বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

পুরাণের গল্পে সমৃদ্ধ  সীতামারি

পৌরাণিক গল্প আর নৈসর্গিক দৃশ্যে মোড়া সীতামারি। ঘুরে এসে বর্ণনায় তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক।

বেনারস থেকে এলাহাবাদ যাওয়ার পথে যে এমন একটা পৌরাণিক ইতিহাস বিজড়িত জায়গা রয়েছে, তা জানতাম না। জায়গাটার নাম সীতামারি। আবার কেউ কেউ বলেন সীতাকুণ্ড। ইতিহাস এবং জনশ্রুতি অনুযায়ী, যখন শ্রীরামচন্দ্র প্রজাদের ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে সীতাকে পরিত্যাগ করেন, তখন এই জায়গায় সীতা কিছু বছর কাটিয়েছিলেন।
মহর্ষি বাল্মীকি সীতাকে এই তপোবনে থাকার জন্য বলেন। আসন্নপ্রসবা সীতা এইখানেই যমজ শিশু লব-কুশের জন্ম দেন। লব-কুশের বিদ্যা শিক্ষা, অস্ত্রশিক্ষা সহ সবের দায়িত্ব মহর্ষি বাল্মীকি নিজের হাতে পালন করেন। প্রকৃতির নিয়মে বড় হতে থাকে লব কুশ। অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে তারা।
এদিকে রামচন্দ্র অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের ঘোড়া ঘুরতে ঘুরতে বাল্মীকির আশ্রমের কাছে চলে আসে। ঘোড়াকে ধরার পরিণতি সম্পর্কে লেখা রয়েছে ঘোড়ার মাথায়। লব কুশ তবু ধরে নেয় যজ্ঞের ঘোড়া। এই ঘোড়া ধরা মানে শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া। যদিও রামের সেনারা এটা বালক দু’টির ছেলেখেলা বলেই প্রথমে মনে করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে লব কুশের দৃঢ় মনোভাব দেখে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে। ভীষণ লড়াইয়ের শেষে রামচন্দ্রের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেনাদের হারের খবর যখন অযোধ্যায় পৌঁছায় তখন হনুমান যুদ্ধক্ষেত্রে র‌ওনা দেন। হনুমান দেখে বোঝেন যে, এই বালক দু’টি সাধারণ নয়, হনুমান ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করেন কিন্তু লব কুশ হনুমানকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। অযোধ্যায় বসে লক্ষ্মণ সব শুনে বেজায় রেগে যান। তিনি তড়িঘড়ি এসে দেখেন অপূর্ব সুন্দর দু’টি শিশু! তাদের তিনি অসময়ের ঘোড়াকে আটকানোর অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। লব কুশ যুদ্ধ বিষয়ে অনড়। 
এরপর লব কুশ লক্ষ্মণকে যুদ্ধে আহ্বান করে ও অজ্ঞান করে ফেলে। লক্ষ্মণের ওই পরাজয়ের কথা যখন অযোধ্যায় পৌঁছয় শ্রীরামের সমস্ত সেনা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়। স্বয়ং শ্রীরামও তপোবনে আসেন। শ্রীরাম বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন এই ঘোড়া যেন তারা ছেড়ে দেয় নতুবা পরিণতি ভয়ঙ্কর! লব কুশ সে কথায় বিন্দুমাত্র ভয় পায় না। রামচন্দ্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলে মহর্ষি বাল্মীকি বলেন, এই যুদ্ধ অসম্ভব, কেননা এরা তাঁরই পুত্র।
সমস্ত ঘটনা জেনে রাম খুব খুশি। লব কুশ সব জানতে পেরে সীতার কাছে ছুটে যায়। রাম লব কুশ এবং সীতাকে অযোধ্যায় নিয়ে যাওয়ার জন্য লক্ষ্মণকে পাঠান। দূর থেকে লক্ষ্মণকে আসতে দেখে নিজের জীবনের সব যন্ত্রণার কথা মনে পড়ে সীতার। 
শ্রীরামের সঙ্গে বিয়ে, রাজবধূর সম্মান, বনবাস, চিত্রকূট দণ্ডকারণ্যে বসবাস, রাবণ কর্তৃক অপহরণ, বন্দিনী জীবন,‌ অগ্নিপরীক্ষা, অযোধ্যার প্রজাদের অবিশ্বাস, লোকমত দ্বারা শ্রীরামের দেওয়া নির্বাসন ও মহর্ষির আশ্রমে লব কুশের জন্ম! মনের মধ্যে আলোড়ন ফেলতে থাকে সব ঘটনা। দুঃসহ অপমান, অভিমান, ক্ষোভে নিদারুণ যন্ত্রণায় সীতা ধরণীকে অনুরোধ জানান সকাতরে, ‘হে জননী আমাকে পুত্রী রুপে তোমার কোলে নাও।’ প্রার্থনা ধরণী শোনেন ও সীতার পাতাল প্রবেশ হয়। ছুটে এসেও লক্ষ্মণ কিছুই করতে পারেন না। সীতার একটা কেশ শুধু তাঁর হাতে রয়ে যায়। 
ড্রাইভারজির মুখে রামায়ণের বহু পরিচিত এই গল্প শুনতে শুনতেই আমরাও চলেছি সীতামারি। গাড়ি থেকে নেমে দু’পাশে ছোট ছোট পুজো দেওয়ার সামগ্রীর দোকান ফেলে এগিয়ে যাই। সেই তপোবনে একশো আশি ফুট হনুমানজির সুবিশাল মূর্তি রয়েছে। ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয়। ঝড় জল অথবা প্রখর রোদে অযুত শক্তির অধিকারী, হাতে গদা নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজমান। 
জুতো ছেড়ে ভেতরে ঢোকার নিয়ম। সুসজ্জিত বাগানের মাঝখানে কৃত্রিম পাহাড় তৈরি করে সেখানে সুউচ্চ হনুমানজির মূর্তি দেখে মন ভরে যায়।
এর নীচে মন্দিরও রয়েছে। শুরুতেই ছোট গুহা, এরপরে খুব সুন্দর মন্দির। পুরনো চিত্রকলা দিয়ে সাজানো। রামায়ণের সব কাহিনি সেই সব ছবিতে। বিভিন্ন গাছগাছড়াও রয়েছে। ছোট্ট সুন্দর ঝিল, বসার জায়গা ছায়া ঘেরা এবং সযত্নে রক্ষিত ফোয়ারা।
এবার সীতার সমাধিস্থলে গন্তব্য। ঢুকেই চোখে পড়ল উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে জল আসছে। লোককথা অনুযায়ী এই জলের উৎপত্তি শিবের জটা থেকে। সীতামারির সঙ্গে আছে গেস্ট হাউস। আর সীতার মন্দির তো রয়েছেই।
সাদা মার্বেলের মন্দিরে ঢুকতেই ঘণ্টা ঝুলছে। দর্শনার্থীরা মন্দিরে ঢোকার সময়ে হাত বাড়িয়ে বাজিয়ে দিচ্ছেন ঘণ্টা। ঢং ঢং আওয়াজে গোটা চত্বরে যেন পুজোর আবহ। সুবিশাল চত্বর। প্রথমে সীতা মায়ের রাজরূপ। অযোধ্যায় রানি বেশে যেমন থাকতেন সেই রূপ! অপরূপ সেই মূর্তি।
মা সীতার রাজরানি রূপ দেখে মুগ্ধ হবেনই। মন্দিরের ভেতরে যেখানে সীতার মূর্তি রয়েছে অনেকটা উঁচু কারুকার্যময় দরজায় সীতার জীবনগাথা ও রয়েছে।
এই সীতামারি জায়গাটি বেনারস থেকে তিরাশি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সীতার রাজরূপ দেখে এবার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে যাওয়া। সেখানেই সীতার সমাধিস্থল। সাদা সবুজ টি-মার্বেলের পরিষ্কার সিঁড়ি ভেঙে নেমেই চোখে পড়ল সীতা সমাধির চিত্ররূপ। মা সীতার গেরুয়া রঙা পাথরের অপরূপ মূর্তি। চুল খোলা, গলায়, হাতে লাল ফুলের মালা, সবটাই পাথরের। নীচে এবড়ো খেবড়ো পাথরের ধরণী। বলা হয় এখানেই ধরণীর বুকে আশ্রয় নিয়েছিলেন সীতা। তাই এই জায়গার নাম সীতামারি। মন্দির থেকে বেরিয়ে জলাশয়। প্রচুর মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। এটি সীতাকুণ্ড নামে পরিচিত।
বেনারস থেকে এলাহাবাদ যাওয়ার পথে এমন সুপ্রাচীন পুরাণ (মহর্ষি বাল্মীকির তপস্যার স্থল, সীতার অন্তিম সাধনার স্থল, এবং ভূপ্রবেশের স্থান, রাম সীতার পুত্রদ্বয় লব কুশের জন্ম তাদের বেড়ে ওঠা এবং সীতা মন্দির দর্শন) ছুঁয়ে যেতে দারুণ লাগল।
কীভাবে যাবেন: বেনারস থেকে গাড়ি বা বাসে সীতামারি যাওয়া যায়। সময় লাগে সাড়ে আট ঘণ্টা। এলাহাবাদ থেকেও যাওয়া যায়। দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন: শ্রীসীতা সমাহিত স্থল ট্রাস্ট। 

16th     March,   2024
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ