বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

কেন্দ্রে এলিট মন্ত্রীদের
এই দুরবস্থা কেন?
সমৃদ্ধ দত্ত

ভারতীয় রাজনীতিতে দুই ধরনের রাজনীতিবিদ থাকেন। একটি অংশকে বলা হয় মাস-লিডার। অর্থাৎ জননেতা, জননেত্রী। যাঁদের আম জনতার উপর বিপুল প্রভাব। তাঁদের আহ্বানে, জনসভায় লক্ষ মানুষের সমাগম হয়ে যায়। সাধারণত এই অংশের নেতানেত্রীরা  সাধারণ, গরিব অথবা মধ্যবিত্ত পারিবারিক ও সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসেন সংগ্রাম, পরিশ্রমের সিঁড়ি দিয়ে। এর ফলে তাঁদের ভারতের মতো একটি জটিল এবং বহুধা বিভক্ত সমাজ সংস্কৃতির জনমানস সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা তৈরি হয়। অর্থাৎ, একেবারে সাধারণ জীবনযাপন করা মানুষ প্রতিদিন ঠিক কী চায়, তাদের অভাব এবং আকাঙ্ক্ষা কী, এসব নিয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকে এই মাস-লিডারদের। যে কোনও সময় তাঁরা মানুষের সঙ্গে মিশে যান। অত্যন্ত বুঝে, প্রতিটি শব্দ বুঝেশুনে উচ্চারণ করে মানুষের কাছে নিজের উচ্চমার্গের ইমেজ বজায় রাখার কোনও তাগিদ তাঁদের থাকে না। তাঁরা সচরাচর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেন। কখনও ঠিক বলেন। কখনও ভুল বলেন। কিন্তু প্রচণ্ড আবেগ নিয়েই রাজনীতিটা করেন। কোনও ক্যালকুলেটিভ কেরিয়ার হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যান না। পরবর্তীকালে সাফল্য পাওয়ার পর নিজের অর্জিত ভাবমূর্তিকেই সাকসেস ফর্মুলা হিসেবে তাঁরা বুঝে যান। এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেটাকে পুঁজি করে অগ্রসর হন। কেউ কেউ দীর্ঘ সাফল্য লাভ করেন। কেউ কেউ আবার বিচ্যুত হন সাফল্যসরণী থেকে। কিন্তু চিরকাল তাঁদের সঙ্গে থেকে যান তাঁদের প্রতি একান্ত মুগ্ধ অনুগামী অথবা জনতা। তাঁকে ওই জনতা শতরকম ত্রুটি বিচ্যুতি সত্ত্বেও ‘আমাদের লোক’ হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনীতিবিদদের সম্মোহনী শক্তির ম্যাজিকের কোনও নিখুঁত বিশ্লেষণ করা যায় না। এই মাস-লিডার অথবা জননেতা-নেত্রীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, তাঁরা স্মার্ট ঝকঝকে শহুরে এলিট ইংরাজির তুলনায় মাতৃভাষায় কানেক্ট করেন মানুষের সঙ্গে। আর তাঁদের ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য দ্রুত মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। বিতর্ক হয়। আলোচনা হয়। মুগ্ধতাও ছড়ায়। 
আর একরকম রাজনীতিবিদ আছেন যাঁরা ইংলিশ স্পিকিং, আছে হাই প্রোফাইল শিক্ষাগত যোগ্যতা। ধীরস্থির কথাবার্তা, পরিশীলিত শব্দচয়ন করেন। তাঁদের বক্তৃতায় আক্রমণাত্মক মেঠো ঝাঁঝ নেই। আবেগের তুলনায় যুক্তি এবং নিজের রাজনৈতিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার সূক্ষ্ম ক্যালকুলেশন থাকে তাঁদের। অথচ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে দেখা গিয়েছে আশ্চর্যজনকভাবে এই শ্রেণির মানুষের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক থাকে না। তাঁদের মেধা, শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতাকে কাজে লাগায় সংশ্লিষ্ট দল। বিনিময়ে তাঁদের বিধানসভা, লোকসভা অথবা রাজ্যসভায় জয়ী করিয়ে মন্ত্রী করে নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করে দল।  এই ইংলিশ স্পিকিং এলিট নাগরিক রাজনীতিবিদদের নিয়ে মুগ্ধতা আছে। কিন্তু তাঁদের একঝলক দেখার জন্য প্রবল গরমে কয়েকলক্ষ মানুষ হাজির হয়ে যাবে জনসভায় এরকম হয় না। অর্থাৎ এই রকম রাজনীতিবিদদের জনমোহিনী সম্মোহনী শক্তি নেই। একাই নিজেকে অথবা দলকে জিতিয়ে আনবেন সেই ক্ষমতা তাঁদের নেই। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ একা নিজের দলকে জিতিয়ে এসেছেন। তাঁর দলে বহু উচ্চশিক্ষিত এলিট সেলেব্রিটি পোড়খাওয়া অথবা প্রশাসনিকভাবে দক্ষ রাজনীতিবিদ আছেন। কিন্তু তাঁদের জয়ের জন্য মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারের উপর। লালুপ্রসাদ যাদব, মায়াবতী, মুলায়ম সিং যাদব,নরেন্দ্র মোদি, জয়ললিতা, করুণানিধি, এন টি রামা রাও সকলেই এই গোত্রের। যদিও এই তালিকায় কয়েকজন জাতিগত আইডেন্টিটি অথবা ফিল্মি জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে অগ্রসর হয়েছিলেন। তবে নিজেদের সম্মোহনী শক্তিকে ভোটব্যাঙ্কে পর্যবসিত করতে সক্ষম হয়েছেন প্রত্যেকে। জওহরলাল নেহরু অথবা ইন্দিরা গান্ধীরা প্রবলতম জনপ্রিয় মাস-লিডার ছিলেন এবং ‌ইংলিশ স্পিকিংও ছিলেন। তাঁদের সাফল্য ফর্মুলায় অবশ্য পারিবারিক পেডিগ্রি এবং ইতিহাসের ব্যাকগ্রাউন্ড সাহায্য করেছিল। তার সঙ্গে  ছিল চূড়ান্ত কর্তৃত্ব, দল ও সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। এই দুজনই দলকে জেতাতে পারতেন একক ক্যারিশমায়। যা বহুবার প্রমাণিত। অটলবিহারী বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদবানিরা প্রধানত হিন্দুধর্ম, হিন্দি ভাষা এবং ভারতীয়ত্বের একটি সংমিশ্রণ তৈরি করে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রচনা করেছিলেন। যদিও তাঁরা হিন্দুত্বকে বাদ দিয়ে স্রেফ একক ব্যক্তিত্ব দিয়ে দলকে জিতিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেননি। অর্থাৎ তাঁদের একক ক্যারিশমার তুলনায় হিন্দুত্ব রাজনীতির উত্থান ছিল প্রধান অনুঘটক। 
স্বাধীনতার পর থেকে তো বটেই, সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত ইংলিশ স্পিকিং, শিক্ষাগত যোগ্যতা, তুখোড় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক জ্ঞান সংবলিত নেতাদের আধিক্য সর্বদাই কংগ্রেসে বেশি। মনমোহন সিং থেকে পি চিদম্বরম। প্রণব মুখোপাধ্যায় অথবা নরসিমা রাও। শশী থারুর কিংবা সলমন খুরশিদ। এঁরা প্রত্যেকেই ওই ইংলিশ স্পিকিং এবং প্রশাসনিক অথবা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা জননেতা ছিলেন না। আম জনতা তাঁদের সম্মোহনী শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের ভোট দিতে আগ্রহী, এরকম হয়নি। অথচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁরা সফল ছিলেন। 
ঠিক এখানেই বর্তমান ভারত সরকারের সঙ্গে তুলনা চলে আসছে। মোদি সরকার তথা বিজেপি আদর্শগতভাবে স্বদেশি, ভারতীয়ত্ব, পশ্চিমী সভ্যতার বিরোধী, ইংরাজি ভাষাচর্চাকে পিছনে ফেলে বেশি বেশি হিন্দিকে আরোপ করার মরিয়া আগ্রাসনেই বিশ্বাসী চিরকাল। দিল্লিতে একটি হাই প্রোফাইল মার্কেট আছে। আদতে দেশভাগের পর উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে ভারতে চলে আসা উদ্বাস্তুদের পেশাগত পুনর্বাসনের জন্য এই মার্কেটে দোকান দেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। খান মার্কেট।  প্রাথমিকভাবে উদ্বাস্তুদের দোকান হলেও, পরবর্তীকালে খান মার্কেটে যাতায়াত করা মানুষের সিংহভাগই ইংলিশ স্পিকিং, এলিট ও ধনী। দীর্ঘকাল ধরেই বিজেপি নেতারা এই উন্নাসিক ও বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধাচারণ করা সেকুলারপন্থীদের আক্রমণ করে বলে থাকে ‘খান মার্কেট গ্যাং’। 
অথচ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি স্বধর্ম থেকে নিজেরাই সরে আসছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ চারটি মন্ত্রককে সরকারি পরিভাষায় বলা হয় বিগ ফোর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক, প্রতিরক্ষামন্ত্রক, অর্থমন্ত্রক, বিদেশমন্ত্রক। মোদি মন্ত্রিসভার অর্থ এবং বিদেশমন্ত্রকের দায়িত্বে দুই ইংলিশ স্পিকিং নেতানেত্রী। নির্মলা সীতারামন ও সুব্রহ্মনিয়াম জয়শঙ্কর। এই সরকারে সবথেকে গুরুত্ব পাচ্ছেন এখন কারা? রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, শিল্পবাণিজ্যমন্ত্রী পীযুষ গোয়েল। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কাদের মতামতকে ক্যাবিনেট মিটিং-এ বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্বে রাখা হয়? বিদ্যুৎ মন্ত্রী রাজকুমার সিং, পেট্রলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী। কোন মন্ত্রী দ্রুত উঠে আসছেন গুরুত্বের তালিকায়? রাজীব চন্দ্রশেখর। তথ্যপ্রযুক্তির রাষ্ট্রমন্ত্রী। 
এই প্রত্যেক মন্ত্রীর মধ্যে সাদৃশ্য কী? এঁরা সকলেই ইংলিশ স্পিকিং এলিট গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এবং কারও কোনও নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক নেই। সিংহভাগই লোকসভায় নয়, রাজ্যসভার এমপি হিসেবে মন্ত্রী হয়েছেন। জনমোহিনী শক্তি কারও নেই। এই শ্রেণির এলিট রাজনীতিবিদদের বিজেপি চিরকাল ব্যঙ্গ করেছে। কেউ আইএএস, কেউ আইআইটি, কেউ আমেরিকার হোয়ার্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট স্নাতক, কেউ ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের সর্বোচ্চ কর্তা, কেউ আবার বৃহৎ শিল্পপতি।  
কিন্তু সমস্যা এবং আশ্চর্য কাকতালীয় হল, এই প্রত্যেক হাইপ্রোফাইল এলিট মন্ত্রীদের মন্ত্রক ভারত সরকারের সবথেকে ব্যর্থ বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দেশের বেকারত্ব আর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অর্থমন্ত্রকের ব্যর্থতা সর্বজনবিদিত। শিল্প ও বাণিজ্য কতটা ব্যর্থ তার প্রমাণ লাগাতার কয়েক বছর ধরে রপ্তানি ও শিল্পস্থাপনের হার সম্পূর্ণ তলানিতে। পেট্রলের দাম আকাশছোঁয়া থেকে আর নামেনি। বিদ্যুতের দাম দেশজুড়ে ক্রমেই চরম আকার নিয়েছে। আরও বাড়তে চলেছে। এবং রেল! বালাসোর দুর্ঘটনা এবং সাড়ে তিন লক্ষ শূন্যপদ পূরণ না হওয়া। সব ক্ষেত্রেই বোঝা যাচ্ছে রেলমন্ত্রীর অদক্ষতা কতটা! চীনের লাগাতার আগ্রাসন থেকে স্পষ্ট ভারতের বিদেশমন্ত্রকের দুর্বলতা।
কংগ্রেসের মনমোহন সিং, পি চিদম্বরম, প্রণব মুখোপাধ্যায়, নরসিমা রাও, এ কে অ্যান্টনি, শশী থারুররা ইংলিশ স্পিকিং, জিরো ভোটব্যাঙ্ক হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের দায়িত্বে হয়েছিলেন চূড়ান্ত সফল।  অথচ মোদি সরকারের ইংলিশ স্পিকিং এলিট মন্ত্রীরা সকলে ব্যর্থ কেন?  

9th     June,   2023
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ