বিশেষ নিবন্ধ

দড়ি ধরে টান মারাটাও গণতন্ত্রের বড় শক্তি
সন্দীপন বিশ্বাস

নির্বাচন পর্ব গড়িয়ে গড়িয়ে প্রায় শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে। চার পর্বের ভোট শেষে ফলাফলের দিশা অনেকটাই যেন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর দিন কুড়ি পরেই বাস্তব চিত্রটা বোঝা যাবে। কিন্তু এর মধ্যেই সারা দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা দেখে ‘হীরক রাজার দেশে’র শেষাংশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই যে যেখানে মগজ ধোলাই কক্ষে সমস্ত জনগণের প্রতিনিধি হয়ে গুপি হীরক রাজার দিকে আঙুল তুলে বলছেন, ‘রাজা দুষ্টু, রাজা মন্দ, রাজা ধূর্ত, রাজা ভণ্ড, রাজা নীচ, রাজা ক্রূর, রাজা খল... রাজা আনে দেশে ঘোর অমঙ্গল। রাজা ধিক, রাজা ধিক। ...এইবার রাজা শোনো, জেনো নিস্তার নেই কোনও।’ তারপরই উদয়ন পণ্ডিত নতুন প্রজন্মের হাত ধরে হুঁশিয়ারি দেয়, ‘নাই কোনও পরিত্রাণ, হীরকের রাজা শয়তান।’ এর পরের দৃশ্যে দেখা যায়, সকলে মূর্তির মাঠে ছুটে যায়। সেখানে হীরক রাজার বর্ষপূর্তি উৎসবে তার বিশাল মূর্তির উন্মোচন হওয়ার কথা। উদয়ন পণ্ডিত সমস্ত মানুষকে একমন্ত্রে জাগিয়ে দিয়ে হাঁক দেয়, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’ সেখানে একসঙ্গে হাত মেলায় দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ছাত্র, অমাত্য, এমনকী রাজা নিজেও। নতুন মন্ত্রে এক গণজাগরণ! 
কী অসাধারণ সাযুজ্য বর্তমান সময়ের সঙ্গে! মোদি সরকারের দশম বর্ষ পূর্তির প্রাক্কালে সারা দেশের মানুষের মধ্যে যে গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা চলছে, সেখানে নিঃশব্দে আমরা এই গণজাগরণের পদধ্বনিই যেন শুনতে পাচ্ছি। তাই এবারের নির্বাচনে ট্যাগলাইন হতে পারে, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান।’ যে কোনও যুগে বা যে কোনও দেশে স্বৈরাচারী শাসকরা মানুষের মঙ্গল করতে পারেন না। এটা ইতিহাসে বারবার প্রতিষ্ঠিত। সোনার দেশ গড়তে গিয়ে মানুষ যে বড় দায়িত্ব নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তিনি তা পালন করতে পারেননি। উল্টে দশ বছরে দেশের নানা ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকরি, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, সংবিধান সব লাটে তুলে দিয়ে তিনি হিন্দুত্বের জপমালা জপছেন। একনায়কতন্ত্র মানসিকতা নিয়ে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করার খেলা খেলছেন। আর সর্বত্র অসত্য প্রচার করে মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করে চলেছেন। 
দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। বিজ্ঞানকে ধ্বংস করে বৈদিক শিক্ষা চালুর চেষ্টা চলছে। সংবিধানকে ধ্বংস করে মনু সমাজের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া চোরা চেষ্টা চলছে। ভুলে ভরা ইতিহাস ও বিজ্ঞান শিখিয়ে দেশের নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করার চেষ্টা চলছে। তাদের মনে বিষ সঞ্চারের চেষ্টা হচ্ছে। পাশ করার পর কোনও দিশা নেই! ধনীর ছেলেরা, নেতাদের সন্তানরা বিদেশ চলে যাবেন। আর আম জনতার সন্তানরা চাকরি না পেয়ে ‘হিন্দু-মুসলমান’ নিয়ে ঠেসাঠেসি করবে! ওদের মনে আর কত বিষবাষ্প ঢুকবে! একটা সময় ফ্যাসিজম, নাৎসিজমের ভয়ঙ্কর চেহারা আমরা দেখেছি। এখন দেখছি ‘মোদিজম’! ভয়াবহ সেই মতবাদ গত দশ বছর ধরে দেশটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। দশ বছরই বা বলি কেন, ২০০২ সালের গোধরা কাণ্ড থেকেই সেই ইজমের বহিঃপ্রকাশ। আজ তা গোটা দেশকে গ্রাস করতে চলেছে।
কী পাওয়া গেল এই দশ বছরে? চাকরিহীন যুবক, উপার্জনহীন যৌবন, চাকরিচ্যূত মধ্যবিত্ত, অন্নহীন নিচুতলার মানুষ, লাঞ্ছিত নারী, স্বপ্নহীন ভারত, বিষাক্ত আবহাওয়া, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা। আরও আছে! যে প্রবীণ মানুষটি তাঁর চাকরি জীবনের সঞ্চয়টুকু ব্যাঙ্কে রেখে জীবনযাপন করতেন, তাঁর সমকালও এই সরকার নরক করে দিয়েছে। একদিকে ব্যাঙ্কের সুদ কমিয়ে তাঁকে আর্থিক দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে রেকর্ড জায়গায় নিয়ে গিয়েছে। নিজেদের তহবিলে মোটা টাকার ভেট নিয়ে ওষুধের দেদার কালোবাজারি করতে সরকারি সিলমোহর মেরে দিয়েছে। হিটলার বলতেন, মানুষকে এমন নিষ্পেষণের মধ্যে রাখবে, যাতে একটু শ্বাস নিতে পারলে তার মনে হয়, এই তো বেশ ভালো আছি। অন্তত আগের থেকে তো ভালো।  তাই যখন গ্যাসের দাম চারশো টাকা বাড়িয়ে একশো টাকা কমানো হয়, আমরা বলি, দেখেছো, কী ভালো ব্যবস্থা! জ্বালানি তেলের দাম পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দু’ টাকা কমানো হলে আমাদের মনে হয়, এই তো রাজামশাই কত বড় প্রজাহিতৈষী! আবার যখন সোনার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গিয়ে সাতশো টাকা কমে যায়, তখন অনেকেই বলেন, যাক বাবা, বিয়ের মরশুমে একটু সুবিধা হল। জুমলাতন্ত্রের মোহতে আবিষ্ট হলে যুক্তিজ্ঞান হারিয়ে যায়। আর এই যে ‘চান্দা দো ধান্ধা লো’ থিয়োরি, এটা হিটলারও চালু করেছিলেন। হিটলারের তহবিলে মোটা চাঁদা দিয়ে বেশ কিছু কোম্পানি তাঁর আশীর্বাদ পেতে চেয়েছিলেন। যেমন বিএমডব্লু, ডয়েশ ব্যাঙ্ক, ফক্সওয়াগন, মার্সেডিজ বেঞ্চ, পোর্সা প্রভৃতি। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলে আসছে। 
এই মুহূর্তের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে কোনও ধর্মগোষ্ঠী নয়, কোনও সম্প্রদায় নয়, কোনও জাতপাতের অঙ্ক নয়, এবার দেশে সরকার গড়বে মহিলা এবং যুবশক্তি। তাঁরাই এই সরকারের আমলে সবথেকে বঞ্চিত শ্রেণি। যুবকদের কথা ধরা যাক। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি বা  সিএমআইই’র একটা হিসাবে দেখা গিয়েছে এদেশের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে কাজ করার বয়স রয়েছে ১১০ কোটি মানুষের। এদের বলা হয় ওয়ার্কিং এজ গ্রুপ। এই সংখ্যার মধ্যে ৬৮ কোটি মানুষ বেকার। বাকিদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের যা আয়, তাতে দু’বেলা পেট ভরে না। ওই হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গত আট বছরে অর্থাৎ মোদি জমানায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন। অর্থাৎ যিনি বছরে দু’কোটি চাকরি দেওয়ার ধাপ্পা দিয়েছিলেন, তিনি বাস্তবে গড়ে বছরে এক কোটি মানুষের চাকরি খেয়ে নিয়েছেন। তার ফল যে কী মারাত্মক, তা শুনলে বুক কেঁপে উঠবে। প্রতি বছর শত শত অবসাদগ্রস্ত যুবক আত্মহত্যার পথকে বেছে নিচ্ছেন। মোদির মন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই সংসদে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, দেশে ৯ হাজারেরও বেশি যুবক চাকরি না পেয়ে অবসাদে আত্মহত্যা করেছেন। মোদির ব্যর্থতা একটা প্রজন্মকে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বেরোজগারি চিত্রই যেন নিরুচ্চারে বলে ওঠে, ‘রাজা ধিক, রাজা ধিক।’ তাই এখনই তো তাই দড়ি ধরে টান মারার সময়। নাহলে আরও বড় মূল্য দিতে হবে দেশের মানুষকে।  
মহিলাদের কথা ভাবুন। সন্দেশখালি নিয়ে বিজেপি এত কাঁদছে, কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকারে কতটা ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তা বোঝা যায়নি! পরে কী দেখা গেল? অভিযোগ উঠল, গরিব মহিলাদের হাতে দু’হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে তাঁদের দিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে ‘ধর্ষিতা’ সাজিয়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ করছেন কারা? যাঁদের নিয়ে বিজেপি নোংরা খেলা খেলতে চেয়েছিল। এটা যে নারীজাতির প্রতি কতটা অপমান, তা ক্ষমতালোভীরা বুঝবেন না। শকুনির পাশা খেলায় সন্দেশখলির নারীরা যেন বিজেপির পাশার দান। অথচ  নরেন্দ্র মোদির মুখে মণিপুরের নাম নেই। মণিপুরের চিত্রাঙ্গদারা কীভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছেন। যে সরকার মহিলাদের জন্য কাঁদে, সেই সরকারের অঙ্গুলি হেলনে ধর্ষণে সাজাপ্রাপ্তরা জেলের বাইরে কলার তুলে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সরকারের প্রশ্রয়ে ধর্ষিতা মেয়েকে পুড়িয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা হয়। তাদের বিধায়কই ধর্ষণে অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটেন। তাদেরই নির্বাচিত রাজ্যপালের গায়ে লেগে যায় শ্লীলতাহানির কলঙ্কের অভিযোগ। আবার তিনিই রক্ষাকবচের জোরে গলা উঁচিয়ে নির্দেশ দেন, তদন্তে সহযোগিতা করা হবে না। 
হাওয়া যে বদলাচ্ছে, মানুষের মনে যে দড়ি ধরে টান মারার একটা ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছে, সেটা রাজামশাই নিজেও বুঝেছেন। তাই তাঁকেও বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছে। তাই বিভিন্ন মঞ্চে তিনি উল্টোপাল্টা বলছেন। সেসব বলে দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর পদমর্যাদাকে খাটো করে তুলছেন। এসবই হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে। বাংলায় এসে কত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাংলাকে যাঁরা এতদিন ভাতে মারার চেষ্টা করেছেন, বাংলাকে নিয়ে যাঁরা এতদিন ব্যঙ্গ করেছেন, তাঁরাই আজ বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে গলায় গামছা দিয়ে করজোড়ে ভোট ভিক্ষা করছেন। 
দড়ি ধরে টান মারাটা গণতন্ত্রের একটা বড় শক্তি। অবশ্য তার একটা উপযুক্ত সময় থাকে। সেটা মিস করলে তার খেসারত দিতে হয় মানুষকেই। ২০১৯-এর নির্বাচনে পুলওয়ামা কাণ্ডের পর সহানুভূতির ভোটে মোদি জয়ের ডিঙা ভাসিয়েছিলেন। সেই কাণ্ডের কোনও তদন্ত রিপোর্ট আজও পাওয়া যায়নি। প্রমাণ করা যায়নি পাকিস্তানের চক্রান্ত। এভাবে নেপোয় দই মারার ঘটনা এবার ঘটবে না। তাই শেষ পর্বের নির্বাচনী ভাষণে মোদির গলায় বিষণ্ণতার সুর। বিসর্জনের বাদ্যি তিনিও শুনতে পাচ্ছেন কি?  
1Month ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক মতান্তর, কলহে মনে হতাশা। কাজকর্ম ভালো হবে। আয় বাড়বে।...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮২.৭৭ টাকা৮৪.৫১ টাকা
পাউন্ড১০৪.১৬ টাকা১০৭.৬৩ টাকা
ইউরো৮৮.০৭ টাকা৯১.১৯ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
22nd     June,   2024
দিন পঞ্জিকা