‘বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো...।’
—কবি রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহ
লাশ, সর্বত্র লাশ। প্রয়াগের সঙ্গম থেকে নয়াদিল্লির স্টেশন—স্তূপাকার লাশ। সরকারি হিসেবে সংখ্যাটা এখনও পর্যন্ত ৫৫। কিন্তু কে না জানে, বাস্তবের সঙ্গে সরকারি হিসেব কখনওই মেলে না। বাস্তবে সংখ্যাটা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়াও আশ্চর্যের নয়। সেই লাশের স্তূপের উপর দাঁড়িয়েই চলছে মোদি-যোগীর ২ লক্ষ কোটি টাকার বেসাতি— ধর্মের নামে। প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২ লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসার স্বপ্নে বিভোর উত্তরপ্রদেশ সরকার কিংবা কেন্দ্রের সরকার কেউই আম জনতার সুরক্ষার দিকটি নিশ্চিত করেনি। যদিও কনফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া ট্রেডার্সের (সিএআইটি) সম্পাদক, প্রবীণ বিজেপি নেতা ও সাংসদ খান্ডেলওয়ালের দাবি, ব্যবসার অঙ্ক ৩ লক্ষ কোটির গণ্ডি টপকাতে চলেছে। ব্যবসায় লাভের অঙ্ক যাই হোক, অভিযোগ হল, যথাযথ সুরক্ষার অভাবেই এই মৃত্যু মিছিল। প্রথমে মৌনী অমাবস্যার স্নানে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় ৩৭ জনের মৃত্যু। তারপর নয়াদিল্লি স্টেশনে ফের পদপিষ্ট হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু। এছাড়াও বার তিনেক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে মেলা প্রাঙ্গণে। যদিও সেইসব অগ্নিকাণ্ডে কোনও প্রাণহানি হয়নি। কুম্ভে যাওয়ার পথে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও আছে। অথচ দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের সামনে উত্তরপ্রদেশ সরকারের আমলারা সুরক্ষা ব্যবস্থার কত গালভরা বিবরণই না দিয়েছিলেন! বলা হয়েছিল, এআই সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এই নাকি এআই সুরক্ষা! বলা হয়েছিল ৫৫টি থানায় মোট ৪৫ হাজার পুলিস কর্মী মোতায়েন থাকবে। ৩ হাজার সিসি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হবে গোটা মেলা। কিন্তু সেসব কী কাজে লাগল! আসলে গোড়ায় গলদ। গোটা মেলার পরিকল্পনাটাই হয়েছিল উচ্চকোটির লোকেদের কথা ভেবে। সাংবাদিকদের বলা হয়েছিল, ৪০ কোটি মানুষ আসতে পারে এই মেলায়। প্রত্যেকে যদি গড়ে ৫ হাজার টাকা করে ব্যয় করে তবে ২ লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা হবে। কিন্তু মহাকুম্ভে যে অগণিত মানুষ পুণ্যলাভের আশায় আসেন, তাঁদের অধিকাংশই তো গরিব গুর্বো। নয়াদিল্লি স্টেশনে কিংবা প্রয়াগের সঙ্গমে যাঁরা পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন তাঁদের অনেকেই গরিব মানুষ। পুণ্যার্থীদের অধিকাংশই জেনারেল কামরার টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসেন। আখড়ার প্রসাদ খেয়ে পেট ভরান। স্টেশনে বা সাধু সন্ন্যাসীর ডেরায় রাতটা কাটিয়ে দেন। তারপর ফিরতি ট্রেন ধরেন। তাঁরা কী করে ব্যয় করবেন ৫ হাজার টাকা! হয়তো এঁদের মাসিক আয়ই ৫ হাজার টাকা হয় না। কিন্তু কুম্ভ তো এঁদেরই। অথচ এঁদের কথাই ভুলে গিয়েছিল মোদি ও যোগী সরকার।
শঙ্করাচার্য পরিষদ ও শঙ্করাচার্য ট্রাস্টের সভাপতি স্বামী আনন্দস্বরূপ মহারাজ প্রয়াগে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার আগের দিনই যা নিয়ে সাবধান করেছিলেন আয়োজকদের। তিনি বলেছিলেন, মহাকুম্ভে যেভাবে ভিআইপি সংস্কৃতির বাড়বাড়ন্ত হয়েছে তা আগে কখনও দেখা যায়নি। ভিআইপিরা গাড়ি নিয়ে সোজা পৌঁছে যাচ্ছিলেন স্নানের ঘাটে। যেখানে সাধারণ মানুষকে ১৫-২০ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হচ্ছিল স্নান করতে। ভিআইপিদের যাতায়াত সহজ করতে বার বার আটকে দেওয়া হচ্ছিল সাধারণ মানুষকে। কুম্ভে সবচাইতে উপেক্ষিত ছিল আম জনতা। মোদি ও যোগী সরকার ভিআইপি ও বিদেশি অতিথিদের রাত্রিবাসের জন্য ১ লাখি টেন্ট করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শৌচালয় করেনি। কুম্ভ ফেরত অধিকাংশ মানুষ এই অভিযোগ করেছেন। আসলে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা ও সুবিধের থেকে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের বেশি নজর ছিল পয়সা রোজগারের দিকে, ‘বেওসা’ করার দিকে। বিজেপি প্রথমে ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে তুলেছে, আর এখন ধর্মকে তারা ব্যবসার উপকরণে পরিণত করেছে। যার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলির প্রতিনিধিদের কাছে কুম্ভকে ব্রাজিলের ‘রিও কার্নিভাল’-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেছে, রিওতে ৭০ লক্ষ মানুষ জড়ো হন। কুম্ভে আসবেন ৪০ কোটি মানুষ। কোথায় রিও কার্নিভাল, যেখানে স্বল্পবসনা সুন্দরীদের নাচ দেখতে বিশ্বের পয়সাওলা মানুষ ভিড় করেন, আর কোথায় মহাকুম্ভ!— যেখানে সাধারণ মানুষ আসে শান্তির খোঁজে। ত্রিবেণী সঙ্গমের জলে পাপ ধুয়ে পুনর্জন্ম থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায়। এই দু’-ই কি এক হল? কিন্তু বিজেপি পরিচালিত সরকার এই দুইকে এক করে ছাড়ল। এই হল বিজেপি। এই বিজেপিরই লোকসভার এক সাংসদ— অভিনেতা পরেশ রাওয়াল একটি ছবিতে এক নাস্তিক ব্যবসায়ীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ছবিটির নাম ‘ও মাই গড’। এটি আদতে একটি হিন্দি নাটক অবলম্বনে তৈরি। ‘কিষেন ভার্সেস কানহাইয়া’ নামে সেই নাটকেও অভিনয় করেছিলেন পরেশ এবং প্রযোজনাও ছিল তাঁরই। নাটকটি নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। তখনই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি নাস্তিক? জবাবে তৎকালীন বিজেপির লোকসভার সাংসদ জানিয়েছিলেন, তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, কিন্তু ধর্ম নিয়ে ব্যবসার ঘোরতর বিরোধী। যেভাবে ভণ্ড বাবারা ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার করে তুলেছে, তার বিরোধিতার জন্যই এই নাটক তাঁর করা। পরেশ কি দেখতে পাচ্ছেন কী চলছে কুম্ভমেলা নিয়ে? কুম্ভমেলা নিয়ে সরকারি উদ্যোগে এই ব্যবসার কি প্রতিবাদ করবেন তিনি?
সিআইআই এক হিসেবে দেখিয়েছে, ২০১৩ সালে কুম্ভমেলায় ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছিল। ২০১৯ সালে কুম্ভমেলায় আয় হয়েছিল ১.২ লক্ষ কোটি টাকা। ওই বছর ৬ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল মেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এ বছর মোদি সরকারের লক্ষ্য ছিল সেই রাজস্ব বাড়িয়ে ২ লক্ষ কোটিতে নিয়ে যাওয়া। তার জন্য উত্তরপ্রদেশ সরকার ২০২৪-২৫ সালের রাজ্য বাজেটে ২৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। তার আগের বছর রাজ্য বাজেটে এই লক্ষ্যেই বরাদ্দ করেছিল ৬২১.৫৫ কোটি টাকা। এতেই শেষ নয়। উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে কেন্দ্রীয় সরকার ২১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ করেছে মহাকুম্ভ উপলক্ষ্যে। লক্ষ্য একটাই, কুম্ভ ভাঙিয়ে উত্তরপ্রদেশের অর্থনীতিতে জোয়ার নিয়ে আসা। কই বাঙালির দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে তো কোনওদিন এক পয়সাও দেয় না কেন্দ্র! দুর্গাপুজো তো ইউনেস্কোর কালচারাল হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিবছর দুর্গাপুজো দেখতে প্রচুর দেশি-বিদেশি অতিথির সমাগম হয় রাজ্যে। গত বছরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যবসা হয়েছে পুজোর সময়ে। কিন্তু তাতে সরাসরি সরকারি অংশগ্রহণ থাকে না। হ্যাঁ, পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ সরকার নিশ্চয়ই করে। সেটা সরকারের দায়িত্ব। পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক অনুদানও দিয়েছে, কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ করে সরাসরি বিনিয়োগ— নৈব নৈব চ। আর কেন্দ্রীয় সহায়তা তো কখনওই নয়। কুম্ভের তুলনায় অত্যন্ত অপরিসর কলকাতার রাস্তাঘাট। কিন্তু কোনওদিন একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি কোনও দর্শনার্থীর গায়ে। রাজ্যের পুলিস প্রশাসন এতটাই সচেতন থাকে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে যে, দেশপ্রিয় পার্কের পুজো হোক কিংবা সুজিত বসুর পুজো—যেখানেই সামান্যতম দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে, সেখানেই প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে বিধি নিষেধ আরোপ করেছে।
মোদ্দা কথা যোগীর প্রশাসন ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাকুম্ভ আয়োজনের নামে একটি বিরাট অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে। চূড়ান্ত ব্যর্থ উত্তরপ্রদেশের প্রশাসন। যোগীর রাজ্যের উচিত কী করে একটা মেগা ইভেন্টের আয়োজন করতে হয় তা পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো দেখে শেখা।
সর্বোপরি সংবিধান মোতাবেক ভারত এখনও ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষ কথাটার অর্থ হচ্ছে, সাধারণ নাগরিকের ধর্মাচরণে রাষ্ট্র নাক গলাবে না। কিন্তু মোদি ও যোগীর সরকার শুধু নাক গলিয়েছে তা-ই নয়, তারা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কুম্ভমেলার আয়োজন করেছে। যা কি সরাসরি সংবিধান বিরোধী নয়?