বিশেষ নিবন্ধ

রাম বাম শ্যাম সেই এক ছাদেরই নীচে
হারাধন চৌধুরী

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, বাঙালি কলকাতায় না গেলে কুলীন হয় না। তেমনি ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলার গুরুত্ব। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা পেয়েও একটা রাজনৈতিক দল জাতে ওঠে না, যদি না বাংলার ক্ষমতা অন্তত একবার দখলের কৃতিত্ব তার ঝুলিতে থাকে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বিজেপি এখনও সেই হীনমন্যতার শিকার। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বিজেপিই দেশের ধনীতম পার্টি। আটটি জাতীয় দলের ঘোষিত আয় ও সম্পত্তির নিরিখে বিজেপিই ধনীতম। কংগ্রেসসহ বাকি বিরোধীদের তহবিলের আকার তার ধারেকাছেও নয়। গত একবছরে বিজেপির সম্পদ বৃদ্ধির হার কংগ্রেসের প্রায় দশগুণ! বিজেপি এও দাবি করে যে, তারাই পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। 
আয় এবং প্রভাবের যত বড়াই তারা করুক না কেন, দলটা বাংলায় এসেই পিগমি! এই লজ্জা ঢাকার চেষ্টায় তারা বহুদিন ধরেই কসরত করে চলেছে। আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার সংগঠন বিস্তার, হিন্দুত্বের সুড়সুড়ি, পশ্চিমবঙ্গকে ভারতভুক্ত করার কৃতিত্ব দাবি, পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের (বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়) জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ প‍্রভৃতি বহুদিন ধরে চলছে। ওইসঙ্গে ইতিউতি যোগ হয় রামনবমী, দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো প্রভৃতিকে সামনে রেখে ধর্মীয় বিভেদ ও উত্তেজনা সৃষ্টি। আর আছে রাজ্যের শাসক দলের হিন্দু ভোট ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাবার জন্য পরোক্ষে বামপন্থী ও কংগ্রেসিদের একাংশের সঙ্গে আঁতাত।
এ গেল দক্ষিণবঙ্গের খেলা। উত্তরবঙ্গের খেলাটা আরও মারাত্মক—চলে সরাসরি বাংলাকে টুকরো করতে মদতদান। কখনও গোর্খাল্যান্ডের মারকুটে বাহিনীকে তোল্লা দিয়েছে, কখনও-বা হাত মিলিয়েছে কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার কিংবা পৃথক উত্তরবঙ্গের দাবিদারদের সঙ্গে। কোনও সন্দেহ নেই, এইভাবে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কয়েকটি কেন্দ্রে এবং উত্তরবঙ্গে তারা খানিকটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। গত লোকসভা নির্বাচনে ইভিএমেও তার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন আমরা দেখেছি।
দিল্লিওয়ালারা ভেবে নিয়েছিলেন যে ফলটা হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি। তাই দু’বছর বাদে, ২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ‘অল-আউট’ খেলার ঘোষণা দেন স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলার জন্য তাঁরা যে সঙ্কল্পপত্র (ইস্তাহার) প্রকাশ করেছিলেন, তা একটি রূপকথার দেশের রাজাই বানাতে পারেন মাত্র। আর ওই কাগজটা সামনে রেখেই মোদির ডানহাত অমিত শাহ হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, দুশোর বেশি আসন জিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হ্যাটট্রিক রুখে দেবেন এবং বাংলায় পত্তন হবে গেরুয়া যুগের। হায়, বাংলার ভোটাররা মোদি-শাহ জুটিকে একশোর অনেক আগেই থামিয়ে দিল।
বাংলায় কল্পিত বিজেপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হওয়ার বাসনায় দলের একাধিক এমপি-ও বিধানসভা ভোটে লড়েছিলেন। জিতেও, স্বপ্নভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গেই বিধায়ক পদ ছেড়ে ফের দিল্লিবাসী হন তাঁরা। তবে মুম্বই-ক্রীড়ার ওস্তাদরা সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার বান্দা কি? তৃণমূল বিধায়কদের একটা বড় অংশকে ভাঙিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয় সরকার ফেলে দেওয়ার ভয়াবহ খেলাতেও মেতেছিলেন তাঁরা। এজন্য শুরু হল সাঁড়াশি আক্রমণ—রাজ্যের বিরুদ্ধে ‘আর্থিক অবরোধ’ এবং রাজভবনের অপব্যবহার। মনরেগা (১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি স্কিম) এবং গরিবের গৃহনির্মাণ (আবাস যোজনা) প্রকল্পে রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে দেওয়া হল। কমিয়ে দেওয়া হল গরিবের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিতে রাজ্যের বরাদ্দ। পরিকাঠামো উন্নয়নে নবান্নের তরফে ঋণগ্রহণেও কেন্দ্রের অনুমোদন এল না। এমন বঞ্চনার ট্র্যাডিশন বহাল আজও। বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার প্রতিকারের নামে তৎকালীন রাজ্যপাল রাজভবনকে বিজেপি পার্টি অফিসের স্তরে নামিয়ে এনেছিলেন বলে বারবার অভিযোগ করেন তৃণমূল নেতৃত্ব। পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ইস্যুতে রাজভবন এবার যেন বর্ধিত ভূমিকায় অবতীর্ণ!
কিন্তু এত করেও নবান্নকে শায়েস্তা করতে পারেননি অমিত শাহরা। বরং বিজেপির ভিতরের গোলমাল বেশ পেকে উঠেছে। গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের পর একাধিক এমপি ও এমএলএ বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলেই ফিরে গিয়েছেন। বিজেপির প্রতি দ্রুত মোহভঙ্গ হচ্ছে সাধারণ মানুষেরও। ভুলের থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার কথা বলেছিলেন বিজেপি নেতারা। এজন্য দলের অন্দরে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে, কোনও কোনও নেতাকে বকাঝকা করা হয়েছে দিল্লি ডেকে, বদল এসেছে বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বেও। কিন্তু তাতে যে কাজের কাজ কিছু হয়নি, তা পরিষ্কার হয়ে যায় রাজ্যুড়ে তারপর অনুষ্ঠিত পুরসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলে। সাগরদিঘিসহ একাধিক বিধানসভা এবং আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও গোহারা হয়েছে গেরুয়া শিবির। যে উত্তরবঙ্গ নিয়ে এত বারফট্টাই, সেখানেও যে গেরুয়ার শিবিরের হাড়ির হাল! খোলসা হয়ে গেল সদ্য অনুষ্ঠিত ধূপগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে।
অতঃ কিম্? বিড়াল এবার সত্যিই ঠেলায় পড়েছে। এবার তার হাতে উঠে এসেছে যেন ভিক্ষাপাত্র! আর কোনও রাখঢাক নয়, সরাসরি ভোট ভিক্ষায় নেমেছেন বঙ্গ বিজেপির নেতারা। মোদি-শাহের পার্টির বাংলার নেতারা সিপিএম এবং কংগ্রেস নেতা-সমর্থকদের কাছে ‘বুক ফুলিয়ে’ ভোট ভিক্ষা করছেন। সাগরদিঘি উপনির্বাচনে এবং পঞ্চায়েত ভোটে মুখে ‘বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী মানুষের ঐক্য’-এর কথা বলেছিল সিপিএম। আলিমুদ্দিন থেকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল ঘটা করে। বলা হয়েছিল—ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে যেখানে সিপিএম কিংবা তাদের সমমনোভাবাপন্ন প্রার্থী নেই, সেখানে ফাঁকা ব্যালটই জমা দিতে হবে। তৃণমূলের বারবরের দাবি, বিজেপির সঙ্গে বামেদের ‘ঘোঁট’ রয়েছে। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে ২০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট ছিল সিপিএমের। একুশে তা নেমে আসে ৫ শতাংশে। এই সূত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়দের দাবি, ‘বামের ভোট রামে’ গিয়েছে। সিপিএম পাল্টা ‘দিদি-মোদি দোস্তি’র গল্প ফেঁদেও তা বিশ্বাসযোগ্য করতে পারেনি। বরং নিজেদের কলঙ্ক মুছতেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিট তৎপর হয়েছিল পঞ্চায়েতে। কিন্তু ভাণ্ডা ফোঁড় করে দিয়েছে বিজেপিই। সিপিএম-কংগ্রেসের বন্ধু দল আইএসএফের নেতা নৌশাদ সিদ্দিকির উদ্দেশে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার আহ্বান শোনা গিয়েছে, ‘বাঁচতে চাইলে নো ভোট টু মমতা বলুন’!
বিজেপি-বিরোধী ২৮ দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’ নিয়ে যখন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির পাগল পাগল অবস্থা, ঠিক তখনই বাংলায় বেসুরো গাইছে কংগ্রেস এবং সিপিএম। এই দুই দলের রাজ্যের অধিনায়ক অধীর চৌধুরী এবং মহম্মদ সেলিম কোনওভাবেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের সঙ্গে পথ চলতে রাজি নন। দেশবাসীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁরা এখনও অব্দি ঘুরিয়ে এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, নরেন্দ্র মোদির হ্যাটট্রিক মেনে নিলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলার সামান্যতম অগ্রগতি তাঁরা মেনে নেবেন না!
রীতিমতো মনমরা বিজেপি এতেই যেন আশার আলো দেখছে। দেশ যখন আড়াআড়িভাবে বিজেপি এবং ‘ইন্ডিয়া’য় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, তখন এই ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ দুটোকে (কংগ্রেস ও সিপিএম) মানুষ প্রত্যাখ্যানই করবে। এই মওকারই প্রতিফলন ইভিএমে চায় বিজেপি। দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, শমীক ঘোষ, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা প‍্রমুখ এখন প্রকাশ্যে আহ্বান জানাচ্ছেন, অমূল্য ভোট‍ কংগ্রেস, সিপিএমকে দিয়ে নষ্ট করবেন না, সেটা বিজেপিকেই দিন। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, তৃণমূলের কোটি কোটি কমিটেড ভোটারের কাছে হাত পাতা আজ বৃথা। সার্কাস দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ কংগ্রেস ও সিপিএম সমর্থকদের একাংশকেও যদি বিভ্রান্ত করা যায়, সেটুকুই লাভ। একটা জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের ভাষা একটু পাল্ট‍ে নিলেই রাজ্য-রাজনীতিতে একেবারে লাগসই: ‘সেসব এখন অতীত, বঙ্গে মমতার বিরোধীরা এক ছাদের তলায়’! তৃণমূল সুপ্রিমো এটাকেই তো ‘রাম-বাম-শ্যাম’ যথার্থ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ওই মানুষগুলিও মোদির পার্টিকে ভোট দেবেন কেন—বঙ্গ বিজেপির কোনও নেতা প্রশ্ন করেছেন কি নিজেকে? দু-দুটি টার্মে এই প্রধানমন্ত্রী বঞ্চনা, উন্নয়নে বাগড়া এবং রাজ্যভাগের ষড়যন্ত্রের অধিক কী ‘উপহার’ দিয়েছেন বাংলাকে? এরাজ্যের মানুষকে কি পাগলেরও অধম ভাবেন দিল্লির কর্তারা?
9Months ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

সৃজনশীল কর্মে উন্নতি ও প্রশংসালাভ। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় যোগ। আধ্যাত্মিক ভাবের বৃদ্ধি ও আত্মিক তৃপ্তি।...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮২.৭৭ টাকা৮৪.৫১ টাকা
পাউন্ড১০৪.১৬ টাকা১০৭.৬৩ টাকা
ইউরো৮৮.০৭ টাকা৯১.১৯ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা