বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মোদির স্টান্টবাজি, বিপদ বাড়ছে বিজেপিরই
তন্ময় মল্লিক

রুমাল থেকে বেড়াল হওয়ার কথা বাঙালিকে জানিয়ে ছিলেন সুকুমার রায়। এবার বাঙালির সামনে এল ‘মুখ’ থেকে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হওয়ার ঘটনা। সৌজন্যে নরেন্দ্র মোদি। এতদিন তিনিই ছিলেন দলের মুখ। তাঁকে দেখিয়েই বিজেপি ভোট চাইত। এবার তিনি সঙ্কট মোচনকারীর ভূমিকায়। ‘নারী সশক্তিকরণে’র নামে দলের মহিলা প্রার্থীদের ফোন করছেন। তবে, সব মহিলা প্রার্থীকে নয়। যাঁদের নিয়ে দলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, তাঁদেরই দিচ্ছেন ‘বরাভয়’। সঙ্কট গভীর, তাই প্রধানমন্ত্রী পদে থেকেও টাকা বিলির ‘গাজর’ ঝোলাতে নেমে পড়েছেন। অভাবনীয়। অকল্পনীয়। নজিরবিহীন। পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে নামতে হয়! আর তাতেই উঠছে প্রশ্ন, ‘বেড়াল’ কি তাহলে সত্যিই ঠেলায় পড়েছে?
বিজেপির টিকিট বিলি নিয়ে বাংলায় যা হচ্ছে তাতে দলের কর্মীরা প্রচণ্ড হতাশ। পঞ্চম দফার তালিকা প্রকাশ সত্ত্বেও রাজ্যের ৪২টি আসনে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করতে পারেনি। কারণ, লবিবাজি। অনেক যোগ্য টিকিট প্রত্যাশীর নাম প্রার্থী তালিকায় নেই। আবার কয়েকজনের নাম আছে কিন্তু ‘ই ধার কা মাল উধার’ হয়ে গিয়েছে। তা নিয়েও অনুগামীদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। প্রতিবাদে কোথাও প্রার্থী বদলের দাবিতে পড়ছে পোস্টার, কোথাও বিক্ষোভ। তবে নজর কেড়েছে সন্দেশখালি। 
বসিরহাট বিজেপির কাছে ‘টাফ সিট’। বঙ্গ বিজেপি আন্দোলনকারীদের মধ্যে কাউকে প্রার্থী করে স্টান্ট দিতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যেই সন্দেশখালির ‘প্রতিবাদী মুখ’ রেখা পাত্রকে প্রার্থী করে। নেতৃত্ব ভেবেছিল, এটাই হবে মাস্টার স্ট্রোক, কিন্তু হয়ে গেল ব্যুমেরাং। আন্দোলনকারী মহিলারাই ক্ষুব্ধ। বিজেপির কাছে যা ‘শিরে সর্পাঘাতে’র শামিল। তাই কোনও ঝুঁকি নয়। হস্তক্ষেপ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।
সিএএ গাজর শুধু ফ্লপ নয়, সুপার ফ্লপ। বিজেপির মতুয়া নেতারাও এখন খুব একটা নাগরিকত্বের কথা মুখে আনছেন না। এই অবস্থায় বঙ্গে সন্দেশখালি বিজেপির একমাত্র অস্ত্র। সেখানেই প্রার্থীকে নিয়ে দলে বিক্ষোভ হলে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। সন্দেশখালি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ছিল না। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর মতো অত্যন্ত যত্ন সহকারে ‘তা’ দেওয়ায় সন্দেশখালি ইস্যু ভূমিষ্ঠ হয়েছে। বহু কষ্টের ফসল নির্বাচনের মুখে হাতছাড়া করতে নারাজ বিজেপি। তাই বঙ্গ বিজেপির উপর ভরসা না রেখে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে।  
রেখা পাত্রকে প্রধানমন্ত্রী ‘শক্তিস্বরূপা’ বলে সম্বোধন করেছেন। এরপর বিজেপিতে কারও ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশের জায়গা নেই। তাই যাঁরা ‘রেখা পাত্রকে মানছি না, মানব না’ বলে পোস্টার হাতে ক্যামেরার সামনে স্লোগান দিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন ভুল স্বীকার করছেন। এটাই ‘মোদি ম্যাজিক’! 
২০১৪ সালের আগে মোদিজির একটা কথায় লক্ষ লক্ষ মানুষ আলোড়িত হতো। তাঁর কথাকে ‘বেদবাক্য’ ভেবে অনেকেই চোখ বন্ধ করে পদ্মফুলে বোতাম টিপতেন। আর এখন? দলীয় কর্মীদের ক্ষোভ দূর করার জন্য তাঁকে জনে জনে ফোন করতে হচ্ছে! প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা প্রকাশ্যে আনতে হচ্ছে। বোঝাতে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাশে আছেন। তবেই মিটছে ক্ষোভ। ২০১৪ আর ২০২৪ সালের ‘মোদি ম্যাজিকে’র তফাৎটা এখানেই।
প্রধানমন্ত্রী বাংলার আরও এক মহিলা বিজেপি প্রার্থীকে ফোন করেছেন। তিনি কৃষ্ণনগর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অমৃতা রায়। বিজেপিতে যোগদানের দু’দিনের মধ্যেই তিনি প্রার্থী। তা নিয়ে দলের নেতা কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ আছে। তবে, সেটা সন্দেশখালি পর্যায়ে পৌঁছয়নি। কারণ তিনি রাজ পরিবারের বধূ। সেই সূত্রে তিনি ‘রাজমাতা’।
প্রধানমন্ত্রীর ফোন নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে অমৃতাজির সঙ্গে কথোপকথনের অডিও প্রকাশ্যে আসার পর। প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁকে শুধু উৎসাহ দিতেন তাহলে কোনও বিতর্ক হতো না। কিন্তু তিনি নির্বাচনের মুখে বাংলার গরিবদের সামনে ৩ হাজার কোটি টাকার ‘গাজর’ ঝোলানোর পরামর্শ দিয়েছেন। অমৃতাজিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনি অবশ্যই লোকজনকে বলবেন মোদিজির সঙ্গে আপনার ফোনে কথা হয়েছে এবং উনি বলেছেন যে, বাংলার মানুষ যেন বিশ্বাস করে, যে তিন হাজার কোটি টাকা ইডি ‘অ্যাটাচ’ করেছে, তা বাংলার গরিবদের টাকা। সেই টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কোনও না কোনও রাস্তা আমি খুঁজব।’
ইডির ‘অ্যাটাচ’ করা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলার দায়িত্ব মোদিজি নিজে নিলেন না কেন? 
কেন তিনি অমৃতা রায়কে বললেন, ‘বাংলার মানুষ যেন বিশ্বাস করে’! তাহলে কি নরেন্দ্র মোদিও বুঝতে পারছেন, বাংলার মানুষ এখন আর তাঁর কথা বিশ্বাস করে না! সেই জন্যই কি বাংলার মানুষকে বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব তিনি ‘রাজমাতা’র উপর চাপিয়ে দিলেন?
ইডির ‘অ্যাটাচ’ করা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পথে আইনি জটিলতা আছে। সেটা প্রধানমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এও বলেছেন, ফের ক্ষমতায় এলে সেই টাকা তিনি ফিরিয়ে দেবেন। তারজন্য তিনি নাকি আইনি পরামর্শ নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। আর তাতেই উঠছে প্রশ্ন, বাংলার গরিবদের প্রতি যদি এতই দরদ তাহলে কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১০০ দিনের কাজ? কেন গরিবের মজুরি টাকা আটকে রাখা হয়েছে? কেন আবাস যোজনার টাকা আটকে দিয়ে গরিবদের পশুর মতো জীবন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে? 
মোদিজি, আপনি কি সত্যিই বাংলার গরিবদের ৩হাজার কোটি টাকা দিতে চান? তাহলে আপনি তা অনায়াসেই দিতে পারেন। ‘ইলেকশন বন্ড’ বাবদ বিজেপির পার্টি ফান্ডে এসেছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সামনে এসেছে ইলেকশন বন্ড ক্রয়কারী সংস্থাগুলির নাম। তাতেই মানুষ বুঝেছে, বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থায় কেন্দ্রীয় এজেন্সি হানার আসল উদ্দেশ্যটা কী! ঘুরপথে ‘তোলাবাজি’র অর্ধেকটা দিলেই বাংলার গরিবদের পাশে দাঁড়ানোর আপনার ইচ্ছা পূরণ হবে। সেক্ষেত্রে কোনও আইনি বাধাও থাকবে না। প্রয়োজন হবে না আইনি পরামর্শ নেওয়ার। শুধু আপনি চাইলেই হবে। কিন্তু বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছে, আপনি সেটা চাইবেন না। কারণ উন্নতি নয়, বাংলাকে নিয়ে রাজনীতি করাই দিল্লি বিজেপির লক্ষ্য।
অমৃতা রায় বয়সে প্রবীণ হলেও রাজনীতিতে নবাগতা। রাজনীতির মারপ্যাঁচ এখনও সেভাবে রপ্ত হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়ে আপ্লুত অমৃতাদেবী গড়গড় করে সব বলে ফেলেছেন। রাজমাতা হয়তো ভেবেছিলেন, নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে রাজসিক সম্মান পাবেন। কিন্তু, তার বদলে তাঁকে শুনতে হচ্ছে ‘গদ্দার’। নিজের দুঃখ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করতে গিয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পত্তনে তাঁর পরিবারের পূর্বসূরিদেরও যে ভূমিকা ছিল, সেটা স্বীকার করে ফেলেছেন। 
মনের দুঃখ কাউকে বললে হালকা হওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে মনকষ্টের কথা বলে হয়তো তিনিও কিছুটা হালকা হয়েছেন। কিন্তু বিপাকে পড়ে গিয়েছে বিজেপি। কারণ উঠতে বসতে দেশাত্মবোধের বুলি আওড়ানো বিজেপি এমন একজনকে প্রার্থী করেছে যার সঙ্গে পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার একটা যোগসূত্র রয়েছে। এটা কি বিজেপির জন্য খুব স্বস্তিদায়ক হবে? 
বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশেই প্রকাশ্যে আনা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ। প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন ব্যক্তিত্বও দলের সাধারণ প্রার্থীকে কতটা গুরুত্ব দেন, সেটা বিজেপি বোঝাতে চেয়েছিল। এটা ছিল বিজেপির একটা ‘নির্বাচনী স্টান্ট’। সেই স্টান্টবাজি করতে গিয়েই বিজেপি খুঁচিয়ে ঘা করেছে। ৩ হাজার কোটি টাকা বিলির কথা বলে প্রধানমন্ত্রী ফের ‘১৫ লাখি ধাপ্পা’র বিষয়টি উস্কে দিয়েছেন। 
নারী সশক্তিকরণের দোহাই দিয়ে মোদিজি দলের মহিলা প্রার্থীদের চাঙ্গা করতে চাইছেন। এটা রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু, তখনই তাঁর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যা রণে ভঙ্গ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, তিনি ভোটে দাঁড়াবেন না। তাঁর নাকি ‘অর্থবল’ নেই। 
তবে অনেকেই বলছেন, এটা আসলে অর্থমন্ত্রীর অজুহাত। প্রকৃত কারণ ‘ইলেকশন বন্ডে’র দুর্নীতি। তাঁর স্বামী পরকলা প্রভাকরের দাবি, ‘ইলেকশন বন্ড শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি।’ আর এরপর যদি ‘পিএম কেয়ার্স ফান্ড’ নিয়ে নাড়াচাড়া হয় তো কথাই নেই। একে রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর। তাই কি তিনি নিয়েছেন ‘যঃ পলায়তি সঃ জীবতি’ নীতি?

30th     March,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ