বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

ইতিহাসকে সঙ্গী করে রাজগীর

সাত দিনের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন রাজগীর। নতুন ও পুরনো নানা পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে এখানে। লিখেছেন সুমিত সেনগুপ্ত।     

গত কয়েক বছরে রাজগীর ও রাজগীর সংলগ্ন পর্যটনস্থলের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। মসৃণ চওড়া রাস্তা, থাকার ভালো জায়গা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ও মনোরঞ্জনের দিকে দৃষ্টি রেখে নতুন কিছু দর্শনীয় স্থলের সংযোজনও করা হয়েছে এখানে। তাই  পর্যটনস্থল হিসেবে রাজগীরের বেশ কিছুটা মানোন্নয়ন হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না।              
রাজগীর শহর থেকে বেরিয়ে পর্যটন পরিসীমায় প্রবেশ করতে প্রথমেই যা আপনাকে মুগ্ধ করবে তা হল রাজগীর উষ্ণ প্রস্রবণ। শহরের প্রধান সড়কের পাশেই এই উষ্ণ প্রস্রবণটির অবস্থান। একটি জলাধারে গড়িয়ে এসে পড়ছে উষ্ণ জল। কথিত আছে এই জলে স্নান করলে অনেক রোগের উপশম হয়। রাজগীরের সঙ্গেই জড়িত দুই রাজার নাম। একজন মহাভারতে বর্ণিত রাজা জরাসন্ধ। তখন আজকের পাটনা সংলগ্ন বিহার পরিচিত ছিল মগধ নামে। আর এই মগধের রাজা ছিলেন জরাসন্ধ। সেই সময় রাজগীর ছিল জরাসন্ধের মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী। দ্বিতীয় ব্যক্তি বৌদ্ধ যুগের ভগবান বুদ্ধের অনুগত শিষ্য রাজা বিম্বিসার। রাজা বিম্বিসারের রাজধানীও ছিল রাজগীর। রাজা বিম্বিসার ভগবান বুদ্ধকে নির্জনে ধ্যান করার জন্য ও শিষ্যদের মধ্যে তাঁর বাণীর প্রচারের জন্য রাজগীরে উপযুক্ত স্থান ও পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।  
পুরাণ আর ইতিহাস ছেড়ে  আবারও বর্তমান পর্যটন কেন্দ্র রাজগীরের ভ্রমণকথায় ফেরা যাক। এখানে বেণুবন অবশ্য দর্শনীয়। একটি পুকুরকে ঘিরে বাঁশ গাছের জঙ্গল। 
শান্ত, সমৃদ্ধ পরিবেশে বুদ্ধনাম করেন ভক্তকুল। একটু এগলে পাবেন জাপান সরকার দ্বারা নির্মিত জাপানি বৌদ্ধ মন্দির। শান্ত বৌদ্ধ মন্দিরের পরেই রাজগীরের অন্যতম দ্রষ্টব্য, জরাসন্ধের কুস্তির আখরা। জরাসন্ধ কুস্তি লড়ায় বিশেষ কুশলী ছিলেন। রাজধানী রাজগীরকে শত্রুর থেকে সুরক্ষিত রাখতে চীনের প্রাচীরের মতো উঁচু ও চওড়া প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন রাজা জরাসন্ধ। চল্লিশ কিলোমিটার জুড়ে তার ব্যাপ্তি। প্রাচীরের কারিগরি প্রযুক্তি দর্শনীয়। একটি পাথরের সঙ্গে আর একটি পাথরকে জুড়তে কোনও সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ ব্যবহৃত হয়নি। ইংরেজিতে এর নাম সাইক্লোপিয়ন ওয়াল। এটি ইউনেস্কো দ্বারা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। 
রাজা বিম্বিসারকে সিংহাসনচ্যূত করে রাজা হন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র অজাতশত্রু। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী। ঔরঙ্গজেবের মতো পিতাকে এক নিঃসঙ্গ কয়েদখানায় বন্দি করেছিলেন। শাহজাহান কয়েদখানা থেকে তাজমহল দেখতেন, আর বৌদ্ধ ভক্ত বিম্বিসার কয়েদখানার জানলা দিয়ে মানসচক্ষুর সাহায্যে তাঁর আরাধ্য দেবতা ভগবান বৌদ্ধকে গৃধ্রকূট পর্বত আরোহণ করতে দেখতেন। বিম্বিসারের কয়েদখানাও তাই বর্তমানে রাজগীরের এক দর্শনীয় স্থল। 
পাশাপাশি দেখবেন অজাতশত্রু ফোর্ট, স্বর্ণ ভাণ্ডার, রথের চাকায় দু’ধারে বসে যাওয়া সম্পূর্ণ পাথুরে রাস্তা, বৌদ্ধ পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর মিউজিয়াম ইত্যাদি। 
রত্নগিরি পর্বতে অবস্থিত রাজগীর বিশ্ব শান্তিস্তূপটিও অনবদ্য। এখানে ভগবান বুদ্ধের নয়নাভিরাম মন্দির আছে। এটা মূলত ধ্যান করার জন্য তৈরি হয়েছে। রোপওয়ের মাধ্যমে পৌঁছতে হবে। চূড়াতে পৌঁছলে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। শান্তিতে মন ভরে ওঠে।
রাজগীর শহরে দেশ বিদেশ থেকে পর্যটক আসেন। এই জায়গাটির গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য পর্যটন শহর রাজগীরের মুকুটে চড়েছে এক নতুন পালক। তার নাম রাজগীর সাফারি পার্ক। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তৈরি এই পার্কের মূলত দু’টি ভাগ। একটি ভাগে আছে প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্তু জানোয়ার দর্শন। আর একটি ভাগে তৈরি করা হয়েছে প্রকৃতি ও প্রযুক্তি মিলিয়ে রোমহর্ষক অনুভূতির নানা উপাদান। 
দৃষ্টিনন্দন স্বর্ণগিরি এবং বৈভবগিরি উপত্যকার উপর তৈরি হয়েছে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ। খাঁচার আদলে তৈরি ভ্যান বা বাসে চড়ে ঘুরে দেখতে পারেন। রাজগীর নেচার পার্কে পাবেন দোদুল্যমান গ্লাস ব্রিজ, প্রজাপতি কানন বা বাটারফ্লাই পার্ক, অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং আরও নানা কিছু। এই পার্কটি ঘুরে দেখার জন্য চাই পুরো একটি দিন। এছাড়াও রাজগীরে পর্যটকদের জন্য দর্শনীয়স্থল হচ্ছে ঘোরা কাটোরা লেক, পান্ডু পোখার ইকো অ্যাডভেঞ্চার রিসর্ট ইত্যাদি। 
রাজগীরের অভ্যন্তরীণ ট্যুর শেষ। পরের দিন রাখতে হবে নালন্দা ও পাওয়াপুরি। রাজগীর থেকে মাত্র ১৫ কিমি দূরে পৌরাণিক নালন্দা বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। এখানে অবশ্যই একজন গাইড নিয়ে নেবেন। 
নিষ্ঠা ও অনুশাসনে ভরা এক পৌরাণিক সভ্যতা যার আধার ছিল বৌদ্ধিক বিচারধারা, যেখানে একসময় পদধূলি পড়েছিল পৃথিবী বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের— তা দেখার সুযোগ পাবেন। পৌরাণিক হয়েও কীভাবে বাস্তুবিজ্ঞান ও আধুনিক মানসিকতায় তা তৈরি করা হয়েছিল, তারও নজির পাবেন প্রতি পদে। 
নালন্দা থেকে পরবর্তী গন্তব্যস্থল পাওয়াপুরি। এটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।  জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ভগবান মহাবীর জন্মগ্রহণ করেছিলেন পাওয়াপুরিতে। এখানেই তিনি ধর্ম প্রচার করেন এবং তাঁর  দেহাবসানও হয়। নালন্দা থেকে পাওয়াপুরির দূরত্ব ১৫ কিমি। পাওয়াপুরিতে আছে বিখ্যাত জৈন জলমন্দির। একটি বিশাল আকারের পুকুরের কেন্দ্রস্থলে মন্দিরটি অবস্থিত। সেখানে পৌঁছতে পায়ে হেঁটে যেতে হবে।  
ধর্মীয় মহত্ত্ব ছাড়া এই জলমন্দিরের পাশে পুকুরে দেখতে পাবেন  পানকৌড়ি পাখি। রাজগীরের সম্পূর্ণ ভ্রমণে সময় লাগবে মোটামুটি সাত দিন। 
কীভাবে যাবেন: কলকাতা বা হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে বা বিমানে পাটনা আসুন। পাটনা থেকে সড়ক পথে রাজগীর মাত্র ১০০ কিমি। সময় লাগবে মোটামুটি তিন ঘণ্টা। রাজগীরের দর্শনীয়স্থল ঘুরতে গেলে স্থানীয় টাঙ্গা ভাড়া করতে পারেন কিংবা অটো রিকশা চড়েও ঘুরতে পারেন। এছাড়া শহরের ভিতরে অলিগলি চলতে গেলে সাইকেল রিকশা পাবেন।

24th     February,   2024
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ