বিকিকিনি

ট্রেক করে যমুনার উৎসে

ফাচু কান্দি পেরিয়ে তমসা থেকে যমুনার দিকে যাত্রা। কেমন সেই অভিজ্ঞতা? জানালেন সুমন চট্টোপাধ্যায়

দেরাদুন থেকে শাঁকরি। সেখানে একরাত কাটিয়ে পরদিন গাড়িতে চলেছি তালুকা। দূরত্ব নয় কিলোমিটার। এখান অবধিই গাড়ি চলাচল করে। তবে ডাটমির অবধি রাস্তার কাজ চলছে। অদূর ভবিষ্যতে সেখানে গাড়ি চলে যাবে। এখানে আমাদের জন্য চারটে ঘোড়া নিয়ে দুটো ঘোড়াওয়ালা অপেক্ষা করছে। ঘোড়ার পিঠে মালপত্র চাপিয়ে আমাদের ট্রেক শুরু হল বেলা সাড়ে এগারোটায়। আমাদের ছ’জনের দলে গাইড, একজন কুক, একজন হেল্পার।
দু’হাজার মিটার উচ্চতার তালুকা থেকে তমসা নদীর পাশ দিয়ে সোজা চিরাচরিত পথ চলে গিয়েছে সীমা হয়ে হর কি দুন-এর দিকে। এই সমগ্র উপত্যকাটিকে বলা হয় তমসা উপত্যকা বা টনস ভ্যালি। আমাদের ট্রেক রুট ডানদিকে ঊর্ধ্বমুখী পথে তালুকা গ্রামের মধ্য দিয়ে। উঠতে উঠতে দেখলাম নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে তমসা নদী। দু’পাশে পাহাড়। অসাধারণ সুন্দর উপত্যকা। শস্যশ্যামলা তালুকা গ্রামে ফলে রয়েছে অজস্র লাল রামদানা। উঠে চললাম আপার তালুকার খেতের মধ্যে দিয়ে। এরপর গ্রাম শেষে শুরু হল পাইন, ফার, ওক গাছের ঘন জঙ্গল। নিবিড় অরণ্যের মধ্যে দিয়ে বিরক্তিকর টানা চড়াই পথ। সূর্যের আলো প্রায় ঢোকে না বললেই চলে। তাই পুরো পথটা ভেজা, স্যাঁতসেঁতে। পথের মাঝে কোথাও কোথাও গাছের বিশাল গুঁড়ি পড়ে আছে। সেসব টপকে টপকে চলা। গোরু, মোষ, খচ্চর চলে চলে অনেক জায়গাই কর্দমাক্ত। একঘেয়েমি পথে চলতে চলতে শেষবেলায় উঠে এলাম এক উন্মুক্ত বুগিয়ালে (ঘাসে মোড়া পাহাড়ি ঢালু প্রান্তর)। বিশাল প্রশস্ত বুগিয়াল। নাম পুসতারা। উচ্চতা ৩০৬৭ মিটার। দেখলাম শাঁকরি থেকে ফুলারা রিজ হয়ে এখানে এসে গোটা দশ বারোটা তাঁবু গেড়েছে অল্পবয়সি ছেলেমেয়ের এক বিরাট দল। কাল ওরা তালুকা নেমে যাবে।
আজও সকালে ঝকঝকে আকাশ। সোনারোদে ভেসে যাচ্ছে চরাচর। নাস্তা সেরে সাড়ে আটটায় স্যাক তুলে নিলাম পিঠে। বিস্তীর্ণ বুগিয়াল অঞ্চল, রডোডেনড্রনের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে কিছুক্ষণের বিশ্রাম। আজকের ট্রেকিংয়ের পথও বেশ ছোট। দূর থেকে দেখতে পেলাম বেশ উঁচুতে একফালি বুগিয়াল অঞ্চল। রোদ পড়ে ঝকঝক করছে। চড়াইপথে চলতে চলতে একটা সময় রডোডেনড্রনের ঝাড়ি শেষ হল। উঠে এলাম বিস্তীর্ণ এক চারণক্ষেত্রে। সবুজ মখমলের মতো ঢেউ খেলানো বুগিয়াল। এটাই দেখছিলাম দূর থেকে। জায়গাটার নাম তালোটি। ভাবলাম এখানেই আমাদের ক্যাম্প হবে। কিন্তু ঘোড়াওয়ালারা আরও কিছুটা এগিয়ে উপরের দিকে। গাইডের কথায় উঠে চললাম আরও উপরের দিকে, একটা ছোট সমতল জায়গায়। এখানে একটা পাথর দিয়ে তৈরি শেফার্ড হাট আছে। মেষপালকদের অস্থায়ী আস্তানা। তারই পাশে আমাদের তাঁবু পড়েছে। উপর থেকে ৩৬০ ডিগ্রি উন্মুক্ত। অসাধারণ লাগছে জায়গাটা। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে দেখার জন্য আদর্শ। এখন বাজে বেলা বারোটা। উচ্চতা ৩৫৮০ মিটার।
গরম গরম খিচুড়ি পাঁপড়ভাজা দিয়ে লাঞ্চ সেরে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম। বিকেল বিকেল বেরলাম আশপাশের অঞ্চলটা ঘুরে দেখতে। সামনে অনেকটা উঁচুতে ফুলারা রিজ, একের পর এক সবুজ বুগিয়াল, অনামী পাহাড়ি ফুলের সমারোহ। অন্যদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের বিস্তার। কোথা থেকে যেন সময় কেটে যায় ঘুরেফিরে। সন্ধে নামার মুখে ফিরে এলাম তাঁবুতে।
তালোটি আপার ক্যাম্প ছাড়লাম সকাল ৮.৪০-এ। প্রথমেই ঘাসের চাপড়া দিয়ে বুগিয়ালের দমফাটা চড়াই পথ। উপরে উঠে দম নিতেই সামনে আর একটি প্রশস্ত বুগিয়াল। প্রায় ৬০ ডিগ্রি থেকে ৭০ ডিগ্রি ঢাল। সোজাসুজি উঠে যাওয়া। উঠে এলাম উপরে। চারদিকে ধূসর, সবুজ, খয়েরি রঙের পাহাড়। তাতে বরফ নেই। নীচে নানা আকৃতির বুগিয়াল। এরপর পাহাড়ের গা পেঁচিয়ে করে শুরু হল একের পর এক পাহাড়ের ঢাল পেরনো। একটা সময় দূর থেকে একটা ক্যাম্পসাইট দেখা যায়। চিত্রিকুনাল ক্যাম্পসাইট। এখানেও মেষপালকদের পাথর বাঁধানো ঘর রয়েছে। তবে ফাঁকা। বিশাল এক পাথরের চাট্টানে (চাটাই) বসে সঙ্গে নিয়ে আসা প্যাকড লাঞ্চ দিয়ে আহার সারলাম। অনেক উঁচুতে রিজের ওপারে সারুতাল...। ধসা পাহাড়ের অঞ্চল। বেশ কষ্টকর চড়াই। উচ্চতা ৪১৪০ মিটার। তাল খুবই ছোট ও সরু। ক্যাম্পসাইটে জলের অভাব। তাই সারুতালে যাওয়ার ইচ্ছে ত্যাগ করে নেমে এলাম নীচের সুবিশাল ক্যাম্পসাইটে। এটাকে রাতেরি বা পাসের বেসক্যাম্পও বলা যেতে পারে। উচ্চতা ৩৯৮০ মিটার। দারুণ সুন্দর প্রশস্ত এক টেবিল টপ বুগিয়ালের উপর আমাদের ক্যাম্প করা হয়েছে। পাশেই উপর থেকে বয়ে আসছে সারু নালা। রাতেরিতে এই নালা বহুভাগে বিভক্ত। অনেকক্ষণ ধরেই আকাশে মেঘ জমছিল। কোহারায় ঢেকে যাচ্ছে চরাচর। একটু বাদেই মিহি বরফকুচি পড়া শুরু। ক্রমে তার গতি বাড়তে লাগল। পুরো বুগিয়াল মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল সাবুদানার মতো তুষারে। এরপর শুরু হল বৃষ্টি। বেশ অনেকক্ষণ চলল। তারপর ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করল। আগামী কাল পূর্ণিমা। তাই আমরাও ভরপুর চাঁদের আলোয় কিছুক্ষণ  কাটালাম। কিন্তু ঠান্ডার প্রকোপে বেশিক্ষণ থাকা গেল না। তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে নিজেকে সঁপে দিলাম।
আজ আমাদের ট্রেকের আসল দিন। আজ পাস ক্রসের দিন। গত রাত থেকেই একটা রোমাঞ্চ, আলাদা অনুভূতি। আজ আকাশ ঝকঝকে তকতকে। মিঠে রোদ এসে পড়ল তাঁবুতে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীরটা ওম ফিরে পেল। চটপট রেডি হয়ে নিলাম। পাসের দূরত্ব বেশি নয় বলেই বেরতে বেরতে পৌনে ন’টা। প্রথমেই একটা চড়াই ভেঙে উঠে এলাম উপরে। এখান থেকে ঘুরে দেখলাম আমাদের ফেলে আসা ক্যাম্পসাইট। উত্তরমুখী পথে একের পর এক পাথর পেরিয়ে চলা। ক্রমশ চোখের সামনে পরিষ্কার হচ্ছে পাসের অবস্থান। বাঁ দিকের পাহাড়গাত্রের রিজ দিয়ে সারুতাল থেকে পরিষ্কার পায়ে চলার পথ এসে মিলেছে পাসের সঙ্গে। পাসের দিকে লক্ষ রেখে এগিয়ে চলেছি। শেষমেশ চড়াই  ভেঙে উঠে এলাম ফাচু কান্দি পাসের উপর। উচ্চতা ৪২৫০ মিটার। ঘড়িতে সময় সকাল ৯.৪৫। পাসের উপর বরফের চিহ্নমাত্র নেই। ওপাশের দিকে দেখা যাচ্ছে কালানাগ, বন্দরপুঞ্চ, গঙ্গোত্রী-১ সহ বেশ কিছু তুষারশৃঙ্গ। দেখা যাচ্ছে যমুনা উপত্যকার বিস্তার। পাসের উপর পুজো দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে নামতে শুরু করলাম। নামার পথটা ঝুরো মাটি ও পাথুরে হলেও বেশ চওড়া। সামনে যমুনা উপত্যকার দিকে ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ বুগিয়াল। বেশ অনেকটা নেমে প্যাকড লাঞ্চ দিয়ে আহার সারলাম। এরপর রুক্ষতা কমে দেখা মিলল রডোডেনড্রন গাছের। ক্রমে তা ঘন হতে শুরু করল। তারপর ঝাউ, পাইন ইত্যাদি বড় বড় গাছের আধিক্য। নেমে এলাম মন্দিরা কা থাচ বুগিয়ালে। এটি বেশ বড় ও বিস্তীর্ণ। কাছেই রয়েছে ভৈসা তাল। বেশ কিছু গোরু মোষ চরে বেড়াচ্ছে। বুগিয়ালে  তাঁবু ফেলা হল।
পরদিন সকাল সাতটায়  নামা শুরু করলাম। বেশ কিছু বিপজ্জনক অঞ্চল পেরিয়ে পুসলা পৌঁছে গেলাম সাড়ে আটটায়। এখানে একসময় কুড়ি-পঁচিশ ঘর লোকের বসবাস ছিল। বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে ঘরগুলি। কোনও মানুষজন নেই। পুসলা পেরিয়ে প্রবেশ করলাম ঘন জঙ্গলের মধ্যে। ক্রমশ উতরাই আর উতরাই। লেকা চারণক্ষেত্র থেকে দেখা গেল দুরবিল গ্রাম। খেতের মধ্যে দিয়ে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ নেমে এলাম দুরবিল গ্রামে। দূর থেকে অনেক নীচে হনুমান চটি। গ্রাম ছাড়িয়ে আরও একঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম হনুমান চটি। এটি হনুমান গঙ্গা ও যমুনা নদীর সঙ্গমস্থল। এর সঙ্গেই শেষ হল ট্রেক। এখান থেকে গাড়িতে পাড়ি দেরাদুনের পথে।
প্রয়োজনীয় তথ্য: এই ট্রেকটি শাঁকরি থেকে কেদারকণ্ঠের পথে জুদা কা তালাও এবং সেখান থেকে ফুলারা রিজ হয়েও করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দু’দিন সময় বেশি লাগবে। প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র শাঁকরি চেকপোস্ট থেকেই নিতে হবে।
আমাদের এই ট্রেকের পুরো প্যাকেজ মূল্য ছিল দেরাদুন থেকে দেরাদুন ১৬ হাজার টাকা।
1Month ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
বিশেষ নিবন্ধ
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনি কর্মে ব্যস্ততা। ব্যবসা সম্প্রসারণে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা।...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮২.৮৫ টাকা৮৪.৫৯ টাকা
পাউন্ড১০৬.৪৩ টাকা১০৯.৯৫ টাকা
ইউরো৮৯.৬৩ টাকা৯২.৭৮ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা