বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন
এস শ্রীশান্থ

সময়ের নিজস্ব দাবি থাকে। কালের নিয়মে ছাইচাপা পরিস্থিতির ভিতর থেকেও তা বেরিয়ে আসে। তাই বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতীয় সমর্থকদের এই ব্যাকুলতা ও কাপ জেতার আকুতির মধ্যে অন্যায় কিছু দেখছি না।
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। তাও ১২ বছর পর। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির আকাঙ্খা পালতোলা নৌকার মতো ছুটবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। ২০১১ সালেও একই রকম উন্মাদনা ছিল। দেশের যে প্রান্তে খেলতে গিয়েছি, সবার মুখে একটাই কথা—‘স্যর, ওয়ার্ল্ড কাপ জিতনা পড়েগা।’ সে হোটেলের কর্মীই হোক কিংবা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিআইএসএফ জওয়ান। আসলে ক্রিকেট আজও ভারতীয় জীবনের অঙ্গ। আমাদের ধর্ম, ভালোবাসা, বেঁচে থাকার জিয়নকাঠিও বটে। এশিয়া কাপ জেতার পর তাই রোহিতের হাতেই কাপ দেখতে পাচ্ছি, চাইছিও। সাহস করে বলতে পারি, এই সিরাজকে থামানোর দম কার আছে! বিশ্বকাপের ঠিক আগে ফর্মের শিখরে টিম ইন্ডিয়া। কোহলি, শুভমানদের আত্মবিশ্বাস দেখে ‘পুষ্পা’ সিনেমার সেই জনপ্রিয় সংলাপ মনে পড়ছে—‘ম্যায় ঝুকেগা নেহি...।’
ক্রিকেটের এই মহাকুম্ভে সকলেই অন্তত একবার ডুব দিতে চায় অমৃতের সন্ধানে। কারও মনস্কামনা পূর্ণ হয়, কারও হয় না। আমি ঩কিন্তু সেই ভাগ্যবান ক্রিকেটার, যে দু’বার বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তিরাশিতে কপিল দেবের হাতে যেদিন প্রথমবার কাপ উঠেছিল, তখন আমি মাত্র চার মাসের। ভারতীয় ক্রিকেটে নবজাগরণের উত্তাপ আহরণের সুযোগ হয়নি। তবে ২০০৭ সালে প্রথম টি-২০ বিশ্বকাপ জয়, আজও ভাবলে শিহরিত হই। কিন্তু ২০১১ সালের ২ এপ্রিল কখনও ভোলার নয়। ভুলবই বা কী করে! মায়াবী রাতে ওয়াংখেড়ে থেকে ট্রাইডেন্ট হোটেলে ফেরার কয়েক ঘণ্টা কীভাবে কেটে যে গিয়েছিল, বুঝতেও পারিনি। সকলেই তখন ঘোরের মধ্যে। আতসবাজি পুড়ছে, ব্যান্ড বাজছে, কোমর দোলাচ্ছে লক্ষ লক্ষ সমর্থক। এ এক অন্য স্বাধীনতার স্বাদ!
বলতে দ্বিধা নেই, এগারোর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলে আমি ছিলাম ‘অ্যাক্সিডেন্টাল মেম্বার্স’। প্রবীণ কুমার চোট না পেলে বিশ্বকাপ খেলাই হতো না। পুরো জানির্টাই ছিল নাটকীয়তায় মোড়া। যত দূর মনে পড়ে, বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড খেলতে এসেছিল আমাদের এখানে। বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান থাকায় ‘ছুটি’ নিয়েছিলেন আশুভাই (আশিস নেহরা)। এক অনুষ্ঠানে কোচ গ্যারি কার্স্টেনের সঙ্গে দেখা। বললেন, তুমি কি খেলবে? গুয়াহাটি ও জয়পুরে দুর্দান্ত বল করেছিলাম। তখনও বুঝিনি, আমি আসলে বিশ্বকাপ দলে ব্যাক-আপ প্ল্যানের অঙ্গ। প্রবীণ ভাইয়ের জন্য খারাপ লেগেছিল। তবে মনে মনে নেহরা ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম ‘ছুটি’ নেওয়ার জন্য। না হলে তো ঘরের মাঠে আমার বিশ্বকাপ খেলা ও জেতা, দু’টোই অধরা থেকে যেত।
মীরপুরে প্রথম ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রত্যাশা ছুঁতে পারিনি। স্বাভাবিকভাবেই ঠিকানা হয় ড্রেসিংরুম। হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। ফাইনালের আগের দিন হঠাৎ শচীন পাজি আমাকে কোচ গ্যারি কার্স্টেনের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, শ্রীকে ফাইনালে খেলানো উচিত। ধোনিভাইও সায় দিয়েছিল। ভেবেছিলাম, আমার সঙ্গে মজা হচ্ছে। ভুল ভাঙল রাতে। ডিনারের পর ভাজ্জিপার (হরভজন সিং) ফোন, ‘তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়, কাল ফাইনালে তুই খেলবি।’
সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না, ফাইনালে আমি হিট স্ট্রোকের শিকার হয়েছিলাম। কয়েক ওভার পর আর বল করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। শচীনপাজি পিঠে হাত রেখে বলল, ‘শ্রী কাম অন, তুই পারবি। ট্রফিটা জিততেই হবে।’ সেকথা আজও কানে বাজে। কাপ জেতার ঠিক আগের মুহূর্তগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। গ্যালারি গাইছে বন্দে মাতরম... গায়ের রোম খাড়া করে দেওয়ার মতো এক আবেগঘন দৃশ্য। সেই উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল ধোনির সেই ‘দে ঘুমাকে’ স্টাইলে হাঁকানো বিশাল ছক্কা। ম্যাচ তো আগেই চলে এসেছিল আয়ত্তে। তবে মাহি ভাই যে কুলশেখরার বলে এভাবে সপাটে ছক্কা হাঁকিয়ে ২৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে, তা ছিল সাধারণ চিন্তায় অকল্পনীয়। ক্যাপ্টেন এমনই হওয়া উচিত, যে সামনে থেকে বুক চিতিয়ে লড়াই করে গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করবে। ফাইনালে যুবি পাজির আগে ধোনির ব্যাট করতে নামার সিদ্ধান্তও ছিল একেবারে সঠিক ও সময়োপযোগী। 
তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। বারবার আইসিসির টুর্নামেন্ট থেকে আমাদের ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। রোহিতদের বলব, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বজয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়। এই সুযোগ বারবার আসবে না। তোমরা পারবে। আমরা সবাই কাপটা জিততে চেয়েছিলাম শচীনপাজির জন্য। ওটাই ছিল ওঁর শেষ বিশ্বকাপ। এবার কাপটা জেতা উচিত কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের জন্য। উনি কত ভালো অধিনায়ক বা কত বড় কোচ, সেই হিসেবে না-ই বা গেলাম। তবে মানুষটা বড় ভালো। বরাবরই ক্লাসে ‘সেকেন্ড’ হয়েই থেকে গেলেন। বিশ্বকাপটা সত্যিই ওঁর প্রাপ্য।
বড় আসরে সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু এক্স ফ্যাক্টর কাজ করে। ২০১১ সালে বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা ছিল যুবরাজ সিংয়ের। ওঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সই বিশাল ফারাক গড়ে দিয়েছিল। ন’টি ম্যাচে ৩৬২ রান, বল হাতে ১৫টি উইকেট—প্রকৃত অর্থেই যুবিপাজি ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট। আসলে একদিনের ফরম্যাটে বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষেত্রে অলরাউন্ডারদের ভূমিকা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারতীয় দলেও কাউকে যুবরাজ সিং হয়ে উঠতে হবে। সেটা হার্দিক পান্ডিয়া কিংবা রবীন্দ্র জাদেজা হতে পারে। চার নম্বরে কে খেলবে, তা নিয়ে অনেক হইচই শুরু হয়েছিল। এখন কি তা শুনতে পাচ্ছেন? পাবেন না। দল জিতলে সব ব্যর্থতা নিমেষে ঢাকা পড়ে যায়। লোকেশ রাহুল চোট সারিয়ে দুরন্ত ফর্মে। শ্রেয়স আইয়ারও সেঞ্চুরি করল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ব্যাক-আপ হিসেবে রয়েছে ঈশান কিষান, সূর্যকুমার যাদব। আমার তো মনে হয়, সবাই যেভাবে সেরাটা মেলে ধরছে, তাতে সমস্যায় পড়বে ম্যানেজমেন্ট।
এবারের দলে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের মিশেল স্পষ্ট। এগারোর বিশ্বকাপ খেলছিল কোহলি। ও জানে, কীভাবে খেতাব ছিনিয়ে নিতে হয়। রোহিতের ট্রফি ভাগ্য দুর্দান্ত। ওদের ঘিরেই তো স্বপ্ন বুনছি আমরা। এর চাইতে ভালো ব্যাটিং লাইন-আপ কিছুই হতে পারে না। তবে আমার বাজি তরুণ তুর্কি শুভমান গিল। নায়ক হয়ে ওঠার সুযোগ ওঁর সামনে। কী অসাধারণ ব্যাটিংই না করছে ছেলেটা! ও রান পেলে রোহিত, কোহলির বোঝা কমবে। দেখবেন, গিলকে থামানো যাবে না।
বোলিংও যথেষ্ট শক্তিশালী। স্পিন বিভাগে রবীন্দ্র জাদেজার সঙ্গে কুলদীপ যাদবের জুটি ক্লিক করা উচিত। সঙ্গে অক্ষর প্যাটেল খারাপ চয়েস ছিল না। কিন্তু চোট তো বলেকয়ে আসে না। অশ্বিনকে দলে ফেরানোর সিদ্ধান্তটা একদম সঠিক। তবে যে সময়ে খেলা হচ্ছে, তাতে পেসারদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদিক থেকেও অ্যাডভান্টেজ টিম ইন্ডিয়া। বুমরাহকে দেখে মনে হচ্ছে না, ও বহুদিন মাঠের বাইরে ছিল। একই রকম খিদে লক্ষ্য করছি ওঁর বোলিংয়ে। সিরাজ এখন অনেক পরিণত। দারুণ স্যুইং রয়েছে হাতে। সামি হল পুরনো চাল ভাতে বাড়ার মতো। তবে শার্দূলকে দ্রুত ছন্দে ফিরতে হবে।
বিশ্বকাপ জেতার মতো সব উপাদানই মজুত এই ভারতীয় দলে। দরকার শুধু মনের জোর আর মাঠে নেমে সেরাটা মেলে ধরা। আমি আশাবাদী, ১৯ নভেম্বর মোতেরায় ফিরে আসবে ওয়াংখেড়ের সেই রাত।
অনুলিখন: সুকান্ত বেরা

1st     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা