বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

কুল খেতে মানা
সন্দীপন বিশ্বাস

স্কুল থেকে ফেরার পথে বিন্তির চোখে পড়ল, বাজারে বিক্রি হচ্ছে বড় বড় কুল। পাশে রয়েছে আপেল কুল, টোপা কুল। তাই দেখে তার জিভে জল এসে গেল। মনে হল, কেটে নুন দিয়ে মেখে খেলে বিকেলটা জমে যাবে। মায়ের কাছে সে আবদার করল, ‘আমায় একটু কুল কিনে দাও না মা!’ 
মা বড় বড় চোখ পাকিয়ে বলল, ‘এখন নয়, সরস্বতী পুজোর দিন খাবি। কতবার বলেছি না, সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতে নেই! তাও বায়না করবি। পুজোর পর তোকে বস্তা বস্তা কুল কিনে দেব, খাস।’ 
শুনেই মুখ গোমড়া বিন্তির। বাড়ি ফিরতেই ঠাম্মা সেই মুখ দেখে বলল, ‘কী হল, বসন্তকালে মহারানির মুখে এমন ঘন কালো মেঘ জমে কেন?’
বিন্তি বলল, ‘দেখো না ঠাম্মা, বাজারে কী সুন্দর কুল বিক্রি হচ্ছে! মায়ের কাছে খেতে চাইলাম, মা বলল, সরস্বতী পুজো না গেলে কুল খেতে দেবে না।’
ঠাম্মা বলল, ‘ঠিকই তো বলেছে, সামনের বছর বড় পরীক্ষায় বসবি। মা সরস্বতীর কৃপা তো চাই। তাই না খাওয়াই ভালো। তাছাড়া দিদিভাই,আমি তো সারা বছর আমার ভাণ্ডার থেকে তোমাকে কুলের আচার সাপ্লাই দিই।’
বিন্তি হেসে ফেলে। ঠাম্মা বলে, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। তোকে একটা গল্প বলব। সেই গল্প থেকেই জানতে পারবি, কেন সরস্বতী পুজোর আগে কুল খায় না।’
খাওয়ার পরে ঠাম্মার ঘরে গিয়ে বিন্তি বলল, ‘ঠাম্মা, তোমার গল্প শুরু করো।’ ঠাম্মা বসে একটা বই পড়ছিল। সেটা সরিয়ে রেখে বলল, ‘সে অনেক দিন আগের কথা। মহর্ষি ব্যাসদেব মহাভারত রচনায় হাত দেবেন। তার আগে তিনি চাইছিলেন দেবী সরস্বতীকে তুষ্ট করতে। বদরিকাশ্রমে ধ্যানে বসার তোড়জোড় করছিলেন। বদ্রীনাথকে বলা হতো বদরিকাশ্রম। বদরি মানে হল কুল। প্রচুর কুলগাছ থাকার জন্য সেই জায়গাটার এমন নাম। ব্যাসদেবের অন্তরের কথা জানতে পেরে সেখানে আবির্ভূত হন দেবী সরস্বতী। দেখলেন, মহর্ষির হাতে একটি কুলের বীজ। তিনি বললেন, মহর্ষি আমি আপনার অন্তরের কথা জানি। আমাকে তুষ্ট করার জন্য আপনি ধ্যানে বসছেন। আমার একটি শর্ত আছে। এই কুলের বীজটি মাটিতে পুঁতে আপনি ধ্যানে বসবেন। এই বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে গাছ বেরবে। সেই গাছে ফল আসবে। সেই ফল পেকে খসে পড়বে আপনার মাথায়। তখন আপনার ধ্যানভঙ্গ হবে। তার আগে যদি আপনার ধ্যানভঙ্গ হয়, তবে সাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমিও তুষ্ট হব না। এর পরেই সরস্বতী অন্তর্হিত হলেন।
ধ্যানে বসলেন মহর্ষি। অনেক বছর পরে সেই গাছ বড় হয়ে তাতে কুল ধরল। সেই কুল পেকে একদিন মহর্ষির মাথায় পড়ল। ধ্যানভঙ্গ হল ব্যাসদেবের। সেদিনটা ছিল শুক্লপক্ষের পঞ্চমী, অর্থাৎ বসন্ত পঞ্চমী। তিনি ধ্যান থেকে উঠে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করলেন সরস্বতীর চরণে। নিবেদন করলেন সেই কুলও। সেই থেকে মর্ত্যে সরস্বতী পুজো শুরু হল বসন্ত পঞ্চমীতে। তাই আজও বাগদেবীর পুজোর আগে আমরা কুল খাই না।’ 
গল্পের ফাঁকে কখন ঘরে এসে বসেছে বাবা। গল্প শেষ হতেই বলল, ‘আরও একটি কারণ আছে বিন্তি। সেটা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত। আসলে কুল পাকতে পাকতে সরস্বতী পুজো হয়ে যায়। তার আগে শীতকালে আমাদের নানা রোগ-ভোগ, সর্দিকাশি হয়। তাই এই সময়ে কাঁচা ও কষা কুল খাওয়া মানা। এতে শরীরের ক্ষতি হয়, পেটেরও রোগ হয়। তাই পুরাণকথা বা গল্পের মধ্য দিয়ে একটা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চেষ্টা করা হয়েছে। সুনির্মল বসুর ‘শ্রীপঞ্চমীর ভোর’ কবিতায় ওই লাইন দুটো মনে আছে? ‘পূজার আগেতে কুল খেতে মানা, কুলতলা দিয়ে যাই,/ জিভে জল যেন জ’মে ওঠে যত কুলের গন্ধ পাই।’ তাই পুজোর আগে কুল খাওয়া মানা।’
বিন্তির মা হেসে বলল, ‘তাহলে বোঝা গেল, পুজোর আগে কুল এখন প্রতিকূল!’

11th     February,   2024
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা