বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

এআই একদিন দখল নেবে পৃথিবীর—আশঙ্কা করেছিলেন স্বয়ং স্টিফেন হকিং। সত্যিই কি মেশিন লার্নিং, চ্যাটজিপিটি, ডিপফেক, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের দাপটে দিশেহারা হয়ে পড়বে মানুষ? ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যানের বিবাদের নেপথ্যেও কি এআই নাকি পুরোটা মাইক্রোসফ্টের ব্যবসায়িক চাল? প্রশ্ন তুললেন মৃন্ময় চন্দ। 

সান ফ্রান্সিসকোর মিশন ডিস্ট্রিক্ট, এইনটিথ স্ট্রিট। অফিসে গভীর চিন্তায় মগ্ন এক ব্যক্তি। দু’হাত টেবিলে ছড়ানো। মাথার সামনের দিকে টাক পড়েছে। জন্মসূত্রে রাশিয়ান হলেও পাঁচ বছর বয়স থেকে জেরুজালেমের বাসিন্দা। রাশিয়ান ভাষার সঙ্গে সমানতালে হিব্রুও বলতে ও লিখতে পারেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। লাজুক এই মানুষটির নাম ইলিয়া সাটসকেভার। গোটা পৃথিবী তাঁকে এক ডাকে চেনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর (এআই) জনক হিসেবে। গত নভেম্বরে তাঁর তৈরি চ্যাটজিপিটি বদলে দিয়েছে আমাদের আটপৌরে ইতিহাস। কেঠো রাশভারী গাণিতিক সমীকরণে ঠাসা গবেষণাপত্র—সবেতেই সমান দড় এআই। গুপী-বাঘার মতো হাতে তালি দিয়ে হুকুম করলেই হল!

ডিপ লার্নিং ও অ্যালেক্সনেট
মানব মস্তিষ্কের গঠন ও তার জটিল কর্মপদ্ধতিতে বরাবরই উৎসাহী ইলিয়া সাটসকেভার। মস্তিষ্কের ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’-এর অনুকরণে তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন এআই-কে। সে কাজে সফলও হন। বন্ধু জেফ্রি হিন্টনকে সঙ্গে নিয়ে ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড মেনে এআই-কে করে তোলেন চৌকশ ও চটপটে। যন্ত্রের মস্তিষ্কে সঞ্চারিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষার ক্রমোন্নতিকে তাঁরা অভিহিত করলেন ‘ডিপ লার্নিং’ হিসেবে। ২০১২ সালেই সাটসকেভার, হিন্টন এবং হিন্টনের ছাত্র অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি মানব মস্তিষ্কের অনুকরণে তৈরি করছিলেন ‘অ্যালেক্সনেট’ নামে এক নতুন ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’।
‘অ্যালেক্সনেটের’ সাফল্যে মরিয়া হয়ে সাটসকেভারকে দলে টানতে ঝাঁপাল গুগল। বছরদুয়েক গুগলে কাটিয়ে ‘প্যাটার্ন রিকগনিশন’কে আরও তথ্যনিষ্ঠ, নিখুঁত করে ভাব-ভাষার আদানপ্রদানের কাজে লাগান তিনি। এরপরেই আসরে নামেন এলন মাস্ক। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গুগলের ‘ব্রেন ল্যাব’ থেকে সাটসকেভারকে নিয়ে আসেন ওপেনএআই-তে। ২০১৫ সালে এক বিলিয়ন ডলার নিয়ে সাটসকেভার ও স্যাম অল্টম্যান যুগ্মভাবে তৈরি করেন ওপেনএআই। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বুঝে টাকা ঢালতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করলেন না এলন মাস্ক বা পিটার থিয়েলের মতো ধনকুবেররা। হাজির হল মাইক্রোসফ্ট বা ওয়াই কম্বিনেটরের মতো একাধিক নামজাদা সংস্থাও।
চ্যাটজিপিটি, ডিপমাইন্ড ও আলফা-গো
২০১৬ সালের কথা। সাটসকেভার-অল্টম্যানের হাত ধরে তৈরি হল ‘জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফর্মার’ বা চ্যাটজিপিটি। এরপর ধাপে ধাপে এল জিপিটি-টু, থ্রি, ফোর এবং দাল-ই। মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে কঠিন কাজ—ভাষাশিক্ষা। এআই বা চ্যাটজিপিটি যখন এই কাজটি সাবলীলভাবে উতরে দিল, তখন প্রমাদ গুনলেন সাটসকেভার। বুঝলেন, মানুষের সমকক্ষ হয়ে ওঠা বা কালক্রমে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা! কলম্বাস যেভাবে আমেরিকার দখল নিয়েছিলেন, সেভাবেই মানবসভ্যতাকে হটিয়ে একদিন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গোটা বিশ্বের অধীশ্বর হবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন স্টিফেন হকিং। সেই আশঙ্কা যে কতটা সত্যি, তা বুঝে দুর্ভাবনায় বিনিদ্র রাত কাটাতে লাগলেন সাটসকেভার ও হিন্টন।
সেই বছরেই ৯-১৫ মার্চ সিওলে ডিপমাইন্ডের ‘আলফা-গো’র বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানে হেরে যান প্রখ্যাত গো-প্লেয়ার লি সেডল। দ্বিতীয় গেমে ৩৭তম চালে ‘আলফা-গো’ এমন চালে কিস্তিমাত করে, যা দেখে চোখ কপালে ওঠে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী-গবেষকদের। সেই চাল এতটাই সুচতুর এবং অভিনব ছিল যে, তা দেখে সাটসকেভার এবং হিন্টনের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। এআইয়ের দাপটে কী বিপদ আসতে চলেছে, তা উপলব্ধি করার পরেই স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে বিবাদ চরমে ওঠে ওপেনএআইয়ের এই মুখ্য বিজ্ঞানীর। এর পরেই অল্টম্যানকে ওপেনএআই থেকে হটানোর জন্য সাটসকেভার রীতিমতো উঠেপড়ে লাগেন।
অল্টম্যান ও মাইক্রোসফ্ট
সাটসকেভারের মতে, মানুষের উপরে কর্তৃত্ব ফলাবে এআই। অন্যদিকে চ্যাটজিপিটিকে আরও উন্নত ও ক্রেতা সহায়ক করে তুলতে বদ্ধপরিকর ছিলেন অল্টম্যান। সাটসকেভারের ক্ষোভটা সেখানেই। অল্টম্যানের বহিষ্কারের পিছনেও অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন তিনিই। আবার ওপেনএআই-এর ৭০০ জন কর্মচারীর মধ্যে যে ৫৫০ জন একটি খোলা চিঠিতে নিঃশর্তভাবে স্যাম অল্টম্যানকে ফেরানোর দাবি তুললেন, সেই দলে ছিলেন সাটসকেভারও। দাবি না মানা হলে তাঁরা একসঙ্গে ওপেনএআই ছেড়ে মাইক্রোসফ্টে যোগ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। মাইক্রোসফ্ট ইতিমধ্যেই ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ওপেনএআইতে। সংস্থার ৪৯ শতাংশ শেয়ারও তাদের হাতে। কিন্তু বহিষ্কার-কাণ্ডের পরেই যেভাবে মাইক্রোসফ্ট ঝাঁপিয়ে পড়ে অল্টম্যানের জন্য, তাতে অন্য জল্পনা জন্ম নেয় সিলিকন ভ্যালিজুড়ে।
এত কিছুর পরেও ওপেনএআইয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া ভাঙল না মাইক্রোসফ্ট। কিন্তু সেই সংস্থার সমস্ত প্রতিভাকে ছেঁকে তুলে আনার বার্তা দিলেন কর্ণধার সত্য নাদেল্লা। আসলে ওপেনএআই অধিগ্রহণে বিস্তর খরচ। কিন্তু ওপেনএআইয়ের সবাই যদি স্বেচ্ছায় মাইক্রোসফ্টে যোগ দেন, তবে কোনও সমস্যা নেই। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া যাবে গুগলকেও। 
কম যায় না গুগলও। ওপেনএআইয়ের রুদ্ধশ্বাস নাটকের মধ্যেই চ্যাটজিপিটি-ফোরকে টেক্কা দিতে আসরে নামল গুগলের ‘ডিপমাইন্ড’। নিঃশব্দে বাজারে হাজির করল ‘ম্যাসিভ মাল্টিটাস্ক ল্যাঙ্গুয়েজ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ পরিচালিত ‘জেমিনি’কে। ৩২ ধরনের কাজ বা মাপকাঠির ৩০টিতেই ‘জেমিনি’ নাকি দশ গোলে হারাচ্ছে চ্যাটজিপিটি-ফোরকে! কড়াইতে একটি অমলেট ভাজার ছবি দেখিয়ে ‘জেমিনি’কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ভাজা ঠিক হয়েছে কি না? চোখের পলকে উত্তর দিল ‘জেমিনি’—অমলেট এখনও ভাজা হয়নি। ডিমের কুসুমের পাশে বুদবুদ করছে। পুরোপুরি ভাজা হলে এই বুদবুদের দেখা মিলবে না।

ডিপফেক ও এআইয়ের ভালোমন্দ
বছর ঘুরলেই আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রচার-প্রস্তুতি পর্ব। তার মধ্যেও মাথাচাড়া দিচ্ছে এআই। ডিপফেক প্রযুক্তিতে তৈরি এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দু’হাতে জড়িয়ে ধরছেন ডাঃ অ্যান্টনি ফাউসিকে। গালে চুমুও খাচ্ছেন। কোভিডকালে এই ফাউসির সঙ্গেই ট্রাম্পের মন কষাকষি চরমে উঠেছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকের কথা। আচমকা নেটদুনিয়ায় ভাইরাল পাফার জ্যাকেট পরিহিত পোপ ফ্রান্সিসের ছবি। নেহাৎ মজা করার জন্য তৈরি ডিপফেক ওই ছবিটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। এতে বিশেষ দোষ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধের মতো অতিস্পর্শকাতর বিষয়ে যখন ভুয়ো তথ্য ছড়ায় এই ডিপফেকের মাধ্যমে—সেই তথ্য হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। তার জেরে প্রাণ হারান শিশু সহ বহু নিরপরাধ মানুষ। দিনকয়েক আগে এআইয়ের বাড়বাড়ন্তকে বাগে আনতে আসরে নেমেছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের তিনটি সরকারি সংস্থা। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় বরাবরই অগ্রণী ইইউ। কিন্তু ইইউয়ের তিন প্রভাবশালী দেশ—জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স বাধা দেয় প্রস্তাবিত সেই বিলে। যার জেরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এআই বিলও এখন বিশ বাঁও জলে।
কিছুদিন আগে জারা প্যাটেল নামে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মহিলার ভিডিওতে বসানো হয় অভিনেত্রী রশ্মিকা মন্দানার মুখ। তীব্র প্রতিবাদ জানান অভিনেত্রী। সরব হন অমিতাভ বচ্চন সহ একাধিক বলিউড তারকা। পরে ভিডিওটি সরিয়ে নেয় মেটা। কিন্তু কে বা কারা এই ভিডিওটি আপলোড করল, তার হদিশ পাননি বিশেষজ্ঞরা। আলিয়া ভাট, ক্যাটরিনা কাইফ বা কাজলকে নিয়েও তৈরি হয়েছে ডিপফেক ভিডিও।
এআইয়ের সবই কি খারাপ? বোধহয় না। তার প্রধান উদাহরণ বিখ্যাত চিত্রকর গুস্তাভ ক্লিম্‌টের আঁকা ‘মেডিসিন’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছবিটিকে নষ্ট করে দেয় নাৎসি বাহিনী। মাত্র একটা ফটো এবং দু-একটা স্কেচ থেকে ক্লিম্‌টের আসল ছবিটি পুনরুদ্ধার করে এআই। জোয়ানিস ভার্মিয়ারের অন্যতম বিখ্যাত ছবি ‘গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়ারিং’কেও একইভাবে ‘অক্লুডিং কনট্যুর’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে পুনর্নির্মাণ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে মেয়েটির মুখ এবং চোখ দু’টিকে তির্যকভাবে আলো ফেলে জীবন্ত করে তোলে এআই। রেমব্রান্টের ‘দ্য নাইট ওয়াচ’ এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘টু রেসলার’ ছবিকেও পুনর্নির্মাণ করে রাতারাতি সারা পৃথিবীর শিল্প-রসিকদের মন জয় করে নিয়েছে এআই।
জালিয়াতি-প্রবঞ্চনার প্রবণতা থাকবেই। তার মধ্যেও সতর্ক-সচেতন হয়ে ব্যবহার করতে হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে। হতে হবে ‘টেকনিক্যালি লিটারেট’ও। নইলে যে পিছু ছাড়বে না বিপদ!

17th     December,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা