বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

গুপ্তচরবৃত্তিতে আমেরিকাকে টেক্কা চীনের
মৃণালকান্তি দাস

হয় খুন, নয় জেলবন্দি! বছর কয়েক আগে চীনের মাটিতে আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র অন্তত ২০ জন এজেন্ট গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন। এমনই তথ্য ফাঁস করেছিল খোদ মার্কিন সংবাদসংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমস-ই। জানা গিয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, চীন থেকে সিআইএ-র তথ্য সংগ্রহ একরকম বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল চীনের অন্দরে বেড়ে ওঠা মার্কিন গুপ্তচর নেটওয়ার্ক।
এক সময় সোভিয়েত রাশিয়ার সমস্ত পদক্ষেপের উপর নজরদারি চালানো ছিল আমেরিকার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মস্কোই ছিল সেই সময়ে ওয়াশিংটন ডিসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। একইভাবে আমেরিকার উপরেও নজরদারি চালাত রুশ গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি। আমেরিকা এবং রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থা পরস্পরের উপর গোপন নজরদারি এখনও চালায়। কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ চীনের উপর নজরদারি।
কমিউনিস্ট সরকারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চীনে গুপ্তচর তৈরি করা বেশ কঠিন। কিন্তু দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করে চীনে সেই নেটওয়ার্ক নাকি সিআইএ তৈরি করে ফেলেছিল। চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিভাগের কিছু কর্তা বা কর্মীই মার্কিন চর হয়ে উঠেছিলেন, দাবি সিআইএ-র কয়েকজন প্রাক্তন কর্তার। কিন্তু ২০১০-এর শেষ কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে ২০১২-র মধ্যে একে একে সেই সব মার্কিন চরকে চিহ্নিত করে বেজিং এবং নিঃশব্দে খতম করে দেয়। স্রেফ আতঙ্ক ছড়াতে এক গুপ্তচরকে নাকি সরকারি অফিস চত্বরে তাঁর সহকর্মীদের সামনেই গুলি করা হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছিল, ওই মার্কিন এজেন্টদের বেজিং চিহ্নিত করল কীভাবে? তাহলে কী ‌‘বাঘের ঘরেই ঘোগের বাসা’! যার অর্থ, সিআইএ-র মধ্যেই চীন কিছু ডাবল এজেন্ট তৈরি করেছে, যারা তথ্য গোপন করছে কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে কাজ করছে। শুরু হল গোপন তল্লাশি। খোঁজ মেলে জেরি চুন শিং লির। কে এই লি? সিআইএ এজেন্ট হিসেবে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন লি। সিআইএ-র কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর লি হংকংয়ে থাকা শুরু করেন। ২০১০ সালে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে চীনা গুপ্তচর সংস্থা এমএসএস-র এজেন্টরা। গোপন তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে লি-এর হংকং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে লাখ লাখ ডলার। ২০১২ সালে লি-এর হোটেলের রুমে তল্লাশি চালিয়ে একটি পেন ড্রাইভ পায় এফবিআই। সেখানে এমন একটি নোট পাওয়া যায়, যেখানে সিআইএ এজেন্টদের তথ্য, তাদের সত্যিকারের পরিচয়, অপারেশন, মিটিংয়ের স্থান ও ফোন নম্বর ছিল। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালে নিউ ইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে লিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এফবিআইয়ের জালে তার আগেই ধরা পড়েন সিআইএ-র আরও এক প্রাক্তন অফিসার— আলেকজান্দার ইউক চিং মা। অভিযোগ, চীনের গোয়েন্দা অফিসারদের কাছে আমেরিকার জাতীয় প্রতিরক্ষা বিষয়ক গোপন তথ্য সরবরাহ করতেন। চিং মা ১৯৮২ সালে যোগ দেন সিআইএ-তে। এর সাত বছর পরেই সিআইএ ত্যাগ করেন। তারপর কিছুদিন সাংহাইতে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ২০০১ সালে আবার ফিরে গিয়েছেন হাওয়াইয়ে। ওই বছর মার্চে হংকংয়ে তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সেই থেকে দু’জনের প্রায় এক দশকের গুপ্তচরবৃত্তির সূচনা। চিং মা একসময় এফবিআইয়ের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখান। উদ্দেশ্য, সেখান থেকে মার্কিন প্রশাসনের তথ্য চীনের কাছে পাচার করা। তাঁকে ২০০৪ সালে হনলুলু অফিসে একজন কন্ট্রাক্ট লিঙ্গুইস্ট হিসেবে ভাড়া করে এফবিআই। সেখানে যেসব ডকুমেন্ট সিক্রেট বলে মার্ক করা থাকত, তাও চুরি করতেন চিং মা।
এরকম একের পর এক ঘটনা ফাঁস হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন সিআইএ কর্তারা। এরপর শুধু চীনকে টার্গেট করে বিশেষ একটি ইউনিট গঠন করে সিআইএ। চায়না মিশন সেন্টার। এর কাজ শুধু চীনের বিভিন্ন হুমকির উপর বিশেষ নজর রাখা। সিআইএ প্রধান উইলিয়াম বার্নস প্রকাশ্যে বলেন, এই শতাব্দীতে চীন হল আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় ‘ভূরাজনৈতিক হুমকি’। এরই প্রেক্ষাপটে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির দৈনিকে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিশেষ এজেন্ট নিয়োগ করছে। এর পিছনে অবশ্যই আরও ভয়াবহ এবং অসহনীয় পদ্ধতি থাকতে পারে। তবে কোনও ধূর্ত শিয়াল একটি ভালো শিকারিকে পরাজিত করতে পারে না।’ একসময় দেশত্যাগী চীনা গোয়েন্দা অফিসার লি ফেংঝি ওয়াশিংটন টাইমসকে সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘আপনি বলতেই পারেন, দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দাদের লড়াই ঠিক আগুন বিহীন যুদ্ধের মতো।’ ঘোর কমিউনিস্ট পার্টি বিরোধী লি-এর কথায়, এমএসএস কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের কাজ শুধু বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে অপারেশন চালানো নয়, প্রযুক্তি সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই চীনা গোয়েন্দা সংস্থা এমএসএস তাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায়। ঠিক যেমন পাঠিয়েছিল লি ফেংঝিকেও।
মার্কিন কূটনীতিক ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন গোয়েন্দা অফিসার গ্রান্ট নিউজহাম লিখছেন, আধুনিক যুগে অন্য দেশের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে মানব ও প্রযুক্তির মিশ্রমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে গোয়েন্দা অভিযান চালানো হয়। তবে চীন গুপ্তচরবৃত্তিতে আলাদা ধরনের পন্থা অবলম্বন করে থাকে। চীনের জাতীয় গোয়েন্দা আইনে (২০১৭) পরিষ্কারভাবে লেখা রয়েছে, চীনের সমস্ত কোম্পানি ও নাগরিক গোয়েন্দা কাজে সহযোগিতা করতে বাধ্য। চীনের প্রতিটি কোম্পানি অথবা নাগরিককে চীন সরকারের গোয়েন্দাবৃত্তির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম মনে করা হয়। ২০১৭ সালের আগেও চীনের কোনও নাগরিককে নিরাপত্তা সংস্থা ‘চায়ের আমন্ত্রণ’ জানালে তাঁর আর বুঝতে বাকি থাকত না, তারা কী বলতে চাইছে।
গ্রান্ট নিউজহাম জানিয়েছেন, আমেরিকা তার নাগরিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে যে স্বাধীনতা দিয়ে থাকে, বেজিং অনেক সময় তারও সুযোগ নিয়ে থাকে। যেমন— চলাচলের স্বাধীনতা, নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে ঘোষণা করার স্বাধীনতা। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার সুবিধাকে চীন অনেক সময় তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগিয়ে থাকে। চীনাদের তৎপরতা শুধু যে ‘তথ্য শুষে নেওয়া’ পর্যায়ে আটকে থাকে, তা নয়। তা অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআইয়ের পরিচালক ক্রিস্টোফার রে বলেছেন, প্রতি ১২ ঘণ্টায় একটি করে মামলার ঘটনা ঘটছে, যেখানে চীন যুক্ত রয়েছে। তবে সেই একটির বিপরীতে একশোটি ঘটনা হয়তো তাদের নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, চীনা নাগরিকরা স্বেচ্ছায় গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। মার্কিন প্রযুক্তি চুরি করে চীনা নাগরিকরা নিজেদের কোম্পানি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। চীনে যে আমেরিকান কোম্পানিগুলি রয়েছে, তারা চীনা গুপ্তচরদের এবং ‘ফ্রিল্যান্সার’দের জন্য সেই রাস্তা সহজ করে দিচ্ছে। সব সময়ই যে চীনা নাগরিকদের চীন সরকার কাজ করাচ্ছে, তা নয়। তবে এই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া তথ্যকে সরকার পরে কাজে লাগাচ্ছে এবং চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জাতীয় শক্তির ক্ষেত্রে তা বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি আমেরিকার আকাশে যে চীনা বেলুন দেখা গিয়েছে, তার প্রযুক্তি সন্দেহাতীতভাবে আমেরিকানদের কাছে পরিচিত। কারণ, এই প্রযুক্তি তারা আমেরিকার কাছে থেকেই নিয়েছে। অথচ, এ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
বছর তিনেক আগে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এক সন্দেহভাজন চীনা চর স্থানীয় এবং জাতীয় স্তরের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ওই মহিলার নাম ফ্যাং ফ্যাং ওরফে ক্রিস্টিন ফ্যাং। ফ্যাং চীনের নিরাপত্তা মন্ত্রকের অধীনস্থ গুপ্তচর সংস্থার কর্মী বলে দৃঢ় বিশ্বাস আমেরিকার গোয়েন্দাদের। অন্তত দু’জন মেয়রের সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্কও হয়েছিল বলেও গোয়েন্দাদের অনুমান। তাঁদের দাবি, ওই চীনের গুপ্তচরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের। আসলে চীনের গুপ্তচররা এখন আমেরিকার ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে।
শুধু আমেরিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়াতেই নয়, ভারতেও নজরদারি চালিয়েছিল চীনের নজরদার বেলুন। এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট আমেরিকার ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ সংবাদপত্রের। সাদা বেলুন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে নামিয়ে আনা নিয়ে চীনের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের আবহেই ‘বন্ধু’ দেশগুলিকে চীনের ‘অভিসন্ধি’ নিয়ে সতর্ক করতে চাইছে আমেরিকা। আমেরিকার আকাশসীমায় ঢুকে পড়া চীনের সাদা বেলুনটিকে ক্ষেপণাস্ত্রর মাধ্যমে নামিয়ে আনার পর সেটির ভিতরে কী কী পাওয়া গিয়েছে, তার রিপোর্ট ভারত-সহ ৪০টি দেশের হাতে তুলে দিয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার তরফে বলা হচ্ছে, চীনের কৌশলগত স্বার্থ আছে, এমন এলাকার উপরেই নজরদারি চালাচ্ছে চীন। বিভিন্ন দেশের ‘স্পর্শকাতর’ সামরিক কেন্দ্রগুলির উপর নজরদারি চালাচ্ছে চীনের বেলুন, এমনটাই দাবি আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনেরও।
কিন্তু নয়াদিল্লি চীনের গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে কতটা সতর্ক? মোদি সরকার তো শুধু ভোটের রাজনীতির রসদ খোঁজেন!

30th     March,   2023
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ