বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

সরস্বত্যৈ নমো নমঃ
কৌশিক মজুমদার

আমাদের নয়ের দশকের মফস্বলে উত্তেজনার খোরাক বলতে খুব বেশি কিছু ছিল না। বিশেষ করে আমরা যারা সেকালে ছাত্র ছিলাম, তাদের জন্য। মাস্টারমশাই আর অভিভাবকদের গণ ছাতাপেটাইয়ের ফাঁকে বুধবার সন্ধ্যায় টিভিতে চিত্রহার আর রবিবার সকালের রঙ্গোলিতে কিছু বস্তাপচা গান বাদে গোটা হপ্তাটাই কৃষিকথার আসর আর ‘খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর মতো নেহাত নিরেস ছিল। বেশ কিছু পরে আমাদের দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল সুপারহিট মুকাবিলা আর বাবা সায়গলের ‘ঠান্ডা ঠান্ডা পানি’র পূজা বেদী। কিন্তু সে অন্য গল্প। 
সোজা কথায় আমাদের মত ‘কাঠ’ বয়েজ স্কুলের ছেলেদের কাছে মেয়েরা সেকালে ভয়ানক এক দূরতর দ্বীপ। তারা যখন মভ কালারের লেডিবার্ড সাইকেলে চেপে রাস্তা দিয়ে স্কুলের দিকে যায়, গোটা পাড়ায় অকাল বসন্ত নেমে আসে। আর লেডিজ স্কুলটাও ছিল তেমনি। আমি পীরবাবার পুকুরের ওপারের মেয়েদের স্কুলের প্রাচীর দেখিয়াছি। তিহার জেলের প্রাচীর দেখিতে চাহিনা আর। বিরাট বড় সিংহ দরজার সামনে গোঁফ পাকানো দারোয়ানকাকু অল্প বয়সি ছেলে দেখলেই রে রে করে তেড়ে আসত। আর কি এমন তুক জানি না, বহু ছেলের সাইকেলের চেন পরে যেত সেই স্কুলের সামনেটাতেই। এমন জাহাঁবাজ ইস্কুলের গেট আমাদের জন্য খুলত দুইদিন। এক, যেদিন সরস্বতী পুজোর নেমতন্ন করতে যাওয়া হবে আর দুই, যেদিন অ্যাকচুয়ালি পুজো। 
আমাদের স্কুলে এই নেমতন্ন করা ব্যাপারটায় প্রতিবার একজন কচিমতো স্যার দায়িত্ব পেতেন আর ছাত্রদের মধ্যে জনা তিন চার। তাও ক্লাস ইলেভেনের। জানুয়ারি পড়তে না পড়তে সে ক্লাসের সবাই আড়চোখে সবাইকে দেখে। স্যারের তখন র‌্যালাই আলাদা। আগুপিছু তিন চারটি বশংবদ প্রাণী ঘুরছে কৃপা পাওয়ার আশায়। অবশেষে যেদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আসত, সেদিন ধোপদুরস্ত জামাপ্যান্ট পরে পায়ের কেডসে চুনের পোঁতা মেরে সেই বাছাই করা তিন চারজন সকাল সকাল স্কুলে এসে হাজির। এই গ্রুপে সুবোধ বালক টাইপ একটা ফার্স্ট বয়কে থাকতেই হতো। সেদিন দেখি তারও চিবুক উপরে ওঠা। প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না। শুধু হুঁ আর হাঁ করে।
চকচকে নতুন সাইকেল চেপে তারা নেমতন্ন করতে রওনা হলে গোটা স্কুল জুড়ে দীর্ঘশ্বাসের এক উদাসী হাওয়া বয়ে চলত। যখন তারা ফিরত, গোটা ক্লাস ‘জাহাঁপনা তুসি গ্রেট হো’ বলে নুইয়ে দিত মাথা। বেঞ্চের উপরে বসে তারা একের পর এক গল্প করে চলত। বলত হেডম্যামের ঘরের ঠিক পাশেই ফিল্টার থেকে জল খাচ্ছিল যে মেয়েটি, সে কেমন করে পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে চেয়েছিল তার দিকে, কিংবা ফেরার পথে দোতলার জানলা থেকে কার নাম ধরে ডেকেছিল রিনিরিনে একটা গলা। উপরে তাকাতেই চকিতে সরে গিয়েছিল। শুধু লাল পাড়ের সাদা শাড়ির আঁচলটা দেখা গিয়েছিল নিমেষের জন্য।
সরস্বতী পুজোর আগে নাকি কুল খেতে নেই। মা সরস্বতী একবার একটা কুলের বীজ পুঁতে ব্যাসদেবকে বলেছিলেন, ‘এই বীজ বড় হয়ে, গাছ হয়ে, ফল হলে, সেই ফল পেকে তোমার মাথায় পড়লে, তবেই তোমার তপস্যা পূর্ণ হবে।’ সে তপস্যা শেষ হয়েছিল শ্রীপঞ্চমীর দিন। তাই এই দিনের আগে কুল নৈব নৈব চ। তবে অন্য তুকও ছিল। কুল যদি নিতান্ত খেয়েই ফেলি তবে মা সরস্বতীর থেকে ক্ষমা চেয়ে একখানা বীজ খেয়ে নিতে হবে শেষে। মা ক্ষমা না করলে পেট থেকে গাছ গজাবে। ‘সত্যি এমন হয়?’ জিজ্ঞেস করলেই সবাই জানাত, এটাই নাকি দস্তুর। গাছ গজানো ঢের মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। নেহাত চুলদাড়ি কাটার মতো নিয়মিত সে গাছের ডালপালা ছাঁটতে হয় এই যা। 
তারপর দুম করে একদিন চলেই আসত পুজোটা। সকাল হলেই কাঁচা হলুদ আর নিমপাতা মেখে লালচে গ্লিসারিন সাবানে স্নান। চাপা কলের জল থেকে হালকা ধোঁয়া উঠত। সেজেগুজে বাইরে বেরিয়েই দেখতে পেতাম গোটা পুজো সাদা আর হলুদ রঙে মাখামাখি। হলদে শাড়ি পরে কোনক্রমে আঁচল সামলাতে সামলাতে বটুয়া হাতে যে বালিকা সদ্য কেনা হিলতোলা জুতো পায়ে ‘অ্যাই একটু দাঁড়া না তোরা! পায়ে ফোসকা পড়েছে’ বলে খোঁড়াত, তাকে রোজই ব্যাচে দেখেও আজকের দিনে বড্ড অচেনা মনে হতো। কেমন যেন অলীক। সদ্য জাগা ভোরের মতো। পাড়ার ক্ষীণ প্যান্ডেলে বক্স বাজিয়ে ‘পৃথিবী হারিয়ে গেল মরু সাহারায়’ আর সনৎ সিংহের ‘সরস্বতী বিদ্যেবতী’।
গত এক হপ্তা ধরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দু’-পাঁচ টাকা করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কেনা হতো রঙিন কাগজ, শোলার চাঁদমালা আর ছোট্ট একখানি মাটির ঠাকুর। মুখখানা খবরের কাগজ দিয়ে ঢাকা। দশকর্মার জন্য ঠাকুরঘরে চুরি করতে হতো প্রায়ই। ‘এ চুরিতে পাপ লাগে না’—বলত সবাই। গোটা কয় লাল বাতাসা, কদমা, কলা আর সাদা তিল, খোয়াক্ষীর আর সন্দেশ মিশিয়ে তৈরি ‘তিলকুটো’। পুজোর আগের রাত জেগে নানা রঙের কাগজ কেটে, শিকল তৈরি করে ভোর হতে না হতেই চুপিচুপি বেরুতে হবে ফুল চুরি করতে। সেই সেবার লাল্টুদের বাড়ি ফুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে বান্টি। সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড! লাল্টুর বাবা বান্টিকে হাতেনাতে ধরে কান মুলতে, সেও নাকি তড়বড় করে কাকুর কান মুলে পালিয়েছে। এটা অবশ্য পরে লাল্টুর মুখে শুনেছি। কাকু নিজে কোনওদিন কিছু বলেননি।
এদিন পুরুত ঠাকুরের ডিমান্ড দেখতে হয়। আমাদের মতো কুচোকাঁচা প্যান্ডেলকে মারাদোনার দক্ষতায় ডজ কাটিয়ে চলে যেতেন পাশের বড় প্যান্ডেলে। সেখানে থালায় থালায় মরশুমি ফল, গ্যাঁদা ফুল ছড়ানো খিচুড়ি, গোল গোল করে কাটা আলুভাজার সঙ্গে বাঁধাকপির তরকারি। এককোণে কুলের চাটনি, রাজভোগ আর বোঁদে। সেই বোঁদে আবার তিন কিসিমের। লাল, হলুদ আর সাদা। সত্যি-মিথ্যে জানি না, সাদা বোঁদে নাকি আমাদের বাংলা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না! রং আলাদা হলেও স্বাদের খুব একটা তারতম্য নেই লাল আর হলুদ বোঁদের। কিন্তু বরবটির বেসন দিয়ে বানানো সাদা বোঁদের স্বাদই আলাদা। রামকৃষ্ণদেব এই বোঁদে খেতে বেজায় ভালবাসতেন।
পাড়ার পুজো মিটতেই পড়ি কি মরি করে স্কুলে দৌড়। এদিন সব স্কুলের অবারিত দ্বার। যখন ক্লাস টেনে পড়ি একবার এক ঘটনা ঘটল। ভ্যালেন্টাইনস ডে-র নাম অবধি তখনও কানে আসেনি, কিন্তু এই একটা পুজো যে প্রোপোজের জন্য বেশ জম্পেশ, সেটা সেই ইস্কুলবেলা থেকেই জানা ছিল। সেবার সরস্বতী পুজোর বেশ কিছুদিন আগেই লোকমুখে খবর এল আমাদের এক বন্ধু নাকি ভয়ানক প্রেমে পড়েছে। পড়া বলে পড়া! একেবারে ফেলে ছড়িয়ে একাকার অবস্থা।
বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল সব থেকে ডাকাবুকো। গুলতি দিয়ে পাখি মারা, কুকুরের লেজে কালিপটকা বাঁধা, ড্রেনের জল থেকে পুঁটিমাছ ধরা ইত্যাদি নানা কাজে সে ব্যস্ত থাকত। মারামারিতে তার উৎসাহ ছিল দেখার মতো। যেদিন ঢিল ছুঁড়ে কাউকে জব্দ করতে পারত, সেদিন তার মনে বিশেষ ফুর্তি দেখা যেত। এমনধারা ছেলে প্রেমে পড়লে তাকে দেখতে কেমন লাগে, দেখার ইচ্ছে ছিল খুব। দু’-তিনজন মিলে একসঙ্গে সেই বন্ধুর বাড়ি গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম তার সঙ্গে একটা দৃশ্যই তুলনীয়। ‘নরম গরম’ সিনেমায় রেডিও বুকে লাল পাঞ্জাবি পরা শত্রুঘ্ন সিনহার দশা।
আমাদের দেখে খুব নরম সুরে বলল, ‘আয়।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোর পড়াশুনো কেমন চলছে?’ দীইইইর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নেমে এল হৃদয়ের গহীন কোণ থেকে। ‘আর আমার পড়া!’ খুঁচিয়ে টুচিয়ে জানা গেল ক্লাস নাইনের এক গোলাপবালার প্রেমে পাগল সে। পুজোর দিন বিকেলে স্কুলের সামনে প্রোপোজ করার ইচ্ছে। 
সেবার পুজোর উৎসাহে বিশেষ ভাঁটা পড়ল। সবার মধ্যেই সেই প্রোপোজ নিয়ে একটা কী হয় কী হয় টাইপ উত্তেজনা। অভিজ্ঞ প্রেমিকরা তাদের শেষ মুহূর্তের টিপস দিতে ব্যস্ত। নব্য প্রেমিক ঘাড় গুঁজে সব শুনছে আর ঘনঘন মাথা ঝাঁকাচ্ছে। ফুল হাতা শার্ট, বন্ধুর থেকে নেওয়া নতুন জিন্সের প্যান্ট (লম্বায় বড়, তাই তলা গোটানো), আর এক বন্ধুর চার্লি সেন্ট মেখে বাবু তো রেডি।  আমরা জনা চার-পাঁচ বন্ধু মেয়েদের স্কুলের একটু দূরে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষায়। বেগতিক দেখলেই চম্পট মারব। খানিক বাদে মেয়েটি স্কুল থেকে বেরিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল বাড়ির দিকে। ছেলেটি টিং টিং করে সাইকেল চালিয়ে উপস্থিত হল মেয়েদের সামনে। তারপর পকেট থেকে একটা চিঠি বার করে মেয়েটির হাতে দিয়ে সোজা বলে দিল, ‘আই লাভ ইউ।’ মেয়েটি একটু ওভারস্মার্ট গোছের। যেন কিছুই হয়নি ভাব করে সোজা চিঠিটা হাতে নিয়ে দুই টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিল রাস্তায়।
ব্যস! আর যায় কোথায়! ছেলেটির পুরনো সত্তা চাগাড় দিয়ে উঠল নিমেষে। প্রাকৃত ভাষায় সে যা বলল, সাধু ভাষায় তার অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘হে রাসভনন্দিনী, তোকে এই সাহস কে দিয়াছে যে তুই আমার লেখা এই পত্রকে খণ্ড খণ্ড করিস! আমার প্রতি তোর প্রেম না থাকিতেই পারে, কিন্তু অতি কষ্টে লিখিত এই পত্রকে তুই অসম্মান করিস কী রূপে? এক্ষুণি ইহাকে মাটি হইতে উত্তোলন কর, না হইলে আমি তোর পিতাঠাকুরকেও ছাড়িব না।’
খুব স্বাভাবিক, ছেলেটির এই মূর্তি দেখে মেয়েটি একেবারে থতমত। তার বান্ধবীদের দু’-একজন আবার বিপদ দেখে ছেলেটির পক্ষ নিল। ‘না ভাই, তোর কিন্তু চিঠিটা ছেঁড়া উচিত হয়নি। পছন্দ না, সেটা মুখে বললেই হতো।’
কি আর করা? বেগতিক দেখে মেয়েটি ছেঁড়া চিঠি মাটি থেকে তুলল। এবার ছেলেটির দাবি, ‘এ চিঠি দিয়ে আমি কী করব! এটা কি আর কাউকে দেওয়া যাবে? আমি অতশত বুঝি না। আমি কত কষ্ট করে লিখেছিলাম। আমায় আবার এই খাতায় লিখে দিতে হবে।’ অগত্যা মেয়েটি সেই রাস্তায় দাঁড়িয়েই ছেঁড়া চিঠি দেখে গোটাটা কপি করে দিল, চোখে জল, হাত কাঁপাকাঁপা।
টেন পাশ করার পর মাঝে বহুবছর দেখা নেই সেই বন্ধুর সঙ্গে। খবরও নেই কোনও। বছর কয়েক আগে আচমকা একদিন বাজারে দেখা। বিবাহিত। পাশে একটি কচি শিশুকে কোলে নিয়ে সেই মেয়েটি। মাঝখানে কি হইতে কি হইয়া গেল জানা নেই, তবে কোনও এক সেপিয়া টোনের অতীতে প্রেম আসিয়াছিল এটুকু বুঝলাম।
একেই বোধহয় প্রজাপতির নির্বন্ধ বলে। নাকি সরস্বতীর নির্বন্ধ বলব?
অঙ্কন : সুব্রত মাজী

11th     February,   2024
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা