বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

ফাটাকেষ্টর কালী
রাতুল ঘোষ

যে সময় কালের কথা বলছি, সেটা বিগত সাতের দশকের গোড়ার দিক। নকশাল আন্দোলনের ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ শহর কলকাতার মধ্যবিত্ত ছাপোষা বাঙালি সমাজকে ভয়ে তটস্থ করে রেখেছে। বেপাড়ায় বিবাহের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়াও যথেষ্ট ঝুঁকিবহুল। লালবাজারে পুলিস কর্তাদের ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। তৎকালীন ডিসি ডিডি দেবী রায়, বিভূতি চক্রবর্তীরা সিদ্ধান্ত নিলেন, কংগ্রেসের কিছু ডাকাবুকো, স্বাস্থ্যবান যুবককে নিয়ে উত্তর ও মধ্য কলকাতায় ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’ গড়ে তুলতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় নকশাল যুবকদের উপর তাঁরা নজরদারি চালাবে। রাত জেগে মহল্লা পাহারা দেবে। প্রয়োজনে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার স্বাধীনতাও তাঁদের দেওয়া হয়েছিল। এরই ফলশ্রুতি কাশীপুর ও বরানগরের গণহত্যা।
‘আরবান নকশাল’দের মোকাবিলায় পুলিসের হাতে গড়া এই অক্সিলিয়ারি ফোর্সেরই ফসল কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্ট। কলেজ স্ট্রিট বাটার উল্টোদিকের ফুটপাতে বসে তাঁকে ছয়ের দশকেও পান বেচতে দেখা যেত। গোটা মুখে বসন্তের দাগ। স্কুলে লেখাপড়ায় তেমন এগতে পারেননি। তবে ছোটবেলা থেকেই মা কালীর প্রতি কেষ্টর ভক্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। রোজ সন্ধ্যায় বাড়ির অদূরে ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে তাঁর দেখা মিলত নিয়মিত। বন্ধুদের নিয়ে গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনে একটা কালীপুজো করতেন। সেই পুজোই কয়েক বছর বাদে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে তুলে আনেন ফাটাকেষ্ট। নব যুবক সঙ্ঘের ব্যানারে পুজো হলেও যা গোটা দেশে অচিরেই ‘ফাটাকেষ্টা’র কালী পুজো রূপে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ক্রমেই বাড়তে থাকে তার জাঁকজমক, বৈভব। অতুলনীয় আলোকসজ্জা, চোখ ধাঁধানো মণ্ডপ ও ১৬ ফুটের বিশাল কালী প্রতিমা ফি বছর দূরদূরান্ত থেকে দর্শকদের চুম্বকের মতো সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের অপরিসর, সরু গলিতে টেনে আনতে শুরু করে। সাতের দশকেই এই বঙ্গের গাঁ-গঞ্জ তো বটেই, এমনকী পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকেও দর্শকদের ঢল আছড়ে পড়ত মধ্য কলকাতার এই প্রতিমা দর্শনের জন্য। সেই সঙ্গে ছিল বাড়তি আকর্ষণ—বলিউড ও টলিউডের রুপোলি পর্দার তারকাদের নিয়মিত উপস্থিতি। আর সেটাই ধীরে ধীরে প্রায় লোকগাথায় পরিণত করে তোলে ফাটাকেষ্টর এই কালীপুজোকে।
তখন উদ্বোধনী দিবস থেকে ধরলে প্রায় ১২ দিন এই কালীপ্রতিমা মণ্ডপে থাকত। চন্দননগরের বিখ্যাত আলোর খেলা কলকাতায় প্রথম এনেছিলেন ফাটাকেষ্টই। আলোকশিল্পী শ্রীধরের ম্যাজিকে বিস্ময়ে থ হয়ে যেতেন দর্শকরা। আর সবশেষে মা কালীর বিদায়ের দিনে যে বিশাল বর্ণময় শোভাযাত্রার আয়োজন করতেন ফাটাকেষ্ট, তেমনটা এ শহর আগে দেখেনি। ১০১টি ব্যান্ড পার্টি, ১০১টি মোবাইল আলোর গেট, শ’খানেক সুসজ্জিত লরিতে চাপানো দেবদেবীর মূর্তি, কীর্তন-ভজনের মোবাইল মঞ্চ নিয়ে সেই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার তিন-চার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে যেতে লাগত পাক্কা তিন ঘণ্টা। ভাবতে পারেন? বিসর্জনের দিন সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতার রাজপথের দু’দিকের ফুটপাথে, গাড়ি বারান্দায়, ছাদে, জানালার ধারে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনবিস্ফোরণ ফাটাকেষ্টকে জীবন্ত কিংবদন্তি বানিয়ে তোলে। আর তাঁর কালীপুজোও পরিণত হয় এক মিথে।
অধুনা প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্র কিন্তু পিছিয়ে ছিলেন না। পাশের পাড়া ৪৫ নম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটের সামনে সাতের দশকের শুরু থেকে তিনিও বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে কালীপুজো শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে কর্পোরেশন নির্বাচনে কে পি ঘোষকে হারিয়ে প্রথমবার কাউন্সিলার হন সোমেন মিত্র। ১৯৭১ সালে শহরে নকশাল আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলিতে সোমেন এবং ফাটাকেষ্ট দু’জনেই সাঙ্গপাঙ্গ সহ হাতে হাত মিলিয়ে কলকাতা পুলিসের সহযোগিতায় এই ‘জঙ্গি দমন’ অভিযানে নেমেছিলেন। তখন মধ্য কলকাতার রাজপথে দিনেদুপুরে চলত বোমা-গুলির লড়াই। মনে আছে, ১৯৭১ সালের কালীপুজোয় নকশাল হামলার আশঙ্কায় কলকাতা পুলিসের বিশাল টিম এসকর্ট করে সোমেন মিত্র ও ফাটাকেষ্টর প্রতিমা দু’টি একসঙ্গে বিসর্জনের ঘাটে নিয়ে গিয়েছিল। সেবার ঢাকের বাদ্যি ছাড়া আর কোনও জাঁকজমক ছিল না। এরপর এল ১৯৭২ সাল। পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের শুরু। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে তিনটি কোয়ালিশন সরকারের পতনের পর, কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী মন্ত্রিসভাও গঠন করে তারা। শিয়ালদহ বিধানসভা কেন্দ্রে জনতা পার্টির প্রার্থী বিনয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে সোমেন মিত্র প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন। আর এরপর থেকেই পাশাপাশি দু’টি কালীপুজোর মধ্যে শুরু হয় প্রবল আকচাআকচি। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। হাম কিসিকে কম নেহি। ১৯৭২ সালে নব কংগ্রেস আমলের শুরুতেই কালীপুজোয় এই প্রতিযোগিতা কারও নজর এড়ায়নি। আমহার্স্ট স্ট্রিটের উপর কলকাতার রাজভবনের গেটের নিখুঁত শিল্পকর্ম বসিয়ে দিয়ে গেল মডার্ন ডেকরেটর। আর ফাটাকেষ্ট বানালেন চারমিনার। ওরিয়েন্ট ডেকরেকটরের সেই সূক্ষ্ম কারুকাজ আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেবারই বাঁধভাঙা দর্শকের ঢেউ প্লাবিত করেছিল দুই কালীপুজো মণ্ডপকে। পাশাপাশি দুই পুজোর আয়োজকরাই প্রতিদিন মারকাটারি বিচিত্রানুষ্ঠান করে আম জনতাকে দুশো মজা উপহার দিতেন। আমহার্স্ট স্ট্রিটের কালীপুজো কমিটি সেন্ট পলস কলেজের মাঠে বড় বড় যাত্রাপালা বসাত। সত্যম্বর অপেরা, নট্ট কোম্পানির সুপারহিট পালা দেখতে উপচে পড়ত লোকের ভিড়।
আর ফাটাকেষ্টর পুজোয় রিসেপশন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। আমৃত্যু, অর্থাৎ ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ফি বছর ধুতি-পাঞ্জাবি পরে ভুবন ভোলানো হাসি মুখে উত্তমকুমারকে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে মাতৃ প্রতিমা দর্শন করতে আসতে দেখেছি। তবে মহানায়কের সঙ্গে ‘ফাটাকেষ্ট’র সখ্যতার নেপথ্যে একটা ঘটনার ভূমিকা আছে। ১৯৭১ সালে ময়দানে পুলিসের গুলিতে খুন হন ‘দেশব্রতী’ পত্রিকার সম্পাদক নকশালপন্থী বুদ্ধিজীবী সরোজ দত্ত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পুলিস জিপ থেকে নামিয়ে তাঁকে বলা হয়, ‘আপনি এখন মুক্ত। পালান।’ লালবাজারের রুনু গুহনিয়োগী, সুজিত সান্যাল, রাজকুমারদের টিম ঠান্ডা মাথায় এনকাউন্টারের বাহানা দেখিয়ে পিছন থেকে গুলি করে আপাদমস্তক ভদ্রলোক সরোজ দত্তকে ‘খুন’ করেছিল। এই ‘দেশব্রতী’ পত্রিকার অফিস ছিল ফাটাকেষ্টর কালীপুজোর মণ্ডপ থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে, কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটে।
যে দিন সকালে ওই খুনের ঘটনাটি ঘটে, সেদিন ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাট থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে প্রাত্যহিক মর্নিং ওয়াকে এসেছিলেন উত্তমকুমার। দূর থেকে তিনি এই গুলি চালানোর ঘটনাটি দেখে ফেলেন। পুলিস অফিসাররাও সেটা অনুধাবন করতে পারেন। এরপর সাক্ষী দেওয়া এবং না দেওয়ার জন্য পুলিস ও নকশাল—উভয়পক্ষ থেকেই উত্তমকুমারের ওপর প্রবল চাপ আসতে থাকে। গোটা ঘটনাটি জানতে পেরে একদিন সকালে সোজা ময়রা স্ট্রিটে উত্তমকুমারের ফ্ল্যাটে চলে যান ফাটাকেষ্ট। তাঁরই পরামর্শে মহানায়ক সব শ্যুটিং বাতিল করে কিছুদিনের জন্য মুম্বইয়ে গিয়ে এক চিত্রতারকার বাড়িতে আত্মগোপন করেন। পরে এই ঘটনার উত্তাপ কিছুটা থিতিয়ে এলে কলকাতায় ফিরে এসে আবার কাজ শুরু করেন মহানায়ক।
এরপর থেকে ফাটাকেষ্টর কালীপুজোয় আসার অনুরোধ উত্তমকুমার কখনও ফিরিয়ে দিতে পারেননি। সাতের দশকের মাঝামাঝি একবার সোমেন মিত্রের সনির্বন্ধ অনুরোধেও আমহার্স্ট স্ট্রিটের কালীপুজোয় আসেননি তিনি। অনেকেই জানেন, বিবেকানন্দ রোডে উত্তমবাবুর পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের একটা ওষুধের দোকান ছিল। দোকানের নাম আইভি কোম্পানি। পরদিন সকালে ‘ডেয়ার ডেভিল’ জীবন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে রামচন্দ্র সিং, শঙ্কু সিংরা বাইকে চেপে এই আইভি কোম্পানির দোকানে দুটো বোমা ছুঁড়ে পালিয়ে আসে। পুলিস অভিযুক্তদের অ্যারেস্ট করে। দীর্ঘদিন মামলাও চলে। কিন্তু সেই সময় অফিসে হাজির থাকার ‘অ্যালিবাই’ দেখিয়ে সকলে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
এবার  সংক্ষেপে ফাটাকেষ্টর জীবদ্দশায় ‘মিথ’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে দু-একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। ছয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট মার্কেট এলাকায় তিনজন কেষ্ট খুচরো মাস্তানি করে কিঞ্চিৎ পরিচিত হয়েছিল। এর মধ্যে জহর সিনেমার অদূরে বিড়ি কেষ্টা এবং ড্রাইভার কেষ্টা এ লাইনে বেশি দূর উঠতে পারেনি। কিন্তু পান কেষ্টার উত্থান ঘটে একটি রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর। নিজের পাড়ায় এক সংঘর্ষে নকুলের হাতে তিনি ছুরিবিদ্ধ হন। দু’জন আততায়ী পরপর ‘স্ট্যাব’ করেছিল। ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তাঁর দেহ। বাঁচার কোনও আশা ছিল না। কিন্তু কাছেই মেডিক্যাল কলেজে খুব দ্রুত তাঁকে ভর্তি করা হয়। ডাক্তারদের অক্লান্ত চিকিৎসার পর প্রায় অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে পাড়ায় ফিরে আসেন ফাটাকেষ্ট। এই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন দেখে পল্লীবাসী নিদারুণ বিস্মিত হয়ে কেষ্টার নামের আগে জুড়ে দেয় ‘ফাটা’ শব্দটি।
অথচ প্রকাশ্যে তাঁকে কেউ একটা চড় মারতেও দেখেননি। কিন্তু সেই ব্যক্তি যখন ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও সুস্থ দেহে ফিরে আসেন, ঠিক তখন থেকেই তাঁকে ঘিরে সাহসী যুবকদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। সাতের দশকের গোড়া থেকে রেল, আর্মি ও পুলিসের অকশনে নেমে পড়েন ফাটাকেষ্ট। ১৯৭২ সালে কংগ্রেস আমল শুরু হওয়ার পর এই বঙ্গের অকশন সার্কিটে যোগ দিতে আসা সব মাস্তানদের মধ্যে নিখাদ কুলীনের মর্যাদা পেতেও শুরু করেন। তাঁকে দলবল সহ ঢুকতে দেখলে প্রথম দিকে অকশনে ‘বিড’ করতে ইতস্তত করত অন্য মাস্তানরা। শেষ পর্যন্ত বছর খানেকের মধ্যে অকশন থেকে পর্যাপ্ত কাঁচা অর্থ কামানোর পর কেষ্টা বোঝেন, বিশাল কালীপুজোর আয়োজক রূপে তাঁর নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর থেকে পানাগড়ের আর্মি অকশনে, চিত্তরঞ্জন লোকোমটিভে রেলওয়ে অকশনে, পুলিস ট্রেনিং স্কুলের পুলিস অকশনে কিংবা হাওড়ায় লোহার স্ক্র্যাপের নিলামে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হানা দেওয়া কমিয়ে দেন তিনি। পরিবর্তে অকশনে জয়ী বিডারের সঙ্গে পার্সেন্টেজ ডিলে চলে যান। যে কেউ বিড জিতুক, মোট ডিলের পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কাটমানি ফাটাকেষ্টকে দিতেই হবে। এই অলিখিত ডিল প্যাটার্ন বামফ্রন্ট আমলেও বহু বছর চলেছিল। ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে নব কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পর সরকারি ড্রাইভারের একটা চাকরি পান ফাটাকেষ্ট। কিন্তু কোনওদিন সেই চাকরি না করেও দিব্যি নিয়মিত মাইনে পেয়ে যেতেন।
ফাটাকেষ্টর কালী ঘিরে এক ধরনের অলৌকিকতার গল্প লোকের মুখে মুখে পল্লবিত হয়ে মায়ানগরী মুম্বইতেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালে ‘সমঝোতা’ ফিল্ম রিলিজের পর বাঙালি পরিচালক অজয় বিশ্বাস কালীপুজোর মঞ্চে এনে তোলেন তৎকালীন উঠতি তারকা ‘শটগান’ শত্রুঘ্ন সিন্‌হাকে। জানা যায়, শত্রুঘ্নই প্রথম ‘ফাটাকেষ্ট’র কালীর অলৌকিকতার আখ্যান মুম্বইয়ে তারকা মহলে ছড়িয়ে দেন। পরের বছর এলেন নবীন নিশ্চল। আর ১৯৭৫ সালে স্বয়ং মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চন।
‘বিগ বি’ ততদিনে ‘জঞ্জির’ ও ‘দিওয়ার’ ফিল্মে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয় করে সুপারস্টার হওয়ার পথ প্রায় নিষ্কণ্টক করে ফেলেছেন। তাঁকে কাছ থেকে দেখতে কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের উপর শিব মন্দিরের সামনে একশো ফুটের বিশাল উদ্বোধনী মঞ্চ প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হল। তখন কলকাতা ও দার্জিলিংয়ে অমিতাভ ও রেখা অভিনীত ‘দো আনজানে’ ছবির শ্যুটিং চলছিল। সেবার মধ্য কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলে গিয়ে ফাটাকেষ্ট কালীপুজোয় উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান বচ্চনকে। পরিচালক দুলাল গুহ সুপারস্টারকে মনে করিয়ে দেন, এই প্রতিমা দর্শনের পর ‘বিহারিবাবু’ শত্রুঘ্ন সিনহার মুগ্ধতার স্মৃতি। বিগ বচ্চন রাজি হয়ে যান। কলেজ স্ট্রিট বাটার দিক দিয়ে ঝড়ের গতিতে তাঁর কনভয় প্রবেশ করেছিল। সরু গলি দিয়ে পায়ে হেঁটে প্রতিমা দর্শনের পর ফের মঞ্চে উঠে ‘নমক হারাম’ ফিল্মের অবিস্মরণীয় ডায়লগ আউড়ে আসর মাতিয়ে দিয়েছিলেন ‘বিগ বি’। মাসখানেক বাদে একটা পেল্লাই  হীরে বসানো (মাতৃ প্রতিমার জন্য) নাকছাবি ফাটাকেষ্টার হাতে তুলে দেন পরিচালক দুলালবাবু এবং বলেন, ‘এটা অমিতাভ ও জয়া পাঠিয়েছে। মাকে পরাবেন।’
কয়েক বছর বাদে, দীপাবলি উৎসবের মধ্যেই এক ভোররাতে ওই দুর্মূল্য হীরের নাকছাবিটি স্থানীয় এক চোর মই বেয়ে উঠে চুরি করে গা ঢাকা দেয়। সেটা সিসিটিভি ক্যামেরার যুগ নয়। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার পুলিস বউবাজারের সোনাপট্টিতে সব জুয়েলারি দোকানে খোঁজখবর নেয়। শেষ পর্যন্ত এক ছোট্ট জুয়েলারি দোকানের মালিক কবুল করেন, তিনি ওটি অল্প দামে কিনে সোনা গলিয়ে ফেলেছেন। অনেক কষ্টে হীরে ফেরত পাওয়া যায়। বিগ বি’র দেওয়া সেই নাকছাবির হুবহু রেপ্লিকা বানিয়ে এখন সেটি বছরে একবার ব্যাঙ্ক লকার থেকে বের করে মা কালীকে পরানো হয়। ভক্তদের দেওয়া সোনার থালা, বিশাল সীতাহার, মাথার টিকলি ও সোনার জিহ্বাও থাকে সেই লকারেই।
এরপর অমিতাভ বচ্চন ১৯৯১ সালে বিনোদ খান্নাকে নিয়ে ফের এসেছিলেন ফাটাকেষ্টর মা কালী দর্শনে। এর মাঝে কিংবদন্তি রাশিয়ান গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিন থেকে সাতের দশকের সুপারস্টার রাজেশ খান্না, ড্রিম গার্ল হেমা মালিনী, আশা ভোঁসলে, আর ডি বর্মন, বাপ্পি লাহিড়ি, মুকেশ খান্না-রূপা গঙ্গোপাধ্যায়-নীতীশ ভরদ্বাজ সহ ‘মহাভারত’ মেগা সিরিয়ালের ফুল টিম, চিরসবুজ বলিউড হিরো দেব আনন্দ জিতেন্দ্র, রানি মুখোপাধ্যায় সহ মায়ানগরীর অসংখ্য কুশীলবের পদধূলি পড়েছে এই পুজোয়। রানি মুখোপাধ্যায় যেবার এসেছিলেন, সেবার ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য মানিকতলা বাজারে রাতে দোকান খুলিয়ে গোরু বাঁধার মোটা দড়ি কিনে এনেছিলেন উদ্যোক্তারা।
মনে পড়ছে, ১৯৭৭ সালের কথা। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার গঠনের পর সেবার কালীপুজোয় দ্রুত প্রতিমা বিসর্জনের জন্য জবরদস্তি করে পুলিস। ফাটাকেষ্টা পাড়ার ছেলেদের নিয়ে পুলিসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বলপূর্বক মণ্ডপ থেকে কালী প্রতিমা বের করতে গেলে সিলিংয়ে টাঙানো বিশাল ঝাড়বাতির কাঁচ ভেঙে যায়। আমহার্স্ট স্ট্রিটের কালীপুজোতেও একইরকম পুলিসি উপদ্রব চলে। সেবার হাতে হাত মিলিয়ে সোমেন মিত্র এবং ফাটাকেষ্টকে লড়াই করতে দেখেছিল পল্লীবাসী। তাবড় তাবড় কংগ্রেস নেতারা এসে সেই বিক্ষোভে সামিল হন। প্রতিবাদে সেদিন রাতে অনাড়ম্বরভাবে সেবার দুই প্রতিমার নিরঞ্জন হয়েছিল।
জীবদ্দশায় ‘মিথ’ হয়ে যাওয়া সেই ফাটাকেষ্ট ১৯৯২ সালে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নার্সিংহোমে মাত্র একদিন থেকে প্রয়াত হন। সেই সঙ্গে উধাও হয়ে যায় বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে সুদে খাটানো তখনকার দিনে পঞ্চাশ লক্ষেরও বেশি টাকা।
তারপর তিন দশক কেটে গিয়েছে। বারাসতে কেএনসি রেজিমেন্ট, সন্ধানী, তরুচ্ছায়া, নবপল্লী পায়োনিয়ার ক্লাবের রমরমা বেড়েছে। কিন্তু ফাটাকেষ্টর নব যুবক সঙ্ঘের কালীপুজোকে আজও কেউ টপকে যেতে পারেনি। মাতৃপ্রতিমার পিছনে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো এখন নিরাপত্তার কারণেই আর হয় না। কিন্তু অতীতে কুমোরটুলির শিল্পী কালীপদ পাল, পুত্র মাধব পারে পর তাঁর কন্যা মিলি পালের হাতে তৈরি মাতৃ প্রতিমার সৌন্দর্য আজও দূরদূরান্ত থেকে ভক্তদের টেনে আনে। মুম্বইয়ের আন্ধেরি স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ফাটাকেষ্টর এই পুজোর ফ্র‌্যাঞ্চাইজিও বছর দশেক আগে চালু হয়েছে। ‘মহাগুরু’ মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত টলিউড ফিল্ম ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ও সুপারহিট হয়েছিল। কে  পেরেছেন স্পনসরবিহীন সেই সময়ে গোটা কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের তিনশো মিটার রাস্তাজুড়ে পোলার ফ্যান ও ঝাড়বাতি লাগিয়ে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিতে? কিংবা উচ্চকোটির সাধিকা আনন্দময়ী মাকে মণ্ডপে মাতৃদর্শনে আনতে? গুরু সীতারামদাস ওঙ্কারনাথকে তো কাঁধে তুলে নিয়ে মা কালীর সামনে এনেছিলেন ‘অদ্বিতীয়’ ফাটাকেষ্ট। সেসব ঘটনা মনে পড়লেই আজও শরীরে শিহরণ জাগে।
ছবি নবযুবক সঙ্ঘের সৌজন্যে ও অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়

12th     November,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা