বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

নীল জল সাদা বালির দ্বীপ রস অ্যান্ড স্মিথ

জলের রং এমন নীল যেন কলম ডুবিয়ে লেখা যায়। তারই মাঝে জেগে ঘন সবুজ দু’টি দ্বীপ, রস আর স্মিথ। আন্দামানের দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখছেন তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক।
 
আন্দামান বলতেই  ছোটবেলায় পড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা সবুজ দ্বীপের রাজার সেই দৃশ্যপট চোখে ভাসে। জঙ্গল, সমুদ্র, জারোয়া— সব মিলিয়ে বেশ রোমাঞ্চকর ব্যাপার! আন্দামানের সমুদ্র তো আর পাঁচটা সমুদ্রের মতো নয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন তা ‘এত গাঢ় নীল যে কলম ডুবিয়ে লেখা যাবে।’ তবে এই অতি সুন্দর আন্দামানের সৌন্দর্যেরও তারতম্য রয়েছে। কিছু জায়গা এমনই যা দেখলে ভোলা দায়। তেমনই দ্বীপ রস অ্যান্ড স্মিথ। ‌
নর্থ আন্দামানের একটা ছোট্ট শহর ডিগলিপুর  সংলগ্ন এই দ্বীপ দু’টি। ঘণ্টা দুয়েকের বিমানযাত্রা সেরে পৌঁছলাম পোর্টব্লেয়ার।  পরবর্তী গন্তব্য জারোয়া জঙ্গল পেরিয়ে ডিগলিপুর এবং সেখান থেকে রস অ্যান্ড স্মিথ আইল্যান্ড। পরের দিন রাত তিনটেয় উঠে হোটেল ম্যানেজারের দেওয়া প্যাকেট বন্দি ব্রেকফাস্ট সঙ্গে নিয়ে বেরলাম আমরা।  ঘুমন্ত পোর্টব্লেয়ারকে পিছনে ফেলে নিকষ কালো অন্ধকারের বুক চিরে গাড়ি ছুটল আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের সফরের পরে পৌঁছনো চেকপোস্টে।  সেখান থেকে পারমিট করিয়ে তবে যাত্রা শুরু। গাড়ি ছুটল  জারোয়া অধ্যুষিত জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে। ৭৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জঙ্গলে মানবসমাজের আনাগোনা নেই। শুধু পর্যটন শিল্পের কারণে জঙ্গলের মাঝ বরাবর বিশাল রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এই পথ দিয়েই পর্যটকদের গাড়ি জঙ্গলের ভেতর এগতে থাকে।‌ নিরাপত্তার জন্য পুলিসের পেট্রোল সার্ভিস সবসময় চলে।
দু’পাশের গভীর ও ঘন জঙ্গল, বড় বড় খাদ, পাহাড় , জলাশয়,  নির্জন নিঝুম রাস্তা। মনে একটা শিরশিরে অনুভূতি হয়।  গাড়ির কাচ তোলা। বারবার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে পর্যটকদের, জারোয়া জঙ্গলে গাড়ি ঢুকলে ছবি তোলা নিষিদ্ধ। নতুবা বহু টাকা জরিমানা ও  হাজতবাস। ঘণ্টা দেড়েকের যাত্রাপথে আন্দামানের আদিম জনজাতি জারোয়াদের দেখা মিলল। এখন তারা অনেক সুসভ্য। অনেকেই পোশাক পরা। সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান এদের উন্নত জীবন দেওয়ার জন্য নিরলস কাজ করে চলেছে। তবে অরণ্যের বুক চিরে যাওয়া রাজপথ নির্মাণকালে জারোয়াদের সঙ্গে  শহুরে মানুষদের নিয়মিত সংঘর্ষ হতো। সেই বাধাকে উপেক্ষা করে পর্যাপ্ত সংখ্যায় পুলিস নিয়োগ করে ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
রাস্তা চালু হওয়ার পরেও গভীর অরণ্য থেকে যাত্রীবোঝাই বাসের দিকে মাঝেমধ্যেই জারোয়াদের তির ধেয়ে আসত। তবে আন্দামানে প্রগতি ও বিকাশ খুবই দ্রুত এসেছে। তারই ফলস্বরূপ আজকের নির্বিঘ্ন এই যাত্রা। হাতে হাতে তিরধনুক নিয়ে আদিম জারোয়াদের দেখা মিলল ঠিকই তবে তারা হিংস্র নয়। বাচ্চারা হাতের ইশারায় খাবার চাইছিল। কিন্তু আগে থেকেই চালক বলে রেখেছিলেন কিছু না দিতে। এরপর মায়াবন্দর আর রন ঘাট ছাড়িয়ে আমরা ছুটলাম আমাদের ঈপ্সিত গন্তব্য ডিগলিপুর ও রস অ্যান্ড স্মিথ আইল্যান্ডের দিকে। জারোয়া জঙ্গল ছাড়িয়ে গাড়ি যত এগল পথে বকুলতলা, ফুলতলা, সুভাষগ্রাম নামের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদ চোখে পড়ল।
অসংখ্য উদ্বাস্তু পুনর্বাসন পেয়ে উত্তর আন্দামানে এসেছিলেন। সরকার জঙ্গলে পাহাড়ে প্রত্যেককে সেইসময় প্রচুর জমিজায়গা দিয়েছিল। নিরুপায় উদ্বাস্তুরা পূর্ববঙ্গ থেকে এসে এখানেই বসবাস শুরু করেন। অদম্য উৎসাহ আর আর অনমনীয় মনোবল নিয়ে ভয়াল প্রকৃতি ও পরিবেশ,  হিংস্র বুনো জন্তু আর আদিবাসীদের সঙ্গে লড়াই করে তাঁরা বেঁচে থেকেছেন।  অবশ্য তার ফলও মিলেছে। আজ এই সমস্ত জনপদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি দেখার মতো। 
ছোট ছোট পাহাড় ঢেকে আছে ডাব ও  হাজার হাজার সুপুরি আর নারকেল গাছের সারি আর কলাগাছের বাগানে। যাত্রাপথের মাঝে মাঝে বিরতিতে স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, উত্তর আন্দামানে ৮০-৯০ শতাংশ লোকই বাঙালি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে যথেষ্ট সুরক্ষিত।  আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরে  মায়াবন্দর হয়ে ডিগলিপুর পৌঁছতে অনেক রাত হল। স্বপ্নের রস অ্যান্ড স্মিথ আইল্যান্ডের প্রবেশপথ এটি। পরের দিন সকালে কালিপুরের এরিয়াল বে জেটিতে  গেলাম। সেখানে ভোটার বা আধার কার্ডের কপি লাগে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পারমিটও দরকার হয় দ্বীপে যাওয়ার জন্য। 
ওই নির্জন জায়গায় নিরাপত্তার দায়িত্বে একজন মহিলা। তিনি কঠোরভাবে ব্যাগ চেক করছিলেন।  কোনও নেশার জিনিস সঙ্গে রয়েছে কি না দেখছিলেন। আট সিটের স্পিডবোট ভাড়া করে আমরা ছ’জন চললাম রস অ্যান্ড স্মিথ আইল্যান্ড দেখতে। কেউ কেউ আবার টুইন দ্বীপও বলে থাকে একে। দিগন্ত ছোঁয়া জলরাশি, শান্ত স্নিগ্ধ  সমুদ্রের কী অপরূপ রূপ!  শুধুই দেখছি আর বিস্ময়ে মন ভরে উঠছে।  ওই বিস্তীর্ণ সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে চলেছে আমাদের স্পিডবোট। জল কেটে কেটে বেশ গতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে যন্ত্রচালিত নৌকাটি।  সেখানেই  নির্জনতার মাঝে সমুদ্র লোকজন পেয়ে দুষ্টুমি করে ভিজিয়ে দিচ্ছে যাত্রীদের। যেন কতকাল পর চেনা লোকের উপস্থিতি টের পেয়ে আদুরেপনায় মেতে উঠেছে সে। মন তখন জলের জোয়ারে মাতাল হয়ে গুনগুন করছে, ‘অসীম কালের   যে হিল্লোলে জোয়ার ভাটায় ভুবন দোলে’...।  আমরাও তো জানার মাঝে অজানার সন্ধানেই মোহিত হয়েছি, তাই না?
মিনিট দশ পনেরোর জলযাত্রা শেষে পৌছলাম রস অ্যান্ড স্মিথ। জলের রং যে এইরকম সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। সমুদ্রের মধ্যে সবুজ দ্বীপ জেগে রয়েছে। দ্বীপের ধারে ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে। একেবারে নির্জন দ্বীপ। সেদিন মোট চারটে নৌকা ছাড়া হয়েছে। সাকুল্যে দশ থেকে বারোজন পর্যটক। বেলা তিনটের পর সে জায়গা জনমানবশূন্য হয়ে যায়। কোনও থাকা বা খাওয়ার জায়গা নেই। আছে কেবল প্রকৃতি আর প্রকৃতির আপন খেয়াল। সমুদ্রের জলের দিকে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না।  এক অদ্ভুত নীলাভ আর সবুজের মিশেল সেখানে।  নিজের ছন্দে পাড়ে লুটিয়ে পড়ছে দুধ সাদা ঢেউ আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসছে অজস্র কোরাল বা পলা, নানা রঙের বৈচিত্র্যময় ঝিনুক এবং অদ্ভুত সব জলজ সামগ্রী। চারদিকে ছোট ছোট সবুজ পাহাড় আর মাঝে  কাচ-স্বচ্ছ সমুদ্রের একাকী অবিরাম বয়ে চলা। ছোট ছোট বসার জায়গা রয়েছে দ্বীপ জুড়ে। সানবাথের ব্যবস্থাও রয়েছে। ছোট্ট দুটো দ্বীপ রস আর স্মিথ সাধারণভাবে একে অপরের গায়ে লেগে থাকে। তারা যে পৃথক তা বোঝা যায় ভাটার সময়। তখন দুই দ্বীপের মাঝে জেগে ওঠে চারশো পঞ্চাশ মিটার মতো সাদা বালির চর। প্রকৃতি তার অকৃপণ দানে সাজিয়েছে নির্জন  দ্বীপ দুটোকে। তবে আন্দামানের প্রকৃতি, সমুদ্র কখন কী রূপ ধারণ করে সেটা বলা মুশকিল। আমরা পেয়েছিলাম নির্মেঘ আকাশ। তাই  দু’চোখ ভরে নীলজল, সাদাবালি, আর ঘন-জঙ্গলের সখ্য অনুভব করেছি। 
 কীভাবে যাবেন:  কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আন্দামান যাওয়ার বিমান ছাড়ে। এছাড়া জাহাজেও যাওয়া যায়।  কোথায় থাকবেন:  প্রচুর নামীদামি হোটেল আছে। সামর্থ্য অনুযায়ী বুকিং করুন। বেড়ানোর উপযুক্ত সময় নভেম্বর-মার্চ।  
 ছবি: পিংকি বিশ্বাস সান্যাল 

18th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ