বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা কৌশলী, ভাঙা জরুরি
পি চিদম্বরম

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেকে বোঝাতে ‘আমি’ বা ‘আমার’ শব্দ দুটি এড়িয়ে চলেন এবং সেই জায়গায় বরাবর ব্যবহার করেন উত্তম পুরুষ।
এই স্টাইলে নিজেকে চেনানোর অভ্যাসের জন্য ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে: ‘illeism’। এটি তাঁর একটি ‘পাসিং ফ্যান্সি’ বা সাময়িক খেয়াল হতে পারে, কিন্তু এর থেকে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদিই ‘ভারত সরকার’ এবং এই সরকারের ভালো-মন্দ সবকিছুরই দায় তাঁর। তার ফলে যেটা হয়েছে—বাদবাকি মন্ত্রী (ব্যতিক্রম কেবল অমিত শাহ), দলীয় নেতা, সাংসদ, এমনকী মুখ্যমন্ত্রীরাও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন। পরিহাসও এই যে, তাঁরাও যেন গুরুত্বহীন হয়ে গিয়েই খুশি! তাই আমাদের আর্জি কিংবা সমালোচনার সবই করতে হবে শুধুমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে।
প্রধানমন্ত্রী একটি নতুন স্লোগান বেঁধেছেন: ‘বিকশিত ভারত’ বা ‘উন্নত ভার’। ‘আছে দিন আনেবালে হ্যায়’ দিয়ে স্লোগানের যে লম্বা মালা গাঁথা হয়েছে, আশা করি তাতে এটাই শেষ স্লোগান। অনেক স্লোগানেরই ঠাঁই হয়েছে পথের ধারে। ‘উন্নত ভারত’ হল একটি লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা অবশ্যই ওই লক্ষ্যে পৌঁছে যাব। এখন থেকে শুরু করে ২০৪৭ সাল—এর মধ্যে যাঁরাই সরকারে থাকুন না কেন, ভারত ২০২৪ সালের তুলনায় আরও উন্নত হয়ে উঠবেই, ঠিক যেমন ১৯৪৭ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অনেকটাই উন্নত হয়েছে। ‘উন্নত ভারত’ এই সংজ্ঞাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অস্থির গোলপোস্ট
প্রথমে গোলপোস্ট নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে। গোলপোস্ট সময়ে অসময়ে সরে সরে গেলে হবে না। ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির জন্য লক্ষ্যবর্ষ দেওয়া হয়েছিল ২০২৩-২৪। ধাপে ধাপে সরাতে সরাতে এটা ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের শেষাশেষি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়াবে ১৭২ লক্ষ কোটি টাকার মতো। বর্তমান এক্সচেঞ্জ রেট বা বিনিময় হারে সেটা ৩.৫৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। বিনিময় হার এটাই বা স্থির থাকলে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক বৃদ্ধির হারে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ করতে বিভিন্ন বছর লাগবে:
ডলার এবং ভারতীয় মুদ্রার বিনিময় হার ভারতের জন্য খারাপ হয়ে গেলে, এই গোলপোস্টকে অবশ্যই আরও দূরে সরিয়ে দিতে হবে।
গত দশ বছরে বিজেপি বা এনডিএ সরকারের রেকর্ড আমাদেরকে প্রাণিত করেত ব্যর্থ হয়েছে। নতুন অঙ্কে ইউপিএ জমানায় ৬.৭ শতাংশের বৃদ্ধি ঘটেছিল (এটা পুরনো অঙ্কে ছিল ৭.৫ শতাংশ)। অন্যদিকে, এনডিএ সরকারের দশ বছরে বৃদ্ধির হার হয়েছে মাত্র ৫.৯ শতাংশ।
গ্যাসের ব্যাপারে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ করে বৃদ্ধির হারটা বিজেপি বাড়াতে পারবে কি? বিজেপির কেউই এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন না। কারণ বৃদ্ধির হারটা কিছু বাহ্যিক কারণের সঙ্গে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার উপরেও নির্ভরশীল। অনিশ্চয়তা আছে। তবুও বলছি, নরেন্দ্র মোদি যদি তৃতীয় দফায় জিতে ক্ষমতায় ফিরতে পারেন এবং অর্থনীতির বৃদ্ধি বছরে ৮ শতাংশও হয়, তবে তাঁর তৃতীয় দফার পঞ্চম বছরে পৌঁছনোর পরই ভারতের জিডিপি ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে ছোঁবে।
‘উন্নত’ বলতে কী বোঝায়?
ধরুন, ভারতের অর্থনীতি ২০২৮-২৯ সালে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্তরে পৌঁছল। তখনও কি ভারতকে একটি ‘উন্নত’ দেশ বলা যাবে? ২০২৮-২৯ সালে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আকারের অর্থনীতিরই পাশে রাখতে হবে ১৫০ কোটি জনসংখ্যাকেও! তাতে ভারতবাসীর মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে মাত্র ৩৩৩৩ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ভারত তখনও রয়ে যাবে ‘নিম্ন-মধ্য’ আয়ের অর্থনীতির পংক্তিতে। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যে ভারতের বর্তমান স্থান হল ১৪০ (নমিনাল টার্মের হিসেবে)। ২০২৮-২৯ সালে এই র‌্যাঙ্কটি বড় জোর ৫-১০ স্থান উপরে উঠবে।
এই বিস্তারিত আলোচনার উদ্দেশ্য এটাই যে—কথায় কথায় ‘ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং ইকনমি’, ‘ফিফথ লার্জেস্ট ইকনমি ইন দি ওয়ার্ল্ড’ বা ‘ইউএসডি ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ইকনমি’র নিজের ঢাক নিজে পেটানোর ‘অবসেশন’ বন্ধ হওয়া দরকার। কারণ আমার কাছে এগুলোর কোনওটারই তেমন কোনও আবেদন নেই এবং একইভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তা থাকা উচিত নয়।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন
কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন রাখতে চাই। আসন্ন নির্বাচনে এগুলিকে ঘিরে বিতর্ক হওয়া উচিত:
১. বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ভারতের গায়ে একটা কলঙ্ক দাগ এবং দারিদ্র্যসীমার নীচে রয়েছে এখনও ২২ কোটি মানুষ! এমন কলঙ্ক থেকে ভারত আর কবে মুক্ত হবে? রাষ্ট্রসংঘের (ইউএনডিপি) হিসেবে, ২০০৫-২০১৫ সালের মধ্যে ভারতের ২৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের অভিশাপ মুক্ত হয়েছিল। এই ২২ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের করাল গর্ভ থেকে কবে বের করে আনা সম্ভব হবে?
২. বেকারত্বের বর্তমান হার (৮.৭ শতাংশ) লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে। উজ্জ্বল ও যোগ্য তরুণ-তরুণীরা এবং আধা-দক্ষ কর্মীরা কাজের খোঁজে অন্যত্র  চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে গিয়েছেন। দেশে অপরাধ বৃদ্ধিরও কারণ এই অভিশাপ। এই যুব সম্প্রদায় কবে তাদের উপযুক্ত কাজ বা চাকরি পাবে? এমএ/এমকম/এমএসসি এবং পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা হামেশা প্রহরী বা রেলের গ্যাংম্যান (রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের শ্রমিক) পদে কাজ জোটাবার জন্য হত্যে দেন। দেশকে এই ভয়ানক লজ্জা থেকে কবে মুক্ত করতে পারব আমরা?
৩. লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট (এলএফপিআর) কবে ৫০ বা ৬০ শতাংশের উপরে উঠবে? এলএফপিআর মহিলাদের ক্ষেত্রে কবে উঠবে ২৫ শতাংশের উপরে? 
৪. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যক্তিগত ব্যবহার কখন বাড়াতে পারব আমরা? গরিব মানুষজন, তাদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যশস্য কেনার টাকা-পয়সা হাতে পাবে কবে?
৫. শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কবে বাড়বে? অর্থাৎ এমন যৎকিঞ্চির বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে না, যা মুদ্রাস্ফীতির দরুন কাটাকুটি হয়ে যায়। প্রকৃত মজুরি একটা জায়গায় রয়ে যাওয়ার এই যন্ত্রণার অবসান কবে হবে?  
বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি—এই দুটো সমস্যায় মানুষ জর্জরিত এবং এগুলি তাদের ভয়ানক উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। আমি অন্তত মনে করতে পারি না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেষ কবে এই জ্বলন্ত সমস্যা দুটি নিয়ে কথা বলেছেন। আমি এটাও মনে করতে পারছি না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেষ কবে কথা বলেছেন চীন নিয়ে, মণিপুরের ব্যাপারে, রাজনীতিকদের দলত্যাগ সম্পর্কে, রাজনৈতিক দল ভাঙার উপরে, গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে, নীতি পুলিস কিংবা বুলডোজার বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এই বিষয়গুলি বারবার উত্থাপন করতে হবে, সব রাজনৈতিক দলকেই। আর সেটা এমনভাবে করা দরকার যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর কৌশলী নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হন। কেননা, উপর্যুক্ত প্রতিটি বিষয় বেশিরভাগ মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপিতে তিনিই তো এক ও অদ্বিতীয়। অতএব, এই সমস্যাগুলির সুরাহার পথ তাঁকেই বাতলাতে হবে। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

26th     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ