বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা
ডঃ সমিত রায়

স্কুল-কলেজের প্রথাগত পড়াশোনার শেষে অন্যান্য রাজ্যের ছেলেমেয়েরা সর্বভারতীয় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। সফল হন। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকারের চাকরিতে যোগ দেন। কেউ বা আবার বেছে নেন কর্পোরেট হাউসের চাকরি। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ছবিটা অনেকটাই আলাদা। অন্যান্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যের ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজের প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণ করলেও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকসময় সফল হতে পারেন না। আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল ছেলেমেয়েদের অপারগতা নিয়ে চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলে। এই বিষয়ে পরিসংখ্যানও এ রাজ্যের তরুণ তুর্কীদের বিপক্ষে। বিগত কয়েক বছরে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহার থেকে বহু সংখ্যক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি—ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC), ব্যাঙ্ক, রেল এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশন-কম্বাইন্ড গ্রাজুয়েট লেভেল এগজামিনেশনে (CGL) প্রভূত সাফল্য পেয়েছেন। বিহারের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারত ও উত্তর ভারতের বেশ কিছু রাজ্যেও আমরা এই একই চিত্র দেখতে পাই। অথচ আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে ছবিটা এক্ষেত্রেও বিপরীত। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, যা কিছু নেতিবাচকতা এ রাজ্যেই হয় কেন? 
এর উত্তরে দু’টি বিষয়ে আমাদের আলোকপাত করা প্রয়োজন। এ রাজ্যের ছেলেমেয়েরা সর্বভারতীয় বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন পরীক্ষা দেন এবং সর্বভারতীয় স্তরে স্থান লাভ করেন। আর এক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা নিয়ে সবাই (সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে) নিশ্চিত এবং দ্বিধাহীন। পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর মান এবং উৎকর্ষতাও অন্যান্য রাজ্যের থেকে বহুলাংশে বেশি। অথচ এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আমরা ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হই। তাই এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন। আর বর্তমানে সেই সময় এসে উপস্থিত। প্রকৃতপক্ষে, এটা আমাদের বুঝতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত প্রায় সমস্ত রাজ্যের ছেলেমেয়েরা প্রায় ১০-১৫ বছর আগে থেকেই একটা বিষয় সম্পর্কে নিঃসংশয় যে, স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্রই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি বৃত্তিমুখী শিক্ষারও অত্যন্ত প্রয়োজন। তাঁরা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেন যে সর্বভারতীয় স্তরে সরকারি চাকরির কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু সত্যি বলতে এই ধরনের চৈতন্যোদয় এখনও আমাদের হয়নি। জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষায় সাফল্য লাভের জন্য যে অধ্যবসায়, ধৈর্য্য, অভ্যাস এবং সর্বোপরি প্রতিদিন যে পরিমাণ কঠোর পরিশ্রম করা উচিত, তা নিয়ে আমরা আজও ভাবি না। স্কুল বা কলেজের পরীক্ষার ক্ষেত্রে যেখানে শুধুমাত্র একটি বিষয়ের কিছু তথ্য নিয়ে পরীক্ষায় বসতে হয়, সেখানে সর্বভারতীয় স্তরে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসতে হয় কমপক্ষে ১৮-২০টি বিষয়ের জ্ঞান নিয়ে। কাজেই বলা বাহুল্য, এটা একটা আর্ট। কীভাবে সমস্ত তথ্যকে বাস্তব ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে কার্য উদ্ধার করতে হবে, তা জানতে একমাত্র উপায় হল লাগাতার অনুশীলন এবং স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরের পর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেওয়া। যতদিন না তা হচ্ছে ততদিন, হ্যাঁ ততদিনই পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েরা সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সফল হতে পারবে না।
দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর রাইস এডুকেশন (RICE EDUCATION) পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি দেখছি যে, সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য কোনও বিশেষ মেধার প্রয়োজন হয় না। মধ্যমেধার ছেলেমেয়েরাও যদি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, সঠিক পরিকল্পনা এবং সাফল্যের অঙ্গীকার নিয়ে আসেন, তাহলে তাঁরাও বহু শীর্ষস্থানীয় আমলা হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে পদাধিকার লাভ করবেন। তাই সময় এসেছে চায়ের আড্ডায়, অভিভাবকদের আলোচনায়, ক্লাবের আড্ডার সময়ে এমন চর্চার যেখানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশুনার পর সঠিক প্রশিক্ষণের প্রসঙ্গ আসবে। 
আমি শেষ করব, সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করে। পড়শি রাজ্য বিহারে অষ্টম শ্রেণিতে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বিষয় এসেছিল ‘UPSC পরীক্ষার জন্য কীভাবে প্রস্তুত হলে সাফল্য পাওয়া যাবে।’ বোঝাই যাচ্ছে, অন্যান্য সর্বত্রই সবার মূল লক্ষ্য একটিই—পারলে ক্লাস এইট থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে UPSC বা যে কোনও সর্বভারতীয় পরীক্ষার বীজ বপন করা। যাতে তারা বোঝে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাহাত্ম্য। উচ্চশিক্ষার শংসাপত্রই কেবল সরকারি চাকরি লাভের জন্য যথেষ্ট নয়; আমাদের রাজ্যে এ মনোভাব যেদিন আসবে, সেদিন থেকেই এই চিত্রটা বদলাবে। ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরি লাভ করে পরবর্তী ৩০-৪০ বছর উচ্চ বেতনে একটি সুখকর জীবন কাটাবেন। ৪০ বছর আগে আমি যখন বলেছিলাম যে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট হওয়া দরকার, তা বহু মানুষ বিশ্বাসই করেননি। অথচ বর্তমানে প্রতিটি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কাউন্সেলিং সেন্টার’ খোলা হয়েছে। রাজ্য সরকার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছে। তাই এখন আর একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, ৪০ বছর আগের সিদ্ধান্ত আজ ভারতবর্ষের মানুষ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আমি আবার বলব যে, এমন একটি দিন আসবে যখন অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল বা আইআইটি পরীক্ষার প্রস্তুতির মতোই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি চাকরির জন্যও ছেলেমেয়েরা অষ্টম শ্রেণি থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে। আর এই ব্যবস্থা শুরু হবে আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যেই। কারণ প্রশ্নপ্রত্রের পদ্ধতি বা ধরনের এমন কিছু পরিবর্তন আসছে যে শুধুমাত্র মুখস্থ করে এই ধরনের চাকরিতে সফল হওয়া যাবে না। এর ইঙ্গিত এখন থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই আমি আবারও বলব, এ রাজ্যের ছেলেমেয়েদের, অভিভাবকদের ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এখন থেকেই বিশ্বাস করতে হবে যে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি চাকরির জন্য যে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তা পেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। আর তা হতে হবে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি থেকেই। কারণ আগামী বঙ্গ প্রজন্ম যদি দেশের আমলাতন্ত্রকে করায়ত্ত করতে চায় বা বলা ভালো দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হতে চায়, তাহলে বঙ্গ সমাজের সর্বস্তরে এই বৈপ্লবিক মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আশা করা যায়, এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের ছেলেমেয়েদের থেকে পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েদের কয়েক যোজন এগিয়ে রাখবে। আর তখনই পশ্চিমবঙ্গবাসী সোল্লাসে বলতে পারবে, সর্বভারতীয় সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ‘মিশন অ্যাকমপ্লিসড।’ 
 লেখক রাইস এডুকেশনের চেয়ারম্যান (মতামত ব্যক্তিগত)

29th     March,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ