে না—
‘আমি ঠিক খুঁজে নেব বাবা, সব গল্প ফিরে এসে তোমায় শোনাব।’
স্বভূমি থেকে চলে আসা বাবার সেই বেদনাম্লান মুখ মনে পড়ল। সেবার ঢাকা গিয়ে সেমিনার শেষে অধ্যাপক রিয়াজ আহমদের সৌজন্যেই ওদের পিতৃপুরুষের পুরনো পল্টনের ভিটের কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেয়েছিল মনোশ্রী। তাদের সেই বিশাল বাগানওয়ালা বাড়ি, জমি তখন ছোট ছোট প্লটে বিভক্ত। তবুও সেই জমিতে মাথা তুলে দাঁড়ানো বাবার স্মৃতিতে উজ্জ্বল বিশাল বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হাত ভরে নিয়েছিল বকুল ফুল। তার সুগন্ধে ভরে উঠেছিল ক্ষণকালের বন্ধুত্ব।
তারপর— কেটে গিয়েছে এক যুগ। এরমধ্যে মনোশ্রীর নামের পাশে যোগ হয়েছে বিদেশি গবেষণালব্ধ ডিগ্রি। ইচ্ছে থাকলেও আর ঢাকা যাওয়া হয়নি।
এখন এখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব ছাড়াও উচ্চশিক্ষা সংসদের কার্যকরী সমিতির সদস্য পদে সর্বক্ষণের ব্যস্ততা। ঢাকার পুরনো পল্টনের একদিনের স্মৃতিসুখ যেন ঝরা বকুলের গন্ধের মতো।
ভাবনার মাঝে চিঠির পাতায় চোখ রাখে মনোশ্রী।
—‘এক দশকেরও অতীত কোনও স্মৃতি আপনার মনে আছে কি? পত্রশেষে প্রেরকের নাম কি আপনাকে অদূর অতীতের কোনও বকুল গন্ধের সুরভি মনে করায়?
একদিন চকিত চমকের মতো এসেছিলেন আমাদের দৌলত মঞ্জিলে। এটা নাকি ছিল আপনাদের পিতৃপুরুষের বাসভূমি। আপনার বাবার ফেলে আসা ‘দেবনিবাস’ দেখতে এসে একদিনেই আপনি আমার বাবা আর মায়ের স্নেহের ভাগীদার হয়েছিলেন। আমার আব্বুও তাঁর ফেলে আসা কলকাতার বাসভূমির স্মৃতিতে মগ্ন বিষাদে আপনাকে পেয়ে আন্তরিক খুশি হয়েছিলেন। ভেবেছিলাম, যোগাযোগ রাখব। কিন্তু মনে হল ক্ষণিকের পরিচয় ক্ষণকালের সীমাতেই থাক। তবুও কিছুদিন পরে আপনার ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে উত্তর পাইনি। মনে হয়েছিল ক্ষণকালের ছন্দ অসম্পূর্ণই থাক।
আজ এতদিন পরে আকস্মিকভাবে আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা সেমিনারে বক্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য আমার কাছে আমন্ত্রণ এসেছে। আয়োজকদের তালিকায় একটি পরিচিত নাম দেখে সাহস করে চিঠিটা লিখলাম। যদি মনে পড়ে—
স্মৃতিধন্য দৌলত চৌধুরী সুমন।’
চিঠি শেষ করে পাশে টেবিলে রাখা চায়ের পাত্রে চুমুক দিতে ভুল হয়ে গেল মনোশ্রীর। এক লহমায় মনে পড়ল এতদিনের ভুলে থাকা ঢাকার সেই সেমিনার, পুরনো পল্টনে খুঁজে পাওয়া তাদের ‘দেবনিবাসে’র নতুন নামের ‘দৌলত মঞ্জিলে’র কথা। সেই ঝরা বকুলের স্নিগ্ধ সুবাস।
প্রথম বাংলাদেশ যাবার সুখস্মৃতি মনে পড়ল। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণী সেমিনারে মনোশ্রী গিয়েছিল পেপার পড়তে। বিমানযাত্রার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে মন পরিবর্তন করে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আসলে সে যাত্রাপথের আনন্দ ও দুর্ভোগ দুই-ই পেতে চায়। সল্টলেকের করুণাময়ী টার্মিনাস থেকে বাস ছাড়ে। ঢাকা পৌঁছতে লাগে প্রায় ১২ ঘণ্টা। সকাল সাতটা থেকে সন্ধে সাতটা। অভিবাসন ও শুল্ক দপ্তরের ঝামেলা থাকবে, তবে পথের একটা আকর্ষণ তো আছেই। কাঁটাতারের বেড়া দেখতে পাওয়া কিংবা পদ্মার সঙ্গে প্রথম শুভদৃষ্টির সুযোগ হারাতে চায়নি মনোশ্রী।  বাবার কাছে কত যে পদ্মার গল্প শুনেছে, জেনেছে ঢাকার পুরনো পল্টনে তাদের গাছগাছালি ঘেরা বাড়ির কথা। সুগন্ধী ফুলে ভরা বকুল গাছের তলায় তাঁদের আড্ডার কথা এখনও ভোলেননি বাবা। ঢাকার জগন্নাথ হলে বাবার ছাত্রজীবন কেটেছে। মধুর ক্যান্টিন আর মরণচাঁদের দোকানের গল্প বাবা এখনও ওদের শোনান। এসব শুনে মনোশ্রীরও খুব ইচ্ছে করত একবার ঢাকা গিয়ে ওদের পুরনো বাড়ি দেখে আসে। দাদা বলত, সে বাড়ি হয়তো ভেঙে গিয়েছে। শুনে মন খারাপ হতো। মনে পড়ত ঠাকুমার মুখে শোনা নানা কাহিনি। দেশের বাড়ির আমবাগানের কথা বলতে গিয়ে ঠাকুমার চোখে জল আসত। বাবা-কাকা আর পিসির নামে ছিল ওদের বাড়ির তিনটে আমগাছের নাম— বাবুভোগ, সোনাভোগ আর তোতাভোগ। বাগানের গাছগুলো ছিল আত্মীয়ের মতো। কতদিন কোনও কারণে মনখারাপ হলে ঠাকুমা সবেদা গাছের তলায় লুকিয়ে কাঁদতেন। যেদিন বরাবরের মতো চলে এলেন কলকাতায়, চলে এলেন কিছুটা সচ্ছল উদ্বাস্তু হয়ে সেদিনও সবেদা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো চোখের জল ফেলেছিলেন। বকুলগাছের তলা থেকে একমুঠো বকুল ফুল বেঁধে এনেছিলেন আঁচলে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সেই শুকনো ফুলের মথিত সুবাস আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তাঁর স্মৃতির প্রহর।
আর পদ্মার গল্প তো ফুরতই না। সেই উত্তাল জলরাশি, মাঝিদের সারি গান, জেলেদের জালে ওঠা নদীর রুপোলি শস্য পদ্মার ইলিশের গন্ধে যেন তাঁর মন কেমন করে উঠত। নাতনিকে আদর করে ডাকতেন ‘পদ্মা’ বলে। একটু বড় হতেই মনোশ্রী পদ্মাকে ভালোবেসে ফেলেছিল রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ পড়ে। ‘পদ্মা চলেছে কোথায়, মনে মনে দেখি’ রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই চরণ যেন তার মনেও গুনগুন করত। তাই ঢাকা যাবার আমন্ত্রণ পেয়ে তার মন ভরে উঠেছিল। দেখা না দেখায় মেশা, আর শোনা না শোনায় ভরা তার চিত্ত উদ্বেল হয়েছিল।
আজ এতদিন পরে আবার যেন ডাক পড়ল স্মৃতির ভুবনে। ডাক এল দৌলত চৌধুরী সুমনের পত্রলেখায়। এতদিন যা ছিল বিস্মরণের ছায়ায়। সেবার তিনদিন কেটেছিল ইউনিভার্সিটি গেস্ট হাউসে। আলাপ পরিচয় হয়েছিল অনেকের সঙ্গে। ঢাকা, রাজশাহি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অনেক কলেজের অধ্যাপকদের সঙ্গেও পরিচয় হল। ওদের উদ্যোগে একদিনের সফরে শিলাইদহে গিয়ে মুগ্ধ হল। রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য শিলাইদহ মনোশ্রীর কাছে তীর্থদর্শন।
তবু ভরিল না চিত্ত। ওদের পুরনো বাড়ির জন্য একটা ব্যাকুল বেদনায় বিষণ্ণ হল। কথা প্রসঙ্গে সে কথা উঠতেই বিভাগীয় প্রধান রিয়াজ আহমেদ সব ব্যবস্থা করে দিলেন। পরদিন ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি, তাই সারাদিনের জন্য মনোশ্রীকে গাড়ি করে ঢাকা শহর ঘোরানোর ব্যবস্থা করা হল।
প্রফেসর আহমেদ তাঁর ড্রাইভারকে বলে দিয়েছিলেন পুরনো পল্টনে ওঁর পরিচিত একজনের বাড়িতে মনোশ্রীকে নিয়ে যেতে। মনোশ্রী সেদিন দারুণ উত্তেজিত। এই সেই পুরানা পল্টন— বুদ্ধদেব বসু থাকতেন, কাছাকাছি অজিত দত্ত। প্রতিভা বসু রানু সোম নামে সুধাকণ্ঠের জন্য এখানেই বিখ্যাত ছিলেন। বাবা বলে দিয়েছিলেন এই পুরনো পল্টনেই ছিল তাঁদের বাড়ি দেবনিবাস।
ড্রাইভার বলল— ‘আপা, এটাই পুরানা পল্টন।’ মনোশ্রী উত্তেজিত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল রাস্তায়। কিছুটা হেঁটে এগল। বোধহয় একটু আনমনা ছিল। কী করে খুঁজে পাবে তাদের এককালের ‘দেবনিবাস’? হঠাৎ একটা গাড়ি এসে তার প্রায় পাশে দাঁড়িয়ে গেল। হর্নের শব্দে সচকিত হয়ে সে সরে যাচ্ছে এমন সময় গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এক তরুণ— ‘সালাম আলেকুম, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’
‘আমি মানে’ একটু থমকে মনোশ্রী বলল, ‘আমি কলকাতা থেকে এসেছি।’
‘ও, ইন্ডিয়া থেকে আসছেন?’
এবার ড্রাইভার বসির মিঞা এগিয়ে এল—
‘ভাইসাব, আমাগো সাহেব আপারে এহানে পাঠালেন’
‘ও আপনি, রিয়াজ চাচার বাসা থেকে আসছেন, আসুন আসুন।’
গেট পেরিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দু’জনেই বাড়ির ভিতরে এসেছিল।
‘বাবা, ইনি ইন্ডিয়া থেকে আসছেন।’ সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে দেখে সম্ভ্রম জাগে।
‘প্রফেসর আহমেদ আমাকে পাঠালেন। আমি কলকাতা থেকে এসেছি মনোশ্রী দেব।’
‘এসো মা এসো। রিয়াজ আমাকে ফোনে তোমার কথা বলেছে— এ আমার ছেলে।’
 ‘নমস্কার, আমি দৌলত চৌধুরী সুমন।’
...
এতক্ষণ সেই ফেলে আসা অনতি অতীতের ঢাকার স্মৃতি মনোশ্রীর মনোদর্পণে প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল। সেদিনের আকস্মিক দেখা দৌলত চৌধুরী সুমন আজ এখানে এই কলকাতায়। এভাবে দেখা হবে কে ভেবেছিল? সেদিনের বকুল বিছানো পথ ধরেই কি দৌলত সুমন এলেন কলকাতার পথে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাগৃহ সুসজ্জিত। আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে আসছেন। বিভিন্ন বিভাগের পক্ষ থেকে সকলকে নানা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁদের আপ্যায়নের। নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির অধ্যাপকবৃন্দ এসেছেন এই ইন্টার ডিসিপ্লিনারি সেমিনারে।
প্রধান কনভেনর মনোশ্রী অতিথিদের মধ্যে খুঁজে ফিরছে একদিনের চেনা একটি মানুষকে। হয়তো সেই মানুষটিও তাকেই চিনে নিতে চাইছে। তখন তো মোবাইল আর সেলফির এত আয়োজন ছিল না, তাই ছবিতেও ধরা নেই কোনও স্মৃতিচিত্র।
সমাগত অতিথিরা অনেকেই চেনা মুখ। সস্মিত দৃষ্টিতে তাদের আপ্যায়ন করে মনোশ্রীর দৃষ্টি থমকে গেল এক পলকে— চেনা-অচেনার আধো আভাস— ‘সুপ্রভাত’।
উত্তরে হাত তুলে নমস্কার করতে গিয়ে মনোশ্রী থমকে দাঁড়াল। বিমুগ্ধ বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মুহূর্তেই সপ্রতিভ মনোশ্রী বলল, ‘সুস্বাগতম, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে সানন্দ আহ্বান জানাচ্ছে।’
কিছু অধ্যাপক ও ছাত্রমণ্ডলী তখন ঘিরে ধরেছে বাংলাদেশের সুখ্যাত অধ্যাপক ও জনপ্রিয় লেখক দৌলত চৌধুরী সুমনকে। আর তখনই মনোশ্রী অনুভব করল সেদিনের নবীন অধ্যাপক দৌলত চৌধুরী সুমন এবং আজকের বিদগ্ধ অধ্যাপক ও বিখ্যাত লেখক ‘সুমন’ যে অভিন্ন ব্যক্তি তা এতদিন তার অগোচর ছিল।
এক লহমার জন্য দু’জনের দৃষ্টি অপলক বিস্ময়াবিষ্ট।
প্রথাগত সেমিনার, প্রথম পর্বের শেষে মধ্যাহ্নভোজন। অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত মনোশ্রী এক ফাঁকে বলল, ‘সেদিন আপনাদের বাড়িতে আপনার মা যে কী যত্নে কী আদরে আমাকে খাইয়েছিলেন, এখনও মনে আছে।’ স্মৃতি দূরবিনে চোখ মেলে এতদিন পর মনোশ্রী যেন দেখতে পেল সেই পুরনো দিনের ছবি।
মণিরা বেগম বললেন, ‘ঢাকায় এসেছ, তোমার দেশের বাড়ি। ইলিশ মাছ না খেলে তো ছাড়ান নাই।’— এতদিন পরে হঠাৎই দৌলত সুমনের মায়ের কথা মনে পড়ল মনোশ্রীর। মনে পড়ল পাঁচরকম মাছের পদসহ বিপুল নৈশ ভোজের সযত্ন আয়োজন।
সেমিনারের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে দৌলত চৌধুরী সুমনের ভাষণ ও মনোশ্রীর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পর সভা ভঙ্গ। সভা শেষে মনোশ্রী বলল—
‘একটা অনুরোধ, আপনাকে আজ আমাদের বাড়ি যেতে হবে। আমার বাবা আপনাকে একটি বার দেখতে চান। ঢাকা আজও তাঁর কাছে স্বভূমি। আপনার মধ্যে সেই মাটির ঘ্রাণ নিতে চান। আপনার ফ্লাইট তো কাল সকালে। আজ অন্তত একটি বার...’
‘চলুন।’
ঢাকার পুরনো পল্টনের দেবনিবাস— বর্তমান দৌলত মঞ্জিলের তরুণ যেন দেশের মাটির ঘ্রাণ, সুবাতাস ফিরিয়ে আনল অশীতিপর বৃদ্ধের প্রশান্ত মুখে। তাঁর সস্নেহ দৃষ্টিতে স্নাত দৌলতের চোখে জল এল। ওর বাবা-মা দু’জনেই আজ প্রয়াত। মাত্র একদিন দেখা মনোশ্রীর কথা ওঁরা ভোলেননি শেষ দিন পর্যন্ত। মনোশ্রীর বাবাকে দেখে দৌলত সুমনের যেন বড় আপন মনে হল। এক আশ্চর্য অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হল, যার ব্যাখ্যা মেলে না। এক অনুত্তর জিজ্ঞাসায় আচ্ছন্ন হল মনোশ্রীও।
স্মৃতি পিপীলিকা কি সত্যিই সংগ্রহ করে মৃত মাধুরীর কণা? এই স্বগত প্রশ্নে নিজেকে বিদ্ধ করল সে। আশ্চর্য হল এক যুগ আগের একটা দিন এমনভাবে তার মগ্ন চৈতন্যে ছিল এতদিন অনুভব করেনি। একে কী বলে— অনুরাগ, প্রেম, স্মৃতি? হয়তো কিছুই নয়।
দু’জনেরই মনে হল কাঁটাতারের বেড়ার ব্যবধানে থাকা দু’টি মন অদূর অতীতে মুহূর্তের জন্য যে নিবিড় সখ্যে আবদ্ধ হয়েছিল— সেই ক্ষণটুকুই সত্য।
মনোশ্রী বলল, ‘আমার মোবাইল নম্বর তো পেয়েছেন, এবার যোগাযোগ সহজ হবে।’
‘না, অন্তত আপনাকে চিঠি লেখার সুযোগটা থাক। যন্ত্র নয়, হাতের লেখার একটা মূল্য আছে। আমাদের ক্ষণ মুহূর্তের বন্ধুত্বে না হয় সেই স্মৃতিস্বাক্ষরটুকু থাক।’
উত্তরে নীরবে সম্মতি জানাল মনোশ্রী।
‘আর সেই হারানো ছন্দে না হয় থাক সেদিনের ঝরা বকুলের গন্ধ। আমাদের বাড়ির সেই বকুল ফুলের গাছটা আপনার মনে আছে? ওটা তো শুধু আমাদের নয়, একসময় আপনাদেরও ছিল। ওটাই থাক আমাদের বন্ধুদের স্মারক, স্মৃতিকুসুম।’
মনোশ্রীর মনে হল সময়ের অপসারণ ঘটছে। ঢাকার দৌলত মঞ্জিল থেকে চলে আসার কথা যেন স্মৃতিতে ফিরে এল।
গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াল ড্রাইভার। নমস্কার বিনিময় করে মনোশ্রী গাড়িতে উঠল। গাড়ি স্টার্ট করার আগে দৌলত সুমন হাত বাড়িয়ে দিল মনোশ্রীর দিকে। তার প্রসারিত হাতের পাতায় ভরা সুবাসিত ঝরা বকুল ফুল।
‘নিন, মনে পড়বে দেবনিবাসের স্মৃতি।’ হাত ভরে ঝরা বকুলের গন্ধ মেখে মনোশ্রী সেদিন বলেছিল স্নিগ্ধ কণ্ঠে—
‘মনে থাকবে দৌলত মঞ্জিলের স্মৃতিও।’
আজ এক যুগ পরে সেই বিস্মৃত স্মৃতি যেন ফিরে এল ক্ষণকালের বন্ধুত্বের সুবাস নিয়ে। বিদায়বেলায় ওরা দু’জনেই অনুভব করল সেই স্মৃতি কুসুমের সৌরভ, কাঁটাতারের সীমানা ছাড়িয়ে আজও বকুল গন্ধে বন্যা এল।          
অঙ্কন : সুব্রত মাজী

9th     April,   2023
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ