বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সঙ্কটকালে তিনিই ‘ত্রাতা’
তন্ময় মল্লিক

কৃষকবন্ধুর টাকা দ্বিগুণ করা হবে, চালু হবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড। রেশন পৌঁছে যাবে মানুষের দুয়ারে। একুশের ভোটে এমনই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিশ্রুতি। বিরোধীরা বলেছিল, সব ধাপ্পা। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? মানুষের মধ্যেও ছিল সংশয়। কারণ এমন প্রকল্প আগে দেখেনি বাংলা। তবে, সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাতেই জন্মেছিল বিশ্বাস, কথা দিলে তা রাখেন মমতা। এবার ১০০ দিনের বকেয়া মেটানোর ঘোষণামাত্র উঠেছিল সেই একই প্রশ্ন, এত টাকা আসবে কোথা থেকে? তার উত্তর মুখ্যমন্ত্রী মুখে দেননি। কাজে করে দেখালেন। শুরু হয়েছে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে তাঁদের হকের টাকা পাঠানো। আর এসব দেখে গ্রামের মানুষ কী বলছে? ‘মমতা শুধু কথাই রাখেন না, সঙ্কটকালে তিনিই গরিবের ত্রাতা।’
পুরুলিয়ার সোনাইজুড়ি পঞ্চায়েতের বালিগাড়ার করুণা মাহাতর নাম আবাস যোজনা থেকে বাদ গিয়েছিল। তখন থেকেই তাঁর মনটা খারাপ। মাটির ঘর। তাও বাদ পড়ল নাম! খুব রাগ হয়েছিল। তবে এখন সব রাগ, দুঃখ, অভিমান গলে জল। কারণ ১০০ দিনের কাজের বকেয়া মজুরি ঢুকেছে তাঁর অ্যাকাউন্টে। ৬৮১৬ টাকা।
আবাস প্লাসের তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ক্ষোভের কথা গোপন করেননি করুণাদেবী। তাঁর কথায়, 
তখন আশাকর্মীদের উপর খুব রাগ হয়েছিল। এখন আর নেই। মমতা দিদি টাকা দিয়েছে। আমাদের খাটুনির টাকা। হকের পাওনা পেয়েছি। এবার ঘরটা মেরামত করব। আমাদের মতো গরিব মানুষ বুঝে গিয়েছে, বিপদে পড়লে দিদিই পাশে থাকবে। দিদিই আমাদের ত্রাতা। 
পুরুলিয়ার চাকদা গ্রামের বাহাদুর সহিসের অ্যাকাউন্টেও ঢুকেছে বকেয়া মজুরি। ৩৫৮৬ টাকা। কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েনে টাকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। প্রায় জলে যেতে বসা টাকা এসেছে ঘরে। আনন্দে আত্মহারা বাহাদুরবাবুর অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় স্লোগানের ভাষায়, ‘গরিবের শ্বাস ততক্ষণ, দিদি আছে যতক্ষণ।’
একসময় এই সোনাইজুড়িতে সিপিএমের দাপট ছিল ভয়ঙ্কর। বিরোধীরা ভয়ে মাথা তুলতে পারত না। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই পঞ্চায়েত ছিল রাম-বাম জোটের দখলে। সেই সময়ের ১০০ দিনের কাজের টাকাও বকেয়া ছিল। এবার মিটছে। তবে, বেনিফিসিয়ারির তালিকা সামনে আসতেই শুরু হয়েছে হইচই। তৎকালীন বিজেপির পঞ্চায়েত 
সদস্য অজয় সেনের নাম রয়েছে কমপক্ষে পাঁচটি স্কিমে। একাধিক জায়গায় রয়েছে সিদ্ধার্থ সেনের 
নাম। সিদ্ধার্থবাবু হলেন চাকদা গ্রামসভা আসনে বিজেপির পরাজিত প্রার্থীর স্বামী। তিনি অবশ্য অ্যাকাউন্ট চেক করেননি। তাই টাকা ঢুকেছে কি না বলতে পারলেন না। তবে অনেক ভেবে বললেন, হাজার ১৪/১৫ টাকা পাব। 
বেনিফিসিয়ারির তালিকা প্রকাশ্যে আসায় বেশ বিব্রত বিজেপি নেতৃত্ব। অজয়বাবু ছিলেন পঞ্চায়েত সদস্য। বেনিফিসিয়ারির তালিকায় তাঁর নাম? তাও আবার কমপক্ষে পাঁচ জায়গায়। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এক ঝুড়ি মাটি না ফেলেও কেন বিজেপি নেতা-কর্মীদের অ্যাকাউন্টে ঢুকছে এত টাকা? তাহলে কি লঙ্কায় যে যায় সে-ই হয় ‘রাবণ’? অজয়বাবুর সাফাই, ব্লক অফিসের ভিতরে একটি হাপা সংস্কারের ইট, বালি, সিমেন্টের টাকা তিনিই নাকি দিয়েছিলেন। সেই টাকা ঘুরপথে ‘মজুরি’ হয়ে তাঁর অ্যাকাউন্টে ঢুকছে।
এক্ষেত্রে রাম-বাম পরিচালিত সোনাইজুড়ি পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার যথেষ্ট সুযোগ রাজ্যের শাসক দলের সামনে ছিল। কিন্তু করেনি। কারণ নাম বাদ দিলেই উঠত ১০০ দিনের টাকা দেওয়া নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ। তাই শাসক দল বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছে। তবে তালিকা দেখার পর এলাকাবাসীর দাবি, সোনাইজুড়িতে তদন্তে আসুক কেন্দ্রীয় টিম।
অনেকে মনে করছেন, রাজ্য সরকার বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ায় নির্বাচনে ধাক্কা খাবে বিরোধীরা। সম্ভবত সেটা টেরও পেয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। গরিব মানুষ টাকা পাচ্ছে, তাতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে অধীর চৌধুরীর ভালো লাগার কথা। কারণ কংগ্রেস তো সেই কবে থেকে ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান দিয়ে আসছে। কিন্তু অধীরবাবু খুশি 
না হয়ে তুলেছেন প্রশ্ন, ‘বাজেটের কোন খাত 
থেকে এই টাকা দেওয়া হচ্ছে?’ গরিব মানুষের আটকে থাকা হকের টাকা মিটিয়ে দেওয়াটা তাঁর ভাষায় ‘নির্বাচনী ঘুষ’।
তাহলে অধীরবাবু কী চাইছিলেন? ১০০ দিনের বকেয়া মজুরি না মিটিয়ে রাজ্য সরকার আদালতে যাক। আদালত থেকে নিয়ে আসুক মজুরি মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ। সেটা করলে কী হতো? গরিব, খেটেখাওয়া মানুষের দুর্ভোগ আরও কিছুটা লম্বা হতো। কিন্তু রাজনীতির ইস্যুটা জিইয়ে রাখা যেত। নিয়োগ প্রক্রিয়ার মতো বকেয়া মজুরির বিষয়টি ঝুলে থাকলে গরিবদের উস্কে দেওয়া কিঞ্চিৎ সহজ হতো। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বকেয়া মজুরি মিটিয়ে দেওয়ায় সেই রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে একের পর এক ইস্যু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় হতাশা বাড়ছে বিরোধী শিবিরে। শিবরাত্রির সলতের মতো জ্বলছিল সন্দেশখালি। মূল অভিযুক্ত শেখ শাহজাহান গ্রেপ্তার হওয়ায় সেটাও গেল।
রাজনৈতিক মহলের বিশ্বাস, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বৃদ্ধি এবং ১০০ দিনের বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার প্রভাব লোকসভা ভোটে পড়বেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দু’টি পদক্ষেপ আসন্ন নির্বাচনে ঘাসফুল শিবিরকে অনেকটা এগিয়ে দেবে। এখনও হাতে আছে আবাস প্লাসের ‘কার্ড’। নরেন্দ্র মোদির দিকে তাকিয়ে আছে বাংলার ১১ লক্ষ পরিবার। কেন্দ্রীয় সরকার টাকা না দিলে বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলাকে বঞ্চনার স্ট্যাম্পটা পাকাপাকিভাবে লেগে যাবে। হাজার ধুলেও তা উঠবে না। তবে, কেন্দ্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাড়াতাড়ি। কারণ সময় বেঁধে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অপেক্ষা মার্চ মাস পর্যন্ত। বাংলা বুঝে গিয়েছে, মোদি না দিলে দেবে দিদি। আর সেটা ঘটলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেও খুব একটা লাভ হবে না। 
নোটবন্দির পর থেকেই ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি। করোনা পর্বে তা পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় কোমায়। বিশ্বের তাবড় তাবড় অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর একটাই রাস্তা, টাকা দিতে হবে গরিবের হাতে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেই পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ অর্থনীতিবিদরা নোবেলজয়ী ঠিকই, কিন্তু মোদিজির তালে তাল ঠোকেন না। তাই ‘বিশ্বগুরু’ হেঁটেছিলেন উল্টোপথে। গোটা দেশে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের বরাদ্দ 
কমিয়ে দিয়েছিলেন। আর বাংলায় তো বন্ধই 
করে দিয়েছেন। বাংলাকে বরবাদ করাই ছিল বরাদ্দ বন্ধের উদ্দেশ্য। 
১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে লাগে জোর ধাক্কা। আগে গ্রামের বাজারগুলি অনেক রাত পর্যন্ত লোকজনের ভিড়ে গমগম করত। তাসের ও গল্পের আড্ডা থেকে চা, তেলেভাজা-মুড়ির অর্ডারের খই ফুটত। হুজুগ উঠলেই হতো পিকনিক। কিন্তু ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হওয়ার পর একটু অন্ধকার হলেই সেইসব বাজারে মাছি তাড়ানোর অবস্থা। প্রয়োজন ছাড়া কেউ খুব একটা বের হয় না। ফাঁকা পকেটে জমে না আড্ডাও। 
বকেয়া মজুরি মেটানো ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বৃদ্ধির ফায়দা তৃণমূল কতটা তুলবে, তার উত্তর দেবে সময়। তবে, বকেয়া টাকা মেটানোয় ও ৫০ দিনের কাজের গ্যারেন্টি রাজ্য দেওয়ায় ফের চনমনে হবে গ্রাম বাংলার অর্থনীতি। দোকানে, হাটে, ঘাটে বাড়বে ভিড়, ফিরবে সেই পুরনো ছবি। বাজারে ‘রোল’ হবে টাকা। সেই আশাতেই বুক বাঁধছে গ্রাম।
সম্প্রতি দিল্লিতে এক প্রদর্শনীর উদ্বোধনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারকে মধ্যবিত্তের দরকার নেই বলেই আমি মনে করি। তবে সরকার অবশ্যই গরিবদের সহায়তা দেবে।’ বিজেপি যে মধ্যবিত্তদের দায় নিতে চায় না, সেটা সরকারের কাজেই স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিটি বাজেটে ধাক্কা খেয়েছে আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। এ ছিল মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা। সেই কারণেই রেপো রেট বাড়লেও বাড়ে না ফিক্সড ডিপোজিটের সুদ।
কথায় আছে, ‘ফলেন পরিচিয়তে বৃক্ষ’। বিজেপির ‘গরিব প্রীতি’র প্রমাণও মিলেছে সরকারের কাজে। মোদিজির দশ বছরের রাজত্বে দেশের ধনী শিল্পপতিদের ঋণ মুকুবের পরিমাণ ১৫ লক্ষ কোটি টাকা। এটাই কি ‘গরিবে’র প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা?

2nd     March,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ