বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মোদির ম্যাজিক ফিগার আদৌ হবে তো?
শান্তনু দত্তগুপ্ত

বিশ্ব সমাজের পথচলাকে স্বামী বিবেকানন্দ দু’টি ভাগে ভাগ করেছিলেন—রাজনীতি ও ধর্ম। রাজনীতির ব্যাপারে তিনি সবসময় এগিয়ে রাখতেন গ্রিকদের। কারণ, ওই দেশেই জন্ম অ্যারিস্টটলের, যাঁর হাত ধরে পলিটিক্স বিজ্ঞানের মর্যাদা পেয়েছে। কারণ, ওই দেশেই গণতন্ত্রের ভাবনার জন্ম। সবাই মিলে একসঙ্গে একটা প্রশাসন, একটা সরকার কীভাবে চালাতে হয়, সেটাও গ্রিস প্রথম শিখিয়েছে। সেখানে কোনও পরামর্শই ফেলনা নয়, কারও মতই ছোট নয়। সবে মিলে সিদ্ধান্তই সেই আদর্শের বীজ। আর ধর্ম? সেখানে ভারতবর্ষকে সবার আগে রাখতেন স্বামীজি। রাষ্ট্রের উন্নতির সংজ্ঞা ছিল তাঁর একেবারে আলাদা। কেমন সেই উন্নয়ন? মজবুত অর্থনীতি, বিদেশনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশ্বের দরবারে ‘ম্যায় আয়া হুঁ’ জাতীয় অহঙ্কার... নাঃ, এর কোনওটাই নয়। উন্নত ভারত বলতে স্বামীজি বুঝিয়েছিলেন মনের প্রসারতাকে। আধ্যাত্মিকতাকে। এই দু’টি থাকলে বাকি সব এমনিই পিছনে লাইন দেবে। এখন স্বামীজি থাকলে দেখতে পেতেন, ধর্ম হোক বা রাজনীতি... দুই ময়দানেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মনোযোগ একই দিকে—ভারত। কারণ, এখন পরিব্রাজকের দেশে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে ধর্ম এবং রাজনীতি। বৃহত্তম গণতন্ত্রে এখন প্রশ্ন উঠছে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়েই। ভোটের কাউন্টডাউন যত তীব্র হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সোনার দামের মতো বাড়ছে সমালোচনার সাইক্লোন। কিন্তু সেইসব ছাপিয়ে আকাশে-বাতাসে ঘুরপাক খাওয়ানো হচ্ছে একটি সংখ্যা—৩৭০। নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর হয়ে খোল-করতাল বাজানেওয়ালারাও এই একটি সংখ্যাতেই মেতে রয়েছেন। কিন্তু এতকিছুর পরও ভোটের ভরা মরশুমে মোক্ষম প্রশ্নটি হল, এই সংখ্যাতত্ত্বে মানুষ কতটা বিশ্বাসী? এখানেই শেষ নয়। এরই লেজুড় আর একটি প্রশ্ন হল, যুদ্ধ করতে নামা গেরুয়া সৈনিক ও সেনাপতিরাও এই থিওরিতে বিশ্বাসী তো? 
বিজেপির প্রার্থী তালিকার দিকে একবার নজর দেওয়া যাক। ৩৭০ আসনের দিকে ছোটা ব্রিগেডের প্রার্থী ঘোষণায় লক্ষ করার মতো কয়েকটা বিষয় রয়েছে। বহু রাজ্যে, বিশেষত নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনে কাকে দাঁড় করানো হচ্ছে, সেটা জানানোয় বিস্তর টালবাহানা। এখনও বহু রাজ্যে প্রার্থী ঘোষণা হয়নি তাদের। যেমন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ডায়মন্ডহারবারে কে বিজেপির ঝান্ডা ধরবে, সেটাই এখনও জানা যায়নি। এর কারণ কী? সিদ্ধান্তহীনতা? নাকি প্রার্থী-প্রস্তাব পাওয়ার পরও অনেকে বেঁকে বসছেন? অনেক ‘সিটিং এমপি’কেই নরেন্দ্র মোদি এবার টিকিট দেননি। সামনে আনা হচ্ছে পারফরম্যান্সের মাপকাঠি। কিন্তু এলাকায় এলাকায় খবর নিলে জানা যাচ্ছে, বাদ যাওয়া সাংসদরা অনেকেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। পরিস্থিতি বহু জায়গায় এমন বিগড়েছে যে, তাঁকে দাঁড় করালে বিজেপির হার নিশ্চিত। তাহলে উপায় কী? রাজ্যসভা থেকে ধরে আনতে হবে পরিচিত মুখ। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, ধর্মেন্দ্র প্রধান, পুরষোত্তম রূপালা, ভি মুরলিধরন... এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তবে রাজ্যসভার। তাঁদেরই এবার নামানো হয়েছে লোকসভার যুদ্ধে। তিনজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও লড়ছেন চব্বিশের ভোটে। এই সবই কি পরিকল্পিত বলে মানতে হবে? মাস ছয়েক আগেও সেলিব্রিটি মহলের বাঘা বাঘা সব নাম শোনা যাচ্ছিল বিজেপির ছত্রচ্ছায়ায়। সুস্মিতা সেন, মহম্মদ শামি, ঝুলন গোস্বামী... কাউকে কিন্তু প্রার্থী হতে দেখা যায়নি। বিজেপির সেলেব প্রার্থী বলতে কঙ্গনা রানাওয়াত, আর সেই আটের দশকের ‘রাম’ অরুণ গোভিল। মোদিজি হয়তো ভেবেছেন, রামমন্দিরের হাওয়ায় রাম বাজিমাত করবেন। কিন্তু রামমন্দিরের হাওয়া সত্যি কি আছে? গোটা ভারত দূরঅস্ত, উত্তরপ্রদেশেও প্রত্যাশিতভাবে আছে কি? বারাণসীতে উন্নয়ন পর্বে জমি হারানো সদাগরী অফিসের রিসেপশনে বসা যুবতী যখন ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন, তিনি মনে করতে পারবেন না, রামমন্দিরের উদ্বোধন কত তারিখ হয়েছে। কারণ, ততদিনে তাঁর মনে বাসা বাঁধবে আরও অনেক যন্ত্রণা! ভিটে হারানোর, মূল্যবৃদ্ধির, মৃত্যুশয্যায় থাকা বাবার ফুরিয়ে যাওয়া ওষুধের, শেষ হয়ে আসা সঞ্চয়ের, কিংবা বিয়ের জন্য ৭০ লক্ষ টাকা পণ চেয়ে বসা সাধারণ সরকারি চাকুরের। এই ছবি কিন্তু উত্তরপ্রদেশেই আটকে নেই। আশপাশের রাজ্যেও ছড়িয়েছে। এমন সব রাজ্য, যা বিজেপির গড় বলেই পরিচিত। একইসঙ্গে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে কট্টরপন্থী ধ্বজাধারীদের দাপটে সংখ্যালঘুদের ক্ষোভও ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছে না। তার সঙ্গে আঁচ মিলছে কৃষক বিক্ষোভের। সেই আগুন ধেয়ে যাচ্ছে হরিয়ানা-পাঞ্জাবেও। গোদের উপর বিষফোঁড়া হল, পাঞ্জাবে এখন আর অকালি দল মোদিজির সঙ্গে নেই। ফলে লোকসানটাকে শুধু দুটো আসনে বাঁধা যাবে না। ফলাফল আরও গভীর। এবং একটা বিষয় পরিষ্কার—উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানায় গত লোকসভা নির্বাচনে আসন জয়ের যে ঝড় মোদিজি তুলেছিলেন, তা এবার খুব একটা ধরাছোঁয়ার মধ্যে নেই। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগীরাজ্যে যদি এবার বিজেপি ৪০ আসনের আশপাশে থেমে যায়, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অঙ্কটা গেরুয়া বাহিনীর জন্য সত্যিই আতঙ্কজনক। কারণ, এর প্রভাব দেশের বহু রাজ্যে পড়বেই। এরপর বিহার। গতবার বিজেপি বিহার থেকে ১৭টি আসন জিতলেও ১৬টি জিতে ভরপাই করে দিয়েছিল জেডিইউ। গত কয়েক বছরে নীতীশ কুমার যেভাবে এক নৌকা থেকে অন্যটিতে লাফালাফি করেছেন, তাতে তাঁর নিজের তো বটেই, বিজেপির ইমেজও রীতিমতো ধুলো মাখামাখি করছে। আর সেইসঙ্গে ভিড় বাড়ছে তেজস্বী যাদব এবং মহাজোট ইন্ডিয়ার জনসভায়। ফলে ওই রাজ্যের জনমত বলছে, মোদি-নীতীশ জোট এবার ২০টি আসন পেলে হয়। বিজেপি একা সেক্ষেত্রে ১০ পেরতে পারবে না। একইভাবে ধাক্কা অপেক্ষা করছে ঝাড়খণ্ডেও। কারণ, খেপেছেন আদিবাসীরা। প্রথমত, জমির অধিকার নিয়ে বারবার বিতর্কে। আর দ্বিতীয়ত, হেমন্ত সোরেনের গ্রেপ্তারিতে। ফলে, গতবারের ১১টি আসন এবার চারটিতে নেমে এলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। একই সমীকরণের আভাস দিল্লির জন্যও। মূল ইস্যু, এখন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। রাজনীতির সঙ্গে যাঁদের দূরদূরান্ত পর্যন্ত সম্পর্ক নেই, তাঁরা পর্যন্ত এই গ্রেপ্তারিতে রীতিমতো বিরক্ত। তাঁদের আলোচনা এখন একমুখী, ‘কেজরিওয়াল দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তোমরা কি ধোওয়া তুলসী পাতা? বন্ডের হিসেব আনো না দেখি সামনে!’ এছাড়া আরও একটি বিষয় কেজরিওয়ালকে অক্সিজেন দিচ্ছে—দিল্লির ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। ফলে দিল্লিতে এবার বিজেপি একটি আসন বের করতে পারাটাও বিরাট ব্যাপার। আর হ্যাঁ, রাজস্থানও কিন্তু মোদিবাহিনীর জন্য সহজ হবে না। বিধানসভা ভোটে জিতে সরকারে এলেও লোকসভায় অন্তত ১০টি আসনে ধাক্কা খাওয়ার জন্য তৈরি থাকতে পারে বিজেপি। কেন? ঠিক যে কারণে কংগ্রেস সেকেন্ড বয় হয়েছে! রাজস্থান পরিবর্তন পছন্দ করে। ছত্তিশগড়, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ড নিয়ে বিজেপি আশায় থাকতে পারে। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাকি রাজ্যের ট্রেন্ডের সঙ্গে গুজরাত এক পথে হাঁটতে না পারে, বাকিরা একেবারে ধাক্কা দেবে না—এমন আশা করা ভুল। 
দক্ষিণ ভারত? সেই হিসেব হয়তো মোদিজি নিজেই কষতে চাইবেন না। কর্ণাটকে যেমন এবার হাওয়া সম্পূর্ণ কংগ্রেসমুখী। রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রার প্রভাব যদি কোথাও কিছুটা হলেও পড়ে থাকে, সেটা দক্ষিণে। একই অবস্থা তেলেঙ্গানাতেও। যাও বা গতবার চারটি আসন জুটেছিল, এবার তার অর্ধেক মিলবে কি না সন্দেহ। পাশাপাশি কেসিআর যে গেরুয়া শিবিরকে নিঃশব্দে সমর্থন জোগাবেন, সেই সম্ভাবনা ভোটারকুল রাখবে বলে মনে হয় না। হায়দরাবাদি ঘরানাতেও এখন চেপে বসেছে কংগ্রেস। আর মহারাষ্ট্র? গতবার এখানে শিবসেনার জোটভাগ্য সঙ্গে ছিল। সেই সম্ভাবনা এবার বেশ কম। তার প্রধান কারণ, শিবসেনার ভাঙন। বালাসাহেব থ্যাকারের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে সিন্ধেরা এখন সাবালক হতে চান। মহারাষ্ট্রের ভোটাররা সেই চেষ্টাকে কতটা সুনজরে দেখছেন, এইবার তার অ্যাসিড টেস্ট। সেই প্রভাব যে গেরুয়া শিবিরেও পড়বে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আর থাকল পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপির প্রার্থী তালিকা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দ্বিগুণ’ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেখে এখন যা মনে হচ্ছে, বিজেপি টেনেটুনে দু’অঙ্ক পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
তাহলে দেখা যাক, মোদিজির বিচারে ‘অঘটন’ ঘটলে প্রধান রাজ্যগুলিতে কত আসন কমতে পারে বিজেপির। 
অর্থাৎ, গুজরাত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতকে হিসেবে না ধরলেই বিজেপির আসন সংখ্যা গতবারের তুলনায় কমে যাচ্ছে ৯৩টি। ছত্তিশগড় এবং মধ্যপ্রদেশে আগেরবারের তুলনায় যদি দু’টি করে আসনও কমে এবং মণিপুর ফ্যাক্টর, কিংবা বেছে বেছে বিরোধীদের গলায় এজেন্সির ফাঁসের অভিযোগ যদি ভোটারদের মনে এতটুকুও প্রভাব ফেলে, ফিগার আরও কমবে। মানে, গতবারের ৩০৩ অনেক দূর, ২০০ আসনে থমকে যেতে পারে গেরুয়া শিবিরের বিজয়রথ। আর এনডিএ’র হিসেব? অকালি দল সঙ্গে নেই, জেডিইউ ধাক্কা খাবে, ঝোল যেদিকে গড়াবে, জগন্মোহন রেড্ডি সেদিকে ঝুঁকবেন... এইসব থিওরি কার্যকর হলে শরিকরাও কিন্তু ৫০ ছুঁতে পারবে না। সেক্ষেত্রে ম্যাজিক ফিগার আসবে তো?
স্বামীজি বলতেন, ধর্মের উন্নতি হবে... যখন তা ঐক্যে পৌঁছবে। আর এখন দেশ চলছে ধর্মের নামে বিভাজনে। বিদ্বেষে। আইন প্রণয়ন হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে। ভোট কাড়াকাড়িও চলছে সেই পথে। ফলে স্বামীজির ভারতে এখন না হচ্ছে ধর্ম, না রাজনীতি। মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ধর্ম নয়। ধর্ম এবং রাজনীতি—দুটোই লুকিয়ে আছে কর্মের গভীরে। আর সেই সমীকরণটা মানুষ মেলাবে। প্রচারযজ্ঞ উপভোগ করার সময়ে কিন্তু নয়। অঙ্ক মিলবে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে ভাবনায় আসবে, ভোটটা কোথায় দেব? কোন প্রার্থীকে? সেই প্রার্থী গত পাঁচ বছরে আমার জন্য কী করেছে? কোভিডে যখন পকেট হাতড়ে ভাঙা বাজারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, তখন কী সাহায্য মিলেছে তাঁর থেকে? ভবিষ্যতেও কিছু করার আদৌ কোনও সম্ভাবনা আছে কি না? দেশের আম ভোটার এসব ভাববে ১০০ দিনের কাজের মজুরি না পেয়ে, বেকারত্বের জ্বালা চরম সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর, কিংবা দোকানে গিয়ে। যখন তিনি দেখবেন, প্রেশারের ওষুধের যে পাতাটা গত মাসেই ১৩২ টাকা ছিল, সেটা এখন ১৪৪ টাকা। আম আদমির অঙ্ক মিলে যাবে। কিন্তু বিশ্বগুরুর সমীকরণ মিলবে কি?

2nd     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ