বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

৩৭০ আসনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ!
মৃণালকান্তি দাস

লোকসভা ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের আগেই এনডিএ জোট কত আসন পাবে, কত আসনে বিজেপি জয়ী হবে, তা সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী, ‘আমি দেশের মেজাজ দেখে বলছি, এনডিএ ৪০০ পার করবে। আর ভারতীয় জনতা পার্টিকে ৩৭০ সিট অবশ্যই দেবে জনগণ।’
দু’বার ওই কথা বলার পর মোদির সংযোজন, ‘হমারা তিসরা কার্যকাল বহত বড়া ফয়সেলোঁ কা হোগা’ (আমাদের তৃতীয় কার্যকাল অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেবে)। তারপরই দেশজুড়ে ভক্তকুলের জয়ের উল্লাস। প্রচারটা এমন যেন মোদির এই ঘোষণা ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে বিরোধীদেরও। অনেকেই বলা শুরু করেছেন, মোদি-হাওয়া উঠেছে দেশজুড়েই। ইন্দিরা মৃত্যুর সহানুভূতি হাওয়ায় ভর করে কংগ্রেস জিতেছিল ৪০৪টি আসন। মোদিজিকে তো দেশের সব রেকর্ড ছুঁতে হবেই। কংগ্রেসের সেই রেকর্ড ভেঙে এক অনন্যসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন। মোদিজির কথাই যে সত্য তা প্রচার করা শুরু করেছে দেশের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমও।
যেমন ধরুন, সর্বভারতীয় এক সংবাদমাধ্যম তাদের সার্ভেতে জানিয়েই দিয়েছে খেলা শেষ। বিজেপি জিতছে ৩০৪টি আসন। মোদি বলছেন ৩৭০। কিন্তু ওসব বললে বিশ্বাসযোগ্যতাতে ধাক্কা লাগতে পারে, আবার সত্যি কথাটা বললে, ইডি, ইনকাম ট্যাক্স বা সিবিআই-এর রেডও হতে পারে। তাই গতবারের চেয়ে একটা বেশি আসন দিয়ে সার্ভে শেষ করেছে। এমন মজার সমীক্ষা এখন একের পর এক বেরচ্ছে। আরও বের হবে। প্রশ্ন হল, গতবারের থেকে আরও ৬৭টি আসন বেড়ে ৩৭০টি সিট পেয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস যদি বিজেপির থেকেই থাকে, তবে বিরোধীদের বিচ্ছিন্ন করতে রাজ্যে রাজ্যে ‘অপারেশন লোটাস’ চালাতে হয় কেন? যে কোনও উপায়কে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের আলাদা করো, বিরোধী দলে ভাঙন আনো, বিরোধী দলের নেতাদের নিজেদের দিকে নিয়ে এসো— এই রণকৌশল তো সেই ‘আত্মবিশ্বাস’-কেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। এ এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। নির্বাচনের আগেই প্রচার করার চেষ্টা— যাতে বলা হচ্ছে বিরোধীরা সব শেষ, শুধু বিজেপিই আছে। মনে করিয়ে দেয়, পশ্চিমবঙ্গে গত বিধানসভা ভোটে ২৯৪টি আসনের দুই তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৯৬টি আসন জয়ের দাবি করেছিলেন খোদ অমিত শাহ। প্রধানমন্ত্রী মোদি একাধিক জনসভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, ‘বাংলায় সরকার গড়তে চলেছি আমরাই।’ তখনও অলীক স্বপ্নে মেতে ওঠা ভক্তকুলের লাফালাফি ছিল ঠিক এখনকার মতোই। তার জবাব দিয়েছিল এরাজ্যের মানুষই। আসলে নতুন উগ্র ভক্তদের কাজে মানুষ আতঙ্কিত। সেই ভক্তরা মুসলিমদের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা বলছেন না হলে মাথা নিচু করে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন, সংখ্যালঘুদের পিটিয়ে মারছেন, কোথাও এতটুকু মোদি বিরোধিতাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। সেই আতঙ্কিত মানুষদের অনেকে যাঁরা বহু বছর ভোটের লাইনেও দাঁড়াতেন না, তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, এটা বিজেপির কাছে সুখবর নয়।
বিজেপি খুব ভালো করেই জানে বাস্তব ছবিটা এক্কেবারে আলাদা। এবং শুধু তারাই জানে তাই নয়, তাদের হয়ে যারা মাঠে নেমেছে সেই সংবাদমাধ্যমও জানে গ্রাউন্ড রিয়েলিটির হাল হকিকত। ‘রামরাজ্য’ উত্তরপ্রদেশের দিকে তাকান। গতবার ৮০টা আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৬৪টা। এবারে কত? ‘আত্মবিশ্বাস’ এতটাই যদি শক্তিশালী যে, জাঠেদের ভোট টানতে সেই ‘রামরাজ্য’-এ রাষ্ট্রীয় লোকদলের জয়ন্ত চৌধুরিকে ভাঙাতে হয়? জাঠেদের ভোট পাওয়া মানে আরও ৫-৬টা আসন। কিন্তু জাঠেরা ‘দলবদলু’ জয়ন্ত চৌধুরির পাশে থাকবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? একইসঙ্গে এও প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কী রামমন্দিরের হাওয়া কোনও কাজ করছে না, এটা বিজেপি বুঝে গিয়েছে? শুধু জয়ন্ত চৌধুরিই নয়, লোকসভা ভোটের আগে উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টিতে ভাঙানো, হিমাচল ও মহারাষ্ট্রে নতুন করে কংগ্রেস ভাঙানো, নতুন করে বিহারে নীতীশ কুমারকে ভাঙিয়ে নিয়ে আসা কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিহারে গতবার বিজেপি জোটের কাছে ছিল ৪০টার মধ্যে ৩৯টা আসন। গেরুয়া শিবিরের অঙ্ক, নীতীশ বিরোধীদলে থাকলে বিজেপি বিহারে ৪০-এ বড়জোর গোটা ৭-৮ আসন পেত। সেসব বুঝেই নীতীশকে জোটে নিয়েছে বিজেপি। ঢোক গিলতে হয়েছে অমিত শাহকেও। কারণ, তিনিই তো বলেছিলেন, নীতীশকে লিয়ে দরওয়াজা হমেশাকে লিয়ে বন্ধ হো গয়া। কিন্তু ‘দলবদলু’ নীতীশকে নিয়ে কি বিহারে ভোটের অঙ্ক বদলাবে? ভোট বিশ্লেষকরা বলছেন, বিহারে নীতীশকে নিয়ে আগের ফলাফল তো দূরের কথা, কাছাকাছিও যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারা এই ভাঙন চেয়েছিলেন। কারণ, দেশজুড়ে একটা খবর ছড়িয়ে দিতে হবে, ইন্ডিয়া জোট ভেঙে গিয়েছে। এটাই তো বিজেপির ‘সাইকোলজিকাল ওয়ার’!
গুজরাতে ২৬টা আসনে ২৬টাই বিজেপিরই দখলে। রাজস্থানে ২৫-এ ২৫। হরিয়ানাতে ১০-এ ১০। দিল্লিতে সাতে সাত। উত্তরাখণ্ডে পাঁচে পাঁচ। হিমাচলপ্রদেশে চারে চার। এসব রাজ্যে বিজেপির আসন কমতে পারে, বাড়ার জায়গা নেই। মধ্যপ্রদেশে ২৮টার ২৭টাতে বিজেপি। কমলনাথ জিতেছিলেন কংগ্রেসের একমাত্র আসন ছিন্দওয়ারায়। সেটাও বিজেপির দখলে চলে যাবে? ছত্তিশগড়ে ১১তে ৯টা আসন পেয়েছিল বিজেপি। উত্তর পূর্বাঞ্চলে আসন বাড়ানোর জায়গাই নেই। এতগুলি রাজ্যে যদি ধরেও নিই একশো শতাংশ আসন বিজেপিই জিতবে তাহলেও ৪ কি ৫টা আসন বাড়তে পারে। বাকি রইল বাংলা। যেখানে বিজেপির গতবারের থেকে অন্তত ১১-১২টা আসন কমার আশঙ্কাই বেশি। এই পরিস্থিতি থাকলেও গোটা দেশে বিজেপির মোট আসন ৩০-৩২টা কমবে। তাহলে বিজেপির ৬৭টি আসন বেড়ে ৩৭০টি হবে কোথা থেকে? পাটিগণিতই বলছে, সবই মোদির গিমিক! ‘২০২৪ বিজেপির কাছে কেকওয়াক’, এরকম যাঁরা বলছেন তাঁরা আসলে বিজেপির হয়ে ক্যাম্পেন করছেন!
বিজেপির স্ট্রং হোল্ড কোথায়? তাদের গড় কোনটা? বিনা দ্বিধায় বলা যায়, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান। হ্যাঁ, এই চার রাজ্যে তারা দারুণ ফল করতে পারে। কিন্তু আগেরবারের মতো সুইপ করবে? গুজরাতে যদি আপ আর কংগ্রেস একসঙ্গে ভোটটা লড়ে, ওখানকার আদিবাসী সংগঠনের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হয়, তাহলে? উত্তরপ্রদেশে ২০১৪-তে বিজেপি জিতেছিল ৭১টা আসন। ২০১৯-এ যোগী আদিত্যনাথ বিরাট ভোটে রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরেও বিজেপি ৬৪টা আসন পেয়েছে, মানে ৭টা আসন কমেছে। তার মানে স্পষ্ট, মুখ্যমন্ত্রী যোগীজির রাজ্যেও বিজেপির আসন কমছে, ভোট কমছে, সমর্থন কমছে। মহারাষ্ট্রে ভাঙা শিবসেনা আর এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সার্কাস তো এখনও বাকি। তেলেঙ্গানাতে চারটে আসন ছিল বিজেপির। শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র আটটা আসন পেয়েছে। ফলে তেলেঙ্গানাতে আসন কমবে, নিশ্চিত। অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে জোট করলে ওয়াই এস আর রেড্ডির বিরোধিতা করতে হবে, আর ওয়াই এস আর রেড্ডির সঙ্গে জোট করলে চন্দ্রবাবু বিরুদ্ধে যাবেন। সেই অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে বিজেপি একটা আসনেও জিততে পারবে না। পুরো দাক্ষিণাত্যে ১২৮টা আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি কর্ণাটকে ২৫টা আর তেলেঙ্গানাতে চারটে আসন পেয়েছিল। কর্ণাটকে ১৩-১৪টা আসন কমার সম্ভবনা প্রবল। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। কেরলে দাঁত ফোটানো কষ্ট। তাহলে মোদির ‘৩৭০ আসন’-এর অঙ্ক মিলবে কী করে? যে দেশের মানুষ মনে করে ভয়ঙ্কর বেকারত্ব বাড়ছে, মনে করে মূল্যবৃদ্ধি অসহ্য হয়ে উঠছে, মনে করে যে চরম বৈষম্য বাড়ছে, মনে করে যে এই সরকার শুধু বড় ব্যবসায়ীদের জন্য কাজ করছে তারা এই সরকারকে ভোট দেবে? কেন? ৩৭০ আসনের গিমিক ছড়িয়ে আসল সত্যিটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, আর তাঁর সুরে সুর মেলাচ্ছে পেটোয়া কিছু সংবাদমাধ্যম, কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে সত্যি বেরিয়ে আসছে।
১৯২৫-এ হিন্দুরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে পথচলা শুরু করেছিল আরএসএস, তারা আজ তাদের লক্ষ্যের এতটা কাছে এসে কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না, যতরকম পদ্ধতি আছে সব প্রয়োগ করেই তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জিতে নিতে চায়। ২০১৪ থেকে বিজেপি বছরখানেকের মধ্যেই এক অন্য আকার ধারণ করেছে। আজকের বিজেপির দিকে তাকালে স্পষ্ট যে, সে ৮০-র দশকের কংগ্রেস হয়ে উঠেছে। হাইকমান্ডের কংগ্রেস। রাজ্যে রাজ্যে শক্তিশালী নেতাদের অবহেলা করে কিছু পুতুল, জো হুজুর দিয়ে দল চালানো কংগ্রেস। সেই হাইকমান্ড পলিটিক্স যখন চলেছে তখন কি আদৌ বোঝা গিয়েছিল যে এই বিরাট দলটা একবার ক্ষমতা থেকে হেরে গেলে কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকবে? একই অবস্থা আজকের বিজেপিরও। বিজেপির সমস্যা একটাই— মোদি-নির্ভরতা।
২০০৪ সালের কথা মনে আছে তো? তপ্ত চাটুতে রুটি সেঁকতে গিয়ে মুখ পুড়েছিল বিজেপির। সবাই যখন ভেবেছিলেন বাজপেয়িজিই ক্ষমতায় আসছেন। কিন্তু জিতেছিল কংগ্রেস জোটই। জানেন মোদি-অমিত শাহরা। তাই শুরু হয়ে গিয়েছে গেরুয়া শিবিরের ‘সাইকোলজিকাল ওয়ার’! যে যুদ্ধে জেতার পথ দেখিয়েছিল বাংলা। এবং বাঙালিরা।

29th     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ