বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

অনন্ত ভালোবাসার প্রতীক লোকমাতা নিবেদিতা
সন্দীপন বিশ্বাস

ভিতরে ভিতরে ছটফট করছেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। আর একটু পরেই জাহাজ ‘মোম্বাসা’ ভিড়বে কলকাতা বন্দরে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন। জাহাজ বন্দরে ভিড়তেই নেমে এলেন মার্গারেট। সামনে দাঁড়িয়ে গেরুয়া পোশাকে স্বামী বিবেকানন্দ।  সেদিনটা ছিল ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি। সদ্য পেরিয়ে এলাম সেই পুণ্য এবং স্মরণীয় দিনটি। নিবেদিতার সেবাকর্মের ১২৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ভারতের মাটিতে পা দিয়েই মার্গারেট তথা ভগিনী নিবেদিতা এই দেশটাকে নিজের মাতৃভূমির মতোই ভালোবেসে ফেলেন। চারিদিকে দারিদ্র্য, নোংরা বস্তি, জাতপাত, কুসংস্কার, অশিক্ষা— এসব দেখে তিনি প্রতিজ্ঞাঋদ্ধ হয়ে ওঠেন। স্বামীজির নির্দেশে কাজ শুরু করে দেন। স্বামীজি নিবেদিতার নৌকার পালটিকে টাঙিয়ে দিয়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দেন উজান পথে বাধা ঠেলে এগিয়ে চলার হালটি। 
ভারতে পা রাখার ঠিক দেড় মাসের মাথায় নিবেদিতাকে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কোনও প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেই সভা হয়েছিল ১১ মার্চ, ১৮৯৮ সালে। সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতার স্টার থিয়েটারে। বিষয় ছিল, ‘ইংল্যান্ডে ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তার প্রভাব’। স্বামী বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন, এই বিষয়ে বলার জন্য মার্গারেট নোবেলই যথার্থ ব্যক্তি। কেননা তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অধ্যাত্মভাবনার প্রতি অনুরাগ পোষণ করছিলেন। গণ্যমান্যদের সেই সভায় সভাপতি ছিলেন স্বয়ং স্বামীজি। তিনি শ্রোতৃমণ্ডলীর সঙ্গে মার্গারেটের পরিচয় করে দিয়ে বলছিলেন, ‘মার্গারেট হলেন ইংল্যান্ডের আর একটি দান। তাঁর কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক।’ সেদিন মার্গারেটের ভাষণে যে উদ্দীপ্ত ভাব ও আশার কথা ব্যক্ত হয়েছিল, সেটাই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের কর্মক্ষেত্র। এই দেশ হয়ে উঠেছিল তাঁর মানবসেবার লীলাভূমি। তখনও অবশ্য তিনি ‘নিবেদিতা’ হয়ে ওঠেননি।  আরও কয়েকমাস পরে তিনি দীক্ষা নিলেন স্বামীজির কাছে।  ওই বছরই ২৮ মার্চ ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন তিনি। নতুন নামকরণ হল ‘নিবেদিতা’। 
নিবেদিতা বিশ্বাস করতেন, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামীজি কোনও পৃথক সত্তা নন।  তিনি বারবার বলতেন, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ রূপে একটি আত্মাই জন্ম নিয়েছিল।’ তাই তিনি যখন নিজের নাম স্বাক্ষর করতেন, তখন লিখতেন, ‘নিবেদিতা অব রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ’। 
একদিন তিনি পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। প্রচলিত শিক্ষা ও জ্ঞানের বাইরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছিলেন জীবনের মানে এবং লক্ষ্য। কিছুতেই পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলির মধ্যে অন্তরের ভালোলাগাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে স্বামীজির কথার মধ্যে পেলেন কাঙ্ক্ষিত পথের সন্ধান। সিদ্ধান্ত নিলেন বেদান্তের দেশ ভারতবর্ষে গিয়ে তিনি সেবাকর্ম করবেন। স্বামীজিও বুঝেছিলেন, এই মেয়েই পারবেন। ঠিক এমনই এক অগ্নিসত্তার অন্বেষণে ছিলেন তিনি। স্বামীজির সঙ্গে পরিচয়ের আগে নিবেদিতা লন্ডনের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নারীর মহিমা, স্বাধীনতা ও তার চৈতন্যের বিকাশ নিয়ে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেইসব লেখার মধ্যে কয়েকটি লেখা নজরে এসেছিল স্বামীজির। সেগুলি পড়ে স্বামীজির বিশ্বাস হয়েছিল, এই মেয়ে এক পরশমণি। ভারতের নারীদের দিশা দেখাতে এঁর বিকল্প কেউ হবেন না। কিন্তু ভারতের মতো পরিবেশে মার্গারেট কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, তা নিয়ে স্বামীজির প্রাথমিকভাবে সন্দেহ ছিল। মার্গারেট তাঁর সেই সন্দেহ দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপরই স্বামীজি তাঁকে ভারতে এসে কাজ করার আহ্বান জানান। 
প্রথমে কলকাতায় এসে ওঠেন সাহেবপাড়ায়। সেখান থেকে আসেন ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে। মা সারদার সঙ্গে তাঁর দেখা হল ১৭ মার্চ। প্রাথমিকভাবে নিবেদিতা একটু ভয়ে ভয়ে ছিলেন। মা তাঁকে কতখানি গ্রহণ করবেন। কিন্তু প্রথম দর্শনেই মা তাঁকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার খুকি।’ 
মেয়েদের শিক্ষাদানের বিষয়ে উঠেপড়ে লাগলেন নিবেদিতা। মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, বস্তিতে বস্তিতে ঘুরছেন মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে। কলকাতায় প্লেগ মহামারী আকারে দেখা দিল। মানুষ শহর ছেড়ে পালাচ্ছেন। নিবেদিতা কিন্তু সেবায় উজ্জ্বল। নিজেই যুবকদের সঙ্গে নিয়ে  রাস্তা ঝাঁট দিচ্ছেন, নর্দমা পরিষ্কার করছেন,  মইয়ের উপর উঠে ঘর রং করছেন। কী আনন্দ! কাজের ভিতর দিয়ে জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছনোর এই তো সাধনমার্গ।  
নিবেদিতা বিশ্বাস করতেন, কোনও কাজই সম্পূর্ণ হবে না ভারতবর্ষের শৃঙ্খলমুক্তি ছাড়া। স্বামীজির মহামন্ত্রকে পাথেয় করে তিনি শুরু করে দিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সলতে পাকানোর কাজ। নিবেদিতা যথার্থই ভেবেছিলেন, সশস্ত্র লড়াই ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা অধরা থেকে যাবে। তাঁর গুরুর মধ্যে পৌরুষের যে উজ্জ্বল প্রকাশ তিনি দেখেছিলেন, সেটাই দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে তিনি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। স্বামীজি মনে করতেন, কাপুরুষতা আসলে ‘মৃতের সাত্ত্বিকতা।’ অত্যন্ত গোপনে বিপ্লববাদের মশাল জ্বালিয়ে তুলেছিলেন নিবেদিতা।  একটা কথা মনে রাখা দরকার, বাংলায় স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন বঙ্গভঙ্গের আগে ততটা প্রজ্জ্বলিত হয়নি। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর তা যেন দপ করে জ্বলে ওঠে। এই জ্বলে ওঠার পিছনে নিবেদিতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০০৪ সালে নিবেদিতা বুঝেছিলেন, আমাদের দেশাত্মবোধের অনুভবকে একসূত্রে বাঁধার জন্য প্রয়োজন, একটি জাতীয় পতাকার। তিনিই প্রথম ভারতের জাতীয় পতাকার রূপদান করেছিলেন। লাল চতুষ্কোণবিশিষ্ট এই পতাকার কেন্দ্রে হলুদ রঙের মধ্যে ছিল বজ্র ও শ্বেতপদ্ম। পতাকার মধ্যে বাংলায় লেখা ছিল ‘বন্দেমাতরম’। এখানে লাল ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক, হলুদ ছিল বিজয়ের এবং শ্বেতপদ্ম পবিত্রতার প্রতীক। ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম বলেন, বিপ্লবীদের মন্ত্র হোক ‘বন্দেমাতরম’। অনেকেই জানেন না, ১৯০২ সালে হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিসে বোমা বানানো শিখতে পাঠানো, অরবিন্দ ঘোষকে বিপ্লবের মূল স্রোতে আনা, বারীন ঘোষ, কানাইলাল দত্তদের বিপ্লবমন্ত্রে উজ্জীবিত করার পিছনে তিনি এক অনন্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। মুরারিপুকুর বোমা মামলায় একে একে গ্রেপ্তারির পর নিবেদিতার গ্রেপ্তারির সম্ভাবনাও প্রবল হয়ে ওঠে। তখন তিনি ছদ্মনাম এবং বেশ ধারণ করে ভারত ত্যাগ করেন। বুঝেছিলেন, ধরা পড়ে গেলে অনেক কাজ থমকে  যাবে, তাই রণকৌশল হিসাবে আত্মগোপন করার একটা মহৎ অর্থ আছে। তবে গ্রেপ্তারিকেও যে তিনি ভয় পাননি, সেটা তাঁর বহু চিঠিতেই তিনি উল্লেখ করেছেন। মিস ম্যাকলাউডকে লেখা কয়েকটি চিঠিতে এসবের উল্লেখ আমরা পাই। নিবেদিতার লেখা এইসব চিঠিপত্রকে খুব ভয় পেত ইংরেজ বাহাদুর। সেই সময় গোপনে ইংরেজ সরকার তাঁর প্রেরিত সবক’টি চিঠিপত্র খুলে পড়ত। 
এমনকী ইংরেজ সরকার তাঁর পিছনে এক ফেউ লাগিয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন ইঙ্গবঙ্গ সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী মহিলা ছিলেন কর্নেলিয়া সোরাবজি। তাঁকে ‘চর’ হিসাবে পাঠানো হয় নিবেদিতার কাছে। তিনি নিবেদিতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য চারপাশে ঘুরঘুর করতেন। কিন্তু ব্যাপারটা বুঝতে নিবেদিতার এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। মিস ম্যাকলাউডকে চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমার সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্রূর শত্রু কে জানো— তোমার বান্ধবী কর্নেলিয়া। সে একেবারে গোয়েন্দা বিভাগের চর।’  
স্বামীজির মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পরই নিবেদিতা বুঝেছিলেন, তাঁর স্বদেশি কাজ বেলুড় মঠকে বিপাকে ফেলতে পারে। তিনি চাননি, তাঁর কাজের জন্য বেলুড় মঠ ইংরেজ শাসকদের বিষ নজরে আসুক। তাই তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে নিজেকে মঠ ও মিশনের সংস্পর্শ থেকে সরিয়ে নেন।
তাঁকে দেখেই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘ভারতমাতা’ আঁকার প্রেরণা পান। নিবেদিতার পরামর্শেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বদলে ফেলেছিলেন তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসের প্লট। স্যার জগদীশচন্দ্র বসুকে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ গড়ে তোলার জন্য তিনি নীরবে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। ভারতে তিনি কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র ১৩ বছর। তার মধ্যেই তিনি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন নিজের দীপ্তি। এক নতুন মহিমায় ভারতকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন।  
১৯০৭ সালে মিস ম্যাকলাউডকে ফের একটা চিঠিতে নিবেদিতা লেখেন, ‘ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর অবিরাম আক্রমণ চলছেই— জঘন্য থেকে জঘন্যতর—নৈরাশ্য ক্রমবর্ধমান।’ আরও লিখলেন, ‘‘স্বামীজির সুমহান কথাগুলি মনে পড়ে? ‘যতদিন না তাদের কাল ঘনাচ্ছে! কিন্তু যখন ধ্বনিত হয় কালের ঘণ্টাধ্বনি—তখন স্মৃতিভ্রংশ হয় মানুষের। হাত থেকে লাগাম খসে পড়ে। বুদ্ধিদাতাদের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে যায়। নেমে আসে বিনাশ।’ হ্যাঁ ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে— তার প্রথম শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’’ নিবেদিতা বুঝেছিলেন, ভারতে বিপ্লবের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে হৃতবল হবে ইংরেজ শাসকরা। পতন অনিবার্য। এটাই ধর্মের কল। সেই শাশ্বত বাণী পড়তে পড়তে কেমন যেন বর্তমান কালের সঙ্গে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আজকের এই দমবন্ধ করা ধর্মীয় উন্মাদনার অন্ধকূপে বসে আমরাও অপেক্ষা করি স্বামীজি কথিত সেই ঘণ্টাধ্বনির। কালের নিয়মে বারবার হস্তচ্যূত হয় শাসকের লাগাম। ঔদ্ধত্যের একটা সীমা থাকে, কিন্তু ভালোবাসা অনন্ত। সেই অনন্ত ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে লোকমাতা নিবেদিতা জীবিত থাকবেন শতশত বর্ষ ধরে।

7th     February,   2024
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ