বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

অমৃতকালে আত্মহত্যা বাড়ছে কেন?
সমৃদ্ধ দত্ত

রাজস্থানের বারমেড় অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকার হতাশ, জীবনের প্রতি বিমুখ, পারিবারিক অত্যাচারে বিপর্যস্ত, সন্তানহীনতার কারণে নিরন্তর দোষারোপ শুনে আত্মগ্লানিতে নিমজ্জিত মহিলারা আজকাল কুয়ো খুঁজছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না। এতদিন ধরে তারা যে সহজ পদ্ধতিতে এইসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেন, সেই ব্যবস্থা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ আত্মহত্যার সুবিধা। কেন? রাজস্থানের বারমেড় যে শুষ্ক রুক্ষ এলাকা এবং প্রধান সমস্যা জল, সেকথা কে না জানে? এমতাবস্থায় যে গ্রামে যত বেশি করে কুয়ো অথবা টিউবওয়েল বসানো থাকে, ততই গ্রামবাসীর সুবিধা। কিন্তু বারমেড় জুড়ে বিস্ময়কর প্রবণতা। বিগত কয়েক বছর ধরে নতুন করে কুয়ো খনন তো দূর অস্ত, পুরনো একের পর এক চালু কুয়ো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে কংক্রিট দিয়ে। প্রয়োজন বেশি বেশি কুয়ো নির্মাণ। অথচ উল্টে কুয়োর পর কুয়ো, বাঁধানো ইঁদারা প্রশাসন থেকে সীল করে দেওয়া হয়েছে বহু এলাকায়। কারণ, আত্মহত্যা। গোটা ভারতের আধুনিক নাগরিক 
সমাজ যখন কোভিড, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, কাশ্মীরের ৩৭০ নং ধারা, অযোধ্যা, জিডিপি গ্রোথ, ভারতীয় সিনেমার অস্কার নমিনেশন, মোদি বনাম রাহুল কিংবা অ্যানিম্যাল সিনেমার সুপারহিট গান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে নিমজ্জিত, সেই সময় তাদের আড়ালে রাজস্থানের এই প্রত্যন্ত জেলার গ্রামে গ্রামে প্রধানত মহিলাদের আত্মহত্যা যেন একটি মহামারীতে পরিণত হয়েছে। এবং কী আশ্চর্য! শুধু মহিলারাই নয়। জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে কিশোর কিশোরী আত্মহত্যাও বেড়ে চলেছে। ৫৫ ছাড়িয়েছে। বারমেড়ের গ্রামবাসীদের রীতিই হল, সকালে অথবা বিকেলে হঠাৎ যদি দেখা যায় বাড়ির বউটিকে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে আশপাশের বাড়িতে প্রথমে সন্ধান করে না। কারণ, মোটামুটি জানাই আছে যে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাইরে বালিতে পায়ের ছাপ ধরে ধরে এগতে এগতে নিশ্চিত হয় যে, এই পায়ের দাগ গিয়ে পৌঁছবে কুয়োর কাছে। আর হয়ও তাই। কুয়োর কাছে পৌঁছে দেখা যায়, একটি বা দুটি ভরা কলসি রাখা আছে। কিন্তু গৃহবধূটি নেই। সে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছে। যাকে এখানে বলা হয় তাঙ্কা। তবে তার আগে শেষ কর্তব্যটি করতে ভোলেনি। দু কলসি জল অন্তত ভরে রেখে গিয়েছে ফেলে যাওয়া পরিবারের জন্য।
 গোটা দেশে মহিলা আত্মহত্যার হার ২৭ শতাংশ। বারমেড়ে ৭২ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৪৮ জন মহিলা আত্মহত্যা করেছে। ২০২০ সালে ৫৪ জন। ২০২১ সালে ৬৪...। বেড়েই চলেছে। ঠিক এই মহামারীর কারণে বারমেড়ে একটি সরকারি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তার নাম আনমোল জীবন। অর্থাৎ অমূল্য জীবন। ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন নম্বর চালু হয়েছে। মহিলাদের বলা হয়েছে কোনও সমস্যা হলেই ফোন করুন। আমরা আছি শোনার জন্য। প্রশাসনের বক্তব্য এই ব্যবস্থায় কাজ হচ্ছে কিছুটা। নারীরা তাদের ভেঙে পড়া গলায় বলছেন কেন তাঁরা আর বাঁচতে চান না। কিছু ক্ষেত্রে আবার তাঁদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে স্বাভাবিকতায়। কিন্তু অসুস্থ তো তাঁরা নন? অসুস্থ হল পরিবার ও সমাজ। যারা তাঁকে ওই অবস্থায় এনে ফেলছে! শুধু কি বারমেড়ে? একেবারেই নয়। গোটা বিশ্বে যত নারী আত্মহত্যা করে, তার সিংহভাগ হয় ভারতে। ৩৬ শতাংশই। 
হিমাচল প্রদেশ অথবা উত্তরাখণ্ডের যে কোনও এলাকায় যেমন প্রতিটি পরিবারে একজন করে অন্তত আর্মিতে কাজ করে এরকম সদস্য পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই মধ্যপ্রদেশের খাড়গোনে জেলার বাদি গ্রামের বৈশিষ্ট্য হল, প্রতি পরিবারে আত্মহত্যা করেছে এরকম একজন করে অন্তত মানুষ আছেই। এমনকী দুজন করেও রয়েছে। দেশের ২৫০ সবথেকে পিছিয়ে পড়া জেলার মধ্যে খাড়গোনে অন্যতম। বাদি গ্রাম পঞ্চায়েতের জনসংখ্যা খুব বেশি হলে ৩ হাজার। কিন্তু গত কয়েক বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়েছে। প্রধান কারণ কী? ডিপ্রেশন। আর সেটা প্রধানত চাষের জন্য ঋণ  নিয়ে শোধ করতে না পারার জন্য। এবং যখন ঋণ পরিশোধ করার সময় আসে, ঠিক তখনই ফসলের দাম পাওয়া যায় না অথবা প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বাদি গ্রাম পঞ্চায়েতে নিয়ম চালু হয়েছে নাইটগার্ড ব্যবস্থায় সকলকে অংশ নিতে হবে। চুরি চামারি বন্ধ করার জন্য? মোটেই না। আত্মহত্যা ঠেকানোর জন্য। গ্রামবাসীরা নিজেরাই রাতে পাহারা দিচ্ছে নিজেদেরই। কেউ আজ রাতে গোপনে ফসলের খেতের দিকে যাচ্ছে না তো? আর ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের রিপোর্টে দেখা যায় একটি অদ্ভুত প্রবণতা। গরিব এবং জীবনবিতৃষ্ণ কৃষকরা সব রাজ্যেই আত্মহত্যা করতে চায় নিজেরই ফসলের  খেতে। পেস্টিসাইড খেয়ে। অর্থাৎ যে ফসলের দাম না পেয়ে তাদের এই চরম পথ বেছে নিতে হচ্ছে, শেষ মুহূর্তও সেই ফসলের সঙ্গেই থেকে যেতে চাইছে তারা। এই মনস্তত্ত্বের কারণ কী? 
ভারতে কৃষকদের ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একটা রেকর্ড ছিল। তারাই আত্মহত্যায় শীর্ষে। সেই তালিকায় অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং তেলেঙ্গানা থাকে প্রথম তিনটি র‌্যাঙ্কে। কিন্তু ২০২২-২৩ সালে ছাত্রছাত্রীরা কৃষকদের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ২০২২ সালে তেলেঙ্গানায় যত কৃষক আত্মহত্যা করেছে, তার তিনগুণ আত্মহত্যা করেছে ছাত্রছাত্রী। তেলেঙ্গানায় প্রতি মাসে এখন গড়ে ৪৫ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করে। প্রধান কারণ কী কী? প্রেমে ব্যর্থতা? পারিবারিক সমস্যা? না। এসব তো আছেই। তবে প্রধান প্রবণতা হল, উচ্চশিক্ষার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পারা এবং সেটা বেড়ে যাওয়া। কারণ পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি তারা। আর দ্বিতীয় কারণ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও প্লেসমেন্ট হয়নি আশানুরূপ। অর্থাৎ যে বেতন ও যে কোম্পানি হওয়া উচিত তা হয়নি।
পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর? ২০২২ সালে তেলেঙ্গানায় কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৭৮। ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যা ৫৪৩। বিগত চার বছরে শুধু এই রাজ্যে ২০২৫ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। সুতরাং যে নাগরিক সমাজ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিরিজ দেখে রাজস্থানের কোটাকে ছাত্র আত্মহত্যার রাজধানী ভাবে, তারা চমকে যায় যখন দেখতে পায় এটা কোটার একার সমস্যা নয়। গোটা দেশে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা এখন মহামারী। ডিপ্রেশনের কারণে। কখনও মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিয়ে অথবা চাকরি না পেয়ে। 
ভারতের শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সবথেকে উজ্জ্বল শহর কোনটা? বেঙ্গালুরু। বেঙ্গালুরুর বেশ কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে বিগত কয়েক বছরে? ছাত্রদের হস্টেলরুম থেকে সিলিং ফ্যান খুলে নিয়েছে। একটি উদাহরণ হল দেশের সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স। সেখানে ২০২১ সালে শুরু হয় সিলিং ফ্যান খুলে নেওয়া। কারণ, হস্টেলরুমে যখন অন্য কেউ থাকে না, তখন হতাশ এবং মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া পড়ুয়ারা আত্মহত্যা করেছে। আর সবথেকে বেশি প্রবণতা হল, সিলিং ফ্যানে গলায় ফাঁস দিয়ে। আতঙ্কিত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সিলিং ফ্যান খুলতে শুরু করে। যা ক্রমেই অন্য ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও গ্রহণ করেছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ৩৫ হাজার ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল। সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। ২০১৯ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৩৩৫। ২০২০ সালে ১২ হাজার ৫৫৬। ২০২১ সালে ১৩ হাজার ১০০।
গরিবের মধ্যে সবথেকে বেশি আত্মহত্যা কারা করছে? খেতমজুর। প্রতিদিন শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে কতজন আত্মহত্যা করে ভারতে? মোট যত আত্মহত্যা হয় তার ৬৪ শতাংশই হল তারা, যাদের আয় বছরে ১ লক্ষ টাকার কম। অর্থাৎ সরকারি খাতায় যারা দরিদ্র। 
আচ্ছে দিন। সবকা সাথ সবকা বিশ্বাস। কর্তব্যকাল। রামরাজ্য। অসংখ্য উজ্জ্বল স্লোগান শোনা যায় বাতাসে। অথচ আত্মহত্যা করছে নারী। আত্মহত্যা করছে কৃষক। আত্মহত্যা করছে ছাত্রদল। আত্মহত্যা করছে খেতমজুর। আত্মহত্যা করছে গরিব। অমৃতকালে জীবন এভাবে বিষবৎ হয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়ার আত্মহত্যার বিপজ্জনক উৎসব ঠেকাতে কবে আসবে নতুন কোনও সরকারি স্লোগান?

1st     March,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ