বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দ্বিতীয় মণ্ডল: কংগ্রেসকে বদলে দিচ্ছেন রাহুল?
সমৃদ্ধ দত্ত

রাহুল গান্ধী শুধু নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারে নয়, স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের ইতিহাসেও সম্ভবত সবথেকে বড় এক সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাজি নিয়েছেন ঠিক লোকসভা ভোটের আগে। নিজের দলের ইতিহাসের ঘোষিত অথবা অঘোষিত অবস্থানের ঠিক বিপরীত অবস্থানে গিয়ে রাহুল গান্ধী সরাসরি জাতিগত রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন। বিজেপির হিন্দুত্ব ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কোনও ইস্যুতেই টক্কর দিতে না পেরে রাহুল হয়তো সর্বশেষ রাজনৈতিক জুয়ায় এগিয়ে দিয়েছেন দলকে। তাঁকে প্রবল উচ্চকিতভাবে দেখা যাচ্ছে দলিত, অনগ্রসরদের দাবি ও অধিকার আদায়ের প্রতিনিধি হতে। জাতীয় স্তরে কোনও জাতিগত আইডেন্টিটি নিয়েই রাজনীতি করে এরকম দল নেই। যা ছিল বিগত শতকের নয়ের দশকে সেগুলি এখনও আঞ্চলিক স্তরেই রয়ে গিয়েছে। রাহুল গান্ধী এবার জাতীয় স্তরের কাস্ট লিডার হয়ে উঠতে চাইছেন। তিনি কি সফল হবেন? নাকি ব্যর্থ? 
ইতিহাসে ফেরা যাক। প্রথম লোকসভা ভোট হয়ে যাওয়ার পরই সংরক্ষণ নিয়ে দাবি উঠতে শুরু করে। কংগ্রেসেরই অনগ্রসর শ্রেণির নেতারা জওহরলাল নেহরুকে বললেন, পণ্ডিতজি, সরকারি চাকরিতে অনগ্রসরদের জন্য সংরক্ষণ দেওয়া দরকার। নচেৎ তারা এগবে কীভাবে? নেহরুর নিজের ব্রাহ্মণ পরিচয়ের জন্য তাঁর নামের আগে পণ্ডিতজি শব্দটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু তিনি জাতপাত নিয়ে এমনিতে মাথা ঘামাতেন না। উচ্চবর্ণ শ্রেষ্ঠ এরকম ধারণাও পোষণ করতেন না। আবার একমাত্র জাতিগত কারণেই তফসিলিদের জন্য সংরক্ষণ দিতে হবে এই ভাবনারও বিশেষ সমর্থক তিনি নন। তিনি মূলত আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়াদের অনগ্রসর মনে করতেন। তবু এই সম্মিলিত দাবিকে উপেক্ষা করা যায় না। ফলে স্বাধীন ভারতে প্রথম অনগ্রসর শ্রেণির জন্য কমিশন গঠন করলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের ২৯ জানুয়ারি। কী দেখবে এই কমিশন? সামাজিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ভারতবাসী কী অবস্থায় আছে, তাদের হাল হকিকত জানবে এবং রিপোর্ট দেবে। কমিশনের প্রধান দত্তাত্রেয় বালাকৃষ্ণ কালেকর। সমাজ সংস্কারক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী। 
১৯৫৫ সালে কালেকর রিপোর্ট জমা দিলেন। যেখানে তালিকাভুক্ত করা হল, ২৩৯৯ টি জাতিকে যারা আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া। তাঁর সুপারিশ ছিল, ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া হোক এই শ্রেণিকে। নেহরু নিজে সরাসরি কোনও মত দিলেন না। কিন্তু তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ মনে করলেন যে, সবেমাত্র দেশ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এখনই যদি এই সুপারিশ কার্যকর করা হয় তাহলে প্রথমেই জাতিগত কারণে দেশে বিভাজন তৈরি হবে। আর তার ফলে শিল্প, পরিকাঠামো কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি নির্মাণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা বাধাপ্রাপ্ত হবে। সব মনোযোগ চলে যাবে ওই সংরক্ষণের দিকে। উচ্চবর্ণ বিদ্রোহ করতে পারে। নেহরু সমর্থন বিরোধিতা কিছুই করলেন না। ফলে সংসদে সেই রিপোর্ট জমা হল না। 
১৯৬১ সালে নেহরু সরকার স্থির করল, এই পদক্ষেপ রাজ্যের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। রাজ্যগুলিই ঠিক করুক তাদের মতো করে। সেইমতো বেশ কিছু রাজ্য নিজেদের কমিশন গঠন করল। দক্ষিণের রাজ্যগুলি সংরক্ষণ ঘোষণা করল তাদের মতো করে। পাঞ্জাবও ৫ শতাংশ সংরক্ষণ দিল। 
ভোটের প্রচারে ১৯৭৭ সালে জনতা দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা ক্ষমতাসীন হয়ে কালেকর কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করবে। তারা ক্ষমতায় এল বটে। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ করা হল না। ১৯৭৮ সালে কিন্তু জনতা দলেরই বিহার সরকারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পূরী ঠাকুর এক ধাক্কায় ২৬ শতাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন ওবিসিদের জন্য। কিন্তু বিহারে তো বটেই, জাতীয় স্তরেও প্রবল তোলপাড় শুরু হল। উচ্চবর্ণ বিহারে সরাসরি বিদ্রোহ করল। যা ভয় পাইয়ে দিল জনতা দলকে। পিছিয়ে এলেন কর্পূরী ঠাকুর। তিনি সংরক্ষণ রাখলেন। তবে মহিলা ও আর্থিকভাবে অনগ্রসরদের ৩ শতাংশ করে দিলেন সংরক্ষণ। ওবিসিদের সংরক্ষণ কমে গেল। 
এবারই নড়েচড়ে বসল জনতা পার্টি। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে জনতা সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ভারতের দ্বিতীয় অনগ্রসর কমিশন গঠন করলেন। কমিশনের সভাপতির নাম বিন্ধ্যেশ্বর প্রসাদ মণ্ডল। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। বিন্ধ্যেশ্বর প্রসাদ মণ্ডল হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি যে, তাঁর  পদবি এভাবে একদিন ভারতের ঘরে ঘরে রাজনীতির প্রতিটি চর্চায় আলোচিত হবে। মণ্ডল কমিশন! মণ্ডল কমিশন যখন রিপোর্ট সমাপ্ত করল ততদিনে ভারতের রাজনৈতিক আকাশে বিরাট পটবদল হয়ে গিয়েছে। ১৯৮০ সালে যখন রিপোর্ট জমা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এসেছে তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আবার ইন্দিরা গান্ধী। 
বছরের শেষ দিনে বিন্ধ্যেশ্বর প্রসাদ মণ্ডল দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নর্থ ব্লকের অফিসে যখন আসেন তখন নর্থ ব্লক প্রায় ফাঁকা। কে থাকবে ওই নিউ ইয়ার্স ইভের দিনে! তবে আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁরই অপেক্ষায় ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম জ্ঞানী জৈল সিং। তাঁর হাতে রিপোর্ট জমা হল।  কী ছিল সুপারিশ? ওবিসিদের জন্য সর্বোচ্চ সংরক্ষণ। কত? ২৭ শতাংশ। এই সংখ্যার কারণ কী? কারণ ১৯৩১ সালের জনগণনায় ওবিসির সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। অতএব সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ। এর বেশি নয় কেন? কারণ ১৯৬৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায় ছিল (এম আর বালাজি বনাম মহীশূর রাজ্য মামলা) সংরক্ষণ ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারবে না। যেহেতু তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণ তার অনেক আগে থেকেই সাড়ে ২২ শতাংশ রয়েছে, তাই ওবিসিকে সর্বোচ্চ দেওয়া হোক সংরক্ষণ অর্থাৎ ২৭ শতাংশ।
বিরোধী দলগুলি দাবি করল ওই রিপোর্ট সংসদে পেশ করা হোক। ইন্দিরা গান্ধী একটি কমিটি গঠন করলেন। এই রিপোর্টের সুপারিশ কার্যকর করা যায় কি না অথবা কীভাবে কার্যকর করা যায়, এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ওই কমিটি। কমিটির প্রধান কে ছিলেন? পি ভি নরসিমা রাও। এক বছর...দু বছর...তিন বছর...। কমিটি বৈঠকের পর বৈঠক করে গেল। সিদ্ধান্ত হল না।  ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। 
রাজীব গান্ধী সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তিনি জানিয়ে দিলেন, এই রিপোর্ট মোতাবেক আমরা তাঁদের সামগ্রিক আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করব। কিন্তু সংরক্ষণে তাঁর সায় ছিল না। অতএব মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট আলমারি বন্দি হল। 
১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বোমা ফাটালেন। বললেন, মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করা হবে। কীভাবে? সেই খুঁটিনাটি সরকারি অফিসারদের সাহায্যে স্থির করবেন সামাজিক ন্যায় মন্ত্রকের এক যুবক মন্ত্রী। যিনি অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত। মন্ত্রীর নাম রামবিলাস পাসোয়ান। তাই হল। ৭ আগস্ট সংসদের দুই কক্ষে ঘোষণা করা হল মণ্ডল কমিশন। ভারতের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হল। রাজনীতি বদলে গেল। সমাজ বদলে গেল। লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, নীতীশকুমার, মায়াবতী নামক একঝাঁক আইডেন্টিটি পলিটিক্সের দলনেতানেত্রীর আবির্ভাব ঘটল সরাসরি প্রথম সারিতে। আর বিজেপি আরও তীব্রভাবে সুযোগ পেল মন্দির রাজনীতির। মণ্ডল বনাম মন্দির। 
সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল একটি দল। কংগ্রেস। রাহুল গান্ধী তাঁর দলকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে আজ নিয়ে আসছেন। প্রথম পদক্ষেপ দলের সভাপতি করা হয়েছে দলিত নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে। আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ আবার কাস্ট সেন্সাস করার দাবি। তাঁর অভিমত হল, আরও বেশি সংরক্ষণ দেওয়া উচিত। 
রাহুল গান্ধী কি নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত দলের মণ্ডলায়নের পথে হাঁটছেন? লাভ হবে? নাকি লোকসান? ১৯৯০ সালের পর ২০২৪ সালে রাহুল ভারতে আবার ফেরালেন মণ্ডল বনাম মন্দির রাজনীতি। তাঁর পরিবারে প্রত্যেকে জাতিগত রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। রাহুল সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছেন দলকে। ইতিহাসের বিস্ময়কর অধ্যায় হল, তাঁর পিতা রাজীব গান্ধীকে যিনি প্রায় একক চেষ্টায় ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, সেই ভি পি সিং এর রেখে যাওয়া অস্ত্রই হাতে তুলে নিচ্ছেন রাহুল। কেমন হতে চলেছে রাহুলের মণ্ডল-টু? 

23rd     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ