বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

অনুব্রত বাদ যাওয়ায় কেন এত গাত্রদাহ?
তন্ময় মল্লিক

উত্তরাখণ্ডে মাত্র চার মাসে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী বদল করেছিল বিজেপি। নির্বাচনের আগে ত্রিপুরায়, এমনকী গুজরাতেও মুখ্যমন্ত্রীকে পাল্টে দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী বদলে ক্ষোভ এবং ব্যর্থতা ঢাকাই ছিল গেরুয়া শিবিরের কৌশল। সেই বিজেপিই চিৎকার জুড়ে দিয়েছে বীরভূম জেলা সভাপতির পদ থেকে অনুব্রত মণ্ডলকে সরানোয়। বাদ নেই কংগ্রেস, সিপিএমও। কেউ বলছে, ‘কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরলেই পাজি’। কেউবা আবার বলছে, ‘অনুব্রতকে তৃণমূল ঝেড়ে ফেলতে চাইছে’। অথচ এতদিন তারাই জেলবন্দি অনুব্রতকে সভাপতি রাখার সমালোচনা করছিল। এই সিদ্ধান্তে তাদের খুশি হওয়ারই কথা। কিন্তু হচ্ছে গাত্রদাহ। কারণ আর কিছুই নয়। তৃণমূলের পদক্ষেপে বিরোধীদের একের পর এক রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে যাচ্ছে ভোঁতা। তাতেই দিনদিন সঙ্কুচিত হচ্ছে বাংলায় বিরোধী রাজনীতির পরিসর।
তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদল যে চব্বিশের নির্বাচনকে সামনে রেখে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ভোট শুধু বিজেপির কাছে নয়, তৃণমূলের জন্যও চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় এজেন্সির তোলা অভিযোগ সত্যি না মিথ্যে, তা প্রমাণ হবে আদালতে। কিন্তু তার আগে জনতার আদালতে প্রমাণ হবে, এই সমস্ত অভিযোগ তাদের মনে ছাপ ফেলতে পেরেছে কি না! লোকসভা নির্বাচনে হবে তারই অ্যাসিড টেস্ট। সেই কারণেই অমিত শাহ বঙ্গ বিজেপিকে গতবারের দ্বিগুণ আসনের টার্গেট দিয়েছেন। আর তৃণমূলের লক্ষ্য, বিজেপিকে এক অঙ্কের ঘরে আটকে রাখা। 
রাজ্যের শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব গবেষণার বিষয় হতেই পারে। কারণ অঞ্চল থেকে ব্লক, ব্লক থেকে জেলা পর্যন্ত রয়েছে প্রচুর গোষ্ঠী। তার বিন্যাসও অদ্ভুত। অধিকাংশ বিধায়কের সঙ্গে ব্লক সভাপতির সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায়। আবার বিধায়কদের সঙ্গে সাংসদেরও তেমন বনিবনা নেই।  বছরভর লড়াই লেগেই থাকে। কিন্তু নির্বাচন এলে সবাই এক। ব্যতিক্রম পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোট। সেখানে প্রাধান্য পায় ব্যক্তিস্বার্থ। তবে, অনেক জায়গায় লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে নিজের এলাকা থেকে লিড দেওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু বঙ্গ বিজেপিতে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। 
লোকসভা ভোট যত এগিয়ে আসছে, বিজেপিতে কোন্দল ততই বাড়ছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক অনুপম হাজরা একাই কাঁপিয়ে দিচ্ছেন। দলের রাজ্য সভাপতি দু’চারদিনের মধ্যেই ব্যবস্থা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অবস্থাও বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতো। মুখে আছে, বাস্তবে নেই। তাতে অনুপমবাবু আরও আক্রমণাত্মক হচ্ছেন। দলের দুর্নীতির প্রশ্নে এসপার-ওসপার করতে চাইছেন। তাঁর নবতম সংযোজন, পশ্চিমবঙ্গের কোণঠাসা বিজেপি কর্মীদের মনের জানালা উন্মুক্ত করার জন্য খোলা হবে ফেসবুক পেজ। সেখানেই কর্মী-সমর্থকরা উগরে দেবেন মনের জ্বালা-যন্ত্রণা। এসব দেখে অনেকের মনেই জেগেছে প্রশ্ন, এবার কি তাহলে প্যান্ডোরা বাক্স উন্মুক্ত হতে চলেছে?
বঙ্গ বিজেপিতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দিল্লি বিজেপি ফিরেও তাকাচ্ছে না। আর তাকাবেই-বা কী করে? পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে নেতাদের রাতের ঘুম ছুটেছে। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের হাওয়া খুব একটা সুবিধের নয়। সেখানে ভালো ফল না হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির হ্যাটট্রিকের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। তাই বাংলাকে নিয়ে ভাবার এখন সময় নেই। কারণ তাঁদের হিসেবে বাংলা ‘খরচের খাতায়’। এখনও নির্বাচনের মাস তিনেক দেরি। তার আগে আটটি সাংগঠনিক জেলার নেতৃত্ব বদল করেছে তৃণমূল। দু’টি পদে পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে শারীরিক কারণ, বাকিগুলিতে স্রেফ অঙ্ক। এর মধ্যে পুরনোদের গুরুত্ব দেওয়া বা নতুনকে অগ্রাধিকারের কোনও সূত্র কাজ করেনি। লক্ষ্য, লোকসভায় দলের আসন বৃদ্ধি। 
সিবিআই গ্রেপ্তার করার পরেও অনুব্রতকে সভাপতি পদ থেকে সরায়নি তৃণমূল। অনুব্রত সব ফাঁস করে দেবে, সেই ভয়ে সভাপতি রাখা হয়েছে। বিরোধীদের এহেন কটাক্ষ সত্ত্বেও তৃণমূল কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। কোর কমিটিকে দিয়ে পঞ্চায়েত ভোট করিয়েছে। ভোটের ফল দেখে শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝে গিয়েছে, এখনও ভোট হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই। তাঁকে ছুঁতে পারেনি অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর। সেই কারণে জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি এবং অধিকাংশ পঞ্চায়েতেই জয় হাসিল করেছে শাসক দল। এই পরিস্থিতিতে রামপুরহাটের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাথায় রেখে লোকসভা ভোট করাতে চাইছে তৃণমূল। 
আশিসবাবু শুধু দলের কর্মী-সমর্থকদের কাছেই নয়, বীরভূমের সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য মুখ। অধ্যাপনার সুবাদে গড়ে ওঠা তাঁর ‘স্যার’ ইমেজ তাঁকে একের পর নির্বাচনে উতরে দিয়েছে। সেই আশিসবাবুকে মাথায় রেখে ভোট করতে চাইছে। তাতে শাসক দল মনে করছে, এক ঢিলে দু’টি পাখি মরবে। এক, বিরোধী শিবিরের ‘অনুব্রত অস্ত্র’ ভোঁতা হবে। দুই, কাউকে জেলা সভাপতি না করায় অনুব্রত অনুগামীরা খুশি হবেন। ফলে নির্বাচনে তাঁদেরও পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাবে।
বীরভূমের দু’টি আসনের মধ্যে রামপুরহাট আসনটি শতাব্দী রায় জেতেন তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মা ও কাজের জোরে। তিনি সেলিব্রিটি সাংসদ। কিন্তু কাজের ও জনসংযোগের নিরিখে যে কোনও সাংসদের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন। তবে অনুব্রত চাইতেন, শতাব্দী রায় সাংসদ হবেন তাঁরই তৈরি করা সংগঠনের উপর ভর করে। সেটা আবার নাপসন্দ ছিল শতাব্দীর। কিন্তু সংঘাতে জড়াতেন না সাংসদ। তিনি কেবল রামপুরহাট লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতেন। এখন তিনি তাঁর সাংসদ এলাকার বাইরেও দলীয় কর্মসূচিতে যাচ্ছেন। তাতে বীরভূম জেলায় অনুব্রত জমানার চেয়েও তৃণমূলের ফল ভালো হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এই পরিবর্তনে অনুব্রত ছাড়া আর যাঁর নাম নিয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে তিনি হলেন মহুয়া মৈত্র। কৃষ্ণনগরের সাংসদকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। বরং বলা ভালো, রাজনীতিতে পা দেওয়া থেকে এখনও পর্যন্ত বিতর্কই তাঁর ছায়াসঙ্গী। আর পাঁচজন রাজনীতিকের মতো বাঁধাধরা ছন্দে চলতে তিনি একেবারেই অভ্যস্ত নন। তারজন্য দলেরই বহু নেতা তাঁকে পছন্দও করেন না। এড়িয়ে চলেন। তাঁর লোকসভার অন্তর্গত অধিকাংশ দলীয় বিধায়কদের সঙ্গেও সম্পর্ক তেমন মধুর নয়। আর এখন তো তাঁকে নিয়ে বিতর্ক আকাশ ছুঁয়েছে। লোকসভার এথিক্স কমিটি তাঁর সাংসদ পদ খারিজের সুপারিশ করেছে। তারপরেও তাঁকে নতুন করে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়েছে তৃণমূল। কিন্তু কেন?
এর একটা সহজ ব্যাখ্যা, বিজেপি সহ সমস্ত রাজনৈতিক দলকে বুঝিয়ে দেওয়া, তৃণমূল তাঁর পাশে আছে। বিজেপির অভিযোগ মিথ্যে। কিন্তু এর আরও একটা কারণ আছে। সেটা কৃষ্ণনগর লোকসভা আসনটা তৃণমূলের জন্য নিশ্চিত করা। তাঁর অতি বড় নিন্দুকও স্বীকার করেন, মহুয়া মৈত্র ভোটটা করাতে জানেন। নির্বাচনে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কী করে জয় হাসিল করতে হয়, সেটা তিনি ভালোই বোঝেন।
কর্পোরেট স্টাইলে ভোট পরিচালনার বিষয়টা বাংলা প্রথম দেখেছিল প্রশান্ত কিশোরের সৌজন্যে। একুশের নির্বাচনে তৃণমূলের দায়িত্ব নিয়ে তিনি বলে বলে অঙ্ক মিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মহুয়া মৈত্র এই কাজটা শুরু করেছিলেন তার পাঁচ বছর আগেই। ২০১৬ সালে করিমপুরে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি নদীয়া জেলার তৃণমূল নেতাদের পাত্তা দেননি। নিজের টিমকে দিয়ে ভোট করিয়েছিলেন। তাতে প্রয়াত গৌরীশঙ্কর দত্ত সহ তৃণমূলের অনেকেরই গোঁসা হয়েছিল। কেউ কেউ রাজ্য নেতৃত্বের কাছে করিমপুরে তৃণমূল হারবে বলে রিপোর্টও দিয়েছিলেন। কিন্তু জিতেছিলেন মহুয়া। 
২০১৯ সালে লোকসভায় প্রার্থী করার পরেও একই ঘটনা ঘটেছিল। নিজের টিম দিয়ে ভোট পরিচালনা করিয়েছিলেন মহুয়া। সেই সময় অনুব্রত মণ্ডলকে নদীয়ার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহুয়া তাঁকেও আমল দেননি। তারজন্য অনুব্রত শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে ‘কর্মীরা অসন্তুষ্ট’ বলে নালিশ ঠুকেছিলেন। কিন্তু রাজ্য হস্তক্ষেপ করেনি। পাশের লোকসভা রানাঘাটে বিজেপি জিতলেও কৃষ্ণনগরে জিতেছিলেন সেই মহুয়াই। কারণ মহুয়া জানেন, ভোটাররা কথায় নয়, সন্তুষ্ট হয় কাজে। তাই প্রবল বিতর্কের মধ্যেও মহুয়াকেই সংগঠনের মাথায় বসিয়েছেন মমতা। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালো করেই জানেন, গোটা দেশে বিজেপি বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট হলেও বাংলায় তাঁকে লড়তে হবে একাই। বিজেপিকে শায়েস্তা নয়, সহযোগিতা করাই বাংলায় ‘টিম ইন্ডিয়া’র শরিক সদস্যদের লক্ষ্য। তাই বঙ্গ বিজেপি যখন নালিশে এবং একে অপরকে ‘পালিসে’ ব্যস্ত তখন তৃণমূল মন দিয়েছে ঘর গোছানোয়।

18th     November,   2023
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ