বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

শক্তিরূপেণ

১৯৯৮। দুর্গাপুজোয় হাতেখড়ি হল আর্ট কলেজ পাশ করা এক যুবকের। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ২৫টা বছর। এখন তিনি কিংবদন্তি। মা দুর্গা তাঁর কাছে শুধু দেবী নন, শক্তির অপর নাম। সেই ভাবনাই কলমে-তুলিতে রবিবারের ক্যানভাসে মেলে ধরলেন শিল্পী সনাতন দিন্ডা।
 
‘পথের পাঁচালী’র অপুর দিদির নাম ছিল দুর্গা। শুনেছি, আমার দিদার মায়ের নামও নাকি দুর্গাবালা দাসী! এরা তো শুধু নামে... বেনামে আরও কত দুর্গার সঙ্গে আমাদের রোজ দেখা হয়ে যায় রাস্তাঘাটে। কেউ আজীবন মুখ বুজে সব যন্ত্রণা-লাঞ্ছনা সহ্য করে চলেছে, কেউ বা অত্যাচারিত হতে হতে হারিয়ে ফেলেছে সেই বোধটুকুও। কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কোনওদিন প্রতিবাদে টুঁ শব্দটি করতে পারেনি। শুধু মনের ভিতরে জ্বলে মরেছে। পুজো এলে অনেকেরই মনে পড়ে যায় তাদের কথা। পড়বে না-ই বা কেন? দুর্গাপুজো মানে আমার কাছে শিল্প হতে পারে, আম জনতার কাছে তো এক নারীর লড়াইয়ের কাহিনি!
আমারও মনে পড়ে... তামিলনাড়ুর একটি মেয়ের কথা। খবরের কাগজের পাতাতেই ওর সঙ্গে পরিচয়। মেয়েটির মাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল চেন্নাইয়ের নিষিদ্ধপল্লিতে। তারপর কন্যাসন্তানের জন্ম। একই হাল হওয়ার কথা ছিল তারও। কিন্তু সে জেদ ধরে পড়াশোনা করে আজ সেই অন্ধকার জীবন থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমার কাছে ওই মেয়েটিই দুর্গা!
কিংবা রোজ রোজ অত্যাচারের শিকার হওয়া কোনও একটি মেয়ে যদি ভাবে, আমিও তো পারি দুর্গার মতো হাতে অস্ত্র নিয়ে অত্যাচারীকে বধ করতে। হয়তো সে পারছে না, পারবেও না কোনওদিন। কারণ, এই পুরুষশাসিত সমাজে এই পারাটাই খুব মুশকিল। তবু মনের মধ্যে পুষে রাখা এই ইচ্ছেটাই তো বড় ব্যাপার! এই মেয়েটি হয়তো পারছে না, কিন্তু মাতঙ্গিনী হাজরা তো পেরেছিলেন। অনেকে বলবেন, কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! মাতৃভূমিকে অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে সংগ্রামে নেমেছিলেন মাতঙ্গিনী। এর সঙ্গে এখনকার সময়ের মিল কোথায়? কিন্তু পরাধীনতা তো আজও সমাজের প্রতিটা ইট-কাঠ-বালিতে লুকিয়ে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আজও হয়তো কতজনের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে, অথচ তারা প্রতিবাদ করতে পারছে না। টানা একটা উদ্বেগে ভুগছে, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এমনটা হতে হতে হঠাৎ একদিন বিস্ফোরণ ঘটল। এটা কি প্রতিবাদের একটা ধরন নয়? সেখান থেকেই তো দুর্গার জন্ম!
পুরাণেও তো সেই ভাবনার কথাই লেখা। অশুভ শক্তির বিনাশ করতে পারছে না পুরুষরা। কারণ সে জন্মেজয়। কোনও পুরুষ তাকে মারতে পারবে না। তাহলে এই পুরুষশাসিত দেবলোকে তাকে মারবে কে? উত্তরটা সহজ, এক মহিলা। তাঁকে এগিয়ে দেওয়া হল। অস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে নামানো হল যুদ্ধের ময়দানে। ওই সময় যে সামাজিক প্রেক্ষিত ছিল, তা আজ বদলে গিয়েছে। আমরা দার্শনিকভাবে অন্যরকম ভাবছি। কিন্তু নারীদের মনে মনে প্রতিবাদের আকাঙ্ক্ষা... দুর্গা হয়ে ওঠার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যায়নি। কোনওদিন হবেও না। 
এই ভাবনাটা কিন্তু আমার শুরু থেকে ছিল না। তবু দুর্গাপুজোয় হাতেখড়ির বছরেই বিপ্লবটা করে দিয়েছিলাম। ১৯৯৮... গণেশজননী। সেবারই ঠিক করে ফেলেছিলাম, দুর্গাকে আর হাতে অস্ত্র ধরিয়ে অসুরবিনাশিনী রূপে দেখাব না। বরং কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যেমন ঘরের মেয়ে উমা-গৌরী রূপে দেখিয়েছিলেন, সেই পথে হাঁটব। ঘরের মেয়েও তো যুদ্ধ করে! সেই লড়াই কিন্তু অনেক বেশি কঠিন। প্রতি পদে অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করে থাকে তাঁর জন্য। অথচ মজার বিষয়, সিংহভাগ ঘরের মেয়ে কিন্তু সেই যুদ্ধের ময়দান থেকে দৌড়ে পালিয়ে আসতে পারে না। অত্যাচারীকে বধ করাও ভাগ্যে নেই তার। তবু কখনও সেই গৃহকর্মে নিপুণা 
মেয়েটির মনের কোণে একটা ফুলকি জ্বলে উঠবে, সেই আশাতেই ২৫টা বছর কাটিয়ে দিলাম।
এই ২৫ বছরে সারা পৃথিবীর লেখা পড়েছি, দুনিয়া ঘুরেছি... আর ততই বুঝেছি দুর্গা আসলে একজন ‘আইডল’। আগে আমি দুর্গাকে মা হিসেবে দেখতাম, মেয়ে হিসেবেও। কিন্তু এখন ‘আইডল’ হিসেবেই দেখি। আসলে মানুষ তো সারাজীবন একটাই দর্শন নিয়ে পড়ে থাকতে পারে না। উচিতও নয়। একজন শিল্পীর জীবনে ছবি আঁকা হোক বা ভাস্কর্য তৈরি, সবক্ষেত্রেই উত্তরণ ঘটে। আমিও সেই পথের পথিক। আর তাই দুর্গাকেও আমি আন্তর্জাতিক করে তুলেছি। তাকে কেউ ভক্তিভরে মা বলতে পারেন, দুটো হাত বুকের সামনে করে কপালে ঠেকাতে পারেন। প্রতিমার মধ্যে মূর্ত প্রতিবাদ তাতে ঢাকা পড়ে না। গত ২০ বছর ধরে দুর্গাকে আমি বঙ্গজননী করে রাখিনি। শাড়ির বদলে  সাজিয়েছি আন্তর্জাতিক পোশাকবিধি মেনে, প্রতিমার গঠন এবং দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে। 
তবু সেই দুর্গার মুখে মধ্যেও লুকিয়ে থাকে আমার মেয়ের আদল। এ জীবনে যাকে সবথেকে বেশি ভালোবাসি, তার ছায়া, অবয়ব... সবটুকু।
আমি কুমোরটুলির ছেলে। কুমোরটুলি ছাড়া কিছু বুঝি না। এটা আমার গর্ব! দক্ষিণ কলকাতার উপকণ্ঠে এক ক্লাবঘরে বসে প্রতিমা বানাতে গিয়েও তাই কুমোরটুলির মাটি ছাড়া আমার চলে না। ওখানকার পরিকাঠামো আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ছোটবেলায় বাড়ির সামনে এত দুর্গা তৈরি হতো। ঘুরে ঘুরে দেখতাম। দেখে নকল করতাম। ছোট ছোট করে প্রতিমা বানাতাম আর রোজ ভেঙে ফেলতাম। কিন্তু দুর্গাপ্রতিমার ক্ষেত্রে আমার হৃদয়-মস্তিষ্ক তৈরি করে দিয়েছেন অশোক গুপ্ত। পুরাণ বর্ণিত রূপ ধরেই সেজে উঠত তাঁর দেবী-কাঠামো। সেই সব দেখেই বড় হয়েছি। প্রভাবিত হয়েছি। কিন্তু ওঁর সঙ্গে আমার প্রতিমার পার্থক্য বিরাট। আমার দুর্গার হাতের মুদ্রা কিংবা চোখে নন্দলাল বসুর কাজের প্রভাবও দেখতে পাই কখনও কখনও। অবন ঠাকুরের অনুপ্রেরণাও লুকিয়ে থাকে অবচেতনে।
প্রথম প্রথম এত দর্শনের উপর ভিত্তি করে কাজ করতাম না। মায়া ছিল, আবেগও তখন অনেক বেশি। সেসব ভেঙেচুরে বেরিয়ে এসেছি কবেই। এখন দুর্গার কাঠামো গড়ার আগে মিশরের কথা ভাবি... গুস্তাভ ক্লিম্঩ট, ভ্যান গঘের কথা ভাবি। আমার যে সব মাস্টারমশাইরা রয়েছেন, তাঁদের কথা মনে পড়ে যায়। তাংদের শিক্ষাটাও। কেন? হয়তো বয়স পঞ্চাশ হয়ে গিয়েছে বলে। আর তাই দুর্গাপুজোকে জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক জায়গায় আটকে রাখতে আমি রাজি নই। নিজেকে সেভাবে বদলেছি। কিন্তু গিরগিটি হয়ে যাইনি। আমার পা এখনও মাটিতে। আমার তৈরি ঠাকুরেরও পা মাটিতেই পড়বে। 
শিল্পীর ছবি : অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়

8th     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা