বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিকিকিনি
 

টিনটোরেটোর সঙ্গে ভেনিস

ভেনিসে গিয়ে গন্ডোলা ভ্রমণের মজা তো পাবেনই। সঙ্গে বাড়তি প্রাপ্তি টিনটোরেটোর আঁকা বিভিন্ন ছবি। সেই অনুভূতি জানালেন বিদিশা বাগচী।

সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘টিনটোরেটোর যীশু’ গল্পটা অনেক বছর আগে পড়ে মনে হয়েছিল কখনও হয়তো টিনটোরেটোর আঁকা যিশু সত্যিই দেখতে পাব। টিনটোরেটোর জন্ম ইতালির ভেনিস শহরে। রেনেসাঁ যুগে ভেনিসের চিত্রাঙ্কনের বেশ বড় একটা প্রভাব ছিল আর টিনটোরেটো ছিলেন সেই যুগেরই শিল্পী। তাঁর তুলির ছোঁয়ায় ছিল সাহস আর তেজ।
এরপর যখন ভেনিস যাওয়া ঠিক হল, তখন তাঁর আঁকা নানা ছবি দেখার সুযোগ হবে ভেবে বেশ আনন্দই হয়েছিল। একইসঙ্গে একটু অবাকও নিজের এই ভাবনায়। সবাই ভেনিস যায় গন্ডোলা চড়ে ঘুরতে আর ওই শহরের জল-রাস্তায় কীভাবে জীবনযাপন  হয় তাই দেখতে আর আমি যাচ্ছি ‘টিনটোরেটোর যীশু’ দেখতে!
ভেনিস পৌঁছে গ্র্যান্ড ক্যানালের ভেপোরাতি (লঞ্চ) চড়ে পৌঁছলাম স্যান জর্জিও ম্যাজিওরে গির্জায়। ভিতরটা খুব ছিমছাম সাজানো, দুই দিকে লোকজন বসার চেয়ার আর একদম শেষ প্রান্তে প্রার্থনার বেদি। ওই বেদির একদিকে টিনটোরেটোর আঁকা ‘দ্য লাস্ট সাপার’। অনেকের কাছেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ওই একই নামের পেন্টিং অনেক বেশি পরিচিত ঠিকই, আমার কিন্তু এটাও ভীষণ সুন্দর লাগল। বেদির একদিকের একটা দেওয়াল জুড়ে প্রায় ২০ ফুট চওড়া এই পেন্টিংয়ে রঙের খুব একটা বাহার নেই। 
যিশু খ্রিস্টের ‘লাস্ট সাপার’ সম্বন্ধে পৃথিবীর যা ধারণা তার থেকে এটা অনেকটাই আলাদা। চিত্রকরের কল্পনায় এখানে যিশুর বারোজন শিষ্যের মধ্যে কেউই নেই, আছে সাধারণ লোকজন ও একদল দেবদূত। আলোর বাহার বলতে একটা ল্যাম্প আর যিশুর মাথার চারপাশে দিব্যজ্যোতি। কী নিখুঁত আর জীবন্ত আঁকা! নিজের চোখে না চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। অনেকক্ষণ ছবির নীচে দাঁড়িয়ে নানা দিক থেকে দেখেও বোধহয় আশ মিটল না। 
চার্চ থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম ক্লক টাওয়ারে চড়তে। উল্টোদিকে সেন্ট মার্কস স্কোয়ারের  সবচেয়ে সুন্দর ভিউ।  দেখে দু’চোখ জুড়িয়ে গেল।
এরপর আবার ভেপোরাত্তি চড়ার সময়। এবার যাওয়া হবে ক্যানালের ওপারে। সেখানে আছে ডোজ’স প্যালেস বা ভেনিসের ডিউকের প্রাসাদ। এই প্রাসাদের প্রধান হলঘরের একটা দেওয়াল জুড়ে আছে টিনটোরেটোর তেল রঙে আঁকা, ৭২ ফুট চওড়া ছবি ‘প্যারাডাইস’। সারা পৃথিবীর ক্যানভাসে আঁকা বৃহৎ ছবিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। 
প্রথমে দেখে অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব মনে হয়েছিল। খানিকটা ধাতস্থ হওয়ার পর চূড়ান্ত অবাক হলাম। শুধু যে মা মেরি ও যিশুর  মায়া জড়ানো মুখ, তা নয়, তাঁদের ঘিরে প্রায় পাঁচশো লোক। প্রত্যেকের মুখ, বৈশিষ্ট্য ও প্রতিক্রিয়া আলাদা। একটা রক্ত মাংসের মানুষ কীভাবে ওইরকম এক প্রকাণ্ড ছবি, নিখুঁত হাতে এঁকেছেন তা ভেবেই অবাক হলাম। কতক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে এই ছবি দেখেছি জানি না, হঠাৎ আশপাশে বিশেষ কেউ নেই দেখে মনে হল বোধহয় অনেকক্ষণ একাই দাঁড়িয়ে রয়েছি।
ডোজ’স প্যালেস থেকে বেরিয়ে এবার ট্র্যাঘেট্টো বা শেয়ার্ড ট্যাক্সির মতো একটা গন্ডোলায় ওঠা হল। মাথা পিছু ২ ইউরো করে দিয়ে ৪-৫জন মিলে ক্যানালের ওপারে নামলাম। সেখান থেকে হেঁটে এবারে যাব ‘স্কুলা গ্রান্দে ডি  স্যান রোক্কো’—এখানেই আছে টিনটোরেটোর আঁকা তাঁর জীবনের কিছু শ্রেষ্ঠ ও বিশ্ববিখ্যাত ছবি।
স্যান রোক্কোকে বলা হয় ভেনিসের ‘সিস্টিন চ্যাপেল’। টিনটোরেটোর আঁকা প্রায় ৫০-এর বেশি ছবি আছে এখানে। বিলাসবহুল বললেও ভুল হবে না। পুরো সিলিং জুড়ে ছবির যা বাহার, দেখে বিশ্বাসই হয় না যে কোনওকালে কোনও শিল্পী একটা হলঘরের সিলিংয়ে ওইরকম ছবি এঁকেছেন! দেখতে দেখতে যাতে ঘাড় ব্যথা না হয় তার জন্য স্তূপ করে রাখা আছে ম্যাগনিফায়েড আয়না। একটা তুলে নিয়ে ওই সিলিংয়ের প্রতিফলন খুব সহজেই দেখা যায়। 
ওই একই হলঘরের এক কোণে সালা ডেল আলবার্গো; একটা বেশ বড় সাইজের ঘর যার একটা দেওয়াল জুড়ে ‘ত্রুসিফিকেশন’-এর চিত্র। আমার মতে, টিনটোরেটোর আঁকা বিশ্বের আশ্চর্যতম ছবি এটি। প্রায় ৪০ ফুট চওড়া এই ছবির প্রধান চরিত্র যিশুখ্রিস্ট ঠিকই কিন্তু তার আশপাশের লোকজনের অঙ্গভঙ্গি আর মুখে দুঃখের ছাপ, কী সাবলীলভাবে রং তুলির টানে ফোটানো হয়েছে। দেখে মনে হয় চোখের সামনে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া দেখছি।!
টিনটোরেটোর আঁকা যিশু দেখব বলে সকাল সকাল বেরিয়েছিলাম। শেষ ছবি দেখে বুঝলাম বেলা গড়িয়ে বিকেলে চলে গিয়েছে।  এবার ফেরার পালা। শিল্পীর সৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে ফেরার পথে পা বাড়ালাম।
ছবি: লেখক

21st     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ