বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

ডেভিলস অ্যাডভোকেট
মৃণালকান্তি দাস 

ফ্যাসিবাদের ভয়াবহতায় কিশোর বয়সে ইহুদি উদ্বাস্তু হিসেবে জার্মানি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন আমেরিকায়। হেইঞ্জ আলফ্রেড কিসিঞ্জার। নাম বদলে হয়েছিলেন হেনরি। 
হার্ভার্ডে পড়ার সময় এফবিআইয়ের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত ছিলেন গোয়েন্দাগিরিতে। আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্র ও বিদেশনীতি নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘নিউক্লিয়ার উইপনস অ্যান্ড ফরেন পলিসি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। এই বইয়ে তিনি আমেরিকার জয় নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতেও পরামর্শ দিয়েছিলেন। সমালোচকরা তাঁর নাম দিয়েছিলেন, ‘ড. হেনরি কিলিঞ্জার’। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সনের ‘ডান হাত’ হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে মার্কিন কূটনীতির হাল ধরেছিলেন। আবার চীনের উত্থান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির এই যুগে নানা ক্ষেত্রে ভূমিকা— সবকিছু মিলিয়ে তাঁর শতবর্ষী জীবন নিয়ে বুঁদ হয়ে রয়েছেন অনেকেই। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন, ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে কূটনীতি যদি একটি শিল্প হয়ে ওঠে, তাহলে হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন কূটনীতির একজন শিল্পী।’
তবে পশ্চিম দুনিয়ার বাইরে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই কিসিঞ্জারের এই জীবন বিতর্কিত। তাঁদের চোখে, মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ‘কুখ্যাত’ যুদ্ধাপরাধী তিনিই। স্নায়ুযুদ্ধের সময় নিষ্ঠুর ও নির্দয়ের মতো অবস্থান নিয়েছিলেন কিসিঞ্জার। ইন্দোনেশিয়ার একনায়ক সুহার্তোর নেতৃত্বে পূর্ব তিমুরে, চিলিতে, কম্বোডিয়ায় নির্দয় ও নির্বিচার বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা এবং খেমারুজের গণহত্যার পিছনে পরোক্ষভাবে কিসিঞ্জারের সমর্থন ছিল। তিনি আমেরিকার বিদেশ নীতির মহীরুহ হতে পারেন, কিন্তু তাঁর হাতে লেগে রয়েছে নিহত লাখো মানুষের রক্তের দাগ। যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ তিন বছর আগেই বন্ধ করা যেত, কিন্তু রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য তা তিনি জিইয়ে রেখেছিলেন। তারই জন্য ১৯৭৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। দুনিয়াজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছিল। সমালোচনা ও বিক্ষোভের ভয়ে তিনি পুরস্কার নিতেই যাননি। মার্কিন নথি বলছে, কিসিঞ্জার কোথায় কতগুলি বোমা পাঠাতে হবে, কোথায় কতগুলি বোমা ফেলতে হবে, তা ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন। এই বোমাবাজি তাঁকে নেশার মতো পেয়ে বসেছিল।
কিসিঞ্জার বরাবর নিজের ভূমিকা জাতীয় স্বার্থের নিরিখে বিচারের কথা বলেছেন। মার্কিন অনুসৃত নীতির কারণে বহু মৃত্যু ও ধ্বংস হয়েছে, এ কথা তিনি স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁর যুক্তি হল, ‘জন্ম মানেই মৃত্যু, জীবন মানেই যন্ত্রণা।’ তাঁর ভাষায়, এই কূটনীতি ‘রিয়েল পলিটিক’। যার মূল কথা, যেকোনও মূল্যে বিজয় অর্জন করতে হবে। সোজা কথায়, হোক ধ্বংস, হোক মানবাধিকারের লঙ্ঘন, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভালো-মন্দের বাছবিচার অবান্তর। ঠিক এই যুক্তিতেই তিনি উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বকে কাবু করার জন্য চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে রেলযোগাযোগ-ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
নিজের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে কিসিঞ্জার কত দূর যেতে প্রস্তুত ছিলেন, তার এক বড় উদাহরণ বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু হয়েছিল, এ তথ্য কিসিঞ্জারের অজানা ছিল না। তখন তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সবচেয়ে কাছের লোক। তখন উইলিয়াম রজার্স বিদেশসচিব হলেও কিসিঞ্জারই ছিলেন নিক্সনের মন্ত্রণাদাতা। পাকিস্তানের গণহত্যার নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আমাকে শয়তানের পক্ষে ওকালতি (ডেভিলস অ্যাডভোকেট) করতে দাও।’ গোটা কর্মজীবনে তাই-ই করেছেন!
১৯৭১-এর ২৮ মার্চ ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড এক টেলিগ্রামে হোয়াইট হাউসকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ‘ভীতির রাজত্ব’ কায়েম হয়েছে বলে যে সতর্কবার্তা পাঠান, পরদিন সকালেই সে তথ্য কিসিঞ্জারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। একদিন পর দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিটিং ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ এই শিরোনামে এক টেলিগ্রামে অনুরোধ করেন, ‘নীতির ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ধারণের এখনই সময়’। কিন্তু ঢাকা থেকে সামরিক অভিযানের খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বদলে খুশিই হয়েছিলেন কিসিঞ্জার। ২৯ মার্চ নিক্সনকে জানান, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা এখন ইয়াহিয়ার নিয়ন্ত্রণে।’ সে কথা শুনে নিক্সনের জবাব ছিল, ‘চমৎকার। মাঝেমধ্যে শক্তির ব্যবহার কাজে লাগে।’ এক সপ্তাহ পর, ৬ এপ্রিল, ঢাকা থেকে ২১ জন মার্কিন কূটনীতিক বাংলাদেশে গণহত্যায় মার্কিন নীরবতায় তাঁদের ‘ভিন্নমত’ জানিয়ে টেলিগ্রামে কড়া বার্তা পাঠান। স্বাক্ষরকারীদের একজন ছিলেন আর্চার ব্লাড। কিন্তু ১৩ মার্চ নিক্সনের কাছে এক মেমোতে কিসিঞ্জার পরামর্শ দেন, ‘এখন এমন কিছুই আমরা করব না, যা ইয়াহিয়ার পক্ষে অস্বস্তিকর। পাকিস্তানের ঐক্যের স্বার্থে আমাদের উচিত ইয়াহিয়ার সঙ্গে থাকা।’ 
আসলে আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষেই থাকবে, বাঙালিদের নয়— নিক্সন ও কিসিঞ্জার এই সিদ্ধান্ত এক বছর আগেই নিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৭০ সালের ২৫ অক্টোবর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ইয়াহিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি এক বৈঠকে সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা নেন। নিক্সন তাঁকে জানিয়েছিলেন, ‘আপনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’ জবাবে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘আপনাদের বন্ধুত্বের জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। কথা দিচ্ছি, এমন কিছুই করব না, যাতে আপনারা বিব্রত হন।’
স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভিতরেই কিসিঞ্জারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল। পাত্তা দেননি কিসিঞ্জার। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তাঁর যুক্তি ছিল, এর ফলে ভারতকে সাহায্য করা হবে। সেই কথার সমালোচনা শুরু হলে কিসিঞ্জার নতুন পথ ধরেছিলেন। বলেছিলেন, এই নীতি আমার নয়, প্রেসিডেন্টের। পাকিস্তান, বিশেষত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার জন্য নিক্সনের ‘কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে’। পাকিস্তানের প্রতি কেন এই দুর্বলতা, পাকিস্তানের সামরিক শাসকের সঙ্গে কী বিশেষ সম্পর্ক— সে কথা তখনও অনেকের অজানা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি জানা গেল, পাকিস্তানের সামরিক শাসকের মধ্যস্থতায় চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চলছে। নিজের স্মৃতিকথায় কিসিঞ্জার যুক্তি দেখিয়েছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর সেই সম্পর্ক স্থাপনে ‘একমাত্র’ সূত্র ছিল পাকিস্তানের ইয়াহিয়া। কথাটা মিথ্যে। 
সেই সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্তা ছিলেন ক্রিস্টোফার ভ্যান হল্যান। পরে এক দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি প্রমাণ করেছেন, শুধু ইয়াহিয়া নয়, রোমানিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান চশেস্কু, ইরানের শাহ ও পোল্যান্ডের মাধ্যমে সেই যোগাযোগের সুযোগ ছিল। বস্তুত ইয়াহিয়ার আগে চশেস্কুর মাধ্যমে চীনা নেতাদের সম্মতিসূচক চিঠি এসে পৌঁছেছিল। ভ্যান হল্যান লিখেছেন, কিসিঞ্জার পিকিং ঘুরে এসেছেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে— এই ঘোষণার পর স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্তারা ভেবেছিলেন, পাকিস্তানের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এবার হয়তো আমেরিকা পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার ব্যাপারে নীতি বদলাবে। কিসিঞ্জার তাতেও আপত্তি করেন। এবার তাঁর যুক্তি হল, ভারত শুধু পূর্ব পাকিস্তানের বিভক্তি নয়, পাকিস্তান আক্রমণ করে দেশটি দখল করতে চায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে এতে ইন্ধন জোগাচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভ্যান হল্যান জানাচ্ছেন, সিআইএ এবং অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কেউই এই তথ্য দেয়নি। ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখলে উদ্যত, এমন কথাও কোনও পক্ষ থেকেই বলা হয়নি। সবটাই কিসিঞ্জারের মনগড়া। অথচ, দিনের পর দিন এমন মনগড়া তথ্য প্রচার করে ভারতের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বারবার ‘বিচ’ এবং ভারতীয়দের ‘বাস্টার্ড’ ও ‘সান অব বিচ’ বলতেও ছাড়েননি।
বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে দীর্ঘ সময় পাকিস্তানি সেনারা টিকে থাকতে পারবে না, এ কথা কিসিঞ্জার ও নিক্সনের অজ্ঞাত ছিল না। শেষ চেষ্টা হিসেবে তাঁরা বঙ্গোপসাগরে ভারত-বাংলাদেশ নৌসীমানায় পারমাণবিক অস্ত্র সজ্জিত সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তই কাজে আসেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইয়াহিয়া-কিসিঞ্জার-নিক্সন ঠেকাতে পারেননি। কিসিঞ্জার পরে তাঁর ‘হোয়াইট হাউস ইয়ার্স’ গ্রন্থে সাফাই গেয়েছেন, তাঁর জন্যই (পশ্চিম) পাকিস্তানকে বাঁচানো গিয়েছে। বাংলাদেশের গণহত্যায় তিনি বাধা দেননি, কিন্তু ‘সবই করতে হয়েছিল পাকিস্তানকে বাঁচানো জন্য’।
ইতিহাস কীভাবে এই শতবর্ষী কূটনীতিককে মনে রাখবে? বিশ শতকের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার জো নেই। আগ্রাসী মার্কিন বিদেশনীতির তিনিই প্রণেতা। ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিলি—বিগত শতকের প্রতিটি ঘটনায় তাঁর হাতে রক্তের দাগ লেগে রয়েছে। নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ লিখেছেন, আজ প্যালেস্তিনীয়দের যে দুর্দশা, তার প্রধান নকশাকার ছিলেন এই কিসিঞ্জার। মূলত তাঁর পরিকল্পনাতেই ইজরায়েলকে আমেরিকা অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থের নামে যে ‘রিয়েল পলিটিক’ তিনি প্রস্তাব করেন, তার কারণে শুধু লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানিই ঘটেনি, বিশ্বের মানুষের কাছে আমেরিকা নিন্দিত হয়েছে। বিশ ও একুশ শতকে আমেরিকার ইতিহাস যে তার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ইতিহাস, তার রূপকার কিসিঞ্জার-ই। বাঙালি সেই প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জারকে মনে রাখবে খুনে ইয়াহিয়ার দোসর হিসেবেই। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ক্রিস্টোফার হিচেন্স যাঁকে বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার পর্নোগ্রাফির এক প্রতীক।’

7th     December,   2023
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ