বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
অমৃতকথা
 

জীবাতু

শ্রুতির চরম সিদ্ধান্ত “রসো বৈ সঃ”—তিনি (পরব্রহ্ম) রস স্বরূপ। বৈষ্ণব আচার্যেরা একটি নূতন কথা যোগ দিয়াছেন। তাঁরা বলেন, তিনি শুধু রস নহেন। রসিকও বটেন। তিনি রসিক হইয়া আপন রসমাধুর্য আপনি আস্বাদন করেন। এই আস্বাদনের বৈচিত্র্যই ভক্তের জীবাতু। অদ্বৈতবাদী জ্ঞানীগণ শুধু ব্রহ্ম-রসেই বিলীন হইতে চায়। ভক্ত কিন্তু রসিক শেখরের রসবৈচিত্র্যের অনন্ত মাধুর্য ভোগ করিতে কামনা করে। এই দুয়ের পার্থক্য একটি লৌকিক দৃষ্টান্ত দ্বারা স্পষ্ট করা যাইতেছে।
স্বর্ণের কর্মকারের নিকট এক গাছি হার সুবর্ণ মাত্রই। বিক্রয় করিতে গেলে সুবর্ণের মূল্যই পাইবেন। হারে যে কারুকার্য তার দাম সে দিবে না। একটি হার কর্মকারের কাছে এক তাল সুবর্ণের সমান। পক্ষান্তরে কোন গৃহবধুকে এক তাল সোনা দিলে সে তাহা গ্রহণ করিবে কিন্তু কণ্ঠে দোলাইবে না। কারুকার্যের বিচিত্রতা যুক্ত হইয়া কণ্ঠহারে পরিণত হইলেই সে তাহা কণ্ঠে পরিধান করিবে। জ্ঞানী স্বর্ণকার স্থানীয়, তার কাছে সবই ব্রহ্ম। ভক্ত গৃহবধূ স্থানীয়, রসবিলাসী ব্রহ্মই তাহার ধ্যানের ধন। এই বিলাসী-ব্রহ্মই শ্রীকৃষ্ণ।
বেদ বলেন তিনি একাকী রসাস্বাদন করিতে পারে না। “একাকী নৈব রমতে। আত্মানং দ্বেধা অপাতয়ৎ।” নিজেকে দুই করিলেন। স্বরূপ দামোদর আরও সুন্দর করিয়া কহিলেন—“একাত্মানাদপি ভূবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।” কবিরাজ গোস্বামী আরও মধুর ভাষায় শুনাইলেন—
“রাধাকৃষ্ণ এক আত্মা দুই দেহ ধরি।
অন্যোন্যে বিলসে রস আস্বাদন করি।।”
এক আত্মা দুই দেহ ধারণ করিয়াছেন। ‘ধরি’ অর্থ ধারণ করিয়াছেন বলিলে একটু দোষ লাগে। কোন একদিন ধারণ করিয়াছেন—তাহা হইলে পূর্বে ছিল না। পূর্বে ছিল না এখন ধারণ করিলেন বলিলে অনিত্যত্ব প্রসঙ্গ হয়। অনিত্য বস্তু সাধ্য হয় না। ‘ধরি’ অর্থ তাই আমরা বলি ধারণ করিয়াছেন নহে, ‘ধরিয়া রাখিয়াছেন’, নিত্য কাল দুইটি দেহ ধরিয়া রাখিয়াছেন। একটু চেষ্টা করিয়াই যেন রাখিয়াছেন—যদি চেষ্টা না করেন তাহা হইলে দুই এক হইয়া যান। বরফের যেমন গলিয়া গিয়া জল হওয়াই স্বাভাবিক, শ্রীরাধাকৃষ্ণের সেই প্রকার মিলিয়া গিয়া গৌর হওয়াই স্বাভাবিক। রাধাকৃষ্ণের রূপে দুই থাকাই একটা চেষ্টা সাপেক্ষ। বরফে যেরূপ কাঠের গুড়া দিয়া আবরণ দিলে সহজে গলে না,—শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণও সেই পৃথকই থাকিয়া ‘অন্যোন্যে বিলাস’ করিবার ইচ্ছা করিলে পৃথক্‌ই থাকেন। ঐ ইচ্ছা যদি না করেন অমনি দুই মিলিয়া শ্রীগৌরসুন্দর হইয়া যায়। এক আত্মায় এক দেহ হওয়াই স্বাভাবিক, দুই দেহই ইচ্ছা করিয়া ধরিয়া রাখেন। ‘তদ্দ্বয়ং চৈক্যুমাপ্তং’ সেই দুই এক হইয়াছেন, এই একত্বেই চির বিরাজমান আছেন। এক থাকিয়াই দুই হইয়াছেন। এই একত্বের মধ্যে দুইয়ের যে বিচিত্রতা তাহা বিদ্যমান রহিয়াছে। ইহা এক অদ্ভুত কথা। নদীর দুই তীর আছে। নদী সাগরে মিশিলে আর তীরদ্বয় থাকে না। কিন্তু ইহা এক আশ্চর্য ব্যাপার। রস স্রোতস্বিনীর দুই তীর শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ—ইঁহারা গিয়া গৌরমহাসমুদ্রে মিশিয়াছেন—কিন্তু তীর দুইটি অক্ষুণ্ণই রহিয়াছে। কখনও রাধা ভাবে কৃষ্ণকে ডাকিতেছেন। কৃষ্ণ ভাবে রাধাকে ডাকিতেছেন। পৃথক্‌ত্বকে না হারাইয়াই দুই একত্রীভূত। ইহাই অচিন্ত্য ভেদাভেদবাদের মূল তত্ত্ব।
শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপটি কবিরাজ গোস্বামী বড় মধুর অক্ষরে বলিয়াছেন—
“রসিক-শেখর কৃষ্ণ পরম করুণ।”
রসিকশেখর আর পরম করুণ কথা কিন্তু দুইটি নয়। রসিক বলিয়াই করুণ। রসিক রসের আস্বাদক। “রসঃ হ্যেবায়ং লব্ধাব আনন্দী ভবতি।” রসের আস্বাদনে আনন্দ। আনন্দ হয় তখনই যখন বাড়তি শক্তির অভিব্যক্তি হয়। 
‘শ্রীমহানামব্রত প্রবন্ধাবলী’ (১ম খণ্ড) থেকে

24th     March,   2023
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ