বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

রেউড়ি বিরোধিতা এবং অন্য ভারত
সমৃদ্ধ দত্ত

অনিল কুমার ইলেকট্রিসিয়ান। একটি ইলেকট্রিসিটি সরঞ্জাম দোকানের কর্মী। বেতন সাড়ে ৮ হাজার টাকা। গোয়ালিয়রের ডিডি নগরের বাসিন্দা। সাইকেলের পিছনে বাঁধা একটি গ্যাস সিলিন্ডার। স্টেশন রোডে নতুন সিলিন্ডার নিতে এসেছে। স্বামী ও তার স্ত্রী সুমি মিলে সেই সিলিন্ডার সাইকেল থেকে নামিয়ে নতুন সিলিন্ডার নেওয়ার পর জানায়, লাডলি বহেনা স্কিমের ১ হাজার টাকা এই সিলিন্ডারের জন্য যায়। এবছর মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার এই প্রকল্প চালু করেছে। লাডলি বহেনা। মহিলাদের ব্যাঙ্কে ১ হাজার টাকা করে ট্র্যান্সফার করা। এই স্কিম চালুর আগে কী করত তারা? সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা প্রায় ১৭ মাস ধরে বন্ধ ছিল। কেরোসিন কিনে কিনে কোনওমতে স্টোভে রান্না করত। আর এক একবেলা চুলা জ্বালিয়ে। গোয়ালিয়রে কাঠ পাবে কোথায়। তাই সুমি সকালে বেরিয়ে যেত শহরে কাঠ কুড়াতে। কোনও এক জঙ্গল সংলগ্ন জনপদে যেভাবে আদিবাসী মহিলারা কাঠ জোগাড় করে অরণ্যের আশপাশে ঘুরে (এখন ইচ্ছা করলেই যখন তখন জঙ্গলে ঢোকা যায় না) সেরকমই দৃশ্য ঩দেখা যায় গোয়ালিয়রের মতো শহরে। সিলিন্ডার কেনার ক্ষমতা নেই। সাড়ে ৮ হাজার টাকায় সংসার চালানো কঠিন। ২৫০০ টাকা ছিল আগে। এখন মুদিখানার জিনিস কিনতে সাড়ে তিন হাজার, এমনকী চার হাজার টাকাও কখনও কখনও লেগে যায়। এত দাম বেড়ে চলেছে চাল, ডাল, তেল, মশলার। তাও তো মাংস, ডিম খাওয়াই হয় না। অনিল কুমারের পছন্দ পনির। সেই সুযোগ খুব কম পাওয়া যায়। পনিরের দাম বেড়ে গিয়েছে। ১৭ মাস পর একটু আনন্দ হয়েছে। কারণওই লাডলি বহেনা স্কিমে ১ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। অনিল কুমার ও সুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে সতর্ক হয়ে বলেছে, এবার কংগ্রেসকে ভোট দেবে। কারণ, কংগ্রেস বলেছে ৫০০ টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার দেবে আর ১৫০০ টাকা মাসে মহিলাদের। অনিল কুমার ও সুমি আজ কাকে ভোট দেবে? তাদের কি মতবদল হয়েছে? কারণ, ভোটের আগে মধ্যপ্রদেশ সরকার লাডলি বহেনা স্কিমের টাকা বাড়িয়ে ১২৫০ করেছে। আর সেখানেই শেষ নয়। বিজেপি শেষ মুহূর্তে বলেছে, আবার ক্ষমতায় এলে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। কী করবেন আজ অনিল কুমাররা? 
মধ্যপ্রদেশে এখন কোন সরকার চলছে? বিজেপির। বিজেপি নামক দলের চালিকাশক্তি কে? নরেন্দ্র মোদি। ২০২২ সাল থেকে তিনি ঠিক কী বলতে শুরু করেছিলেন? রেউড়ি বন্ধ করো? রেউড়ি কাকে বলে? রাজস্থানের একটি বিশেষ মিঠাই। যা সাধারণত উপহার হিসেবে একে অন্যকে দেওয়া হয়। সোজা কথায় একে অন্যকে খুশি করার উপহারে সচরাচর হাতে ওই মিঠাই নিয়ে যাওয়া দীর্ঘকালীন পুরনো রীতি। রেউড়ি কালচার কাকে বলে? এই যেসব সরকার জনতাকে নানারকম উপহার, আর্থিক সাহায্য, সরাসরি টাকা দেয় প্রতি মাসে অথবা বছরে, ভোগ্য পণ্য উপহার দেওয়া হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। 
বিরোধী দলগুলিকে মোদি প্রচণ্ড সমালোচনা এবং ব্যঙ্গ করেন রেউড়ি নিয়ে। তাঁর অভিযোগ, এসব উপহারের রাজনীতি করে বিরোধীরা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। মোদির ওই কথায় অত্যন্ত খুশি হয়েছে শহুরে নিশ্চিত রোজগারের আওতায় থাকা চাকরি অথবা ব্যবসা 
করা নাগরিক ভোটাররা। তারা বলেও থাকে যে, 
মোদি ঠিক বলেছেন। এসব করে মানুষকে উপকার করা যায় না। মানুষকে কীভাবে উপকার করা যায় তাহলে? তারা বলেছে কাজের সুযোগ দিয়ে। খুব সঙ্গত কথা। কিন্তু যাঁর কথায় তাদের এই বোধোদয় সেই তিনি ১০ বছরে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলেন না কেন? তাঁর নিজের দল রাজ্যে রাজ্যে কেন রেউড়ি কালচারকে আপন করে নিচ্ছে? তিনি নিজে কেন গত সোমবার ঘোষণা করলেন যে, বিনামূল্যের রেশন গরিবদের জন্য আরও ৫ বছরের জন্য সম্প্রসারিত করা হল? ২০২৩ সালেও এরকম উজ্জ্বল অমৃতকালে বিনামূল্যে ৯০ কোটি মানুষকে রেশন দিতে হচ্ছে কেন? কেন বন্ধ করে দিতে পারছেন না তিনি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর কী? 
ডিএমকে কেন ফ্রি মিক্সার গ্রাইন্ডার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে? কর্ণাটকের কংগ্রেস কেন ২ হাজার টাকা করে মহিলাদের প্রতি মাসে দেওয়ার গৃহলক্ষ্মী স্কিম চালু করেছে? এই অভিযোগ তুলে মোদি তীব্র আক্রমণ করেছেন। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে তাঁর বিরোধীরা ভিক্ষা দিয়ে মানুষকে কিনে নেওয়ার রাজনীতি হিসেবে তকমা দিয়েছিল। রেউড়ি কালচারের মধ্যেই গণ্য করা হয়েছিল। এখন আর বিরোধীরা বিরোধিতা করে না। বরং সেগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাজ্যে রাজ্যে চালু অথবা ঘোষণা করতে হচ্ছে কেন?  অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লিতে মহিলাদের বাসে যাতায়াত ফ্রি করে দিয়েছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ফ্রি বিদ্যুৎ করেছেন। কেজরিওয়াল সবেমাত্র এসেছেন রাজনীতিতে। তাঁকে কেন অনুকরণ করছে কংগ্রেস কিংবা বিজেপি? কেন রাজ্যে রাজ্যে এই একই স্কিম চালু করতে হচ্ছে? রাখীবন্ধনের দিন বোনেদের ২৫০ টাকা করে দেওয়ার নতুন প্রকল্প নিয়েছে কেন মধ্যপ্রদেশ সরকার? মোদিজি প্রতিবাদ করেছেন? শ্রাবণ মাসে গ্যাস সিলিন্ডার ৪৫০ টাকা করে দেওয়া হবে। এই ঘোষণার নাম কী? রেউড়ি কালচার নয়? 
পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। গত তিনমাসে একবারও নরেন্দ্র মোদিকে রেউড়ি কালচার দিয়ে কোনও ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে শোনা গেল না কেন? নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে, নিজের ঘোষণা আর শ্লেষাত্মক আক্রমণ হজম করে তাঁকেই দেখা গেল মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, তেলেঙ্গানায় একের পর এক রেউড়ি ঘোষণার দলীয় সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে সেই প্রচারই করতে হচ্ছে। উজ্জ্বলা প্রকল্পে রান্নার গ্যাসের দাম দুই দফায় ৪০০ টাকা কমিয়ে আনতে বাধ্য হলেন তিনি। কৃষকদের অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর ঘোষণা করতে হয়েছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট সিটি, স্টার্ট আপের মতো প্রকল্পের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রকল্প রয়েছে মেরা মাটি মেরা দেশ। কিন্তু রহস্য হল, প্রধানমন্ত্রী সত্যিকারের মেরা মাটি মেরা দেশকে ভুলে গেলেন কেন? 
নরেন্দ্র মোদি গত শতকের সাতের দশক থেকে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছেন। সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে আরএসএসের হয়ে কাজ করেছেন। গোটা দেশ পরিভ্রমণ করেছেন। ভোজনং যত্র তত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে বলতে যা বোঝায়, সেই জীবন তিনি পালন করেছেন। সুতরাং বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিকদের মধ্যে যাঁরা হাতের তালুর মতো ভারতকে চেনেন, দেখেছেন, বুঝেছেন, তিনি তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। অথচ মোদি মাত্র ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে বসার পরই এই অন্য ভারতকে ভুলে গেলেন কীভাবে? অনিল কুমার আর সুমি যে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় সংসার চালায় কীভাবে, সেটা তো রাহুল গান্ধীর নয়, মোদিরই সবথেকে বেশি জানার কথা। জানেনও নিশ্চয়। ফ্রি রেশন না পেলে যে কোটি কোটি মানুষ একবেলা খেয়ে থাকতে বাধ্য হবে, এটা জানেন বলেই তো রেশন স্কিম আরও ৫ বছর বাড়িয়ে দিলেন। তাহলে আম জনতাকে সরকার আর্থিক সহায়তা দেবে, তাদের শিক্ষা অথবা সংসার চালানোয় সাহায্য করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কেন? কারণ ভারতের সংবিধান এদেশকে ওয়েলফেয়ার স্টেট হিসেবেই গণ্য করেছে। মানুষের ওয়েলফেয়ার। সেখানে এইসব উপহার দেওয়াকে মোদি রেউড়ি কালচার বলে ব্যঙ্গ করছেন কেন? 
অথচ বিস্ময়কর হল, এইসব প্রকল্পের পক্ষে সওয়াল করছেন রাহুল গান্ধী। যিনি ভারতকে সবেমাত্র চিনতে শুরু করেছেন। ঠাকুমাকে দুজন দেহরক্ষী হত্য করায় যিনি গোটা কৈশোর একটি বাংলোর ঘেরাটোপে কাটিয়েছেন, বাইরে যাওয়া অথবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগই ছিল না। আবার বাবার হত্যাকাণ্ডের পর যৌবনের ১৩ বছরই সিংহভাগ বিদেশে বিদেশে। সেই তিনি রেউড়ির পক্ষে। আর ভারতের প্রতিটি শ্বাস চেনা নরেন্দ্র মোদি রেউড়ির বিপক্ষে! ভারী আশ্চর্য ভূমিকা বদল! 

17th     November,   2023
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ