বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

শুধু এ রাজ্যের কেলেঙ্কারির টাকাই ফেরাবেন?
হিমাংশু সিংহ

টাকার বিছানায় শোওয়া ছবি ভাইরাল হলেও কোনও হেলদোল নেই বেঞ্জামিন বসুমাতারির। অসমের মধ্যবয়সি এই রাজনীতিক দিব্যি আছেন বুক ফুলিয়ে। উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামের নেতা তথা এই সেদিনও স্থানীয় ভিলেজ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে থাকা বেঞ্জামিন বিলক্ষণ জানেন, বাড়িতে নগদ টাকার পাহাড় থাকলেও ভয়, ভক্তি কিংবা প্রতিহিংসায় তাঁর চৌকাঠে পায়ের ধুলো দেবে না ইডি। ওই নোট কালো না সাদা, তার উৎস দুর্নীতির আঁতুড়ঘর, না পবিত্র মন্দির, আপাতত তার তদন্তও তেমন এগবে না। কারণ তিনি শাসক জোট এনডিএ’র আসলি গ্যারান্টিওয়ালার ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়েছেন বহু আগেই। এবং রাজ্যটা বাংলা নয় বলে! তাই টাকার বিছানার ভাইরাল ছবি তাঁর কাছে অভিশাপ নয়, স্রেফ আশীর্বাদ। সমৃদ্ধির ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টর। দল লোকদেখানো সাসপেন্ড করলেও তাঁকে সমন ধরানোর বুকের পাটা কোনও এজেন্সির নেই—যেমনটা আছে এই বঙ্গে তৃণমূলকে টাইট করতে—প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। কিন্তু যদি তাঁর গায়ে বিরোধী পক্ষের গন্ধ থাকত, তিনি গেরুয়া বিদ্বেষী হতেন তাহলে এতক্ষণে গোটা বাড়ি লন্ডভন্ড করে দিত এজেন্সি নামক বিষ কাঁকড়া। ইডির সমনের পর সমন, সকাল-বিকেল জেরা। শেষে কেঁদে ককিয়ে তাঁকে আশ্রয় নিতে হতো শাসক শিবিরেই! অন্যথা করলেই ঠিকানা হতো শ্রীঘর! মোদিজি কিন্তু একবারও বলেননি বসুমাতারির টাকার বিছানার সব ৫০০ টাকার নোট উদ্ধার করে গ্রামের গরিব জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দেবেন! এজন্য আইনজ্ঞদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন, নতুন আইন খুঁজবেন।
মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক চ্যবনের কথাই ধরা যাক। শোনা যায়, গেরুয়া দলে নাম লেখানোর ৪৮ ঘণ্টা আগে সোনিয়া গান্ধীর পায়ের কাছে বসে হাপুস নয়নে প্রায় ৪৫ মিনিট কেঁদেছেন পোড়-খাওয়া এই কংগ্রেসি। তাঁর সেই হৃদয়বিদারক কান্নার কথা হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো সামনে এনেছেন স্বয়ং রাহুল গান্ধী। অশোক চ্যবনের নামের পাশে বিরাট কেলেঙ্কারি। মুম্বইয়ের আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারির কথা কে শোনেনি এদেশে? সিবিআই হয়েছে। মহারাষ্ট্রের রাজ্য-রাজনীতিও দীর্ঘসময় তোলপাড় হয়েছে সেই ইস্যুতে। বছরের পর বছর বিজেপি নেতারা এর বিরুদ্ধে গলা সপ্তমে চড়িয়েছেন। এবার বিজেপির চোখে ৪০০ আসন জেতার নেশা। বসন্তের পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার মতোই সেই নেশার রং লেগে চারপাশটা কেমন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। ১ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার আয়কর নোটিসেও মন ভরছে না। কংগ্রেসকে আরও নাস্তানাবুদ করতে সেই অভিযুক্ত অশোক চ্যবনকেও গেরুয়া শিবিরে শামিল করা হল। কিন্তু বার্তাটা কী গেল? দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের না, ক’টা আসন জেতার জন্য নির্লজ্জ আপসের। কালিমালিপ্ত হও, দাগি হও, শুধু তুমি আমার ঘরে এস, ব্যস। সব কালি মুছে সফেদ! আদর্শ ‘ওয়াশিং মেশিন’। শত্রু হও, মিত্র হও, যার গায়ে যতটুকু কালি লেগে থাকুক এখন সব ভুলে একজোট হও। হাজার কোটির সংসদে একসঙ্গে বসে গণতন্ত্রের বিজয়কেতন ওড়াই। ৪০০ পার করতে হবে যে! চোরে চোরে মাসতুতো ভাই শুনেছিলাম। এ তো দেখছি, চাঁদের গায়ে চাঁদ নয়, দুর্নীতির কাদা গন্ধ সারা শরীরে মেখেই ক্ষমতা দখলের বর্ণাঢ্য আয়োজন! 
আদর্শ আবাসন কেলেঙ্কারির টাকাও তো সাধারণ মানুষেরই। প্রতারিতদের তালিকাও মহারাষ্ট্র সরকার ও পুলিসের কাছে নিশ্চয়ই আছে। কই সে টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও তো প্রধানমন্ত্রী একবারও বললেন না। উল্টে দুর্নীতি খতম করার বদলে সেই বদ বিষাক্ত রক্ত প্রবাহিত হতে দিলেন নিজের দলেও, এ কেমন রসিকতা ‘বিশ্বগুরু’র!
মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগেই আর্থিক কেলেঙ্কারির গ্লানি মুছে সফেদ হয়ে গিয়েছেন প্রাক্তন অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী প্রফুল্ল প্যাটেল। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৭ সাল থেকেই এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান কেনা সংক্রান্ত এক বিরাট দুর্নীতির মামলা চলছিল। সেই সংক্রান্ত লেনদেনে ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ তোলা হয় মোদিজি ক্ষমতায় আসার পরেই। কাঠগড়ায় তোলা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকেও। একদা শারদ পাওয়ারের মানসপুত্র প্রফুল্ল প্যাটেল এনিয়ে বেশ চাপে ছিলেন। এরই মধ্যে ছন্দপতন হয় গত বছর। শারদকে পথে বসিয়ে প্রফুল্ল প্যাটেল ও অজিত পাওয়ার নতুন এনসিপির জন্ম দেন। দ্রুত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে থাকে মহারাষ্ট্রের। সঙ্গে সারা দেশে ৪০০ আসন জেতার তাড়া। রাজ্য-রাজনীতির ‘পিতামহ ভীষ্ম’ শারদজিকে ত্যাগ করে বিজেপিপন্থী অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীতে নাম লেখাতেই ইউপিএ আমলের বিমান পরিবহণমন্ত্রী কলঙ্কমুক্ত! গত বৃহস্পতিবার সিবিআই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিল প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা ‘ক্লোজড’! মেন্টর শারদ পাওয়ারকে ধাক্কা দেওয়ার পুরস্কার পেলেন প্রফুল্ল। মামলা তো তুলে নেওয়া হল, বিজেপি জিতে এলে ভবিষ্যতে প্রফুল্ল প্যাটেলের উন্নতির পথও পাকা। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়া দুর্নীতির টাকা গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা একবারও তো অমিত শাহরা বললেন না! শোনা গেল না কোনও ফোনালাপের অডিও। রাজ্যে রাজ্যে শখের রাজমাতা কি কম পড়িয়াছে!
কর্ণাটকের জনার্দন রেড্ডির নাম শোনেননি এমন মানুষ দক্ষিণ ভারতে পাওয়া মুশকিল! রেড্ডি ভাইদের বলা হয়, দক্ষিণ ভারতের সর্ববৃহৎ খনি মাফিয়া। সিবিআইয়ের একাধিক মামলা তাঁর নামের পাশে ঝুলছে। কেলেঙ্কারির পরিমাণ টাকার অঙ্কে কয়েক হাজার কোটি। এহেন খনি মাফিয়া প্রথমবার গ্রেপ্তার হন ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। জামিন পান ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু ফের একই মামলায় তাঁকে শ্রীঘরে যেতে হয় ওই বছরের নভেম্বরেই। সিবিআই আদালতের এক বিচারক অভিযোগ করেন, জামিন পাওয়ার জন্য তাঁকে নাকি ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত অফার করা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে সন্দেশখালির শেখ শাহজাহানের চেয়েও তিনি অনেকগুণ প্রভাবশালী। ভোটের মুখে তাঁকে অমিত শাহরা বরণ করে ঘরে তুলেছেন। উদ্দেশ্য একটাই, কর্ণাটকের বেল্লারির সব আসন জিততে হবে। বিনিময়ে খনি কেলেঙ্কারির তদন্ত নিশ্চিতভাবে চাপা পড়ে যাবে কিংবা গতি ধীরে হয়ে যাবে। তবুও কি কর্ণাটকে গতবারের ২৫ আসন জেতার রেকর্ড টপকাতে পারবে বিজেপি। কোথায় যেন আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখছি মোদিজির। তাই খড়কুটো হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই আঁকড়ে ধরার সুযোগ তিনি ছাড়তে নারাজ। কর্ণাটকে ভোটের ফল যাই হোক প্রশ্ন একটাই, খনি দুর্নীতির টাকা জনগণ ফেরত পাবে তো? মোদিজির গ্যারান্টি যখন আছে, গরিবকে তার অধিকার ও প্রাপ্য ফেরতের আশ্বাসও নিশ্চয় থাকবে। তবে মুখে কেউ বলতে শোনেননি। হয়তো ফোনে কথা বলার মতো কোনও বিদুষী রাজমাতা তিনি পাননি বেল্লারিতে।
ভোটের ঠিক আগে দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ী নবীন জিন্দালের বিজেপিতে যোগদান নিঃসন্দেহে নাটকীয় ঘটনা। তার চেয়েও অবাক করা কাণ্ড হচ্ছে যে কয়লা ব্লক বণ্টন কেলেঙ্কারির কথা বলে চোদ্দো সালে বিজেপির নেতারা ভীমরবে ক্ষমতায় এসেছিলেন তাতে অন্যতম অভিযুক্ত নবীনই। কেলেঙ্কারির পরিমাণ ছিল এক দু’কোটি নয়, পৌনে দু’লক্ষ কোটি টাকা। এই কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গেই মনমোহন সিংয়ের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও পিছপা হয়নি গেরুয়া শিবির। জিন্দাল সাম্রাজ্যের মুখ নবীনের বিরুদ্ধে একাধিক এজেন্সি মামলা চালিয়েছে। এখনও চলছে। হঠাৎ তাঁকেই দলে শামিল এবং প্রার্থী করে কোন বার্তা দিতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পার্ষদরা। কথায় বলে ভালোবাসা, যুদ্ধ ও রাজনীতিতে নিয়ম নাস্তি। জয়ই শেষ কথা। তাই ওদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই আগমার্কা আরএসএসেরও।  
ভাটপাড়ার অর্জুন সিং। নিঃসন্দেহে এরাজ্যের অন্যতম বাহুবলী নেতা। কথাটা তাঁর সামনে উচ্চারণ করলেই অগৌরব নয়, আকাশ ভরা তৃপ্তির হাসি খেলে যায় মুখে গালে, ঠোঁটে, সারা শরীরে। ক’টা মামলা আছে তাঁর নামে কেউ গুনে দেখেছেন? এক নিঃশ্বাসে তিনি নিজেও হয়তো বলতে পারবেন না। লোকে ঠাট্টা করে বলে, বিজেপি আর তৃণমূল, তৃণমূল আর বিজেপি, এ নাকি তাঁর কাছে শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ির মতো। ভোট এলেই শিবির বদল, অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার তিনি গিয়েছিলেন মুকুল রায়ের বাড়িতে আশীর্বাদ নিতে। তাঁকে দেখে মুকুলবাবু নাকি বলেছেন, ‘অর্জুন এসেছিস।’ কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটা কথাও হয়তো বলেছেন অস্ফুটে, ‘তুই যেন এখন কোন দলে?’ তা মোদিজি স্থানীয় কাউকে ফোন করে বলবেন নাকি যে ভোট মিটলেই বাহুবলীর বিরুদ্ধে থমকে থাকা যাবতীয় মামলায় তিনি সাধারণ মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দেবেন। এজন্য যদি আইনের সংশোধনও প্রয়োজন হয় তাতেও তিনি দমবার পাত্র নন।
ওই যে বললাম, নেশা লাগলে চারদিকটা যখন রঙিন হয়ে যায়, চোখে ঘোর লাগে মানুষ চিৎকার করে সর্বসমক্ষে অনেক সত্যি কথা বলে ফেলে। আমাদের অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত সংযত সৎ নিষ্ঠাবান মহিলা। শুনেছি তাঁর স্বামীও মেধাবী অর্থনীতিবিদ। মোদিজির বেঁধে দেওয়া সুরের বাইরে কদাপি পা ফেলেন না। তাঁর বাজেট বক্তৃতার ছত্রে ছত্রে তাই মোদির জয়গান। তাঁর স্বামী যখন বলেন, নির্বাচনী বন্ড শুধু এদেশেরই নয়, গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। তখন গা-টা কেমন গুলিয়ে ওঠে। তাহলে আর বাকি কী রইল!
সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, নির্বাচনী বন্ড সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংবিধান বিরোধী। তখন তো দিল্লি কিংবা রাজস্থানের কোনও পাতানো রানিমাকে ফোন করে মোদিজি সস্নেহে বলেন না, ভোট মিটলেই বেআইনি বন্ড থেকে আমার দলের পাওয়া ৮ হাজার কোটি টাকা মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেবেন। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা যা একইসঙ্গে অবাস্তব ও বেআইনি, তা বলার জন্য তিনি বেছে নিলেন এমন একজনকে যিনি প্রার্থী হওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর গেরুয়া দলে যোগ দিয়েছেন। কৃষ্ণনগরের প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব না পেলে সেই রাজমাতাকে কি কোনওদিন বিজেপি অফিসে দেখা যেত? রাজ্যের শিক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করেছে ইডি, খুব উত্তম প্রচেষ্টা। এই টাকা গরিবের, তাও মানলাম। কিন্তু কে কে প্রতারিত এবং সেই তালিকা কীসের ভিত্তিতে তৈরি হবে? দাবিদাররা মুখে মুখে বললেই টাকা মিলবে তো। নাকি সবই ভোটের টোপ। এই সস্তা নাটক প্রধানমন্ত্রীর মুখে মানায়? 
নাকি ভোট মিটলে, উত্তাপ মিইয়ে গেলে গ্যারান্টি ফানুস হয়ে আকাশে উড়বে অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা ও বছরে ২ কোটি চাকরির মতোই। আর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর স্বামীর মতোই এ রাজ্যের বঞ্চিতদের চিৎকার করে প্রকাশ্যে বলতে শোনা যাবে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’!

31st     March,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ